মতামত

বাজেটের আগে স্বাস্থ্যবিষয়ক ভাবনা

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হলো ‘স্বাস্থ্য বাজেটবিষয়ক অনলাইন জাতীয় সংলাপ’। বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচ ও উন্নয়ন সমন্বয়ের যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এ সংলাপে প্রধান বক্তা ছিলেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আতিউর রহমান। গবেষণালব্ধ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে তিনি আগামী বাজেটের জন্য কিছু সুপারিশ পেশ করেন।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বিষয়ে সম্প্রতি অনেক আলোচনা হয়েছে এবং হচ্ছে। স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বে সবার চেয়ে পিছিয়ে। সরকার স্বাস্থ্যক্ষেত্রে জাতীয় আয়ের শতকরা ১ শতাংশেরও কম খরচ করে। একটি জাতি হিসেবে এবং বিশেষ করে অর্থনৈতিকভাবে অগ্রসরমাণ একটি দেশের জন্য এটা অনেকটা কলঙ্কের ও লজ্জার বিষয়। তথাপি প্রতিবছর যে যৎসামান্য টাকা বরাদ্দ হয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সেটাও ব্যয় করতে পারে না। অনেক টাকা উদ্বৃত্ত থেকে যায়। উপরিউক্ত প্রতিবেদন থেকে আমরা জানতে পারি যে ২০১৯-২০ অর্থবছরে মোট বরাদ্দের মাত্র ৬৮ শতাংশ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ব্যয় করতে পেরেছে। এর মধ্যে উন্নয়ন বাজেটের ব্যয়ের অবস্থা আরও শোচনীয়—মাত্র ৫১ শতাংশ। এর একটি প্রধান কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সুষ্ঠুভাবে বাজেট প্রণয়ন, প্রস্তাব এবং প্রাপ্ত তহবিল ব্যবহারের দক্ষতার অভাব।

আমরা যদি ২০৩০ সালে এসডিজি অর্জন করতে চাই, যদি ২০৪১ সালে উন্নত দেশের কাতারে নাম লেখাতে চাই, তাহলে স্বাস্থ্য খাতে আমাদের নজর দিতেই হবে। আমাদের অর্জন অনেক, তবে এখানে আত্মতুষ্টির কোনো অবকাশ নেই। স্বাস্থ্যব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে হলে সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। সরকারকে সাহসী ভূমিকা নিয়ে স্বাস্থ্যব্যবস্থার সেই পরিবর্তনের দিকে এগোতে হবে। পদ্মা সেতু বা বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি সরকারের সাহসী ভূমিকা।

আমার মনে হয়, সেখানে একটি বিশেষ ঘাটতি হলো দূরদৃষ্টি। ভবিষ্যতে, অর্থাৎ ২০৩০ বা ২০৪১ সালে, আমরা কী ধরনের স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রত্যাশা করি, তার ‘চিন্তা-দৈন্য’ একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করে বলে আমার মনে হয়। ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ৩ দশমিক ৮ এবং সরকারের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন দলিলপত্রে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসুরক্ষা বা ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজ (ইউএইচসি) অর্জনে সরকারের অঙ্গীকারের কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। দুঃখজনক হলো, এটা কীভাবে অর্জিত হবে, তার কোনো রোডম্যাপ নেই বা সে সম্পর্কে কেউ কিছু বলছেন না।

অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ বেশ সার্থকভাবেই করোনা পরিস্থিতির মোকাবিলা করেছে বা করছে। করোনা থেকে উত্তরণে বাংলাদেশের সাফল্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হয়েছে, যা আমাদের আপ্লুত করে। আমরা জানি যে প্রতিটি সংকটেরই একটা ইতিবাচক দিক থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের দেশগুলো ধ্বংসাবশেষের ওপর তৈরি করে তাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, যার মাধ্যমে প্রত্যেক নাগরিকের জন্য নিখরচায় উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিশ্চিত হয়। নব্বইয়ের দশকে এক নৃশংস গণহত্যার পর আফ্রিকার দেশ রুয়ান্ডা তৈরি করল তাদের সর্বজনীন স্বাস্থ্যসুরক্ষা বা ইউএইচসি কর্মসূচি। আমার মতে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে করোনা একটি মহাসুযোগ এনে দিয়েছে। এ লক্ষ্যে জাতি হিসেবে আমাদের কী কী করতে হবে, সে ব্যাপারে দেশের বিজ্ঞজন মোটামুটি এক জোট। এই অ্যাজেন্ডাকে মোটা দাগে পাঁচ ভাগে ভাগ করা যায়।

