বেশ কিছুদিন হলো, আবার অভ্যস্ত, গৎবাঁধা ও আটপৌরে জীবনে ফিরে এসেছি। দিনের শুরুতে সকালে পার্কে হাঁটতে যাওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা–সম্পর্কিত বিবিধ কার্যক্রমে অংশ নেওয়া, বই পড়া, লেখালেখি, ছুটির দিনে বাজারঘাট করা ইত্যাদি।
গত সপ্তাহে হাঁটতে গিয়েছিলাম, গুলশান ইয়ুথ ক্লাব এবং শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ স্মৃতি পার্কে। প্রবেশপথে নতুন নামফলক দেখলাম, গুলশান সেন্ট্রাল পার্ক অ্যান্ড স্পোর্টস কমপ্লেক্সে। আরও কিছুটা হাঁটতেই ক্লাবের পুরোনো ভবনে দেখলাম নতুন একটা পাঠাগার হয়েছে, নাম ‘কবি আল মাহমুদ পাঠাগার’। অথচ আমাদের প্রধান কবি আল মাহমুদকে খারিজ করার কত অপচেষ্টাই না হয়েছে: কবির জানাজায়, ঢাকায় কবর দিতে বাধা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ইতিহাস আল মাহমুদকে তাঁর যোগ্য মর্যাদায় সমাসীন করেছে।
আমাদের তরুণ প্রজন্ম তাদের আইকন চিনতে ভুল করেনি। শুধু তা–ই নয়, এখন শেখ মুজিবের জন্মদিনে, মৃত্যুদিবসে তাঁর অনুসারীরা আল মাহমুদের কবিতা ‘নিশিডাক’ উদ্ধৃত করে। জুলাই আমাদের এই আত্মানুসন্ধানের সুযোগ করে দিয়েছে। জুলাই যে সব অনিয়ম বন্ধ করেছে এমন নয়, গুলশানেই জনসাধারণের সাহাবুদ্দীন পার্কের অভ্যন্তরে নর্থ এন্ড কফিশপ ও রোস্টার এখনো তার অবাঞ্ছিত ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ স্মৃতি পার্ক নামটি পাল্টে ফেলা হয়েছে জেনে ক্ষুব্ধ হয়েছিলাম। হাঁটতে গিয়ে দেখলাম বিষয়টি সঠিক নয়। শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ স্মৃতি পার্ক নামফলকটি আগের অবস্থানেই আছে। অর্থাৎ গুলশান অ্যাভিনিউ–সংলগ্ন অংশটি শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ স্মৃতি পার্ক। এর পূর্ব দিকের অংশটি গুলশান সেন্ট্রাল পার্ক অ্যান্ড স্পোর্টস কমপ্লেক্স, যা আগে গুলশান ইয়ুথ ক্লাব নামে পরিচিত ছিল।
আমাদের তরুণ প্রজন্মকে মাদক, চাঁদাবাজি ও অন্যান্য সামাজিক অপরাধ থেকে ফেরাতে হলে তাদের পার্কমুখী ও নানা খেলাধুলায় উৎসাহিত করতে হবে। ভূমিদস্যুদের শ্যেন দৃষ্টি থেকে পার্কগুলোকে রক্ষা করতে হবে। পার্কগুলোর সামাজিক (সরকারি ও বেসরকারি) অর্থায়ন বাড়াতে হবে। সরকারি ভূমিতে পার্ক পরিচালনা ও সদস্য ও ব্যবহার ফি আদায়কারী প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় ও ব্যয়ের নিরীক্ষিত সম্পূর্ণ হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
১৯৭৮ সালে স্থাপিত গুলশান ইয়ুথ ক্লাব, একসময় আমাদের দেশের প্রথম ব্যবসায়ী রাষ্ট্রপতি এরশাদের শ্যেন দৃষ্টিতে পড়ে। তাঁর শাসনামলে এই পার্কের অ্যাভিনিউ–সংলগ্ন অংশ ‘ওয়ান্ডারল্যান্ড অ্যামিউজমেন্ট পার্ক’ হিসেবে যমুনা গ্রুপকে এবং পূর্বের অংশ ‘বন কিডস’ নামে র্যাংগস গ্রুপকে দিয়ে দেয়। পরে তরুণেরা হইচই করলে মধ্যবর্তী অংশ গুলশান ইয়ুথ ক্লাবকে ব্যবহার করতে দেওয়া হয়।
জনসাধারণের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হলে, দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশক্রমে ২০১২ সালে ওয়ান্ডারল্যান্ড অ্যামিউজমেন্ট পার্ক উৎখাত করা হয়। রাজউক সেখানে আবার সবুজ গাছগাছালি লাগিয়ে পুনর্বাসন করে ঢাকা সিটি করপোরেশনকে এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেয়।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন পার্কের এই অংশের নতুন নামকরণ করে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ স্মৃতি পার্ক। পার্কের দুটি অংশ একীভূত করে পার্কের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব গুলশান ইয়ুথ ক্লাবকে দেওয়া হয়। এতে করে নতুন বিতর্কের সূত্রপাত হয়, তাহলে পার্কের মালিক কে?
