
পয়লা বৈশাখকে কেন্দ্র করে বাঙালি সমাজের বর্ষবরণ ছিল মূলত কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি, সমাজব্যবস্থা ও বাংলা সনের সূচনার সঙ্গে যুক্ত। এ উৎসবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ধর্মনিরপেক্ষতা ও সর্বজনীন উৎসব হিসেবে সর্বসাধারণের কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা, যেখানে সব ধর্ম, শ্রেণি ও অঞ্চলের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে।
এভাবে পয়লা বৈশাখ হয়ে উঠেছে গ্রামীণ মেলা, হালখাতা, লোকসংস্কৃতি চর্চার এক ঐতিহ্যের ধারক। কালের বিবর্তনে ধর্মবর্ণ–নির্বিশেষে বৈশাখ আমাদের মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে অসাম্প্রদায়িকতা চেতনার একটি প্রতীক হিসেবে।
পয়লা বৈশাখ হয়ে উঠেছে আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি অন্যতম ধারক। এই সাংস্কৃতিক পরিচয় তৈরি হওয়ার পেছনে কেবল বর্ষবরণের আয়োজনই ছিল না, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই উদ্যাপন হয়ে উঠল আমাদের জাতিসত্তার পরিচিতি নির্মাণের একটি অনন্য হাতিয়ার, যেখানে ছিল সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ, সামাজিক ঐক্য, প্রতিবাদ ও সৃজনশীলতার বহিঃপ্রকাশ। যেমন ১৩৭৪ বঙ্গাব্দে (১৯৬৭ সাল) ছায়ানটের রমনা বটমূলে আনুষ্ঠানিকভাবে নববর্ষ বরণের উৎসবের সূচনার সঙ্গে রয়েছে আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রামের সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের ইতিহাস। সেই ধারাবাহিকতা এখনো অব্যাহত। বর্ষবরণের এই সাংস্কৃতিক চর্চা ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছে আমাদের ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের প্রতীক।
গত শতকের ষাটের দশকে পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসকদের বিরুদ্ধে বর্ষবরণ হয়ে উঠেছিল সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ ও প্রতিবাদের হাতিয়ার।
আশির দশকে পয়লা বৈশাখের আনন্দ শোভাযাত্রা হয়ে উঠল স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের একটি নতুন ধরন। বর্ষবরণের আনন্দ শোভাযাত্রাটি ১৯৯৬ সাল থেকে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামে উদ্যাপিত হওয়া শুরু হয়, যা ২০২৪ সাল পর্যন্ত চলে।
তাই মঙ্গল শোভাযাত্রা কেবল বর্ষবরণের সাংস্কৃতিক একটি ধরনই ছিল না, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আশির দশকের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপট। যদিও ২০২৫ সালে মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম বদলে ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’ নামে নববর্ষের উদ্যাপন শুরু হয়। কিন্তু এ বছর থেকে এর নাম হতে যাচ্ছে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’।
তবে বর্ষবরণে মঙ্গল শোভাযাত্রা আমাদের সংস্কৃতির একটি প্রতীকে রূপান্তরিত হওয়ার কারণে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ২০১৬ সালে মঙ্গল শোভাযাত্রা ইউনেসকো ঘোষিত ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
এ প্রেক্ষাপটে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ থেকে ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ ও ‘বৈশাখী শোভাযাত্রায়’ যাওয়ার করণে সেটি ইউনেসকোর এই স্বীকৃতির কোনো ব্যত্যয় ঘটাবে কি না, সে বিষয়ে সরকারের জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। কেননা, এর সঙ্গে আমাদের সাংস্কৃতিক চর্চার এক অনন্য অর্জন জড়িয়ে রয়েছে, যার সঙ্গে বিশ্বদরবারে আমাদের জাতীয় পরিচিতি ও আমাদের গর্বের বিষয়টিও জড়িত।
পয়লা বৈশাখের তাৎপর্যকে ধারণ করে আমাদের লোক-ঐতিহ্যকে গুরুত্ব দিয়ে একটি সামাজিক সংহতি গড়ে তোলা প্রয়োজন। আমাদের মনে রাখতে হবে, পয়লা বৈশাখ শুধু একটি উৎসব নয়, এটি আমাদের সামষ্টিক আত্মপরিচয়ের বহিঃপ্রকাশ, যেখানে ইতিহাস ও সংস্কৃতি সহাবস্থান করে।
মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে আগেও বিভিন্ন সময় বিতর্ক হতে দেখা গেছে। ধর্মভিত্তিক একাধিক গোষ্ঠী ও দলের সদস্যদের এই আয়োজনের বিরোধিতা করতেও দেখা গেছে। অনেক সময়ই বর্ষবরণের এই শোভাযাত্রাকে আমাদের সাংস্কৃতিক চর্চার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হিসেবে সমালোচনা করা হয়েছে। এই বিভেদ মূলত আমাদের জাতি হিসেবেও একটি বিভেদের মধ্যে নিয়ে গেছে, যা আমাদের জন্য মঙ্গলজনক নয়।
সাংস্কৃতিক চর্চাকে যেমন জোর করে বদলে ফেলা যায় না, তেমনই এখানে জোর করে নতুন চর্চা অন্তর্ভুক্তও করা যায় না। তবে একটি সাংস্কৃতিক চর্চা আবার তার মতো করে ফিরে আসতে পারে, যাকে আমরা বিখ্যাত চিন্তক এরিক হবসবমের ‘ইনভেনশন অব ট্র্যাডিশন’–এর ধারণা দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারি। যেমন অনেক ‘ঐতিহ্য’ আসলে সময়ের সঙ্গে তৈরি বা পুনর্গঠিত হতে পারে, যেখানে একটি সমাজে পরিচয়, ঐক্য বা মূল্যবোধের বিষয়টিও থাকে।
তাই পয়লা বৈশাখ উদ্যাপনের কিছু উপাদানকে ‘অপ্রচলিত’ বা ‘নতুন’ বলে প্রশ্ন তোলারও কিছু নেই, যেমনটি অনেকেই তুলছেন। কেননা, ঐতিহ্য নিজেই একটি পরিবর্তনশীল ধারণা, যা স্থির নয়। সমাজ তার প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন প্রতীক ও অনুশীলন তৈরি করে, যা সময়ের সঙ্গে ‘ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
একটি দেশের পরিচিতি নির্মাণের পেছনে যেমন তার জাতীয় সংগ্রামের সামষ্টিক চেতনা ও স্মৃতি জরুরি, ঠিক তেমনই একটি সমাজের অসাম্প্রদায়িক চেহারাও তার পরিচিতি নির্মাণের প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ঠিক এই মুহূর্তে যদি একটি গোষ্ঠীর কাছে মনে হয় যে এই সাংস্কৃতিক চর্চা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, তাহলে সমাজ ও জাতি ধীরে ধীরে তার এই অসাম্প্রদায়িক চেহারা হারিয়ে ফেলবে, যা আমাদের সমাজজীবন ও জাতীয় পরিচিতি নির্মাণের জন্য সমস্যাজনক হয়ে উঠবে সময়ের পরিক্রমায়।
আমরা দেখতে পাই সাম্প্রতিক সময়ে নানা সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ওপর হামলা ইতিমধ্যে আমাদের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকে আরও সংকুচিত করে ফেলছে। আমাদের সমাজে এমন একটি সময় ছিল, যেখানে গান করা, লেখা আর প্রশ্ন তোলা মানুষের স্বাভাবিক অধিকার ছিল। ছায়ানট, বাউলসমাজ, মতপ্রকাশের মাধ্যম হিসেবে সংবাদমাধ্যম, যেমন প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার—এসব জায়গা ভিন্নমতকে স্বাগত জানানোর প্রতীক। কিন্তু তাদের ওপর সাম্প্রতিক সহিংস হামলা, সেই সহনশীলতার জায়গাগুলো ক্রমে সংকুচিত করছে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তার অন্যতম ভিত্তি হলো বহুত্ববাদ ও সহাবস্থান, যার মৌলিক ক্ষেত্রগুলো সাংস্কৃতিক সংঘাতের মাধ্যমে দুর্বল হয়ে পড়ে, সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট করে এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে হুমকির মুখে ফেলে। এ ধরনের বিষয়গুলোকে প্রশ্রয় দেওয়া হলে তা আমাদের রাষ্ট্রের অসাম্প্রদায়িক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেবে।
পয়লা বৈশাখের তাৎপর্যকে ধারণ করে আমাদের লোক-ঐতিহ্যকে গুরুত্ব দিয়ে একটি সামাজিক সংহতি গড়ে তোলা প্রয়োজন। আমাদের মনে রাখতে হবে, পয়লা বৈশাখ শুধু একটি উৎসব নয়, এটি আমাদের সামষ্টিক আত্মপরিচয়ের বহিঃপ্রকাশ, যেখানে ইতিহাস ও সংস্কৃতি সহাবস্থান করে।
আমাদের জাতীয় পরিচিতি নির্মিত হয়েছে সেই বহুমাত্রিক সংস্কৃতির সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে। যে বিভাজন, ঘৃণা বা বিদ্বেষের ভাষা, যা আমাদের সামাজিক বন্ধনকে দুর্বল করে, সেই চর্চা থেকে বেরিয়ে এসে অসাম্প্রদায়িক চেতনার মাধ্যমে সহনশীল, মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অসাম্প্রদায়িক একটি সমাজ গড়ে তোলার জন্য আমাদের কাজ করে যেতে হবে।
বুলবুল সিদ্দিকী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
মতামত লেখকের নিজস্ব