লাতিন আমেরিকা

বামপন্থীদের দিন কি শেষ হয়ে যাচ্ছে?

ব্রাজিলের সদ্য ক্ষমতা হারানো প্রেসিডেন্ট দিলমা রুসেফ
ব্রাজিলের সদ্য ক্ষমতা হারানো প্রেসিডেন্ট দিলমা রুসেফ

সম্প্রতি লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে, যাতে মনে হচ্ছে ওই অঞ্চলে বামপন্থীদের দিন শেষ হতে যাচ্ছে। উত্থান হচ্ছে ডানপন্থীদের। কলম্বিয়া গত রোববার সে দেশের মার্ক্সবাদী ফার্ক বিদ্রোহীদের সঙ্গে সরকারের একটি শান্তিচুক্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। এর মধ্য দিয়ে দেশটির সাবেক রক্ষণশীল প্রেসিডেন্টের বিজয় হলো, যিনি কিনা এই শান্তিচুক্তির বিরুদ্ধে বেশ ভালোভাবেই প্রচারণা চালিয়েছিলেন। এদিকে একই দিনে ব্রাজিলে মেয়র নির্বাচনে দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট দিলমা রুসেফের বামপন্থী দল ওয়ার্কার্স পার্টির ভরাডুবি ঘটেছে। এর আগে ব্রাজিলের আইনপ্রণেতারা রুসেফকে অভিশংসন করে তাঁকে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরিয়ে দেন। আর্জেন্টিনায় এক বছরের কম সময়ের মধ্যে ভোটাররা বামপন্থীদের আন্দোলন ব্যর্থ করে দেয়। পেরুর ভোটাররা সম্প্রতি একজন সাবেক ব্যাংকারকে তাঁদের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করেছেন। এসব ঘটনা দক্ষিণ আমেরিকায় ক্ষমতার ভার বামপন্থীদের কাছ থেকে ডানপন্থীদের হাতে যাওয়ার লক্ষণ বৈকি।
ব্রাজিলের ফান্ডাকাও গেতুলিও ভারগাস বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক মাতিয়াস স্পেকটর বলেন, খালি চোখেই দেখা যাচ্ছে, লাতিন আমেরিকায় রক্ষণশীল তথা ডানপন্থীদের উত্থান হচ্ছে। এই প্রবণতার পেছনে কাজ করছে বেশ কয়েকটি কারণ। এর মধ্যে রয়েছে জিনিসপত্রের দাম অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়া, যা গোটা লাতিন আমেরিকার অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কিন্তু লাতিন আমেরিকার নেতারা বসে থাকেননি। একের পর এক নেতা বাজারবান্ধব নীতি গ্রহণ করা শুরু করলেন। এর ফলে গত দশকে বামপন্থী নেতারা দক্ষিণ আমেরিকাজুড়ে যে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন, যেসব কর্মসূচি ও নীতি চালু করেছিলেন, তার অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়। তাঁদের কর্মকাণ্ড এখন অনেকটাই প্রশ্নবিদ্ধ। ব্রাজিলের লুই ইনাসিও লুলা ডি সিলভা ও আর্জেন্টিনার ফার্নান্দেজ ডি কার্শনারের মতো দক্ষিণ আমেরিকার একসময়ের প্রভাবশালী বামপন্থী প্রেসিডেন্টদের বিরুদ্ধে এখন দুর্নীতির তদন্ত হচ্ছে।

তবে এখনো রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা এই বলে সতর্ক করছেন যে বামপন্থী নেতাদের নেওয়া নীতি ও কর্মসূচিগুলোকে একেবারে ফেলে দেওয়ার কিছু নেই। কেননা, বিগত বছরগুলোতে এসব নীতি ও কর্মসূচিই প্রশংসা কুড়িয়েছিল এবং বামপন্থী সরকারগুলোকে ক্ষমতায় বসে থাকতে সাহায্য করেছিল। এখনো তাঁদের অনেক কর্মসূচি প্রশংসিত হচ্ছে। যেমন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট মাইকেল টেমার ও আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট মরিসিও ম্যাকরি সম্প্রতি বামপন্থীদের নেওয়া দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচিগুলোর প্রতি তাঁদের সমর্থন ব্যক্ত করেছেন।

