সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এ এইচ এম কামারুজ্জামান ও মনসুর আলী
সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এ এইচ এম কামারুজ্জামান ও মনসুর আলী

ইতিহাসের আয়নায়

চার নেতার হত্যাকাণ্ড নিয়ে জেল কর্মকর্তাদের প্রতিবেদন

১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর জেলখানায় বন্দী অবস্থায় হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতা—সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এ এইচ এম কামারুজ্জামান এবং ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকে। প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান সম্পাদিত এবং প্রথমা প্রকাশন থেকে বের হওয়া পঁচাত্তরের অস্থির সময়: ৩ থেকে ৭ নভেম্বরের অকথিত ইতিহাস বইয়ে সেই ঘটনার কিছু দলিল গ্রন্থিত হয়েছে। প্রথম আলোর পাঠকদের জন্য সেই দলিল কিছুটা সংক্ষেপিত আকারে প্রকাশ করা হলো।

১৯৭৫ সালের নভেম্বরের জেলহত্যা সম্পর্কে তৎকালীন আইজি প্রিজন নুরুজ্জামান ঘটনার এক দিন পর ৫ নভেম্বর তৎকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর নিজের একটি বিবৃতিসহ তখন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কর্তব্যরত ঢাকা বিভাগের ডিআইজি প্রিজন খন্দকার আবদুল আওয়ালের প্রতিবেদন পাঠান। আইজি প্রিজন নুরুজ্জামান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যে রিপোর্ট পাঠান, তার সঙ্গে নিহত জাতীয় চার নেতার লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন ছিল।

আইজি প্রিজনের বিবৃতি ও ডিআইজি প্রিজনের রিপোর্ট এবং চার নেতার সুরতহাল প্রতিবেদনের পূর্ণ বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:

১. আইজি প্রিজন নুরুজ্জামানের প্রতিবেদন

১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ভোর তিনটায় আমি বঙ্গভবন থেকে মেজর রশিদের একটি ফোন পাই। তিনি আমার কাছে জানতে চান, ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে কোনো সমস্যা আছে নাকি। আমি জানালাম, ঠিক এই মুহূর্তের অবস্থা আমার জানা নেই। এরপর তিনি আমাকে জানালেন, কয়েকজন বন্দীকে জোর করে নিয়ে যেতে কয়েকজন সেনাসদস্য জেলগেটে যেতে পারে। আমি যেন জেল গার্ডদের সতর্ক করে দিই। সে অনুযায়ী আমি সেন্ট্রাল জেলে ফোন করি এবং জেলগেটে দায়িত্বে থাকা ওয়ার্ডেনকে মেসেজটি জেলারকে পৌঁছে দিতে বলি, যাতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়।

৩-৪ মিনিট পর বঙ্গভবন থেকে আরেকজন আর্মি অফিসারের ফোন পাই। তিনি জানতে চান, আমি ইতিমধ্যেই ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে গার্ডদের সতর্ক করে দিয়েছি কি না। আমি ইতিবাচক জবাব দেওয়ার পর তিনি আমাকে নিরাপত্তাব্যবস্থা স্বচক্ষে দেখার জন্য জেলগেটে চলে যেতে বলেন। আমি তখন ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে ডিআইজি প্রিজনকে ফোন করি। খবরটি জানিয়ে আমি তাঁকে তাৎক্ষণিকভাবে জেলগেটে চলে যেতে বলি। দেরি না করে আমিও জেলগেটে চলে যাই। ইতিমধ্যেই সেখানে পৌঁছে যাওয়া জেলারকে আবার গার্ডদের সতর্ক করে দিতে বলি। এরই মধ্যে ডিআইজিও জেলগেটে পৌঁছান। বঙ্গভবন থেকে পাওয়া খবরটি আমি আবার তাঁকে জানাই।

এর পরপরই মেজর রশিদের আরেকটি ফোন পাই। তিনি আমাকে জানান, কিছুক্ষণের মধ্যেই জনৈক রিসালদার মোসলেহউদ্দিন জেলগেটে যেতে পারেন। তিনি আমাকে কিছু বলবেন। তাঁকে যেন জেল অফিসে নেওয়া হয় এবং ১. জনাব তাজউদ্দীন আহমদ ২. জনাব মনসুর আলী ৩. জনাব সৈয়দ নজরুল ইসলাম ৪. জনাব কামারুজ্জামান—এই চারজন বন্দীকে যেন তাঁকে দেখানো হয়।

এ খবর শুনে আমি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কথা বলতে চাই এবং টেলিফোন রাষ্ট্রপতিকে দেওয়া হয়। আমি কিছু বলার আগেই রাষ্ট্রপতি জানতে চান, আমি পরিষ্কারভাবে মেজর রশিদের নির্দেশ বুঝতে পেরেছি কি না। আমি ইতিবাচক জবাব দিলে তিনি আমাকে তা পালন করার আদেশ দেন।

কয়েক মিনিটের মধ্যেই চারজন সেনাসদস্যসহ কালো পোশাক পরা রিসালদার মোসলেহউদ্দিন জেলগেটে পৌঁছান। ডিআইজি প্রিজনের অফিসকক্ষে ঢুকেই তিনি আমাদের বলেন, পূর্বোল্লিখিত বন্দীদের যেখানে রাখা হয়েছে, সেখানে তাঁকে নিয়ে যেতে। আমি তাঁকে বলি, বঙ্গভবনের নির্দেশ অনুযায়ী তিনি আমাকে কিছু বলবেন। উত্তরে তিনি জানান, তিনি তাঁদের গুলি করবেন। এ ধরনের প্রস্তাবে আমরা সবাই বিমূঢ় হয়ে যাই। আমি নিজে এবং ডিআইজি প্রিজন ফোনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করি, কিন্তু ব্যর্থ হই।

মতিউর রহমান সম্পাদিত এবং প্রথমা প্রকাশন থেকে বের হওয়া পঁচাত্তরের অস্থির সময়: ৩ থেকে ৭ নভেম্বরের অকথিত ইতিহাস

সে সময় জেলারের ফোনে বঙ্গভবন থেকে মেজর রশিদের আরেকটি কল আসে। আমি ফোনটি ধরলে মেজর রশিদ জানতে চান, রিসালদার মোসলেহউদ্দিন সেখানে পৌঁছেছেন কি না। আমি ইতিবাচক জনাব দিই এবং তাঁকে বলি, কী ঘটছে, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। তখন মেজর রশিদ আমাকে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কথা বলতে বলেন। আমি রাষ্ট্রপতিকে রিসালদারের বন্দীদের গুলি করার ইচ্ছার কথা জানাই। রাষ্ট্রপতি জবাব দেন, সে যা বলছে, তা-ই হবে। তখন আমরা আরও উত্তেজিত হয়ে যাই। রিসালদার মোসলেহউদ্দিন বন্দুকের মুখে আমাকে, ডিআইজি প্রিজন, জেলার ও সে সময় উপস্থিত অন্য কর্মকর্তাদের সেখানে যাওয়ার নির্দেশ দেন, যেখানে উল্লিখিত বন্দীদের রাখা হয়েছে।

রিসালদার ও তাঁর বাহিনীকে তখন উন্মাদের মতো লাগছিল এবং আমাদের কারও তাঁদের নির্দেশ অমান্য করার উপায় ছিল না। তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী পূর্বোল্লিখিত চারজনকে অন্যদের কাছ থেকে আলাদা করা হয় এবং একটি রুমে আনা হয়, সেখানে জেলার তাঁদের শনাক্ত করেন। রিসালদার মোসলেহউদ্দিন এবং তাঁর বাহিনী তখন বন্দীদের গুলি করে হত্যা করে। কিছুক্ষণ পর নায়েক এ আলীর নেতৃত্বে আরেকটি সেনাদল সবাই মারা গেছে কি না, তা নিশ্চিত হতে জেলে আসে। তারা সরাসরি সেই ওয়ার্ডে চলে যায় এবং পুনরায় তাঁদের মৃতদেহে বেয়নেট চার্জ করে।

