
গত ৩০ মে মিয়ানমারের নতুন ‘প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে জ্যোষ্ঠ জেনারেল মিন অং হ্লাইং ভারত সফরে গিয়ে একেবারে নিজের চাওয়ামতোই ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেছিলেন। অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলকারী ও দেশকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়া কোনো বিচ্ছিন্ন জেনারেল হিসেবে নয়, বরং নয়াদিল্লি তাঁকে স্বাগত জানিয়েছে একজন সম্মানিত রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে।
বছরের পর বছর ধরে রক্তপাত এবং কূটনৈতিক প্রত্যাখ্যানের পর মিন অং হ্লাইংয়ের জন্য পাঁচ দিনের এই সফর উপহারের চেয়ে মোটেও কম কিছু নয়।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিসাব-নিকাশটা অবশ্য ভিন্ন। ভারতের কাছে মিয়ানমার কোনো দূরবর্তী নৈতিকতার প্রশ্ন নয়; বরং এটি এমন এক প্রতিবেশী দেশ, যার সঙ্গে ভারতের ১ হাজার ৬৪৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। এটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুর ও মিজোরামের জন্য দীর্ঘদিনের অস্থিরতার উৎস। এটি এমন এক কৌশলগত অঞ্চল, যেখানে চীন বছরের পর বছর ধরে বিশাল প্রভাব ও অবকাঠামো গড়ে তুলেছে।
মোদি ভাবছেন মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত হলে ভারতের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা পাবে। আর মিন অং হ্লাইংয়ের হিসাব হলো, মোদির এই উষ্ণ অভ্যর্থনা ডিসেম্বর ও জানুয়ারির সাজানো নির্বাচনের পর তাঁর বৈধতা এবং স্বীকৃতির দাবিকে জোরালো করবে।
সমস্যাটা কিন্তু ভারতের মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নিয়ে নয়; সমস্যা হলো নয়াদিল্লি এমন একজন মানুষের ওপর অতিরিক্ত ভরসা করছে, যিনি চুক্তিতে সই করতে পারলেও প্রয়োজনীয় অঞ্চলগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখতে পারছেন না।
এ সফরেও দ্বিপক্ষীয় নীতির চিরচেনা বুলিই দেখা গিয়েছে—বন্ধুত্ব, আঞ্চলিক অখণ্ডতা, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং ‘কালাদান মাল্টিমোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট’ ও ‘ত্রিপক্ষীয় মহাসড়ক’ -এর মাধ্যমে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন।
কাগজে–কলমে এই এজেন্ডা বাস্তবসম্মত মনে হলেও এটা এমন অঞ্চলের ভেতর দিয়ে গিয়েছে, যা আদতে বিদ্রোহীদের অধীন রয়েছে। জান্তার নিয়ন্ত্রণ সেখানে নেই বললেই হয়।
কালাদান প্রকল্পটি এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ। ভারতের কলকাতাকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সিতওয়ে বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করা, কালাদান নদী বেয়ে চিন রাজ্যের পালেতওয়া পর্যন্ত পণ্য পরিবহন করা এবং সেখান থেকে সড়কপথে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মিজোরামকে যুক্ত করার উদ্দেশ্যে এটি ডিজাইন করা হয়েছে। এটি ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির অন্যতম মূল ভিত্তি। অস্থির উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতা হ্রাস করা এবং বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে যাতায়াত এড়িয়ে চলা ছিল এর লক্ষ্য।