পেরুর নতুন প্রেসিডেন্ট পেদ্রো পাবলো কুচজিনস্কি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী কেইকো ফুজিমোরিকে হারানোর জন্য বামপন্থীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি জোটের ওপরই নির্ভর করেছিলেন। ফার্ক বিদ্রোহীদের সঙ্গে কলম্বিয়ার শান্তিচুক্তির প্রস্তাবকে অনেকেই সমর্থন করেছিলেন। কলম্বিয়ার জনগণ অবশ্য ফার্ক বিদ্রোহীদের সঙ্গে সরকারের শান্তিচুক্তির বিষয়টিকে ভালো চোখে দেখেনি। কারণ, তাঁরা মনে করেছিলেন যে এর মধ্য দিয়ে বিদ্রোহীদের উদারতা দেখানো হবে। এর ফলে অনেক বিদ্রোহী নির্বিঘ্নে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবেন।

লাতিন আমেরিকার নেতারা তাঁদের দেশে পরিবর্তনের এই বিষয়টিতে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। চিলির প্রেসিডেন্ট মিশেল ব্যাশেলেট ২০১৩ সালে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে ফের ক্ষমতায় আসেন। তাঁর মূল এজেন্ডা ছিল দেশ থেকে বৈষম্য দূরীকরণ। কিন্তু মন্দা অর্থনীতি এবং একটি আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনায় তাঁর পরিবারের সদস্যদের জড়িত থাকার ঘটনা ফাঁস হওয়ার পর তিনি এখন এসব দিকে মনোযোগী হয়েছেন। অর্থনীতি চাঙা করার আশায় নতুন অর্থমন্ত্রী নিয়োগ দিয়েছেন।

ব্রাজিলে ডানপন্থীদের উত্থান রাজনৈতিক বিভেদেরই ফল। দিলমা রুসেফের সমর্থকেরা বলছেন, তাঁকে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরিয়ে দেওয়াটা অভ্যুত্থানেরই সমান। তাঁরা বর্তমান প্রেসিডেন্ট টেমার লুলিয়ার বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। সাবেক এই ভাইস প্রেসিডেন্টও
দিলমা রুসেফের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। টেমারের মধ্যপন্থী দল ব্রাজিলিয়ান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট পার্টির প্রার্থীরাও গত রোববারের মেয়র নির্বাচনে ব্রাজিলের বড় শহরগুলোতে হেরে গেছেন। তবে ব্রাজিলিয়ান সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থীরা বড় জয় পেয়েছেন। দলটি একসময় সে দেশের সামরিক শাসনের তীব্র বিরোধিতা করেছিল।

বলিভিয়ায় প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেসের বামপন্থী সরকার দেশের অর্থনীতি সুব্যবস্থাপনার জন্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে বলিভিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, তারা ধারণা করছে যে এ বছর তারা জাতীয় প্রবৃদ্ধির হার ৫ শতাংশ বাড়াতে পারবে। তবে সম্প্রতি দেওয়া এক বক্তৃতায় বলিভিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট আলভারো গার্সিয়া লিনেরা পর্যন্ত স্বীকার করেছেন যে লাতিন আমেরিকায় বামপন্থীদের প্রভাব কমছে। লিনেরা বলেন, ‘এই অঞ্চলে আমরা একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণের মুখোমুখি হচ্ছি।’ তিনি বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে অতীতে লাতিন আমেরিকায় রক্ষণশীলদের উত্থানের তুলনা করে বলেন, ‘আশি ও নব্ব​ইয়ের দশকে আমরা যা শিখেছিলাম, তা থেকে আমাদের অবশ্যই শিখতে হবে, যখন সবকিছু আমাদের বিরুদ্ধে ছিল।’

লাতিন আমেরিকার একটি উল্লেখযোগ্য অংশে তাঁদের প্রভাব বিস্তার করলেও এখন তাঁদের সংকটাবস্থার সঙ্গে রক্ষণশীল রাজনীতিকদের মিল পাওয়া যাচ্ছে, যাঁরা একসময় লাতিন আমেরিকার ক্ষমতা থেকে উৎখাত হয়েছিলেন।

জার্মানির আর্থিক প্রতিষ্ঠান আলিয়ানজের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা মোহামেদ এ এল এরিয়ান বলেছেন, এখন ডানপন্থী দলগুলোর নীতিগুলো এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মোহমুক্তি ঘটানোর ক্ষেত্রে সহায়ক হবে।

নিউইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনুবাদ রোকেয়া রহমান

সাইমন রোমেরো: মার্কিন সাংবাদিক।