
বাংলাদেশে কোরবানির সময় পশু জবাই ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেয়।
প্রতিবার ঈদুল আজহা উপলক্ষে লাখ লাখ পশু জবাই করা হয়, যার ফলে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য সৃষ্টি হয়। এই বর্জ্য যদি সঠিকভাবে অপসারণ ও ব্যবস্থাপনা না করা হয়, তবে তা জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও সামাজিক জীবনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই প্রেক্ষাপটে আধুনিক, পরিকল্পিত ও স্বাস্থ্যসম্মত কসাইখানা স্থাপন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আধুনিক কসাইখানা কেবল পশু জবাইয়ের স্থান নয়, এটি একটি সমন্বিত অবকাঠামো, যেখানে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে পশু জবাই, মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ, উপজাত সংগ্রহ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন হয়। এতে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি হ্রাস পায়, রোগজীবাণুর বিস্তার কমে এবং বর্জ্য থেকে মূল্যবান পণ্য উৎপাদন করা যায়।
২০২৫ সালের কোরবানির ঈদে শুধু ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত প্রায় ১৯ হাজার টন বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে। এই তথ্য কেবল ঢাকা শহরের, অথচ সারা দেশে কোরবানির পশুর সংখ্যা ও বর্জ্য অনেক বেশি। যদি প্রতিটি জেলায় বা অন্তত জেলা শহরে আধুনিক স্লটার হাউস স্থাপন করা যায়, তাহলে কোরবানিসহ বছরব্যাপী পশু জবাইয়ের সময় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সহজ, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব হবে।
উপজাত দ্রব্য ও রপ্তানির সম্ভাবনা: আধুনিক কসাইখানায় পশুর রক্ত, চামড়া, হাড়, অগ্ন্যাশয় ইত্যাদি উপজাত দ্রব্য সঠিকভাবে সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করা যায়। এসব দ্রব্য থেকে জেলেটিন, ফিড, ঔষধি উপাদান ও রপ্তানিযোগ্য পণ্য তৈরি করা সম্ভব। ফলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও শিল্প উন্নয়নের পথ প্রশস্ত হয়।
জননিরাপত্তা ও প্রশিক্ষণের অভাব: বর্তমানে অনেকেই অদক্ষ মৌসুমি কসাইয়ের মাধ্যমে পশু জবাই করান, ফলে জবাইয়ের সময় অনেক ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ঘটে। শুধু রাজধানীতেই ঈদুল আজহার সময় শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। অপর দিকে, ঘরোয়া পরিবেশে পশু জবাই করায় খরচও বেশি পড়ে এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। এ জন্য পেশাদার কসাই ও সাশ্রয়ী খরচে সেবা নিশ্চিত করার জন্য আধুনিক কসাইখানার প্রয়োজন।
প্রশাসনিক সমন্বয় ও আইনি কাঠামো: পশু জবাই ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রণে ‘পশু জবাই ও মাংসের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১১’ ও ‘বিধিমালা ২০২১’ রয়েছে। এসব আইন বাস্তবায়নে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো (সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ) কসাইখানা স্থাপনের দায়িত্বপ্রাপ্ত। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর মাংস পরিদর্শনের দায়িত্বে রয়েছে। এ দুটি সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জরুরি, যাতে সঠিকভাবে স্বাস্থ্যসম্মত মাংস উৎপাদন ও পরিবেশন নিশ্চিত হয়।
সৌদি আরবে হজ উপলক্ষে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (আইডিবি) ‘আদাহ’ প্রকল্প একটি সফল মডেল। সেখানে আধুনিক কসাইখানায় শরিয়াহসম্মতভাবে কোরবানি করা হয়, পেশাদার কসাই দ্বারা পশু জবাই হয় এবং ৫০০ টনের অধিক বর্জ্য দৈনিক জৈবসারে রূপান্তর করা হয়। ভাউচারের মাধ্যমে জবাই, সংরক্ষণ ও বিতরণ পুরোপুরি ডিজিটালাইজড। এ ধরনের মডেল বাংলাদেশেও অনুসরণ করা যেতে পারে।
বাংলাদেশে আধুনিক কসাইখানা গঠনে নিচের পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে:
• ই-ভাউচার ও অনলাইন বুকিং চালু করে কোরবানির পশু জবাইয়ের ব্যবস্থা।
• পেশাদার কসাই প্রশিক্ষণ ও নিয়োগ।
• পশুর উপজাত দ্রব্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানির ব্যবস্থা।
• আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সংরক্ষণ।
• সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে কসাইখানা স্থাপন ও পরিচালনা।
আধুনিক কসাইখানা শুধু কোরবানির সময় নয়, সারা বছর নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত ও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক পশু জবাই নিশ্চিত করতে পারে। স্থানীয় সরকার, প্রাণিসম্পদ বিভাগ ও স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশে একটি টেকসই, পরিবেশবান্ধব ও লাভজনক কসাইখানা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। এটি শুধু জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা নয়, বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ তৈরি করবে, যা টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
ডক্টর এস এম রাজিউর রহমান জাতীয় পরামর্শক, বিশ্বব্যাংক গ্রুপ-ইকো সিকিউরিটিজ/এসএসআইএল