ওসমান আলী সরকারের চক। দেড় বিঘার ওপর পুকুর, গোয়ালসহ দোতলা বাড়ি। খলিলুর রহমান ও সাত্তার সরকার টিনের বাড়ি ভেঙে এই বাড়ি নির্মাণ করেছেন। নয় সদস্যের বাড়িতে থাকেন মাত্র তিনজন। পাশের লুৎফর সরকারের চকেরও একই অবস্থা। দুই বিঘা জমির ওপর খেলার মাঠসহ তিনতলা বাড়ি।
এক ছেলে অস্ট্রেলিয়ায়, আরেক ছেলে যুক্তরাষ্ট্রে। গ্রামের শিশুরা খেলাধুলা করে আর বাড়ি ফাঁকা। আবদুল বারী সরকারের চকেরও একই অবস্থা। তিন ছেলে, ছেলের বউ, নাতি-নাতনিদের ভরা চক ছিল। এখন সেই বাড়িতে মাত্র চারজন মানুষ।
ঘটনাগুলো রমনা গ্রামের সবচেয়ে বড় পাড়া এনায়েতুল্যাহ সরকারের গ্রামের। এই পাড়া চারটি অংশে বিভক্ত। মূল অংশে বিখ্যাত জোতদার এনায়েত সরকার ও জেনায়েত সরকারের বাড়ি। এনায়েত সরকারের তিন ছেলে দবির উদ্দীন সরকার, নুরুল হক সরকার ও নছির সরকার। ৩ ভাইয়ের ১৩ জন ছেলের ৩ জন বাড়ির এলাকার বাইরে বাড়ি করেছেন। এই ১০ জনের আবার ১৯ জন ছেলে। এই ১৯ জনের মধ্যে হাফিজুর রহমান মারা গেছেন। ১৮ জনের মধ্যে বাড়িতে থাকছে মাত্র ১১ জন। বাড়িগুলো সব ফাঁকা। জেনায়েত সরকারের সাত ছেলে। তাঁদের বংশধরের অধিকাংশই পাড়ায় নেই।
আহমদ ছফার বয়ানে অধ্যাপক রাজ্জাকের ভাষায়, ‘বেঙ্গলের এন্টায়ার এডুকেশন সিস্টেমটাই টপ হেভি। এইখানে সাপোর্টিং কোনো কলেজ তৈয়ার করনের আগে এইটিন ফিফটি এইটে ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি তৈয়ার অইছে। একই রকম সাপোর্টিং স্কুল ছাড়া কলেজগুলা তৈয়ার অইছে। অখন গ্রামেগঞ্জে যেখানে যাইবেন দেখহেন কলেজ অইতাছে। এইগুলা কোনো কামে আইব না। আমাগো দরকার শক্তিশালী মিডল স্কুল। শিক্ষার আসল জায়গাটাতেই নজর পড়ছে না কারও।’
দবির উদ্দীন সরকারের পরিবারের সদস্যরা চাকরি ও শিক্ষা, নুরুল হক সরকারের সদস্যরা নিরাপত্তা ও উন্নত জীবন, নছির সরকারের পরিবারের সদস্যরাও চাকরি ও শিক্ষার উদ্দেশ্যেই গ্রাম ছেড়েছেন। একই ঘটনা সবারই।
চিলমারীর পাঁচ ভাগের তিন ভাগ ব্রহ্মপুত্রের পেটে। বন্দরসংলগ্ন গ্রামগুলোই ছিল বড় বড় গ্রাম। ১৯৬৩ সালের এক রিপোর্টে দেখা যায়, রমনা ইউনিয়নের চারটি গ্রাম—রমনা, মুদাফৎথানা, পাত্রখাতা ও খরখরিয়া গ্রাম। থানাহাট ইউনিয়নের গ্রামগুলো হলো মাচাবান্দা, কুষ্টারি, বালাবাড়ী। রানীগঞ্জ, চিলমারী, নয়ারহাট, অষ্টমীরচর ইউনিয়ন মূলত ব্রহ্মপুত্রের পেটে। এই ইউনিয়নগুলো ভেঙে রমনা ও থানাহাট ইউনিয়নে বসতি গেড়েছে। ফলে এই দুই ইউনিয়নে বিস্তীর্ণ ফসলের খেত আর নেই। চতুর্দিকে বাড়ি আর বাড়ি।
দুই.
বিশাল ব্রহ্মপুত্রে এখনো জাল ফেললে সুস্বাদু সব মাছ পাওয়া যায়, চাইলে চরাঞ্চলের মাঠঘাটে বিনে পয়সায় প্রাকৃতিক খাবার মেলে। চিলমারী ঐতিহাসিক কাল থেকে স্বাস্থ্যকর স্থান। এখনো উঁচালম্বা শালপ্রাংশু চেহারার মানুষ মেলে। তবু কেন বড় শহরে সবাই নিবাস গড়ছে?
