মতামত

সংসার ভাঙচুর, পরিবার আটক, জীবন নিয়ে খেলা

নাটোরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে পুলিশ চায়ের কেটলি জব্দ করে
ছবি: সংগৃহীত

শিরোনামটা এমন হতে পারত। লকডাউন না মানায় ২০টি সংসার আটক, কয়েক শ পরিবার ভাঙচুর, টেনেহিঁচড়ে চলছে জীবন, হাসপাতালে মৃত্যুর সুবন্দোবস্ত। তবে ছাপা হয়েছে অন্য ছবি, অন্য কথা। নাটোরের নলডাঙা থানার পুলিশ লকডাউনে চায়ের দোকান খোলায় অনেকগুলো কেটলি জব্দ করেছে। বিভিন্ন জায়গায় রিকশা উল্টিয়ে রাখার ছবি আসছে। কিছুদিন আগে অনেক অনেক অটো রিকশা চুরমার করা হলো। দিনমজুরেরা খোরাকির খোঁজে বের হওয়ায় কান ধরে ওঠবস করানো হচ্ছে। মধ্যবিত্তরা জরিমানা খাচ্ছে। একজন বৃদ্ধ গৃহপরিচারিকা ছয় ঘণ্টা হেঁটে ঢাকার এক বাসায় কাজ করতে আসছেন এই বৃষ্টির মধ্যে। কেটলি নয়, আসলে আটক হয়েছে পরিবারের আয়, রিকশা নয় আসলে ভাঙচুর হয়েছে সংসারের খাদ্যপ্রণালি। পায়ে হাঁটা মানুষ আর অক্সিজেন না পেয়ে মারা যাওয়া রোগী একই অবহেলার যুগল শিকার।

বলা হচ্ছে, সবই করা হয়েছে করোনা সংক্রমণ ঠেকানোর লকডাউন বাস্তবায়নের জন্য। বলা হচ্ছে না যে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার গাফিলতি আর সরকারি অদূরদর্শিতার খেসারত দিচ্ছে সাধারণ মানুষ। এই অকহতব্য বাস্তবতার জন্ম অবহেলায়। এবারের লকডাউন কঠোর থেকে কঠোরতর হওয়ার আগে অনেক সময় হাতে ছিল। ঢাকার শহর কেন, বড় শহরগুলোও অনেক মানুষের জন্য ভাতের হোটেল ছাড়া আর কিছু না। কিন্তু সেই রাজধানীতে সঞ্চয়হীন দরিদ্র মানুষকে কোনোরকম সাহায্য ছাড়াই ঘরে আটকে থাকতে বলা হলো। কিন্তু তারা মানবে কেন?

করোনার সংক্রমণ কমানোয় লকডাউনের বিকল্প নেই। সময়ে–সময়ে এটা দরকার। কিন্তু সেটা পরিকল্পিত হতে হবে। ত্রাণ ও সাহায্য ছাড়া মানুষকে লম্বা সময় ঘরবন্দী করে রাখা যাবে না। যাদের ঘরই নেই বা যা আছে তা খুপরির সমান, তাদের কি ঘরে থাকার উপায় আসলেই আছে?

কেরানীগঞ্জের কৃষক রহমান মিয়া বলছিলেন, ‘যারা রিকশা চালায়া খাইতো তাগো ঘরে কি কিছু জমা থাহে? এমুন চললে এরা ছুরি নিয়া রাস্তায় বাইরাবো, সন্ধ্যার পরে ছিনতাই করব।’ নবাবগঞ্জের সিংজুড় বাজারের খালেক চিশতী আগে ভ্যানে করে প্লাস্টিকের খেলনা বেচতেন মেলায় বা ওরসে। গত দুই বছরই তিনি ঘরে বসা। মেলা বন্ধ, ওরসও হয় না। শেষে রাস্তার পাশে দোকান সাজিয়ে বসেছেন। কিন্তু গ্রামের মধ্যে কে কিনবে খেলনা? বাড়িতে তাঁর তিন ছেলে, এক স্ত্রী। প্রতিদিনের ভরণপোষণ কীভাবে চালাবেন? তাঁর বাড়িতে খাজা বাবার দরবার ছিল। এলাকায় আলাদা সম্মান পেতেন। দোকানে আগে বাকিও পেতেন। এখন আর দেয় না কেউ।

এবারের বাজেটে কি এই সব মানুষের কথা চিন্তা করে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে? অর্থনীতিবিদ রাশেদ আল-মাহমুদ তিতুমীর লিখেছেন, ‘সর্বজন খাত—সামাজিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে প্রকৃত বরাদ্দ আগের চেয়ে কমেছে। সংঘবদ্ধ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের করপোরেট করে ছাড় দেওয়া হয়েছে। ছোট কারবার উপেক্ষিত থেকেছে। সাধারণ মানুষেরও করে ছাড় দেওয়া হয়নি।...সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে আগের বছরের চেয়ে বরাদ্দ ১৩ শতাংশ বেড়েছে। নতুন ১৪ লাখ মানুষকে এর আওতায় আনা হয়েছে। নগর দরিদ্রসহ আড়াই কোটি নতুন দরিদ্রের জন্য তা অপ্রতুল। উপরন্তু, বরাদ্দকৃত অর্থের বেশির ভাগ অংশ সরকারি কর্মচারীদের পেনশন, সঞ্চয়পত্রের সুদ প্রভৃতি প্রদানে যাবে।’ (প্রথম আলো, ৫ জুন, ২০২১)

আমরা দেখেছি গত ১০ বছরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কম ছিল না। কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠান দুদকই বলেছে, সবচেয়ে বেশি দুর্নীতির খাতগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। চিকিৎসক নেতাদের অভিযোগ, আমলারা সব করেন, তাঁদের কথা শোনা হয় না। স্বাস্থ্য খাতে জিডিপিতে আমাদের বরাদ্দের অনুপাতে মালদ্বীপের চেয়েও কম। আর এই রোববারের প্রথম আলোর সংবাদ শিরোনাম হয়: স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন সব দিচ্ছি, কিন্তু কোথাও কিছু নেই। ৫২ শতাংশ হাসপাতালে আইসিইউ নেই।

কিন্তু ধনী বেড়েছে, টাকা পাচার বেড়েছে। বেড়েছে মানুষের জীবন নিয়ে নিষ্ঠুর উদাসীনতা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং কী বিস্ময়কর বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা ও অন্যান্য ভাতার পরিমাণ জনপ্রতি ৫০০ টাকা থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে। বিশ্বাস হয়? এই স্যাটেলাইট উন্নয়নের যুগে ৫০০-৮০০ টাকায় কারও কি চলতে পারে? সরকারি প্রতিবেদনই বলছে, যোগ্য না হয়েও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির ভাতা নেন ৪৬ শতাংশ সুবিধাভোগী। জনসংখ্যার সঠিক ডেটাবেইস নেই এই ডিজিটাল বাংলাদেশে। ফলে অনিয়ম ও চুরির সুযোগ অবারিত।

এখনকার কথা থাক। আগামী দিনে করোনার কারণে বাংলাদেশ ১৬ লাখ কর্মসংস্থান হারাতে পারে। আসন্ন সময়ের প্রস্তুতির কী অবস্থা? গত বছরের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত পোশাকশিল্পে ৭০ হাজার কর্মসংস্থান হারিয়ে গেছে এবং গত বছরের শেষ পর্যন্ত ১০ লাখ কর্মসংস্থান হারিয়ে যাওয়ার কথা। বহির্বিশ্বে চাহিদা সংকোচনের কারণে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে ২০ লাখ কর্মী, যার বেশির ভাগই নারী, কাজ হারাতে পারেন। খাদ্যনিরাপত্তাহীন থাকবেন ৫ কোটি মানুষ। এসব বলেছেন, জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির সাবেক পরিচালক অর্থনীতিবিদ সেলিম জাহান। এর অর্ধেক আশঙ্কাও যদি ফলে যায়, তা কী মাত্রার জাতীয় দুর্ভোগ আর নৈরাজ্য তৈরি করতে পারে?

এ নিয়ে কোনো রূপরেখা–রোডম্যাপ ইত্যাদি কি হয়েছে? সেলিম জাহান মনে করেন, অভুক্ত পরিবারগুলোর এক মাসের খাদ্য সুরক্ষার জন্য ৬ হাজার কোটি টাকা লাগবে বলে প্রাক্কলিত হয়েছে। এভাবে আগামী ছয় মাসের জন্য লাগবে ৩৬ হাজার কোটি টাকা, অর্থনৈতিক প্রণোদনার জন্য বরাদ্দ টাকা থেকে এর অর্থায়ন করা যেতে পারে। (বণিক বার্তা, মে ২৮,২০২১)

ত্রাণ ও সহায়তা ছাড়া লকডাউন সরকারও চালাতে পারে না, এমনকি চায়ও না। গত বছরের লকডাউনের অভিজ্ঞতা নিয়ে গবেষণা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. তারিক ওমর আলী, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের মির্জা হাসান ও যুক্তরাষ্ট্রের আমেরিকান ইউনিভার্সিটির নওমি হাসান। আমাদের জন্য প্রাসঙ্গিক যে সিদ্ধান্তে তাঁরা পৌঁছেছেন, তা হলো এই: বাংলাদেশের নাগরিকেরা প্রথমে স্বেচ্ছায়ই লকডাউনের নিয়ম মান্য করেছিল। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তারা দেখল সরকারি ত্রাণ ব্যবস্থা অস্বচ্ছ ও অকার্যকর। প্রশাসনকে তখন লকডাউনের কড়াকড়ি উঠিয়ে নিতে দেখা গেল এবং নীতিনির্ধারকেরাও নীরবে এই নীতি থেকে সরে এলেন।

এবারও সেটাই হওয়ার আশঙ্কা বেশি। রাষ্ট্রের কোনো পদক্ষেপের গ্রহণযোগ্যতা তখনই বাড়ে, যখন রাষ্ট্র সংকটে নাগরিকদের সুরক্ষা দেয়। তা না দিতে পারলে জনবিক্ষোভ এড়াতে আবার সব শিথিল করা হবে। ইতিমধ্যে তার আলামতও দেখা যাচ্ছে। প্রথম আলোর আজকে রোববারের অনলাইন সংবাদ বলছে, এত এত জরিমানা, হয়রানি, ধরপাকড়ের পরও ‘চতুর্থ দিনে রাস্তায় গাড়ি-মানুষ-রিকশা কিছুটা বেড়েছে’। ভাত দিতে না পারলে কিল মারার গোঁসাই হওয়ার দুর্বুদ্ধি কেউ করবে না। কিন্তু মূল প্রশ্নের তো মীমাংসা হলো না! টিকা, অক্সিজেন, হাসপাতালের বেড, লকডাউন এবং অর্থনৈতিক সহায়তা ছাড়া কীভাবে মহামারির মহামৃত্যু ও মহাক্ষুধা ঠেকানো যাবে?

লকডাউন এক দুধারি তলোয়ার। এক ধারে আপনাকে স্বাস্থ্যবিধি কঠোর করতে হবে, অন্য ধারে মানুষ যাতে তা মানে, সে জন্য তাদের সুরক্ষা দিতে হবে। একটি ছাড়া অন্যটি অচল।

ফারুক ওয়াসিফ লেখক ও সাংবাদিক।
faruk.wasif@prothomalo.com