মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে বসবাসরত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর সহিংসতার কারণে লাখ লাখ রোহিঙ্গা নাফ নদী পার হয়ে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী টেকনাফ ও উখিয়া উপজেলায় অবস্থান নিয়েছে। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি বেশ জটিল বলে মনে হচ্ছে। এখনো শরণার্থীরা আসছেন। ১৯৭৮ সালে মিয়ানমার থেকে আড়াই লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছিল। পরবর্তী সময়ে, নব্বই দশকের শুরুতে আরও প্রায় চার লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। অতিসম্প্রতি মিয়ানমারে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। জাতিসংঘের সূত্রমতে, বর্তমানে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা ১০ লাখের কাছাকাছি।
৩৯ বছর ধরে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ধারণ করলেও স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত কোনো সরকারই উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শরণার্থীকে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে সক্ষম হয়নি। মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের সে দেশের নাগরিক হিসেবে গণ্য করে না। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের একাংশ হয়তো এ দেশেই থেকে যাবে, যেমনটি থেকে গেছে বাংলাদেশে আটকে পড়া পাকিস্তানি বিহারিরা। বর্তমানে বাংলাদেশের ১৩টি স্থানে প্রায় ৬৬টি ক্যাম্পে পাঁচ লাখের বেশি আটকে পড়া বিহারি অবস্থান করছে।
বাংলাদেশে পালিয়ে আসা লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর জন্য আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণে প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ সরকারি খাসজমি। সীমান্তবর্তী উপজেলা টেকনাফ ও উখিয়ায় পর্যাপ্ত পরিমাণে খাসজমি না থাকায় আশ্রয়শিবির নির্মাণে সরকার বেছে নিয়েছে টেকনাফ অভয়ারণ্য–সংলগ্ন সংরক্ষিত বনের অংশবিশেষ। ইতিমধ্যে প্রায় চার হাজার একর পাহাড় ও সংরক্ষিত বনাঞ্চল উজাড় করে শরণার্থী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। নতুন করে বাংলাদেশে প্রবেশকারী মিয়ানমারের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য অস্থায়ী ভিত্তিতে আশ্রয়শিবির স্থাপনে বনের আরও প্রায় দুই হাজার একর জায়গা অধিগ্রহণ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, বন আইন-১৯২৭-এর আওতায় ১৯৩১ সালে ৩০ হাজার একর আয়তনের এ বনটিকে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়, যার অবস্থান টেকনাফ অভয়ারণ্যের দুই কিলোমিটারের মধ্যে। বাংলাদেশের বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন ২০১২-এর ৪/১৪ (ক)-এ পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে অভয়ারণ্যের দুই কিলোমিটারের মধ্যে কোনো প্রকার অবকাঠামো বা স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না। কিন্তু দেশের প্রচলিত বন আইন, বন্য প্রাণী আইন, পরিবেশ আইন ও নীতিমালার তোয়াক্কা না করে নির্বিচারে বন ও পাহাড় নিধনের মাধ্যমে টেকনাফ অভয়ারণ্যের কাছে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য আশ্রয়শিবির নির্মাণ করা হচ্ছে। উপরন্তু জাতিসংঘের অর্থায়নে বন বিভাগের জায়গায় সংরক্ষিত বনের ভেতরে রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ বন বিভাগের মতামতের ভিত্তিতে জাতীয় স্বার্থে সরকার রিজার্ভ ফরেস্টে জায়গা অধিগ্রহণ করতে পারে। বন বিভাগ টেকনাফ অভয়ারণ্যের নিকটতম দূরত্বে অবস্থিত সংরক্ষিত উখিয়ার ঘাট মৌজায় শরণার্থী শিবির স্থাপনে লিখিত আপত্তি জানালেও তা আমলে নেওয়া হয়নি।
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮(ক)-এ বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করিবেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্য প্রাণীর সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করিবেন।’ স্বাভাবিকভাবেই দেশের বন, বন্য প্রাণী ও বনের পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিতের দায়দায়িত্ব বর্তায় বাংলাদেশ সরকারের বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অধিভুক্ত বাংলাদেশ বন বিভাগের ওপর। সরকারের উচ্চপর্যায়ের উচিত টেকনাফ অভয়ারণ্যের নিকটতম দূরত্বে যেকোনো প্রকার অবকাঠামো বা আশ্রয়শিবির নির্মাণের আগে বন বিভাগের মতামতকে আমলে নেওয়া।
বলা প্রাসঙ্গিক, টেকনাফ অভয়ারণ্যটি বিলুপ্তপ্রায় বন্য প্রাণী এশিয়ান প্রজাতির হাতির অন্যতম আবাসস্থলরূপে পরিচিত। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএন পরিচালিত সর্বশেষ জরিপে দেখা যায়, টেকনাফ অভয়ারণ্যে ৬০-৭০টি বন্য হাতি অবস্থান করছে। অভয়ারণ্যের সন্নিকটে অবস্থিত রিজার্ভ উখিয়ার ঘাট এলাকাটিও বন্য হাতির অন্যতম বিচরণক্ষেত্র। বন্য হাতির আবাসস্থল কমে যাওয়ায় টেকনাফ-উখিয়া অঞ্চলে হাতি-মানুষের দ্বন্দ্বের মাত্রা ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অভয়ারণ্যের আশপাশের লোকালয়ে প্রায়ই বন্য হাতির দল হানা দিয়ে থাকে। অভয়ারণ্যে অবস্থানরত বন্য হাতির একটি অংশ বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে বেশ কয়েকটি করিডর অনুসরণ করে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সীমান্তসংলগ্ন বনাঞ্চলে চষে বেড়ায়, তার মধ্যে বালুখালী-নাইক্ষ্যংছড়ি করিডরটি অন্যতম। রিজার্ভ উখিয়ার ঘাট মৌজায় শরণার্থী শিবির স্থাপিত হলে বন্য হাতি চলাচলের পথটি বাধাগ্রস্ত হবে। ফলস্বরূপ, রিজার্ভ ফরেস্ট–সংলগ্ন লোকালয়ের পাশাপাশি আশ্রয়শিবিরেও বন্য হাতির আক্রমণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা প্রকারান্তরে স্থানীয় জনসাধারণের জানমালের প্রতি হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। খবরে প্রকাশ, অতিসম্প্রতি অভয়ারণ্য–সংলগ্ন শরণার্থীদের জন্য নির্মিত আশ্রয়শিবিরে বন্য হাতির আক্রমণে দুজন শরণার্থীর প্রাণহানি ঘটেছে।
শরণার্থী শিবিরটি বন্য হাতি চলাচলের পথে নির্মিত হয়েছিল। অনুরূপভাবে বনের ভেতরে পাহাড় নিধনের মাধ্যমে আশ্রয়শিবির নির্মিত হলে যেকোনো মুহূর্তে ভূমিধসের কারণে আশ্রিত শরণার্থীদের প্রাণহানি ঘটতে পারে। প্রায় দুই মাস আগে চট্টগ্রাম, রাঙামাটি ও বান্দরবানে সংগঠিত পাহাড়ধসে অর্ধশতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছিল, যাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন সেনাসদস্যও ছিলেন। এ কারণে দেশের বন ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, বনাঞ্চল ধ্বংস ও পাহাড় নিধনের মাধ্যমে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের পরিধি বৃদ্ধিতে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ যেকোনো সময় এ অঞ্চলে বসবাসরত বাংলাদেশি নাগরিক ও রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য পরিবেশগত বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
দুঃখজনক হলেও সত্য যে এ ব্যাপারে দেশের পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো নিশ্চুপ ভূমিকা পালন করছে। প্রাসঙ্গিক কারণে বলতে হয়, রিজার্ভ উখিয়ার ঘাট মৌজায় শরণার্থী শিবির স্থাপিত হলে টেকনাফ অভয়ারণ্যের ক্ষয়িষ্ণু প্রাকৃতিক পরিবেশ আরও বেশি হুমকির মুখে পড়বে। কুতুপালং আশ্রয়শিবিরে বসবাসরত সহায়-সম্বলহীন রোহিঙ্গা শরণার্থীদের অনেকেই জীবন-জীবিকার তাগিদে বাড়তি আয়ের লক্ষ্যে অভয়ারণ্যের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, শরণার্থীদের একটি অংশ স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় অভয়ারণ্যে প্রবেশ করে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করে এবং তা নিকটস্থ বাজারে এনে বিক্রি করে। সুযোগ পেলে বনজ বৃক্ষ নিধনের পাশাপাশি মায়া হরিণ শিকারও চলে। যার পরিণতিতে টেকনাফ অভয়ারণ্যের আজ এই ন্যাড়া দশা। সাড়ে ১১ হাজার হেক্টরের অভয়ারণ্যটি আজ বৃক্ষশূন্য হতে চলেছে। বন ধ্বংসের কারণে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে অনেক বিরল প্রজাতির বন্য প্রাণী। ফলে অভয়ারণ্যটি একপর্যায়ে ইকো ট্যুরিজমের গুরুত্ব হারিয়ে ফেলবে নিঃসন্দেহে। এই প্রেক্ষাপটে অভয়ারণ্য–সংলগ্ন সংরক্ষিত বনভূমি ও পাহাড় নিধনের মাধ্যমে শরণার্থী শিবির স্থাপন কতটুকু যৌক্তিক হতে পারে, সরকারকে তা ভেবে দেখতে হবে।
মিয়ানমার থেকে আসা নির্যাতিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়া নিঃসন্দেহে মানবিক বিষয়। আবেগের বশবর্তী না হয়ে এ মুহূর্তে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মানবিক বিপর্যয় রোধে প্রয়োজন সুপরিকল্পিত শরণার্থী ব্যবস্থাপনা। দেশের বন ও ক্ষয়িষ্ণু পরিবেশকে বিপন্ন করে, সামাজিক নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে মানবিক বিপর্যয় রোধ করা সম্ভব নয়। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহযোগিতায় ভাগ্যবিড়ম্বিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রস্তাবিত ভাসান চরে দ্রুত স্থানান্তর করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
ড. এ এইচ এম রায়হান সরকার: শিক্ষক ও গবেষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
dr.raihan.sarker@gmail.com