কয়েকটি ধাপে ঘটনাটি ঘটছে। প্রথমে আশপাশের যে শহরগুলোয় উন্নত স্কুল আছে, সেখানে অভিভাবকেরা সন্তানদের নিয়ে যাচ্ছেন। তারপর যে শহরগুলোয় বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজ আছে, এমন শহরে। অর্থাৎ গ্রাম ছাড়ার মূল কারণ উপযুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাব।
দেখা গেছে, গ্রামে ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকলে চাকরিজীবীরা সন্তানদের এলাকায় রেখে পড়ালেখা করান। তার নগদ উদাহরণ হচ্ছে, পাশের গাইবান্ধা জেলা। সেখানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে ভালো স্কুল থাকায় গ্রাম ছাড়ার এই হার অনেক কম। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে একজন শিক্ষার্থীর জন্য মাতা–পিতাকে বাড়ি ছাড়তে হয় না, কিন্তু প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের জন্য তা হয়।
অথচ নব্বইয়ের দশকে চিলমারীতে চারটি লোকাল ট্রেন চলত। লোকাল ট্রেনগুলো যখন ছিল এবং গ্রাম ও শহরের স্কুলের মধ্যে তেমন ভেদ ছিল না, তখন পিতারা পরিবারকে গ্রামে রেখে চাকরি করতে যেতেন।
তিন.
রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী। বাংলার মফস্সলে বসবাস করে বিজ্ঞানমনস্ক প্রবন্ধ, দর্শন ও যুক্তিবাদী চিন্তা চর্চা করেন। তিনি শহরের অধ্যাপক না হয়েও বাংলায় বিজ্ঞানবোধ গড়ে তোলেন। তাঁর মিষ্টি গদ্য পাঠকের জিহ্বায় এখনো লেগে আছে। একইকালের গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য। উনিশ শতকের বাংলায় গ্রামে বসে জ্যোতির্বিদ্যা ও গণিত চর্চা করেছেন। ইংরেজি শিক্ষা ও শহুরে প্রতিষ্ঠানের বাইরে থেকেও জ্ঞানচর্চার নজির গড়েন।
বিশ শতকের মৌলভি ইসমাইল হোসেন সিরাজী। সিরাজগঞ্জের গ্রামীণ সমাজে বসে যুক্তি, বিজ্ঞানবোধ ও সমাজচিন্তা নিয়ে লেখালেখি ও পাঠচক্র পরিচালনা করেন। ছিল একধরনের ‘গ্রামভিত্তিক বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা’। অন্যদিকে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ চট্টগ্রামের পটিয়া গ্রামের বাসিন্দা। গ্রামে থেকেই প্রাচীন পুঁথি সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও সম্পাদনা করে বাংলা মধ্যযুগের সাহিত্যের দলিল রক্ষা করেছেন।
একই চট্টগ্রামের আবুল ফজল। গ্রামীণ অঞ্চলে দীর্ঘকাল অবস্থান করে যুক্তিবাদ, বিজ্ঞানমনস্কতা ও প্রগতিশীল চিন্তা চর্চা করেন। তিনি সচেতনভাবেই শহরমুখী হননি। জিয়াউর রহমান তাঁকে ধরে এনে তাঁর উপদেষ্টা বানান। দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বরের কথা তো জানি। বরিশালের লামচরি গ্রামে ‘আমিন’ পেশায় যুক্ত থেকে জ্ঞান চর্চা করেছেন, বই লিখেছেন।
এখন ইন্টারনেটের যুগ। এখন আর বাঙালি বিজ্ঞানী সত্যেন বোসকে জাহাজে করে জার্মান বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের কাছে চিঠি পাঠাতে হয় না। এখন চট্টগ্রামে বসেই যুক্তরাষ্ট্রের নোয়াম চমস্কির সঙ্গে আড্ডা দেওয়া যায়। এরপরও গ্রামে বড় মানুষ তৈরি হচ্ছে না কেন?
অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক কত আগে রোগটা ধরতে পেরেছিলেন। সেই রোগে এখন গ্রাম ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। গ্রাম থেকে যারা শহরে বাড়ি করছে, তারা মূলত উচ্চশিক্ষিত এবং অবস্থাপন্নও।
আহমদ ছফার বয়ানে অধ্যাপক রাজ্জাকের ভাষায়, ‘বেঙ্গলের এন্টায়ার এডুকেশন সিস্টেমটাই টপ হেভি। এইখানে সাপোর্টিং কোনো কলেজ তৈয়ার করনের আগে এইটিন ফিফটি এইটে ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি তৈয়ার অইছে। একই রকম সাপোর্টিং স্কুল ছাড়া কলেজগুলা তৈয়ার অইছে। অখন গ্রামেগঞ্জে যেখানে যাইবেন দেখহেন কলেজ অইতাছে। এইগুলা কোনো কামে আইব না। আমাগো দরকার শক্তিশালী মিডল স্কুল। শিক্ষার আসল জায়গাটাতেই নজর পড়ছে না কারও।’
সবচেয়ে বড় ক্ষতি, বড় মানুষেরা সব বড় শহরে চলে যাচ্ছেন। গ্রামের শিশুরা গাঁয়ে বড় মানুষ দেখতে না পেয়ে বড় স্বপ্ন আর দেখতে পায় না। তাঁদের শিক্ষা ও জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তরুণেরা। কৃষিতে মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। গ্রামে উন্নত স্কুল আর যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করলেই লোকে ভরে উঠবে লোকালয়।
নাহিদ হাসান: লেখক ও সংগঠক।
nahidknowledge1@gmail.com
(মতামত লেখকের নিজস্ব)