নতুন অর্থবছরের জন্য শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বেড়েছে। শিক্ষা খাতে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২ শতাংশে উন্নীত করে মোট ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই বরাদ্দ ছিল ৮৭ হাজার ২০৬ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ। স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের খুশি হওয়ার কথা। কিন্তু বরাদ্দকৃত অর্থ যথাযথ পরিকল্পনা ও প্রক্রিয়ায় খরচ করতে না পারলে শিক্ষা উন্নয়নের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে।
অর্থমন্ত্রী তাঁর বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, এবারের বাজেটে শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে জাতীয় অগ্রযাত্রার ‘নিউক্লিয়াস’ বা কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তিনি যথার্থই বলেছেন, জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার জ্ঞান, মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা ও কর্মক্ষমতার দ্বারা। তাই শিক্ষাকে কেবল সনদ অর্জনের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং জাতীয় পুনর্গঠন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, সামাজিক সমতা প্রতিষ্ঠা এবং কর্মসংস্থানমুখী অর্থনীতির নির্ভরযোগ্য ভিত্তি হিসেবে দেখতে হবে।
এই চিন্তা থেকে এবার কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশকে দক্ষতাভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তর করার জন্য ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে পর্যায়ক্রমে উচ্চতর পর্যায়ে কারিগরি শিক্ষা বিস্তারের চিন্তা করা হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, এর মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা যাতে কর্মবাজারের উপযোগী অন্তত একটি দক্ষতা অর্জন করতে পারে। এ জন্য কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি, বিদ্যুৎ, ইলেকট্রনিকস, গ্রাফিক ডিজাইন, পর্যটন, স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ, সৃজনশীল শিল্পসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরির কথা বলা হচ্ছে।
প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য বেশ কিছু উদ্যোগ ও পরিকল্পনার কথাও অর্থমন্ত্রী বলেছেন। এর মধ্যে আছে ‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন, বিনা মূল্যে ওয়াই-ফাই সুবিধা সম্প্রসারণ, প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য একটি স্বতন্ত্র আইডি চালু করা, ডিজিটাল লাইব্রেরির ব্যবস্থা করা এবং শিক্ষার্থীদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস, কোডিং ও ডিজিটাল লিটারেসির সঙ্গে পরিচিত করানো।
শিক্ষাকে ব্যয়বহুল পণ্যে পরিণত করে সর্বজনীন শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এখন পর্যন্ত সব শিশুর জন্য প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার কারণ চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।
এর আগেও ‘মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম’ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল কঠিন, দুর্বোধ্য বিষয়কে ছবি কিংবা ভিডিও চিত্রের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছে আনন্দময় ও সহজবোধ্য করে তোলা। এ জন্য সরকারি ব্যবস্থাপনায় প্রকল্পের আওতায় ল্যাপটপ, প্রজেক্টরসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি সরঞ্জাম দেওয়া হয়। কিন্তু বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এগুলো কাজে লাগাতে পারেনি। যন্ত্রপাতি অব্যবহৃত থেকে নষ্ট হয়েছে কিংবা চালানোর মতো শিক্ষক পাওয়া যায়নি। সুতরাং নতুন করে প্রযুক্তিনির্ভর ক্লাসরুম গড়ে তোলার জন্য আগের উদ্যোগের ব্যর্থতার কারণগুলো খতিয়ে দেখা দরকার। তা ছাড়া পাঠদান ও পাঠগ্রহণ প্রক্রিয়া আধুনিক করার জন্য শিক্ষাদান পদ্ধতিতেও আমূল পরিবর্তন আনা জরুরি।
শিক্ষা বাজেটের পুরো অংশ শিক্ষা উন্নয়নে কিংবা নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যবহার করা যায় না। এর একটা বড় অংশ নিয়মিত খরচ বাবদ ব্যয় হয়। এর মধ্যে আছে শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা। অভিযোগ আছে, শিক্ষকদের বেতন-ভাতা কম বলে তাঁরা শ্রেণিকক্ষে মনোযোগী না থেকে প্রাইভেট পড়াতে বাধ্য হন। আবার অনেকে শিক্ষকতার বাইরে খণ্ডকালীন অন্য কাজও করেন। এর সমাধানের জন্য শিক্ষকদের ন্যূনতম জীবনধারণের উপযোগী বেতন-ভাতা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। একই সঙ্গে ক্লাসরুমের বাইরে পাঠদানকে কড়াকড়িভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে।
শিক্ষাকে ব্যয়বহুল পণ্যে পরিণত করে সর্বজনীন শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এখন পর্যন্ত সব শিশুর জন্য প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার কারণ চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।
‘মিড–ডে মিল’ কর্মসূচি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এই কর্মসূচিতে যেসব অনিয়ম দেখা গেছে, তার প্রতিকারের জন্য ব্যবস্থা নিতে হবে। তা ছাড়া সরকার মেয়েদের জন্য বিনা মূল্যে স্নাতক শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনার সুযোগ দিতে চায়। কিন্তু এখানে খেয়াল রাখা দরকার, কেবল অর্থসংকট নয়, সামাজিক নিরাপত্তার অভাবেও অনেক মেয়েশিশু পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।
শিক্ষায় বরাদ্দের একটি বড় অংশ যায় অবকাঠামো নির্মাণ ও সংস্কার কাজে। এ ক্ষেত্রেও বরাদ্দ সুষম হয় না বলে অভিযোগ আছে। পিছিয়ে থাকা এলাকার দুর্বল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে। তা ছাড়া অতীতে দেখা গেছে, এ ধরনের নির্মাণ ও সংস্কারকাজে সরকারদলীয় স্থানীয় নেতা-কর্মীরা ‘ভাগ-বাঁটোয়ারা’ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন; বরাদ্দকৃত অর্থের মূল অংশই উন্নয়ন কাজে লাগে না। এমনকি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা নতুন প্রকল্পের ক্ষেত্রেও অর্থ তছরুপের অভিযোগ রয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে ক্লাবভিত্তিক সহশিক্ষা কার্যক্রম, যেমন: বিতর্ক, বিজ্ঞান মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সাহিত্যচর্চাকে উৎসাহিত করার কথা বলা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানভিত্তিক এবং প্রান্তিক পর্যায়ে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও টুর্নামেন্ট নিয়মিত আয়োজন করার পরিকল্পনাও আছে। তা ছাড়া স্কাউটস, বিএনসিসি ও গার্ল গাইডসের কার্যক্রম সম্প্রসারণের চিন্তা করা হচ্ছে।
এসব খাতে অর্থ বরাদ্দ দেওয়াই চূড়ান্ত কথা নয়; বরং বাস্তব ক্ষেত্রে এসব আয়োজন ও ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। স্কুল-কলেজের গ্রন্থাগারগুলোও সমৃদ্ধ করতে কিংবা ব্যবহার উপযোগী করে তুলতে হবে।
নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণের কথাও জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। সেটি করা গেলে আসলেই শিক্ষার ইতিবাচক প্রভাব অর্থনীতিতেও পড়বে।
● তারিক মনজুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক