
১৫ বছর আগে গ্লোবালাইজেশন অ্যান্ড ইটস ডিসকনটেন্টস শিরোনামে একটি বই লিখেছিলাম, যার প্রতিপাদ্য ছিল উন্নয়নশীল পৃথিবীতে বিশ্বায়নজনিত সংস্কারের বিরোধিতা। ব্যাপারটা রহস্যময় লেগেছিল। কারণ, উন্নয়নশীল দেশের জনগণকে বলা হয়েছিল, বিশ্বায়নের কারণে সামগ্রিকভাবে মানুষের জীবন উন্নত হবে। কিন্তু কেন তাহলে এত মানুষ বিশ্বায়নের ব্যাপারে বৈরী হয়ে উঠেছে। আর এখন দেখা যাচ্ছে, উন্নয়নশীল পৃথিবীর বিশ্বায়নবিরোধীদের সঙ্গে উন্নত দেশের লাখ লাখ মানুষ গলা মিলিয়েছে। রুজভেল্ট ইনস্টিটিউটের স্ট্যানলি গ্রিনবার্গ ও তাঁর সহকর্মীদের সমীক্ষা এবং বিভিন্ন মতামত জরিপে দেখা গেছে, বাণিজ্য হচ্ছে মার্কিনদের মনে অসন্তোষ সৃষ্টি হওয়ার অন্যতম কারণ। ইউরোপেও একই দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যাচ্ছে।
কেন এমনটা হচ্ছে—এর উত্তরে নব্য উদারনীতিবাদী অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন হয়েছে। তাঁরা আসলে ব্যাপারটা বুঝতে পারছেন না। ফলে মনস্তত্ত্ববিদেরা আসলে তাঁদের এই অসন্তোষের কারণ ব্যাখ্যা করতে পারেন, অর্থনীতিবিদেরা নন।মানুষের আয়সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত থেকে দেখা যায়, বিশ্বায়নের কারণে নব্য উদারনৈতিক গোষ্ঠী উপকৃত হতে পারে। কিন্তু উন্নত দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবনমানের অবনমন ঘটেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিচু স্তরের ৯০ শতাংশ মানুষের আয় গত এক শতকের মধ্যে তৃতীয়বারের মতো স্থবির হয়ে গেছে। পূর্ণকালীন পুরুষ কর্মীদের গড় আয় ৪২ বছরের আগের তুলনায় বাস্তবে (মূল্যস্ফীতি-সমন্বিত) কমে গেছে। আর নিচের স্তরের মানুষের প্রকৃত মজুরি আজ ৬০ বছর আগের পর্যায়ে চলে গেছে। মার্কিন জনগণের গড় আয়ুর দিকে তাকালেও ব্যাপারটা বোঝা যায়। অর্থনীতিবিদ আন কেস ও অ্যাঙ্গাস ডেটন দেখিয়েছেন, একশ্রেণির শ্বেতাঙ্গ মার্কিনদের গড় আয়ু কমেছে। তবে ইউরোপের অবস্থা এর চেয়ে কিছুটা ভালো।
ব্রাঙ্কো মিলানোভিচ তাঁর নতুন বই গ্লোবাল ইনইকুয়ালিটি: অ্যা নিউ অ্যাপ্রোচ ফর দ্য এইজ অব গ্লোবালাইজেশন-এ আমাদের নতুন অন্তর্দৃষ্টির সন্ধান দিয়েছেন। তিনি ১৯৮৮-২০০৮ কালপর্বে যাঁরা বড় দান মেরেছেন, আর যাঁরা বড় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন; তাঁদের তুলনামূলক অবস্থান বিচার করে এটা করেছেন। যাঁরা দান মেরেছেন তাঁরা পৃথিবীর সেই ১ শতাংশ; এঁদের মধ্যে যেমন ক্ষমতাশালী বণিক আছেন, তেমনি উন্নয়নশীল দেশের মধ্যবিত্তরাও আছেন। আর যাঁরা হারিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে আছেন নিচের স্তরের লোকেরা এবং উন্নত দেশের মধ্য ও শ্রমিক শ্রেণির লোকজন। তবে বিশ্বায়নই এর একমাত্র কারণ নয়, এটি অনেকগুলোর মধ্যে একটি।
অধিকাংশ নব্য উদারনীতিবাদী অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে নিখুঁত বাজারের ধারণা পাড়া হয়। বলা হয়, মুক্ত বাণিজ্যের কারণে সারা পৃথিবীতেই অদক্ষ শ্রমিকের মজুরি সমান হয়। পণ্য বাণিজ্য আসলে মানুষের চলাচলের বিকল্প হিসেবে পরিগণিত হয়। চীন থেকে পণ্য আমদানি করা হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অদক্ষ শ্রমিকের চাহিদা পড়ে যায়, যেসব পণ্য তৈরিতে অনেক অদক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন হয়।