২. ডিআইজি প্রিজন কে এ আওয়ালের প্রতিবেদন

আপনার অবগতির জন্য জানাচ্ছি, গত ২ নভেম্বর ’৭৫ দিবাগত রাত ৩ ঘটিকায় আমি আমার বাসভবনে অবস্থানকালে জেলের ইন্সপেক্টর জেনারেলের কাছ থেকে আমাকে জেলগেটে যাওয়ার নির্দেশসংবলিত একটি মেসেজ পাই। তিনি আরও জানান, বঙ্গভবন থেকে প্রাপ্ত নির্দেশের ভিত্তিতে তিনি নিজেও জেলগেট অভিমুখে রওনা দিচ্ছেন। আমাকে আরও বলা হয়, এই মর্মে রিপোর্ট পাওয়া গেছে যে কতিপয় সামরিক কর্মকর্তা জেলগেটে আসতে পারেন এবং জোরপূর্বক কয়েকজন বন্দীকে নিয়ে যেতে পারেন। মুহূর্তমাত্র ব্যয় না করে আমি জেলগেটের উদ্দেশে রওনা দিলাম এবং রাত ৩টা ২০ মিনিট নাগাদ সেখানে পৌঁছালাম। গিয়ে দেখি জেলগেটে জেলের ইন্সপেক্টর জেনারেল এবং জেলার আগে থেকেই উপস্থিত। অতঃপর আমি ইন্সপেক্টর জেনারেলকে সঙ্গে নিয়ে আমার অফিসকক্ষে গেলাম।

একটু পরই জেলের ইন্সপেক্টর জেনারেল একটি টেলিফোন কল রিসিভ করলেন। আমাকে বলা হলো, তা বঙ্গভবন থেকে এসেছে। এখানে বলা যেতে পারে, এই টেলিফোন সংলাপে ইন্সপেক্টর জেনারেল রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন। স্পষ্টতই তাঁর অনুরোধ মেনে নেওয়া হয়েছিল। কেননা আমি তাঁকে ‘স্যার’ সম্বোধন করতে এবং সালাম দিতে শুনলাম। টেলিফোনে আলাপ সেরে ইন্সপেক্টর জেনারেল আমাকে জানালেন যে তাঁকে বলা হয়েছে, কয়েকজন সশস্ত্র গার্ড নিয়ে রিসালদার মোসলেহ জেলে আসবেন এবং তাঁকে ভেতরে নিয়ে যেতে হবে। তিনি (রিসালদার মোসলেহউদ্দিন) যা করতে চান, তাঁকে তা করতে দিতে হবে এবং বন্দী তাজউদ্দীন আহমদ, মনসুর আলী, সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও এ এইচ এম কামারুজ্জামান কারা, তাঁকে তা চিনিয়ে দিতে হবে।

রেকর্ড অনুসারে রিসালদার মোসলেহ আর তাঁর দল জেলগেটে ঢুকেছে ভোর চারটায় এবং জেলগেট ছেড়ে গেছে ভোর ৪টা ৩৫ মিনিটে। এরপর ভোর ৫টা ২৫ মিনিটে বঙ্গভবন থেকে নায়েক এ আলীর নেতৃত্বে সশস্ত্র কর্মকর্তাদের আরেকটি দল এল এবং গুলি করার জায়গাটা পরিদর্শন করে ভিকটিমদের মৃত্যু সম্বন্ধে নিশ্চিত হতে চাইল। তাদের নির্দেশও পালন করা হলো।

ইতিমধ্যে ইন্সপেক্টর জেনারেল বঙ্গভবন থেকে আরেকটি টেলিফোন মেসেজ রিসিভ করলেন। ইন্সপেক্টর জেনারেল আমাকে জানালেন যে তাঁকে আবার প্রশ্ন করা হয়েছিল, সব গার্ডকে ঠিকমতো সতর্ক করা হয়েছে কি না। তিনি হ্যাঁ-বোধক উত্তর দিলেন এবং অতঃপর কর্মকর্তাসহ অন্য স্টাফদের খুবই সতর্ক ও অতন্দ্র থাকার নির্দেশ দিলেন। ইন্সপেক্টর জেনারেলের এই নির্দেশ পালন করা হলো।

এর কিছুক্ষণ পর স্টেনগান, এসএলআর প্রভৃতি সুসজ্জিত চারজন সশস্ত্র কর্মকর্তাসহযোগে ভীতিকর ভঙ্গিতে রিসালদার মোসলেহ আমার অফিসকক্ষে এলেন এবং জেলের ইন্সপেক্টর জেনারেলকে জিজ্ঞেস করলেন, তিনিই নুরুজ্জামান কি না। জেলের ইন্সপেক্টর জেনারেল হ্যাঁ-বোধক উত্তর দিলেন। এরপর তিনি ইন্সপেক্টর জেনারেলকে তাড়াতাড়ি করতে বললেন। ইন্সপেক্টর জেনারেল তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, কী করতে হবে?

আমাদের ভয়ানক আতঙ্কিত করে তিনি ইন্সপেক্টর জেনারেলকে বললেন, তাঁর কাছে পূর্বে যে কয়জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি তাঁদের গুলি করবেন। ইন্সপেক্টর জেনারেল বললেন যে তিনি পূর্বে এ-জাতীয় কোনো নির্দেশ পাননি এবং তাঁকে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কথা বলে নিতে হবে। আমার অফিসের টেলিফোনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কয়েকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলো, কিন্তু যোগাযোগ করা গেল না।

পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের কেন্দ্রীয় কারাগার।

এর কিছুক্ষণের মধ্যেই ইন্সপেক্টর জেনারেলকে জানানো হলো যে জেলারের অফিসের টেলিফোন সেটে তাঁর নামে বঙ্গভবন থেকে টেলিফোন এসেছে। ইন্সপেক্টর জেনারেল টেলিফোন ধরার জন্য রওনা দিলেন। আমি তাঁকে অনুসরণ করলাম। পেছন থেকে চললেন সামরিক কর্মকর্তারা। টেলিফোনে কথা বলার সময় ইন্সপেক্টর জেনারেল রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কথা বলতে চাইলেন এবং তাঁর অনুরোধ রাখা হলো বলে স্পষ্ট মনে হলো। ইন্সপেক্টর জেনারেলকে বলতে শুনলাম, রিসালদার মোসলেহ তাঁদের গুলি করবেন বলে বলছেন। এরপর ইন্সপেক্টর জেনারেল টেলিফোন রেখে দিলেন এবং তাঁর মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল।

রিসালদার মোসলেহ তখন বন্দুকের নল ঠেকিয়ে আমাদের তক্ষুনি পূর্বোক্ত বন্দীরা যেখানে আটক রয়েছে, সেখানে যাওয়ার হুকুম দিলেন। নির্দেশমাফিক সামরিক কর্মকর্তাদের নিয়ে ইন্সপেক্টর জেনারেল রওনা হয়ে গেলেন। আমি জেলার এবং অন্যান্য নির্বাহী স্টাফরাও সঙ্গে চললাম। পথিমধ্যে আমি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছার কথা জানালাম। রিসালদার হুমকির সুরে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি ভয় পাচ্ছেন? আমি বললাম, ভয়ের প্রশ্ন আসছে না, আমার ৩২ বছরের চাকরিজীবনে আমি এ–জাতীয় ঘটনার কথা শুনিনি। তিনি ক্রোধান্বিত হলেন এবং একজন সামরিক কর্মকর্তা (সিপাহি) আমার কাঁধে হাত রেখে আমাকে চলে যেতে বললেন।