দুই মন্ত্রণালয়, পূর্ত ও স্থানীয় সরকার, এবং দুই সংস্থা রাজউক ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন মিলে এখন সাব্যস্ত হয়েছে পার্কের মালিক রাজউক। আবারও রাজউকের সঙ্গে এক সমঝোতা স্মারকের আওতায় গুলশান ইয়ুথ ক্লাব পার্কের দুই অংশেরই রক্ষণাবেক্ষণ করছে।
সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত এই পার্কটিতে হাঁটাহাঁটির, বাচ্চাদের দোলনা ও অন্যান্য খেলার সামগ্রীর ব্যবস্থা ছাড়াও আগে থেকেই এখানে আছে ক্রিকেট খেলার মাঠ ও নেট প্র্যাকটিসের সুবিধা, বাস্কেটবল কোর্ট, ইনডোর ব্যাডমিন্টন, সুইমিংপুল, ফিটনেস সেন্টার ও জিম, রোলার স্কেটিং, কারাতে ও ইয়োগা প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা। সম্প্রতি যোগ হয়েছে ঘেরা দেওয়া ফুটবল খেলার টার্ফ।
এ ছাড়া সংগৃহীত জাকাত তহবিল থেকে বিনা মূল্যে ক্লিনিক, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য সকালের নাশতাসহ প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। জমজমাট এই পার্কটিতে শিশু, কিশোর, তরুণ থেকে বয়স্করা সবাই আসে নিজ নিজ আগ্রহের খেলা খেলতে ও কাজটি করতে। গুলশান এলাকার অন্যতম ব্যস্ত গণস্থাপনা হয়ে উঠেছে এই গুলশান সেন্ট্রাল পার্ক অ্যান্ড স্পোর্টস কমপ্লেক্স।
পার্ক পরিচালনা ব্যয়বহুল; জনবল, প্রহরী, কোচ লাগে, আরও আছে আনুষঙ্গিক খরচ। এই পার্কে কোচ ও প্রশিক্ষকের সংখ্যা ২৫, অফিসে কর্মকর্তা–কর্মচারী আছে আটজন, প্রহরী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী আছে কয়েক ডজন। মূলত এই পরিচালন ব্যয়ের কথা বলেই ভূমিদস্যুরা পার্কের দখল নেয়, ওয়ান্ডারল্যান্ড, নর্থ এন্ড কফিশপ অ্যান্ড রোস্টার স্থাপিত হয়। পৃথিবীর অন্যত্র পার্কের ব্যয় স্থানীয় সরকার বহন করে। লোকজন উইল করে তাদের সম্পত্তির একাংশ পার্ক, হাসপাতাল, স্কুল ও কলেজকে দিয়ে যায়। এ জন্যই পার্কের স্থাপনায়, বেঞ্চিতে তাদের ভালোবাসার মানুষদের নাম উৎকীর্ণ থাকে।
অর্থনীতিবিদেরা, বিশেষ করে বুকানন ১৯৬৫ সালে তাঁর প্রভাবশালী নিবন্ধে প্রাইভেট ও পাবলিক গুডসের পাশাপাশি ক্লাব গুডের তত্ত্ব উপস্থাপন করেছেন। এতে বলা হয়েছে, এ–জাতীয় সেবার বৈশিষ্ট্য হলো, এগুলোর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা যায় (পাবলিক গুডসের মতো নয়) কিন্তু ভিড় না হওয়া পর্যন্ত নন-রাইভাল, অর্থাৎ একজনের ব্যবহার অন্যের উপযোগিতা কমায় না।
বাজার অর্থনীতিতে এ–জাতীয় পণ্যের সরবরাহ অপর্যাপ্ত হয়ে থাকে। তাই এ–জাতীয় সেবার আর্থিক সংস্থান করা হয়ে থাকে বার্ষিক সদস্য ফি (যা মূলধনি ব্যয় নির্বাহের জন্য ব্যবহৃত হয়) ও ব্যবহার ফির (যা দিয়ে পরিচালন ব্যয় নির্বাহ করা হয়) মাধ্যমে। ব্যবহার ফির আরেকটি ভালো দিক হলো এর মাধ্যমে ভিড় এড়ানো সম্ভব হয়। যেহেতু খেলার মাঠের আয়তন সীমিত তাই সবাই একসঙ্গে খেলতে এলে তো কেউই খেলতে পারবে না। ব্যবহার ফির মাধ্যমে দিন বা সময় নির্ধারণ করে সীমিত সুবিধার সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়।
গুলশান সেন্ট্রাল পার্ক অ্যান্ড স্পোর্টস কমপ্লেক্স এভাবেই তার মূলধনি ও পরিচালন ব্যয় নির্বাহ করছে। তাই কেউ কেউ ক্লাবটির বিরুদ্ধে সরকারি সম্পত্তি দিয়ে ব্যবসার অভিযোগ করেছে। কিন্তু এর বিকল্প কী? ওয়ান্ডারল্যান্ড বা নর্থ এন্ড কফিশপ রোস্টার, বা পার্কের ভেতর থাই-চায়নিজ রেস্টুরেন্টের মতো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান স্থাপন এর বিকল্প হতে পারে না।
তবে এখানেও কথা আছে। যেহেতু বিনা মূল্যে সরকারি সম্পত্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, জনসাধারণ থেকে সদস্য ও ব্যবহার ফি আদায় করা হচ্ছে, গুলশান ইয়ুথ ক্লাবকে তাদের আয়–ব্যয়ের ব্যাপারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। আমি গুলশান ইয়ুথ ক্লাবের ২০২৫-২৬ সালের বার্ষিক রিপোর্ট দেখেছি। তাতে চলতি বছরের নিরীক্ষিত হিসাব অনুমোদনের কথা বলা হলেও প্রকাশনাটিতে বিশদ বিবরণ তো নয়ই, এমনকি মোট আয় ও ব্যয়েরও উল্লেখ নাই। গুলশান ইয়ুথ ক্লাবকে তাদের আয় ও ব্যয়ের সম্পূর্ণ হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
আমাদের তরুণ প্রজন্মকে মাদক, চাঁদাবাজি ও অন্যান্য সামাজিক অপরাধ থেকে ফেরাতে হলে তাদের পার্কমুখী ও নানা খেলাধুলায় উৎসাহিত করতে হবে। ভূমিদস্যুদের শ্যেন দৃষ্টি থেকে পার্কগুলোকে রক্ষা করতে হবে। পার্কগুলোর সামাজিক (সরকারি ও বেসরকারি) অর্থায়ন বাড়াতে হবে। সরকারি ভূমিতে পার্ক পরিচালনা ও সদস্য ও ব্যবহার ফি আদায়কারী প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় ও ব্যয়ের নিরীক্ষিত সম্পূর্ণ হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
● মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান অর্থনীতিবিদ
মতামত লেখকের নিজস্ব