
বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য বিষয় হলো—‘আজ ও আগামীর জন্য তরুণদের আশা-আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন’। এই প্রতিপাদ্য বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট নিয়ে লিখেছেন মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম
জনসংখ্যা ও উন্নয়ন একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত, যার রয়েছে পরিমাণগত ও গুণগত দিক। একটি দেশের জনসংখ্যার আকার, কাঠামো, বণ্টন ও গুণগত বৈশিষ্ট্য সেই দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক অগ্রগতি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং টেকসই উন্নয়নের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
মানব উন্নয়নের কেন্দ্রে রয়েছে পছন্দকে বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা, যেখানে অধিকার ও পছন্দ ১৯৯৪ সালে মিসরের কায়রোতে অনুষ্ঠিত জনসংখ্যা ও উন্নয়নবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন (আইসিপিডি) থেকে স্বীকৃত।
সাধারণত একজন তরুণ-যুবা জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পছন্দকে বেছে নেন বা সিদ্ধান্তে উপনীত হন, তাঁর আশা-আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন ঘিরে। তবে এ ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে আবির্ভূত হয় অসমতা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে প্রবেশগম্যহীনতা, সমাজস্থ জেন্ডার শ্রেয়বোধ ও অর্থনৈতিক সংকট। এ তরুণ-যুবগোষ্ঠী প্রায়ই অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের বাইরে থেকে যায়, তাদের ক্ষমতায়ন, অধিকার ও পছন্দ বাধাগ্রস্ত কিংবা লঙ্ঘিত হয়, যার ফলে বাংলাদেশ দেখেছে চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান।
ন্যায্য, প্রত্যাশিত ও টেকসই দেশ এবং বিশ্ব নির্মাণে তরুণ-যুবাদের ক্ষমতায়ন করতে হবে। এ প্রেক্ষাপটে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য বিষয় হলো ‘আজ ও আগামীর জন্য তরুণদের আশা-আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন’। এই প্রতিপাদ্যের মূল বার্তা হলো তরুণদের এমন শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, দক্ষতা, কর্মসংস্থান, অধিকার ও অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করা, যাতে তাঁরা তাঁদের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা বাস্তবে রূপ দিতে পারেন।
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে তরুণ-যুবা জনগোষ্ঠী দেশের এক বড় জনমিতিক শক্তি। জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশির (৫৬ দশমিক ৪২ শতাংশ) বয়স ৩০ বছরের নিচে। সংখ্যাগত পরিমাপে বর্তমানে দেশে প্রতি ৫ জনে ১ জন কিশোর-কিশোরী আর বয়স ১০ থেকে ২৪ বছর—তারা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ। ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী রয়েছে ৩ কোটি ৩২ লাখের বেশি, (সর্বশেষ জনশুমারি ২০২২) এটি একটি বড় সংখ্যা, বড় সম্ভাবনা ও বড় চ্যালেঞ্জ। এ জনগোষ্ঠীর সবার সুযোগ গ্রহণে সমান প্রবেশগম্যতা ও সুযোগকে কাজে লাগাতে প্রতিবন্ধকতা দূর করা, প্রান্তিক বা পিছিয়ে থাকাদের দিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখা। কেননা, জনসংখ্যা ও উন্নয়ন পটভূমিতে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এখনো সব ক্ষেত্রে জেন্ডার সমতা ও অধিকার নিশ্চিত হয়নি।
বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে ২০২২ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৬ বছরের আগে বিয়ে হয় ২৬ দশমিক ৭ শতাংশ আর ১৮ বছরের আগে ৫০ দশমিক ৭ শতাংশ। বাল্যবিবাহের সঙ্গে জড়িত রয়েছে কিশোরী মাতৃত্ব। (২৩ দশমিক ৭ শতাংশ, বিডিএইচএস ২০২২) প্রতি ১০০০ বিবাহিত নারীর ক্ষেত্রে কিশোরী প্রজনন হার ৯২, যা দক্ষিণ এশিয়ায় অন্যতম সর্বাধিক। আর পরিবার পরিকল্পনায় অপূর্ণ চাহিদা ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী বিবাহিত নারীদের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ হলেও ১৫ থেকে ১৯ বছরের বিবাহিত মেয়েদের ক্ষেত্রে তা ১২ শতাংশ। (বিডিএইচএস ২০২২)
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক (মিকস ২০২৫) জরিপে লক্ষ করা গেছে—জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারের হার হ্রাস পেয়েছে, তবে বেড়েছে অপূর্ণ চাহিদা ও মোট প্রজনন হার, যা মোটেও প্রত্যাশিত নয়। ২০৩০ সালের মধ্যে এ অপূর্ণ চাহিদা শূন্যতে নিয়ে যাওয়ার আইসিপিডি +২৫ প্রতিশ্রুতি ও টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জন আমাদের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। দেশে বর্তমানে জন্মনিরোধক পদ্ধতি ব্যবহারের হার ৬৪ শতাংশ, (বিডিএইচএস ২০২২) তবে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী মেয়েদের ক্ষেত্রে তা অপেক্ষাকৃত বেশ কম (৫৩ দশমিক ৯ শতাংশ), যা মোট পদ্ধতি ব্যবহার কিংবা আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
বাল্যবিবাহ ও কিশোরী মাতৃত্ব বা অপরিকল্পিত গর্ভধারণ মেয়েদের অধিকার লঙ্ঘন করে। জেন্ডার অসমতা তৈরি করে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়। সম্প্রতি শুরু হওয়া এইচএসসি বা সমমানের পরীক্ষায় অংশগ্রহণের যে চিত্র (৩৬ শতাংশ শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিচ্ছেন না), তা বেশ হতাশাজনক। বাল্যবিবাহ, দারিদ্র্য ও এসএসসি পাসের পর কর্মক্ষেত্রে যুক্ত হয়ে যাওয়া এ ক্ষেত্রে প্রধান কারণ বলে মনে করা হয়।
লক্ষণীয় যে বাংলাদেশে ১৫ বছর ও তদূর্ধ্ব জনসংখ্যার সাক্ষরতার হারে পুরুষের (৭৮ দশমিক ৬ শতাংশ) তুলনায় নারীরা ৫ দশমিক ৮ শতাংশ পিছিয়ে আছে। (বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস ২০২৩) বর্তমানে বাংলাদেশে বিবাহিত কিশোরী ও মেয়েদের (১৫ থেকে ১৯ বছর) মধ্যেই পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের হার সবচেয়ে কম—এখানে ৬০ দশমিক ৬ শতাংশ বিবাহিত তরুণী নিজেদের স্বাস্থ্য যত্নে সেবা গ্রহণে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। (বিডিএইচএস ২০২২)
জেন্ডার অসমতার সঙ্গে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা জড়িত। ‘নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ ২০২৪’ শীর্ষক একটি জাতীয় জরিপের ফলাফল প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১২ মাসে কিংবা ১ বছরে কিশোরী–তরুণী (১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী) সবচেয়ে বেশি (৬২ শতাংশ) অন্তত একবার হলেও শারীরিক, যৌন, মানসিক ও অর্থনৈতিক সহিংসতার শিকার হন। এ বাস্তবতায় ২০৩০ সালের মধ্যে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা শূন্যে নিয়ে যাওয়ার আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি (আইসিপিডি) পূরণও আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
নানাভাবেই সমাজে জেন্ডার অসমতা তৈরি হয়। উদাহরণ হিসেবে অর্থনৈতিক দিক বিবেচনায় নিলে বাংলাদেশ শ্রম জরিপ ২০২২-এর তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যায়—আমাদের অগ্রগতি থাকলেও এখনো শ্রমবাজারে নারী–পুরুষের অংশগ্রহণের হারে রয়েছে বিস্তর ব্যবধান। কারণ, ক্ষমতায়ন শুরু হয় স্বাধীনতার সঙ্গে—পছন্দের স্বাধীনতা, সুযোগের স্বাধীনতা ও ভয় থেকে স্বাধীনতা। ফলে জনসংখ্যা ও উন্নয়ন চালচিত্রে আমাদের কয়েকটি ক্ষেত্রে বিশেষ দৃষ্টি, কর্মকৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
সরকারের পরিকল্পনায় বাংলাদেশের পরিবার পরিকল্পনা ও জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনায় জনমিতিক পরিবর্তন, নগরায়ণ, জলবায়ু পরিবর্তন ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সর্বোত্তম ব্যবহার—এসব বিবেচনায় কয়েকটি বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে মনে রাখতে হবে—তরুণ জনগোষ্ঠীই বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রধান চালিকা শক্তি। আজকের তরুণেরাই আগামী বাংলাদেশের নিয়ন্তা। তাঁদের স্বপ্ন একটি উন্নত জীবন, মানসম্মত শিক্ষা, মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান, সুস্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও সমান সুযোগের সমাজ গড়ে তোলা।
উন্নয়ন তখনই টেকসই হবে, যখন তরুণদের সম্ভাবনাকে বিকশিত করার জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করা হবে এবং তাঁরা সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি স্তরে অর্থবহ অংশগ্রহণের সুযোগ পাবেন। প্রতিটি কিশোর ও কিশোরী—সে বিদ্যালয় বা মাদ্রাসায় অধ্যয়ন করুক না কেন, সঠিক ও নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্যতথ্য, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা, পর্যাপ্ত পুষ্টি এবং একটি নিরাপদ ও সহায়ক শিক্ষার পরিবেশে সমানভাবে প্রবেশাধিকার পাওয়ার অধিকার রাখে।
এই লক্ষ্য অর্জনে আমাদের প্রথমত, নীতি ও কৌশল বাস্তবায়নে অগ্রসর হতে হবে। বাংলাদেশে কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্য ও কল্যাণ বিষয়ে ইতিমধ্যে শক্তিশালী নীতি ও কৌশল বিদ্যমান। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো কার্যকর বাস্তবায়ন, পর্যাপ্ত সম্পদ বরাদ্দ, নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
দ্বিতীয়ত, অন্তর্ভুক্তিমূলক সেবা নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও কল্যাণমূলক সব কর্মসূচি এমনভাবে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে বিদ্যালয় ও মাদ্রাসা—উভয় ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সমানভাবে উপকৃত হয় এবং কোনো কিশোর-কিশোরী পিছিয়ে না থাকে।
তৃতীয়ত, বহু খাতভিত্তিক সমন্বয় জোরদার করতে হবে—স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কমিউনিটি। এই তিন খাতের মধ্যে সমন্বিত পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, নাগরিক সমাজ এবং কমিউনিটির সক্রিয় অংশীদারত্ব একটি টেকসই ও কার্যকর কিশোরবান্ধব ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।
চতুর্থত, কিশোর-কিশোরীদের সক্রিয় অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে: কিশোর-কিশোরীদের কেবল কর্মসূচির সুবিধাভোগী হিসেবে নয়, বরং পরিকল্পনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বাস্তবায়ন ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার সক্রিয় অংশীদার হিসেবে সম্পৃক্ত করতে হবে। তাদের মতামত, অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বের সুযোগ নিশ্চিত করা হলে কর্মসূচির কার্যকারিতা ও স্থায়িত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
বাংলাদেশ বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ জনমিতিক পর্যায় অতিক্রম করছে। দেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম শক্তিতে পরিণত হতে পারে। এ জন্য শিক্ষা ও গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ, নারীর ক্ষমতায়ন, ডিজিটাল অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং কার্যকর জনসংখ্যা নীতি বাস্তবায়ন অপরিহার্য। পাশাপাশি পরিবার পরিকল্পনা, কৈশোরবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ দেশের জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
তরুণদের ভবিষ্যৎ, স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য দরকার—(১) সবার জন্য মানসম্মত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিত করা, (২) দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণের সম্প্রসারণ, (৩) যুববান্ধব স্বাস্থ্য ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা, (৪) মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, (৫) লিঙ্গসমতা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করা। (৬) জলবায়ু সহনশীল ও টেকসই উন্নয়ন কৌশল বাস্তবায়ন। (৭) নীতিনির্ধারণ ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