ব্যাপারটা এত প্রবল যে পরিবহন খরচ না থাকলে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের প্রযুক্তির মতো প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা না থাকলে চীনের শ্রমিকেরা দলে দলে যুক্তরাষ্ট্রে আসতে থাকতেন, যত দিন না মজুরির পার্থক্য দূর হয়। ফলে নব্য উদারনীতিবাদীরা যে বাণিজ্য উদারীকরণের এই পরিণতির কথা প্রচার করেননি, তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। উল্টো তাঁরা দাবি করেছেন, নব্য উদারনীতিবাদ সবার জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে। কেউ বলতে পারেন, তাঁরা মিথ্যা বলেছেন।
নব্য উদারনীতিবাদ যে মূলধারার রাজনীতিকদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারেনি তার কারণে ‘ক্ষমতাকাঠামোর’ বিশ্বাসযোগ্যতা বিনষ্ট হয়েছে। আর যে ব্যাংকগুলো ২০০৮ সালের আর্থিক সংকট সৃষ্টি করল, সরকার তাদের বেইল আউট করে এটা বুঝিয়ে দিল যে এই ব্যর্থতা স্রেফ অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনাজাত নয়।
বিশ্বায়নের কারণে যারা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্যরা তাদের সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাবেরও বিরোধিতা করেছেন। আরও সাধারণভাবে বললে, নব্য উদারনীতিবাদীরা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য কল্যাণমূলক পদক্ষেপেরও বিরোধিতা করেছেন। দৃশ্যত, তাঁরা প্রণোদনার ক্ষতিকর প্রভাবের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন ছিলেন।
কিন্তু ব্যাপারটা দুদিক থেকে হতে পারে না। বিশ্বায়নের কারণে যদি সমাজের বেশির ভাগ মানুষের জীবনমানের উন্নতি হতে হয়, তাহলে সামাজিক সুরক্ষামূলক শক্তিশালী পদক্ষেপ নিতে হবে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ানরা এটা অনেক আগেই বুঝতে পেরেছিলেন।
পৃথিবীতে এখন যা ঘটছে বিশ্বায়ন তার একটা অংশ, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন আরেকটি। কিন্তু কথা হচ্ছে, এমন উন্মুক্ত মনোভাব ও হস্তক্ষেপের কারণে আমাদের তো আরও ধনী হওয়ার কথা। আর উন্নত দেশগুলো এমন ব্যবস্থা নিতে পারত, যাতে এর ফসল সবাই ভোগ করতে পারতেন।
কিন্তু সেটা না করে তাঁরা এমনভাবে বাজার পুনর্গঠন করলেন, যার ফলে অসমতা আরও বাড়ল এবং অর্থনীতির সামগ্রিক অবস্থা খারাপ হলো। এটা প্রবৃদ্ধির রাশ টেনে ধরল। কারণ, অর্থনীতির নিয়মই নতুন করে লেখা হলো, যেটা একদিকে ব্যাংক ও করপোরেশনের স্বার্থ রক্ষা করল; অন্যদিকে সিংহভাগ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলো। শ্রমিকদের দর-কষাকষির ক্ষমতা কমে গেল। আর বিদ্যমান আইনের প্রয়োগও হলো অপর্যাপ্ত। ফিন্যান্সিয়ালাইজেশন ব্যাপক গতিতে এগিয়ে চলল, করপোরেট সুশাসন অপশাসনে পরিণত হলো।
আমার নতুন বই রিরাইটিং দ্য রুলস অব দ্য আমেরিকান ইকোনমি-তে বলেছি, এই খেলার নিয়ম আবারও বদলাতে হবে, যার মধ্যে বিশ্বায়নকে বাগে আনার পদক্ষেপও থাকতে হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা যে প্রশান্ত মহাসাগরের তীরবর্তী ১১টি দেশের সঙ্গে ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ চুক্তি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ট্রান্স-আটলান্টিক ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট পার্টনারশিপ চুক্তি করতে যাচ্ছেন, সেটা ঠিক হচ্ছে না।
গ্লোবালাইজেশন অ্যান্ড ইটস ডিসকনটেন্টস -এর মূল বার্তা ছিল এ রকম: বিশ্বায়ন নিজে কোনো সমস্যা নয়, কিন্তু পুরো ব্যাপারটা যেভাবে ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে, সেটাই সমস্যা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হলো, এই অব্যবস্থাপনা দূর হচ্ছে না। আজ ১৫ বছর পর আরও নতুন নতুন অসন্তোষ সৃষ্টি হওয়ায় উন্নত পশ্চিমা দেশগুলোও তা বুঝতে পারছে।
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
জোসেফ ই স্টিগলিৎস: নোবেল বিজয়ী মার্কিন অর্থনীতিবিদ।