এক. উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশন বা কাউন্সিল সৃষ্টি করা, যার কাজ হবে দেশব্যাপী স্বাস্থ্যসুরক্ষা বা ইউএইচসি কর্মসূচি কীভাবে চালু করা যায়, তার রোডম্যাপ তৈরি করা এবং তা বাস্তবায়নে নজরদারি করা।

দুই. স্বাস্থ্যব্যবস্থার জবাবদিহি নিশ্চিতকল্পে একটি ‘ন্যাশনাল হেলথ সিকিউরিটি অফিস’ স্থাপন, যার কাজ হবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ‘পারচেজার’ ও ‘প্রোভাইডার’ ভূমিকাকে আলাদা বা বিযুক্ত করা।

তিন. সুশাসন ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।

চার. বাজেটে প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা বা প্রাইমারি হেলথ কেয়ারের অগ্রাধিকার বাড়ানো, যার মাধ্যমে এখানে বিনিয়োগ বর্তমানের ২৫ থেকে পর্যায়ক্রমে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশে নিয়ে যাওয়া যায়।

পাঁচ. গবেষণায় উপযুক্ত বিনিয়োগ করা এবং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা বৃদ্ধি।

আমার বিশ্বাস, এই পথ ধরে চললে আমরা ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা এবং রূপকল্প ২০৪১-এর দিকে দৃপ্ত পদভারে এগিয়ে যেতে পারব। তবে তার জন্য দরকার এখনই সেই লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করা।

গত এক দশকে সরকার বারবার ইউএইচসি বাস্তবায়নে তাদের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত ইউএইচসি-সংক্রান্ত সম্মেলনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও তাঁর সরকারের পূর্ণ অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন। সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের এখনই সময়। আমরা যদি ২০৩০ সালে এসডিজি অর্জন করতে চাই, যদি ২০৪১ সালে উন্নত দেশের কাতারে নাম লেখাতে চাই, তাহলে স্বাস্থ্য খাতে আমাদের নজর দিতেই হবে। আমাদের অর্জন অনেক, তবে এখানে আত্মতুষ্টির কোনো অবকাশ নেই। স্বাস্থ্যব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে হলে সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। সরকারকে সাহসী ভূমিকা নিয়ে স্বাস্থ্যব্যবস্থার সেই পরিবর্তনের দিকে এগোতে হবে। পদ্মা সেতু বা বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি সরকারের সাহসী ভূমিকা।

স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংস্কারের ক্ষেত্রে সেই একই ধরনের একাগ্রতা প্রয়োজন। সরকারের নীতি নির্ধারণে যাঁরা জড়িত, তাঁদের এ–ও বুঝতে হবে যে ইউএইচসি বাস্তবায়িত হলে রাজনৈতিকভাবে তাঁরা কতটা উপকৃত বা লাভবান হবেন। আমরা দেখেছি, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ যেমন থাইল্যান্ড, মেক্সিকো বা চিলিতে ইউএইচসি বাস্তবায়িত হওয়ার ফলে তাদের সরকারের জনপ্রিয়তা যে আকাশচুম্বী হয়েছিল, শুধু তা-ই নয়, এর মাধ্যমে সেই দেশের ভাবমূর্তি এবং মর্যাদা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছিল।

আশা করব, আগামী বাজেটে ইউএইচসি এবং এর রোডম্যাপ নিয়ে আলোচনার অবতারণা হবে এবং এর জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকবে। এই প্রবন্ধের প্রথমেই যে জাতীয় সংলাপের কথা বলা হয়েছিল, সেখানে বেশ কয়েকজন সম্মানিত সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা তাঁদের গুরুগম্ভীর বক্তব্য দিয়েছেন। আমরা আশা করব, সংসদেও ইউএইচসি এবং ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে তাঁরা সোচ্চার হবেন।

  • ড. আহমদ মোশতাক রাজা চৌধুরী বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচের আহ্বায়ক ও কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক