
এক দশকের বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক জলবায়ু নীতি নিয়ে কাজ করা একজন নেপালি নাগরিক হিসেবে, নেপালের উপত্যকাগুলোতে আছড়ে পড়া ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার তাণ্ডব দেখে আমি ক্ষুব্ধ না হয়ে পারি না।
বিজ্ঞানীদের বছরের পর বছরের সতর্কতা উপেক্ষা করার কারণেই আজ এই ক্ষোভ। তাঁরা স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, উত্তপ্ত পৃথিবীতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ আরও ঘন ঘন, হিংস্র ও অপ্রত্যাশিত হয়ে উঠবে। জলবায়ু পদক্ষেপে বিশ্বনেতাদের এই বিলম্বের চরম মাশুলই আজকের বিপর্যয়।
দুর্যোগটি এড়ানো যেত কি না কিংবা আগেভাগে সতর্ক করা সম্ভব ছিল কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তবে এই বন্যা কেবল ব্যবস্থার ত্রুটি নয়, জলবায়ু সংকটের আসল চেহারাটি উন্মোচিত করেছে; যেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তৈরি হওয়া নতুন মাত্রার বিপর্যয় শনাক্ত করতে বর্তমান প্রযুক্তি একেবারেই অপ্রতুল।
উচ্চ পার্বত্য অঞ্চল ভোটেকোশি উপত্যকার সতর্কীকরণ ব্যবস্থার উদাহরণটি দেখা যাক। নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমা অতিক্রমের সংকেত দেওয়ার আগেই, পাহাড় থেকে নেমে আসা পাথর ও কাদামিশ্রিত স্রোত উজানের মূল হাইড্রোলজিক্যাল স্টেশনগুলোকেই চুরমার করে দেয়। এই প্রযুক্তি তৈরি করা হয়েছিল ধীরে ধীরে পানি বৃদ্ধির হিসাব মাপার জন্য। কিন্তু এই বন্যা এসেছে পাথর, বরফ আর কাদার এক পর্বতপ্রমাণ ঢেউ হয়ে, যা সংকেত দেওয়ার যন্ত্রগুলোকেই আগে ধ্বংস করে দিয়েছে।
প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ বলছে, একটি বিশাল হিমবাহ ধসে পড়ার ফলে বরফ ও পাথরের ধস নামে এবং কাদার স্রোত তৈরি হয়। এর ফলে সাময়িকভাবে নদীর গতিপথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে এবং পরবর্তী সময়ে সেই বাঁধ ভেঙে ভয়াবহ তীব্রতায় স্রোত নিচে নেমে আসে। প্রকৃত ঘটনা অনুসন্ধানে এখনো বৈজ্ঞানিক তদন্ত চলছে।
কর্তৃপক্ষ যখন বন্যার খবর পায় এবং ভাটির এলাকায় সতর্কতা জারি করে, ততক্ষণে উৎসস্থলের কাছের জনপদগুলোর সাড়া দেওয়ার মতো কোনো সময়ই অবশিষ্ট ছিল না। পর্যবেক্ষণ অবকাঠামো শুধু সতর্কবার্তা পাঠাতে ব্যর্থ হয়নি, বন্যা শনাক্ত করার আগেই তা ধ্বংস হয়ে গেছে। এই পার্থক্যটি বোঝা খুব জরুরি। এর মানে এই নয় যে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা অপ্রয়োজনীয়। এর অর্থ হলো, আমাদের এই ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সত্যনিষ্ঠ হতে হবে। একটি সতর্কতা তখনই কার্যকর, যখন পদক্ষেপ নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সময় থাকে।
ভোটেকোশি নদীর তীরের মানুষ হিমালয় উত্তপ্ত করেনি কিংবা জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক অর্থনীতিও বেছে নেয়নি। সহায়তা পেলে হয়তো তারা প্রস্তুতি বা সহনশীল জীবিকা গড়তে পারবে, তবে সব বিপর্যয়ে শুধু ‘অভিযোজন’ করে টিকে থাকা সম্ভব নয়। তাই ক্ষয়ক্ষতি তহবিল কোনো ‘দান’ নয়, বরং সংকটের বলির পাঁঠা হওয়া মানুষদের কাছে এটি উন্নত বিশ্বের এক ঐতিহাসিক বাধ্যবাধকতা।
অভিযোজনেরও নিজস্ব সীমা রয়েছে। নেপালসহ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো পরিকাঠামো মজবুত ও দুর্যোগ প্রস্তুতি বাড়িয়ে টিকে থাকার প্রাণপণ চেষ্টা করলেও, ঐতিহাসিক কার্বন নিঃসরণকারী ধনী দেশগুলোর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা প্রায় পাচ্ছেই না।
গলে যাওয়া হিমবাহ আর ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রায় নেপালের হিমালয় অঞ্চলের স্থায়িত্ব নষ্ট হচ্ছে, বদলে যাচ্ছে ঝুঁকির ধরনও। বিশ্ব উষ্ণায়নের এই ধারা জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলাকে আরও কঠিন করে তুলছে।
আমাদের প্রথম কাজ সংকটের বিস্তার থামানো। জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে লাভবান হওয়া ধনী দেশগুলোরই দায়িত্ব কার্বন নিঃসরণ দ্রুত কমানো। তাই কয়লা, তেল ও গ্যাস ছেড়ে নবায়নযোগ্য শক্তিতে উত্তরণ কোনো দয়া নয়, বরং এটি বৈশ্বিক ন্যায়বিচারের দাবি।
বিপুল মুনাফা লুটে নেওয়া জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানিগুলোকে এই দায় থেকে আলাদা করা যাবে না, যাদের কারণে চরম ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠী সীমিত সম্পদ নিয়েই বিধ্বংসী সংকটের মুখোমুখি।
এখানে নেপালের জন্যও শিক্ষা রয়েছে। জলবায়ু সংকট তৈরি করা অর্থনৈতিক মডেলকে ‘উন্নয়ন’ ভেবে অনুকরণ করা ঠিক হবে না। নেপালের সামনে সম্পদ শোষণের বদলে মানুষ, জীবিকা ও পরিবেশগত সহনশীলতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিকল্প পথ বেছে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
দ্বিতীয় কাজ হলো, ঐতিহাসিকভাবে পরিবেশ দূষণকারী ধনী রাষ্ট্রগুলোকে ‘ক্ষতি ও ক্ষয়ক্ষতি’ তহবিলের অর্থ প্রদান নিশ্চিত করা। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে নেপালের অবদান শূন্য দশমিক ১ শতাংশের কম হলেও, না করা অপরাধের চরম মাশুল গুনতে হচ্ছে দেশটিকে। এর চেয়ে বড় অন্যায় আর হতে পারে না। ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোকে দুর্যোগ থেকে ঘুরে দাঁড়াতে ঋণ নিতে বাধ্য করা কোনোভাবেই ন্যায়সংগত নয়। ধনী দেশগুলোর পাপের মাশুল দিতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত উন্নয়নশীল দেশগুলোর সীমিত সম্পদ বারবার মেরামত কাজে নষ্ট হতে পারে না; তাই তারা ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়ে আসছে।
ভোটেকোশি নদীর তীরের মানুষ হিমালয় উত্তপ্ত করেনি কিংবা জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক অর্থনীতিও বেছে নেয়নি। সহায়তা পেলে হয়তো তারা প্রস্তুতি বা সহনশীল জীবিকা গড়তে পারবে, তবে সব বিপর্যয়ে শুধু ‘অভিযোজন’ করে টিকে থাকা সম্ভব নয়। তাই ক্ষয়ক্ষতি তহবিল কোনো ‘দান’ নয়, বরং সংকটের বলির পাঁঠা হওয়া মানুষদের কাছে এটি উন্নত বিশ্বের এক ঐতিহাসিক বাধ্যবাধকতা।
সুনীল আচার্য কাঠমান্ডুভিত্তিক আন্তর্জাতিক জলবায়ু নীতিবিশেষজ্ঞ
দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেতে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত