ভারতের বড় অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সমস্যা হয়ে উঠেছিল মাওবাদী বিদ্রোহ
ভারতের বড় অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সমস্যা হয়ে উঠেছিল মাওবাদী বিদ্রোহ

মতামত

যে কারণে ভারতে মাওবাদী বিদ্রোহ নিভন্তপ্রায়

এই শতকের শুরুতে, যখন ভারত বিশ্ব অর্থনীতির এক উজ্জ্বল তারকা হিসেবে মাথাচাড়া দিচ্ছিল, তখন দেশটির অভ্যন্তরীণ অঞ্চলগুলোয় এক কালো ছায়া নেমে আসে। সেটি হলো মাওবাদী বিদ্রোহ।

দেড় দশক ধরে ধীরে ধীরে ‘রেড করিডর’ নামে পরিচিত এলাকা বিস্তৃত হচ্ছিল। কারণ, দারিদ্র্যগ্রস্ত সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে বিপ্লবী কমিউনিস্ট মতাদর্শ গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছিল। এর ফলাফল ছিল—সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ভাষায়, ‘ভারতের ইতিহাসের একমাত্র বৃহত্তম অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ।’

তবে ভারত এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম হয়েছে। রেড করিডরের বিস্তার নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। ২০১৩ সালে যেখানে এটি ১২৬টি জেলাকে ছুঁয়েছিল, সেখানে গত বছরে তা মাত্র ১১টিতে নেমে এসেছে। নিশ্চিতভাবে এটি ভারত রাষ্ট্রের জন্য বিজয়ের প্রতীক। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ঘোষণা করেছেন, ‘নকশালবাদী’ বিদ্রোহ (১৯৬০-এর দশকে পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়ি গ্রামে এই বিদ্রোহের সূচনা হয় বলে এই নামকরণ) আগামী কয়েক মাসের মধ্যে সম্পূর্ণ নির্মূল করা হবে।

নকশাল দমনে ভারত এই অগ্রগতি অর্জন করেছে তেমন কোনো ভয়ানক হিংসা ছাড়াই। শ্রীলঙ্কার সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপক্ষে ২০০৯ সালে তামিল টাইগারদের দমনে কঠোর সহিংস পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। এর মধ্য দিয়ে সেখানে ৪০ বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধের অবসান হয়েছিল। ১৯৯০-এর দশকে পেরুতে আলবার্তো ফুজিমোরির সরকার নৃশংস কৌশল অবলম্বন করে মাওবাদী সেনডেরো লুমিনোসো বিদ্রোহ দমন করেছিল। ভারতের কোনো সরকার সে পথে হাঁটেনি। এর বদলে তারা এমন একটি সুপরিকল্পিত কৌশল তৈরি করেছিল, যা বিদ্রোহের কারণ ও পরিণতি—উভয় দিকই বিবেচনা করেছে।

এই বিদ্রোহের শুরুতে আছে ভূমিহীনতা, দারিদ্র্য ও প্রান্তিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে বনাঞ্চলে বসবাসকারী আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারি সেবা ও সুযোগের অভাব। এটি কৃষক বিদ্রোহের জন্ম দেয় এবং বিদ্রোহীরা মাওবাদী সামরিক কৌশল ‘পিপলস ওয়ার’ অনুসরণ করতে থাকে। তারা গ্রামাঞ্চলে তাদের নিজস্ব ‘শাসন ও প্রতিরক্ষা’ প্রতিষ্ঠা করতে ‘শ্রেণিশত্রু’ খতম করতে থাকে।

২০০৪ সালে বিদ্রোহী বিভিন্ন গোষ্ঠী মিলিত হয়ে কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মাওবাদী), সংক্ষেপে সিপিআই (মাওবাদী) নামের দল গঠন করে। এই দল ভারতের গণতন্ত্র উৎখাত করে মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদী মতাদর্শভিত্তিক ‘নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

প্রশাসনিক ও নিরাপত্তাশূন্যতার সুযোগ নিয়ে সিপিআই (মাওবাদী) এই জেলাগুলোয় আংশিক স্বশাসন প্রতিষ্ঠা করে এবং ঔপনিবেশিক ও দমনমূলক প্রাতিষ্ঠানিক শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নিজেকে অধিকারহীনদের রক্ষক হিসেবে স্থাপন করে। বিশেষ করে হতাশাগ্রস্ত যুবকদের দলে ভেড়াতে তারা সফল হয়।

কিন্তু এই ‘রক্ষাকর্তা’র কার্যক্রম প্রায়ই হিংসা ও ডাকাতি এবং চাঁদাবাজির টাকায় চলত। ফলে ২০০৯ সালের জুনে ভারতের সরকার সিপিআই (মাওবাদী) ও তার সহযোগী সংস্থাগুলোকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণা করে এবং বেআইনি কার্যকলাপ (প্রতিরোধ) আইনের অধীন তাদের নিষিদ্ধ করে। এর প্রতিক্রিয়ায় মাওবাদীরা আরও সহিংস হয়ে ওঠে। ২০১০ সালে তারা একটি কুখ্যাত অভিযানে ছত্তিশগড়ে কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ ফোর্সের ৭৪ জন সদস্য ও ২ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যা করে। এর তিন বছর পর যখন মাওবাদীরা তাদের সহিংস তৎপরতার শিখরে ছিল, তখন ছত্তিশগড়ে আরেকটি হামলা চালিয়ে তারা কংগ্রেস পার্টির অনেক শীর্ষ নেতাকে হত্যা করে।

নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সরকার পুলিশ বাহিনীকে আধুনিক অস্ত্র, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা এবং জঙ্গলে যুদ্ধে ও বিদ্রোহ দমন প্রশিক্ষণ দিয়ে শক্তিশালী করেছে। এ ছাড়া সরকার বহু নতুন ফরওয়ার্ড অপারেটিং বেজ স্থাপন করেছে, যা মাওবাদীদের ‘নিরাপদ’ এলাকা সংকুচিত করেছে এবং তাদের চলাচল ব্যাহত করেছে।

ভারতে তখন কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ ক্ষমতায় ছিল। তখনকার সরকার বুঝতে পেরেছিল, সরকারের এমন একটি নতুন কৌশল দরকার, যা নিরাপত্তা–হুমকি ও বিদ্রোহকে উসকে দেওয়া অর্থনৈতিক ক্ষোভ—উভয়কেই সমাধান করবে। ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর নরেন্দ্র মোদির সরকার সরাসরি ও বহুমাত্রিক একটি কৌশল কার্যকর করে। এই কৌশল নিরাপত্তা ও উন্নয়ন—উভয়কেই অন্তর্ভুক্ত করে।

নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সরকার পুলিশ বাহিনীকে আধুনিক অস্ত্র, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা এবং জঙ্গলে যুদ্ধে ও বিদ্রোহ দমন প্রশিক্ষণ দিয়ে শক্তিশালী করেছে। এ ছাড়া সরকার বহু নতুন ফরওয়ার্ড অপারেটিং বেজ স্থাপন করেছে, যা মাওবাদীদের ‘নিরাপদ’ এলাকা সংকুচিত করেছে এবং তাদের চলাচল ব্যাহত করেছে।

সরকারের লক্ষ্য ছিল মাওবাদীদের চাঁদাবাজি ও অন্যান্য অবৈধ অর্থায়ন নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া এবং কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক নেতৃত্বকে গ্রেপ্তার বা অকার্যকর করে দেওয়া।

ভারতের সরকার মাওবাদী বিদ্রোহ মোকাবিলায় ‘লৌহমুষ্টি’ ও ‘মসৃণ হাত’—দুই দিকই ব্যবহার করেছে। শক্তিশালী নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকলেও শুধু তার ব্যবহারই যথেষ্ট হতো না। তাই সরকারের পক্ষ থেকে ‘হৃদয় ও মন জয়ের অভিযান’ চালানো হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল দারিদ্র্য দূরীকরণ ও উন্নয়নমূলক উদ্যোগ। প্রভাবিত জেলাগুলোয় রাস্তা, সেতু, সেল টাওয়ার তৈরি করা হয়েছে। এগুলো গ্রামগুলোকে শহরের সঙ্গে যুক্ত করেছে এবং মাওবাদীদের বিচ্ছিন্ন করার সুযোগ কমিয়েছে।

সরকার সরাসরি জনগণের কাছে পৌঁছানোর জন্য ভর্তুকিপ্রাপ্ত খাদ্য, আবাসন ও স্বাস্থ্যসেবা মতো কর্মসূচিও চালু করেছে। এতে হতাশা ও অভাবের মধ্যে থাকা মানুষ, বিশেষ করে আদিবাসী যুবকেরা অস্ত্রের বিকল্প পেয়েছে।

এ কারণে বড় ধরনের বিদ্রোহ এখন অনেকটা কমে গেছে। সিপিআই (মাওবাদী) নেতৃত্ব এখন দুর্বল। অর্থায়নের সমস্যায় পড়ে তারা আগের মতো দলে সদস্য ভেড়াতে পারছে না। তাদের কেন্দ্রের নেতারা পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করছেন। যেমন ২০২৫ সালের অক্টোবরে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মালোজুলা বেণুগোপাল রাও ৬০ জন সঙ্গী নিয়ে আত্মসমর্পণ করেন। তিনি স্বীকার করেন, আন্দোলন রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে ছোট করে দেখেছিল। ফলে তাঁদের সশস্ত্র সংগ্রাম ব্যর্থ হয়েছে। তাঁর মতে, মাওবাদীদের সশস্ত্র শাখা বন্ধ করে দিয়ে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ ও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা উচিত।

তবে সমস্যার সবটাই এখনো কেটে যায়নি। এ কারণের মাওবাদীদের আবার সক্রিয় হওয়া ঠেকাতে টেকসই উন্নয়ন এবং স্থায়ী ও নির্ভরযোগ্য সেবা গরিব মানুষের দুয়ারে পৌঁছে দিতে হবে। ১১টি জেলায় এখনো মাওবাদীদের প্রভাব আছে এবং এই জেলাগুলো ঘন বনাঞ্চল–অধ্যুষিত হওয়ায় সেই সেবা পৌঁছে দেওয়া কঠিন।

আসলে চূড়ান্ত সমাধান তখনই সম্ভব, যখন সরকার স্থানীয়ভাবে সুপেয় পানি, বন ও জমির অধিকার রক্ষা করবে আর উন্নয়ন এমনভাবে করবে, যা ঐতিহ্য ও সম্প্রদায়ের অধিকারকে অটুট রাখে। এ ছাড়া শোষক প্রতিষ্ঠান (সরকারি বা বেসরকারি) আদিবাসী–অধ্যুষিত এলাকায় মানুষের জীবন ‘নিয়ন্ত্রণ’ করার চেষ্টা করবে না—এটিও নিশ্চিত করতে হবে।

  • শশী থারুর ভারতের কংগ্রেস পার্টির একজন লোকসভা সদস্য

    স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