কিন্তু সেই কৌশলগত পথটি মিয়ানমারের পুনর্লিখিত পশ্চিমাঞ্চলীয় মানচিত্রকে ভেদ করে গেছে। বিদ্রোহী ‘আরাকান আর্মি’ এখন রাখাইন রাজ্যের বেশির ভাগ অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। পালেতওয়া এবং এর আশপাশের অঞ্চলগুলোও এখন আর নেপিদোর অধীন নেই।
চিন রাজ্যের বিভিন্ন প্রতিরোধ বাহিনীর একটি মিশ্র জোট এখন ভারতের সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো দখল করে রেখেছে। রাখাইনের রাজধানী সিতওয়ে হয়তো একটি বন্দর হিসেবে এখনো গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু এর চারপাশের রাস্তা, নদী এবং সীমান্ত এলাকাগুলো এখন আর জান্তার নিয়ন্ত্রণে নেই।
হায়দরাবাদ হাউসের করমর্দনের পেছনের কঠিন সত্য এটাই। মোদি কালাদান প্রকল্প শেষ করার জন্য চাপ দিতে পারেন এবং মিন অং হ্লাইং সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিতে পারেন, কিন্তু প্রস্তাবিত রুটের নিচের মাটির নিয়ন্ত্রণ এই দুজনের কারও হাতেই নেই।
একই সঙ্গে নয়াদিল্লি চায় মিয়ানমারের জান্তা যেন ভারতের স্বার্থ রক্ষা করুক। অথচ অঞ্চল ‘সুরক্ষিত’ করার জন্য জান্তার পদ্ধতি হলো বিমান হামলা, কামানের গোলাবর্ষণ, জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে নিয়োগ এবং পোড়ামাটি নীতি। এটি ভারতের সীমান্তকে স্থিতিশীল না করে বরং মিজোরাম ও মণিপুরে শরণার্থী সংকট তৈরি করে।
ভারত এর আগেও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল। ১৯৪৯ সালে, যখন বিদ্রোহের মুখে উ নুর স্বাধীনতা-পরবর্তী সরকার পতনের দ্বারপ্রান্তে ছিল, তখন জওহরলাল নেহরু তৎকালীন রেঙ্গুনের কেন্দ্রীয় সরকারকে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা প্রদান করেছিলেন।কিন্তু ২০২৬ সাল আর ১৯৪৯ সাল এক নয়। উ নু ছিলেন একজন ভঙ্গুর বেসামরিক নেতা, যিনি একটি সদ্য স্বাধীন হওয়া উত্তর-উপনিবেশবাদী রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছিলেন।
অন্যদিকে মিন অং হ্লাইং হলেন মিয়ানমারের বর্তমান ধ্বংসযজ্ঞের মূল কারিগর। তিনি অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্যু-পূর্ববর্তী রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছেন।
মিন অং হ্লাইংয়ের জন্য এই ভারত সফর ছিল একটি মরিয়া পদক্ষেপ। টিকে থাকার জন্য তিনি মিয়ানমারের সার্বভৌম সম্পদগুলো এমন যে কারও কাছে নিলামে তুলছেন, যারা তাকে সামান্যতম সাহায্য করতে রাজি।
চীনের সামনে কিয়াকফিউ সমুদ্রবন্দর এবং বিতর্কিত মাইটসোনে বাঁধের লোভ দেখাচ্ছেন, রাশিয়ার সামনে দাওয়েই গভীর সমুদ্রবন্দর এবং ভারতের সামনে সীমান্ত নিরাপত্তা, কালাদান প্রকল্প ও বিরল খনিজ খনির চুক্তির লোভ ঝুলিয়ে রাখছেন।
কিন্তু মিন অং হ্লাইং যখন নয়াদিল্লিকে আশ্বাস দেন যে মিয়ানমারের ভূখণ্ড ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না, তখন তিনি মূলত এমন প্রতিশ্রুতি দেন, যা তাঁর সামরিক বাহিনী বাস্তবায়ন করতে পারবে না। পূর্বসূরি যেকোনো সামরিক শাসকের চেয়ে মিন অং হ্লাইংয়ের কাছে কম অঞ্চল এবং কম বৈধতা রয়েছে।
এই সফর মিন অং হ্লাইংকে চীনের সর্বগ্রাসী প্রভাব থেকেও মুক্ত করতে পারবে না। বেইজিং বোঝে যে প্রতিবেশীর ওপর ভারতের বৈধ স্বার্থ রয়েছে, তবে নয়াদিল্লি যদি রাখাইনে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদে বা সীমান্ত সংযোগে কোনো সুবিধা পায়, তবে চীন তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।
ভারত যদি কেবল নেপিদোর মাধ্যমেই কালাদান প্রকল্প সুরক্ষিত করতে চায়, তবে তা ব্যর্থ হবে। আর ভারত যদি আরাকান আর্মির সঙ্গে প্রকৃত প্রভাব গড়ে তোলে, তবে বেইজিং হয়তো নিজের প্রভাবের জায়গাগুলো ব্যবহার করে পাল্টা চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
ভারত এখন চীনের মিয়ানমার নীতির সবচেয়ে খারাপ অংশের পুনরাবৃত্তি করার ঝুঁকিতে রয়েছে—কেন্দ্রীয় সামরিক কর্তৃপক্ষকে দেশের একমাত্র বৈধ সার্বভৌম শক্তি হিসেবে গণ্য করা। বেইজিং নেপিদোয় বিপুল বিনিয়োগ করেছে, তবু সম্পদ ও যাতায়াতের পথের জন্য তাদের এখনো জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং প্রতিরোধ বাহিনীগুলোর সঙ্গে আলোচনা করতে হয়।
চীনের এই ভুলের পুনরাবৃত্তি করা ভারতের উচিত নয়। নয়াদিল্লির কাছে এমন কিছু রয়েছে, যা চীন কখনোই দিতে পারবে না—একটি ফেডারেল গণতন্ত্রের অভিজ্ঞতা। মিয়ানমারের জান্তাবিরোধী শক্তি, জাতিগত গোষ্ঠী এবং নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলো এখন সক্রিয়ভাবে ফেডারেল শাসনব্যবস্থা ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমাধান নিয়ে আলোচনা করছে। ভারত সেই আলোচনায় একটি গণতান্ত্রিক গ্রহণযোগ্যতা দিয়ে সমর্থন করতে পারে, যা বেইজিংয়ের পক্ষে কোনোদিন দেওয়া সম্ভব নয়।
মিন অং হ্লাইংয়ের এই রাষ্ট্রীয় সফর একটি ক্ষতিকর বার্তা পাঠিয়েছে। ভারতের গণতান্ত্রিক বুলি যে সীমান্তেই থমকে যায়, এই বার্তা দিয়েছে মিয়ানমারের জনগণকে। নয়াদিল্লি সেখানকার জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে কেবল অবকাঠামোগত প্রকল্পের বাধা হিসেবেই দেখে, কোনো রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নয়। অথচ তারাই এমন পথ নিয়ন্ত্রণ করছে, যা ভারতের প্রয়োজন। এই সফর মিন অং হ্লাইংকে একটি অভ্যন্তরীণ প্রপাগান্ডামূলক বিজয় এনে দিয়েছে, পক্ষান্তরে ভারত পেয়েছে সামান্য আশ্বাস।
ভারতের একটি বুদ্ধিদীপ্ত নীতি হতো সম্পৃক্ততাকে সমর্থনের চেয়ে আলাদা রাখা। ভারতের উচিত নেপিদোর সঙ্গে কথা বলা; কারণ, ভৌগোলিক অবস্থান তার দাবি রাখে। কিন্তু একই সঙ্গে তাদের আরাকান আর্মি, চিন বিদ্রোহী গোষ্ঠী, জান্তাবিরোধী জাতীয় ঐক্য সরকার এবং সীমান্ত অঞ্চলের মানুষের সঙ্গেও বাস্তবমুখী যোগাযোগ গভীর করা উচিত।
ভারতের উচিত বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা, আন্তসীমান্ত মানবিক সহায়তা এবং তাদের সীমান্তের কাছাকাছি বা সম্ভব হলে দেশজুড়ে বিমান হামলা বন্ধের জন্য চাপ দেওয়া।
মোদি ভাবছেন মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত হলে ভারতের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা পাবে। আর মিন অং হ্লাইংয়ের হিসাব হলো, মোদির এই উষ্ণ অভ্যর্থনা ডিসেম্বর ও জানুয়ারির সাজানো নির্বাচনের পর তাঁর বৈধতা এবং স্বীকৃতির দাবিকে জোরালো করবে।
কিন্তু এই দুটি হিসাবই ত্রুটিপূর্ণ। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী যতক্ষণ না পর্যন্ত দেশের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সততার ভিত্তিতে আলোচনায় বসছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এটি ত্রুটিপূর্ণই থাকবে।
নিয়েন চ্যান আয়ে ওয়াশিংটনভিত্তিক একজন বার্মিজ সাংবাদিক
এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত