অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসনব্যবস্থা পৃথিবীর অন্যতম কঠোর ও নিয়ন্ত্রিত কাঠামো। অস্ট্রেলিয়ার ভিসা টাকায় কেনা যায় না।
অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসনব্যবস্থা পৃথিবীর অন্যতম কঠোর ও নিয়ন্ত্রিত কাঠামো। অস্ট্রেলিয়ার ভিসা টাকায় কেনা যায় না।

মতামত

অস্ট্রেলিয়ায় থাকার সুযোগ সংকুচিত: বাংলাদেশিদের এখন কী করা উচিত?

অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতি ও জনপরিসরে অভিবাসন এখন সবচেয়ে উত্তপ্ত আলোচনার বিষয়। সিডনি, মেলবোর্নের কিংবা অন্য যেকোনো রাজপথে হাঁটলে সাধারণ মানুষের মুখে মুখে এখন মূলত দুটি সংকটের কথা শোনা যায়; বাসাবাড়ির ভাড়ার আকাশছোঁয়া বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার তীব্র ব্যয়ভার।

দীর্ঘদিনের এই ক্ষোভ ও রাজনৈতিক উত্তাপের পুরো দায় একপর্যায়ে গিয়ে পড়েছিল অভিবাসীদের কাঁধে। সেই পটভূমিতেই ক্যানবেরার ন্যাশনাল প্রেসক্লাবে দাঁড়িয়ে দেশটির অভিবাসন ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক অভিবাসনব্যবস্থার এক ব্যাপক সংস্কারের রূপরেখা ঘোষণা করলেন।

সিডনির মাটি থেকে প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা দিয়ে দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায়, ক্যানবেরা থেকে আসা বার্তাটি কোনো সাধারণ রুটিন প্রশাসনিক ঘোষণা নয়। এর সঙ্গে একদিকে যেমন যুক্ত রয়েছে দেশটির অভিবাসনব্যবস্থার দীর্ঘদিনের তৈরি হওয়া ফাঁকফোকর বন্ধের কড়া প্রশাসনিক তাগিদ, অন্যদিকে রয়েছে আসন্ন ফেডারেল নির্বাচনের আগে ক্ষমতাসীন লেবার সরকারের জনমত ধরে রাখার সূক্ষ্ম রাজনৈতিক চাল।

ঘোষিত নীতিতে কী কী বদলাচ্ছে

নতুন নীতিমালায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও অস্থায়ী অভিবাসীদের ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে। যে পরিবর্তনগুলো সরাসরি কার্যকর হতে যাচ্ছে, তার মধ্যে প্রধান কয়েকটি হলো:
১. পরিবার আনার সুযোগ বন্ধ: নতুন আসা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা আর তাঁদের সঙ্গে স্বামী, স্ত্রী বা সন্তানদের আনতে পারবেন না। গ্র্যাজুয়েট ভিসার ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে। কেবল ডক্টরেট বা পিএইচডি পর্যায়ের গবেষকেরা এই কড়াকড়ির বাইরে থাকবেন। তবে যাঁরা ইতিমধ্যে পরিবার নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করছেন, তাঁদের পরিবার বিচ্ছিন্ন করা হবে না।

২. ভিসা বদলের ফাঁকফোকর বন্ধ: এত দিন অনেকেই পড়াশোনা শেষে দেশে না ফিরে কিংবা পিআর (স্থায়ী আবাসন) পাওয়ার শর্ত পূরণ করতে না পেরে ভিসার মেয়াদ বাড়াতে অপেক্ষাকৃত নিচু স্তরের কোনো মানহীন কারিগরি বা ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তি হতেন। এই ‘ভিসা হপিং’ পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, শিক্ষার্থীকে কেবল উচ্চতর স্তরের যোগ্যতায় যেতে হবে—যেমন স্নাতক শেষ করলে স্নাতকোত্তরে যাওয়া যাবে, কিন্তু ভিসা টিকিয়ে রাখতে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে নিচের স্তরের ডিপ্লোমায় নামা যাবে না।

৩. ভ্রমণ ভিসায় স্থায়ী হওয়ার পথ রুদ্ধ: পর্যটক বা ভিজিটর ভিসায় বাধ্যতামূলকভাবে ‘অতিরিক্ত অবস্থানের সুযোগ নেই’ (নো ফারদার স্টে) শর্ত যুক্ত করা হচ্ছে। ফলে ভ্রমণের ভিসা নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় এসে অনশোরে শিক্ষার্থী বা অন্য ভিসায় আবেদনের সুযোগ কার্যত শেষ।

৪. অবৈধ অভিবাসী প্রত্যাবাসন: বৈধ ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবস্থান করা প্রায় ৭৭ হাজার অবৈধ ব্যক্তিকে শনাক্ত করে দ্রুত দেশত্যাগে বাধ্য করতে সীমান্ত রক্ষা বাহিনীতে নতুন ১০০ জন কর্মকর্তা নিয়োগ এবং মেলবোর্নের পুরোনো কোয়ারেন্টিন কেন্দ্র ব্যবহারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

৫. দক্ষ অভিবাসনের অগ্রাধিকার পরিবর্তন: অস্ট্রেলিয়ায় তীব্র আবাসনসংকট মেটাতে নির্মাণ খাতের কারিগরি দক্ষতাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর ডিগ্রির সমান পয়েন্ট দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষকতা ও কৃষিশ্রমের মতো ঘাটতি থাকা খাতগুলোতে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

সংস্কারের বার্তা নাকি রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ

এখন মূল প্রশ্ন হলো—এটি কি সত্যিই অভিবাসনব্যবস্থার ফাঁকফোকর বন্ধের সৎ প্রয়াস, নাকি আসন্ন নির্বাচনের বৈতরণি পার হওয়ার রাজনৈতিক চাল?
বাস্তবতা হলো, এটি একই সঙ্গে দুটিই।

প্রশাসনিক দিক থেকে দেখলে, গত দুই দশকে জন হাওয়ার্ডের সরকারের আমল থেকে অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসনব্যবস্থা ছিল সম্পূর্ণ চাহিদাভিত্তিক। বাজারের ওপর সব ছেড়ে দেওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন খাতে অস্থায়ী শ্রমিকের সংখ্যা হু হু করে বাড়ে।

আজ অস্ট্রেলিয়ার কর্মক্ষম জনসংখ্যার প্রায় ১৬ শতাংশই অস্থায়ী অভিবাসী। সংখ্যাটি প্রায় ৩০ লাখে পৌঁছে গেছে। ফলে আবাসন ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধার ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক। সেই জায়গা থেকে অনিয়ম, অসৎ শিক্ষা এজেন্টদের দৌরাত্ম্য ও নামকাওয়াস্তে কলেজের ব্যবসা বন্ধ করতে নিয়মনীতি কঠোর করা একদিক থেকে যৌক্তিক।

কিন্তু ঘোষণার সময় এবং পরিপ্রেক্ষিতটি বিবেচনা করলে এর পেছনের রাজনৈতিক চালটি অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দীর্ঘদিন ধরে কট্টর ডানপন্থী নেত্রী পলিন হ্যানসনের দল ‘ওয়ান নেশন’ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে বিষোদ্‌গার করে এবং শ্বেতাঙ্গ ভোটারদের আবাসনসংকটের ভয় দেখিয়ে জনপ্রিয়তায় বড় উল্লম্ফন ঘটিয়েছে। জনমত জরিপে বিরোধী জোটের চেয়েও তারা এগিয়ে যাচ্ছিল এবং ক্ষমতাসীন লেবার দলের ভোটেও ভাগ বসাচ্ছিল। বিরোধী দলও অভিবাসী কমানোর দাবিতে সরকারকে কাঠগড়ায় তুলছিল।

বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর হাজার হাজার তরুণ অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান। অনেক পরিবার জমিজমা বিক্রি করে কিংবা সঞ্চয় ভেঙে সন্তানদের পাঠান এই আশায় যে সেখানে গিয়ে স্বামী বা স্ত্রী কাজ করে পড়াশোনার খরচ জোগাবেন এবং কোনো না কোনো উপায়ে স্থায়ী হবেন। নতুন নিয়মে পরিবার আনার সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিবাহিত শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক ও আর্থিক চাপ বহুগুণ বেড়ে যাবে। একা একটি দেশে এসে আকাশছোঁয়া টিউশন ফি ও থাকার খরচ জোগাড় করা অনেকের জন্যই কঠিন হয়ে উঠবে।

অস্ট্রেলিয়ার বর্তমান ক্ষমতাসীন লেবার সরকারের সামনে উভয়সংকট তৈরি হয়েছিল, একদিকে তারা অর্থনীতিকে ধাক্কা দিতে চায় না; কারণ দেশটির ৫ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাত ভেঙে পড়লে কিংবা নির্মাণ ও স্বাস্থ্য খাতে দক্ষ কর্মী না এলে সার্বিক অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়বে।

তাই সরকার মোট অভিবাসীর সংখ্যায় নতুন কোনো বড় কাটছাঁট করেনি; মে মাসের বাজেটে ঘোষিত প্রাক্কলনকেই (চলতি অর্থবছরে ২ লাখ ৪৫ হাজার এবং পরবর্তী বছরে ২ লাখ ২৫ হাজার) কঠোর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে রূপ দিয়েছে। অর্থাৎ বাস্তবে নতুন কোনো সংখ্যা কমানো হয়নি, বরং ‘আমরা পরিস্থিতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে রেখেছি’—জনগণ ও ওয়ান নেশন-ঘেঁষা ভোটারদের এই বার্তা দিয়ে নির্বাচনী ঝুঁকি কমানোই সরকারের মূল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য।

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ওপর প্রভাব

এই নতুন বাস্তবতা বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থী ও অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জন্য এক বিরাট ধাক্কা।

বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর হাজার হাজার তরুণ অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান। অনেক পরিবার জমিজমা বিক্রি করে কিংবা সঞ্চয় ভেঙে সন্তানদের পাঠান এই আশায় যে সেখানে গিয়ে স্বামী বা স্ত্রী কাজ করে পড়াশোনার খরচ জোগাবেন এবং কোনো না কোনো উপায়ে স্থায়ী হবেন। নতুন নিয়মে পরিবার আনার সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিবাহিত শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক ও আর্থিক চাপ বহুগুণ বেড়ে যাবে। একা একটি দেশে এসে আকাশছোঁয়া টিউশন ফি ও থাকার খরচ জোগাড় করা অনেকের জন্যই কঠিন হয়ে উঠবে।

তা ছাড়া ঢাকা ও অন্যান্য শহরের কিছু মধ্যস্বত্বভোগী এজেন্সির পক্ষ থেকে চটকদার প্রচারণা চালানো হতো, ‘ভ্রমণ ভিসায় গিয়ে শিক্ষার্থী হওয়া যায়’ কিংবা ‘একবার ঢুকতে পারলে কোনো না কোনো প্রাইভেট কলেজে ভর্তি হয়ে ভিসা নবায়ন করে থাকা যায়’। অস্ট্রেলিয়া সরকারের এই কঠোর পদক্ষেপে সেই সব চোরাগলি একরাতের মধ্যে বন্ধ হয়ে গেল।

অভিবাসন নিতে আগ্রহী ব্যক্তিদের তালিকায় অস্ট্রেলিয়া হচ্ছে অন্যতম আকর্ষণীয় দেশ

বাংলাদেশিদের এখন কী করা উচিত?

সিডনির রাজপথে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ কিংবা অস্ট্রেলিয়ার বাংলাদেশি কমিউনিটিতে তৈরি হওয়া উৎকণ্ঠা অত্যন্ত স্বাভাবিক। তবে আতঙ্কিত না হয়ে এই বাস্তবতাকে ঠান্ডা মাথায় মোকাবিলা করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

প্রথমত, এজেন্সির ফাঁদে পা দেওয়া বন্ধ করতে হবে: ঢাকায় বসে কোনো এজেন্টের কথায় বিশ্বাস করে ‘যেকোনো উপায়ে আগে অস্ট্রেলিয়া পৌঁছাই, পরে দেখা যাবে’—এই আত্মঘাতী ভাবনা মাথা থেকে পুরোপুরি মুছে ফেলতে হবে। ভিসা বদল বা আপিলের দীর্ঘসূত্রতায় বছর পার করার দিন শেষ।

দ্বিতীয়ত, মেধা ও আর্থিক সক্ষমতার সঠিক মূল্যায়ন: অস্ট্রেলিয়া উচ্চশিক্ষার দরজা বন্ধ করেনি, বরং মানসম্মত উচ্চশিক্ষার জন্য পরিবেশ তৈরি করতে চাইছে। যাদের চমৎকার একাডেমিক রেকর্ড, ভালো ইংরেজি দক্ষতা এবং পড়াশোনার খরচ চালানোর মতো বাস্তব আর্থিক সংগতি রয়েছে, তাঁদের জন্য দরজা এখনো খোলা। যাঁদের মূল লক্ষ্য স্রেফ কাজ করা বা পরিবার নিয়ে থাকা, তাঁদের বর্তমান নিয়মে অস্ট্রেলিয়া না আসাই শ্রেয়।

তৃতীয়ত, চাহিদাসম্পন্ন বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া: যাঁরা শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ী হতে চান, তাঁদের অস্ট্রেলিয়ার শ্রমবাজারের বাস্তব চাহিদার দিকে তাকাতে হবে। নির্মাণ প্রকৌশল, নার্সিং, স্বাস্থ্যসেবা, বিশেষায়িত শিক্ষকতা ও প্রযুক্তিগত পেশাগুলোতে এখনো দক্ষ অভিবাসীদের তীব্র প্রয়োজন। তাই সাধারণ কোনো ব্যবসায়িক বা নামকাওয়াস্তে ডিপ্লোমা কোর্সে না গিয়ে সরাসরি অস্ট্রেলিয়ার অগ্রাধিকার তালিকায় থাকা পেশাভিত্তিক বিষয়ে উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা করতে হবে।

চতুর্থত, যাঁরা ইতিমধ্যে অস্ট্রেলিয়ায় আছেন: যে শিক্ষার্থীরা ইতিমধ্যে দেশটিতে অবস্থান করছেন, তাঁদের জন্য পরিবার বিচ্ছিন্ন করার নিয়ম নেই। তবে তাঁদের উচিত হবে কোনো অসৎ পরামর্শে সস্তা কোর্সে না গিয়ে নিজ নিজ মেধা দিয়ে মূলধারার পড়াশোনা শেষ করা এবং যত দ্রুত সম্ভব বৈধ পথে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের যোগ্যতা অর্জন করা।

অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিতে অভিবাসন এখন একটি কঠিন ফুটবলের মতো, এক দল অন্য দলের দিকে ছুড়ে মারছে। তবে এই রাজনৈতিক উত্তাপের মধ্যেও মূল সত্যটি হলো: অস্ট্রেলিয়া কখনোই অভিবাসন পুরোপুরি বন্ধ করতে পারবে না। কারণ, তাদের অর্থনীতির টিকে থাকার জন্যই দক্ষ মানুষ দরকার। যাঁরা নিয়ম মেনে প্রকৃত মেধা ও স্পষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে এগোবেন, তাঁদের পথ এখনো খোলা। কিন্তু ফাঁকফোকর খুঁজে টিকে থাকার দিন যে শেষ, ক্যানবেরার এই কঠোর বার্তায় তা নিয়ে আর কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।

  • কাউসার খান প্রথম আলোর সিডনি প্রতিনিধি ও অভিবাসন আইনজীবী
    ই-মেইল: kawsar.khan.au@gmail.com

    মতামত লেখকের নিজস্ব