এতে ইন্সপেক্টর জেনারেল বললেন, না, উনি থাকবেন। আতঙ্ক ধরিয়ে দেওয়া চোখে রিসালদার আমার দিকে তাকালেন। ইতিমধ্যে রিসালদার মোসলেহর নির্দেশে জেলার এবং অন্যান্য কয়েকজন নির্বাহী স্টাফ মিলে তাজউদ্দীন আহমদ, মনসুর আলী, সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে অন্য বন্দীদের থেকে আলাদা করলেন। তাঁদেরকে একটা ওয়ার্ডে জড়ো করা হলো এবং ওই ওয়ার্ডের অন্য সদস্যদের সেখান থেকে সরিয়ে ফেলা হলো।

ইতিমধ্যে রিসালদার এ-জাতীয় বিলম্বে বেশ কবার বিরক্তি প্রকাশ করে বলছিলেন, শেখ মুজিবকে খতম করতে তাঁর মাত্র ৩ মিনিট সময় লেগেছিল। যখন তাঁদের জানানো হলো, চার বন্দীকে একটি কক্ষে আনা হয়েছে, রিসালদার মোসলেহ আর তাঁর দল তৎক্ষণাৎ সেই রুমের দিকে রওনা হয়ে গেলেন। যে ওয়ার্ডে উক্ত বন্দীদের আটকে রাখা হয়েছে, সেখান থেকে ৪০ গজ দূরে আমি আর জেলের ইন্সপেক্টর জেনারেল দাঁড়িয়ে রইলাম। অচিরেই আমাদের কানে গুলি করার ভয়াবহ শব্দ ভেসে এল। তাঁরা ফিরে এলেন আর তড়িঘড়ি জেলগেটের দিকে এগিয়ে গেলেন। আমরা তাঁদের অনুসরণ করলাম।

রেকর্ড অনুসারে রিসালদার মোসলেহ আর তাঁর দল জেলগেটে ঢুকেছে ভোর চারটায় এবং জেলগেট ছেড়ে গেছে ভোর ৪টা ৩৫ মিনিটে। এরপর ভোর ৫টা ২৫ মিনিটে বঙ্গভবন থেকে নায়েক এ আলীর নেতৃত্বে সশস্ত্র কর্মকর্তাদের আরেকটি দল এল এবং গুলি করার জায়গাটা পরিদর্শন করে ভিকটিমদের মৃত্যু সম্বন্ধে নিশ্চিত হতে চাইল। তাদের নির্দেশও পালন করা হলো। যেহেতু আমি সে সময় আমার অফিসকক্ষে ফজরের নামাজ পড়ছিলাম, আমি এই দলটিকে স্বচক্ষে দেখিনি। নামাজ শেষ করে আমি জেলের ইন্সপেক্টর জেনারেলের কাছ থেকে এ তথ্য পেলাম। তিনি তখনো তাঁর অফিসকক্ষে ছিলেন। দলটি তাদের পরিদর্শন শেষে ৫টা ৩৫ মিনিটে জেল ছেড়ে চলে যায়। আমি পরে জানতে পারি, এই দলটি মনসুর আলী ও নজরুল ইসলামের দেহে বেয়নেট দিয়ে আঘাতও করে।...

জেলের ইন্সপেক্টর জেনারেল ভোর ৫টা ৪৫ মিনিটে জেল ত্যাগ করেন এবং আমি সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে আমার অফিসকক্ষ ত্যাগ করি। আমি আবার অফিসে ফিরে আসি সকাল ৮টা ৩৫ মিনিটে। অফিসে এসে আমি জেলের ইন্সপেক্টর জেনারেলকে টেলিফোন করি এবং মৃতদেহগুলো সরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে তাঁকে অনুরোধ করি। তিনি আমাকে মেজর রশিদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে অনুরোধ করেন। আমি তাঁকে অনুরোধ করি, যাতে তিনি নিজেই মেজরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, কিন্তু তিনি এ কাজটা আমাকেই করতে অনুরোধ করেন।

আমি কিছুটা সময় অপেক্ষা করি। বিশেষত আমার কিছু মন্তব্যের কারণে আমি রিসালদার মোসলেহর ভয়ানক বিরাগভাজন হয়েছি বলে সামরিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে আমার খানিকটা ভয় ভয়ই লাগছিল। সকাল ১০টার দিকে আমি তবু মেজর রশিদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করলাম এবং মৃতদেহগুলো কী করে সরানো হবে, জানতে চাইলাম। তিনি আমাকে পুরোপুরি নীরব থাকতে বললেন এবং মৃতদেহগুলো যেভাবে রয়েছে, সেভাবেই রাখার নির্দেশ দিলেন। আমি এ কথা ইন্সপেক্টর জেনারেলকে অবগত করলাম।

ওই দিন বেলা দুইটার দিকে জেলের ইন্সপেক্টর জেনারেলের অফিসে গিয়ে এ ঘটনায় আমাদের কী কী করণীয়, তা পর্যালোচনা করলাম। খানিকক্ষণ আলোচনার পর আমরা বিষয়টা সম্পর্কে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিবকে রিপোর্ট করার সিদ্ধান্ত নিলাম। বেলা তিনটার দিকে আমি এবং ইন্সপেক্টর জেনারেল সচিবের দপ্তরে গেলাম। ইন্সপেক্টর জেনারেল পুরো ঘটনাটি সচিবকে জানালেন।

মৃতদেহগুলো সরানোর ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের কোনো রকম নির্দেশের অভাবে যেখানে হত্যা করা হয়েছে লাশগুলো, ৪ নভেম্বর ’৭৫ সন্ধ্যাবেলা পর্যন্ত সেখানে সেভাবেই পড়ে রইল। ৪ নভেম্বর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিবের তরফ থেকে নির্দেশ পাওয়া গেল। অচিরেই লাশগুলোর সুরতহাল-সম্পর্কিত রিপোর্ট এবং দ্রুত ময়নাতদন্তের রিপোর্ট তৈরি করার ব্যবস্থা করতে বলা হলো।

সচিব মহোদয় সদয় হয়ে পুলিশ কর্তৃপক্ষ, মেডিক্যাল কর্তৃপক্ষ এবং ম্যাজিস্ট্রেটকে তাঁদের করণীয় পদক্ষেপগুলো গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। নিহত ব্যক্তিদের পরিবার যাতে লাশগুলো ফেরত পেতে পারে, এ ব্যাপারে তিনি পুলিশ কর্তৃপক্ষকে সব রকম সহায়তা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেই সঙ্গে লাশ দাফনের ব্যাপারে সাহায্য করারও নির্দেশ ছিল।...

পুলিশ কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ সহায়তা দিয়েছে এবং ম্যাজিস্ট্রেট ও মেডিক্যাল কর্তৃপক্ষ তাদের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করেছে। পুলিশের ডিআইজি, ঢাকা রেঞ্জ, এডিসি (জেনারেল) এবং বিপুলসংখ্যক উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা ওই দিন রাত ১১টা পর্যন্ত জেলে অবস্থান করেছেন। ৪ নভেম্বর রাতে তাজউদ্দীন আহমদ এবং সৈয়দ নজরুল ইসলামের লাশ জেলগেটে তাঁদের আত্মীয়স্বজনের হাতে তুলে দেওয়া হয় এবং প্রয়োজনীয় পুলিশ প্রহরায় পুলিশের ট্রাকে করে তাঁদের বাসায় লাশ পৌঁছে দেওয়া হয়। কামারুজ্জামান এবং মনসুর আলীর লাশ ৫ নভেম্বর ভোরে তাঁদের আত্মীয়স্বজনের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। তাঁদের আত্মীয়স্বজন যেভাবে চেয়েছে, পুলিশ কর্তৃপক্ষ সেভাবেই প্রহরা এবং গাড়ি দিয়ে লাশ বাসায় পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা নিয়েছে।

###