কৈশোর ও তারুণ্যের সময় মানবজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরকাল। মানব পুঁজি বিনির্মাণে এ সময় শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে দরকার সর্বাধিক গুরুত্ব ও বিনিয়োগ। অতি সম্প্রতি (২০২৬) শুরু হওয়া এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় নিবন্ধন করেও প্রায় সাড়ে ৫ লাখ নিয়মিত শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ফরম পূরণ করেননি (অর্থাৎ ৩৬ শতাংশ শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিচ্ছেন না)। এক বছরের ব্যবধানে এ হার বেড়েছে প্রায় ৭ শতাংশ। এ চিত্র মোটেও কাঙ্ক্ষিত নয়, বরং হতাশাজনক।
কৈশোর ও তারুণ্যের সময় স্বাস্থ্য, পুষ্টি, যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য–সম্পর্কিত সঠিক তথ্যের অভাব এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। স্কুল ও মাদ্রাসা জাতীয় পর্যায়ে কিশোর-কিশোরীদের কাছে যথাযথ তথ্য ও বার্তা পৌঁছানোর অন্যতম কার্যকর মাধ্যম। এ ক্ষেত্রে নীতিগত সুপারিশ হলো স্কুল ও মাদ্রাসায় সমন্বিত স্বাস্থ্য শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা; জাতীয় পাঠ্যক্রমে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য, অধিকার ও পুষ্টি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা; শিক্ষক ও কাউন্সেলরদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা; আয়রন-ফলিক অ্যাসিড ও স্কুল পুষ্টি সাপ্তাহিক কর্মসূচির সম্প্রসারণ কিশোরবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষ গুরুত্ব প্রদান, বিদ্যালয় ও মাদ্রাসায় স্বাস্থ্য ক্লাব প্রতিষ্ঠা, অভিভাবক, ধর্মীয় নেতা ও সম্প্রদায়কে সম্পৃক্ত করা এবং কার্যকর পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নব্যবস্থা গড়ে তোলা।
পাশাপাশি বহু মন্ত্রণালয়ভিত্তিক সমন্বয় ও সম্প্রদায়ের সম্পৃক্ততা নিশ্চিতকরণ—জাতীয় কিশোর স্বাস্থ্য কৌশল (২০১৭-২০৩০) অনুযায়ী স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি অভিভাবক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা এবং কমিউনিটি সংগঠনগুলোকে সম্পৃক্ত করে সামাজিক কুসংস্কার, ভুল ধারণা ও নেতিবাচক ধারণা দূরীকরণে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনে ও ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য বাল্যবিবাহের অবসান অপরিহার্য। বাল্যবিবাহ বন্ধ করা না গেলে এসডিজির প্রায় অর্ধেক লক্ষ্য কার্যকরভাবে অর্জন করা সম্ভব হবে না। বাংলাদেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর ওপর। তরুণদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা, কর্মসংস্থান, অধিকার এবং অংশগ্রহণে বিনিয়োগের মাধ্যমে তাদের আশা ও আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব। জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জন করে টেকসই উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে হবে। ফলে ‘তরুণদের ভবিষ্যৎ—স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন’ শুধু একটি প্রতিপাদ্য নয়; এটি একটি উন্নত, মানবিক ও টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণের অঙ্গীকার। একটি সুস্থ, সচেতন, দক্ষ ও ক্ষমতায়িত তরুণ প্রজন্ম আমাদের গড়ে তুলতে হবে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে তরুণ-যুবারা তাঁদের শক্তির প্রমাণ দিয়েছেন। অসমতা-বৈষম্যের অবসানে এবং তরুণদের আশা-আকাঙ্ক্ষার সঠিক বাস্তবায়নে যথাযথ বিনিয়োগ করতে হবে। এর মাধ্যমেই একটি সুস্থ, সচেতন, দক্ষ ও ক্ষমতায়িত প্রজন্ম গড়ে তোলা হবে, সম্ভব হবে তরুণদের আশা-আকাঙ্ক্ষার সঠিক বাস্তবায়ন। বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস, ২০২৬ সফল হোক।
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম ডিন (ভারপ্রাপ্ত), সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ; অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারম্যান, পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
মতামত লেখকের নিজস্ব