খুলনার পাইকগাছায় রান্নার সময় সবুজ হয়ে যাওয়া গরুর মাংস। পরে সেই মাংসসহ কড়াই নিয়ে প্রশাসনের শরণাপন্ন হন একটি বেকারির কর্মচারীরা
খুলনার পাইকগাছায় রান্নার সময় সবুজ হয়ে যাওয়া গরুর মাংস। পরে সেই মাংসসহ কড়াই নিয়ে প্রশাসনের শরণাপন্ন হন একটি বেকারির কর্মচারীরা

মতামত

খুলনার সবুজ গরুর মাংস: বিষ, ব্যাকটেরিয়া নাকি রান্নাঘরের রসায়ন

একটি হাঁড়ি, অসংখ্য প্রশ্ন

বনভোজনের জন্য কেনা হয়েছিল গরুর মাংস। রান্নাও চলছিল স্বাভাবিকভাবে। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই দেখা গেল অস্বাভাবিক দৃশ্য—মাংসের টুকরাগুলো ধীরে ধীরে সবুজ হয়ে যাচ্ছে। উদ্বিগ্ন আয়োজকেরা শেষ পর্যন্ত রান্না করা মাংসের কড়াই নিয়ে থানায় হাজির হন। খুলনার পাইকগাছার এ ঘটনা ছড়িয়ে পড়তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় নানা জল্পনা। কেউ বললেন বিষ, কেউ রাসায়নিক ভেজাল, আবার কেউ অসুস্থ গরুর মাংস বিক্রির অভিযোগ তুললেন।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ কাঁচা ও রান্না করা—দুই ধরনের মাংসের নমুনা সংগ্রহ করেছে। কর্মকর্তাদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে শুধু মাংসের টুকরাগুলোর রং বদলেছে, ঝোল সবুজ হয়নি। তবে পরীক্ষাগারের ফল না আসা পর্যন্ত এর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করে বলার সুযোগ নেই।

প্রশ্ন হলো, রান্নার সময় গরুর মাংস কি সত্যিই সবুজ হতে পারে?

বিজ্ঞানের উত্তর—হ্যাঁ, পারে। তবে সবুজ হওয়ার কারণ সব ক্ষেত্রে এক নয়।

এ ঘটনা কি সত্যিই নতুন

মাংসের সবুজ, নীলাভ কিংবা ধূসর বর্ণ নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বহু বছর ধরে গবেষণা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে শীতলীকৃত ও মোড়কজাত গরুর মাংস, ইউরোপে রান্না ও সংরক্ষণ করা মাংস এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশে মাংসজাত খাবারে অস্বাভাবিক বর্ণ পরিবর্তনের ঘটনা গবেষণাগারে নথিবদ্ধ হয়েছে।

এসব ঘটনা খুলনার ঘটনার হুবহু পুনরাবৃত্তি নয়। তবে এগুলো প্রমাণ করে, মাংসের অস্বাভাবিক রং খাদ্যবিজ্ঞানের কাছে একেবারে অজানা বিষয় নয়। মাংসের প্রজাতি, সংরক্ষণ, বাতাসের উপস্থিতি, তাপমাত্রা, অম্লত্ব, জীবাণু এবং রান্নার উপকরণ—সবকিছুই এর রংকে প্রভাবিত করতে পারে।

সবুজ রঙের ভেতরের বিজ্ঞান

গরুর মাংসের লাল রঙের মূল উৎস পেশিতে থাকা মায়োগ্লোবিন নামে একটি প্রাকৃতিক রঞ্জক প্রোটিন। প্রাণী জবাইয়ের পর বাতাসের সংস্পর্শে এলে এর রাসায়নিক অবস্থার পরিবর্তন শুরু হয়। এ কারণেই সদ্য কাটা মাংস কখনো বেগুনি, বাতাসে রাখলে উজ্জ্বল লাল এবং দীর্ঘ সময় পর বাদামি দেখাতে পারে।

বিশেষ পরিস্থিতিতে সালফারজাত পদার্থের সঙ্গে মায়োগ্লোবিনের বিক্রিয়ায় সালফমায়োগ্লোবিন নামে সবুজাভ যৌগ তৈরি হতে পারে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, উত্তাপের সময় মাংসে স্বাভাবিকভাবে থাকা সালফারসমৃদ্ধ উপাদানের জারণ থেকেও এমন সবুজ বর্ণ তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ রান্না করা মাংস সবুজ হলেই তাতে বাইরে থেকে বিষ বা রং মেশানো হয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিক নয়।

সব দোষ কি জীবাণুর

কিছু জীবাণুও মাংসের রং বদলে দিতে পারে। নির্দিষ্ট কিছু জীবাণু হাইড্রোজেন সালফাইড বা হাইড্রোজেন পার–অক্সাইডের মতো পদার্থ তৈরি করে। এগুলো মাংসের প্রাকৃতিক রঞ্জকের সঙ্গে বিক্রিয়া করে সবুজাভ বর্ণ সৃষ্টি করতে পারে।

অনুপযুক্ত তাপমাত্রায় মাংস রাখা, অপরিষ্কারভাবে কাটা, দীর্ঘ সময় বাইরে ফেলে রাখা কিংবা রান্নার আগে সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করলে জীবাণুর সংখ্যা বাড়তে পারে। তবে শুধু সবুজ রং দেখেই জীবাণুর উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায় না। দুর্গন্ধ, পিচ্ছিল ভাব বা অস্বাভাবিক গঠন থাকলে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য জীবাণুবিষয়ক পরীক্ষা প্রয়োজন।

রান্নাঘরের অদৃশ্য রসায়ন

খুলনার ঘটনায় রান্নার পাত্র, পানি ও মসলার ভূমিকাও তদন্ত করা দরকার। ধাতব হাঁড়ির ক্ষয়, পানিতে থাকা কোনো ধাতব উপাদান, মসলার ভেজাল কিংবা রান্নার সময় একাধিক উপাদানের পারস্পরিক বিক্রিয়া রঙের পরিবর্তন ঘটাতে পারে।

শুধু মাংস সবুজ অথচ ঝোল স্বাভাবিক থাকার বিষয়টি বিশেষভাবে কৌতূহলোদ্দীপক। তবে এ থেকে এখনই কোনো সিদ্ধান্ত টানা যাবে না। একই মাংস পরিষ্কার পাত্রে, একই তাপমাত্রায় এবং নিয়ন্ত্রিত উপকরণ দিয়ে রান্না করে তুলনামূলক পরীক্ষা করলে রান্নাঘরের কোনো উপাদান দায়ী কি না, সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

রং বদলালেই কি বিপদ

সবুজ মানেই বিষ নয়। আবার সবুজ মানেই নিরাপদ—এ কথাও বলা যায় না।

যদি রং বদলানোর কারণ কেবল মাংসের রঞ্জকের রাসায়নিক পরিবর্তন হয়, তাহলে তা সব সময় গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির নির্দেশক নয়। কিন্তু জীবাণু, বিষাক্ত ধাতু, ক্ষতিকর রাসায়নিক বা অনুপযুক্ত সংরক্ষণ দায়ী হলে অসুস্থতার আশঙ্কা থাকতে পারে।

তাই কোনো মাংস অস্বাভাবিক সবুজ হলে স্বাদ নিয়ে পরীক্ষা করা, ধুয়ে আবার রান্না করা কিংবা অতিরিক্ত মসলা দিয়ে খাওয়ার চেষ্টা নিরাপদ নয়। মাংসটি আলাদা করে রেখে স্থানীয় নিরাপদ খাদ্য বা স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে জানানোই উচিত।

শেষ কথা বলবে পরীক্ষাগার

খুলনার মাংসে বিষ ছিল, জীবাণু ছিল, নাকি রান্নার সময় কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটেছিল, ছবি দেখে এর উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। জানতে হবে, মাংসটি কোথা থেকে এসেছে, কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছিল, কোন পাত্রে রান্না হয়েছে এবং কী কী উপাদান ব্যবহার করা হয়েছিল। এরপর করতে হবে রঞ্জক, জীবাণু, ধাতু ও সম্ভাব্য রাসায়নিক দূষণের পরীক্ষা।

একটি সবুজ মাংসের টুকরা আমাদের চোখে আতঙ্ক তৈরি করতে পারে। কিন্তু বিজ্ঞান আতঙ্কের ভাষায় কথা বলে না। সে নমুনা পরীক্ষা করে, প্রমাণ খোঁজে, তারপর সিদ্ধান্ত দেয়।

খুলনার ঘটনায়ও শেষ কথা বলবে পরীক্ষাগার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নয়।

  • ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির শিক্ষক, গবেষক ও লেখক, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম

akmhumayun@cvasu.ac.bd