
শত শত কারখানা বন্ধ। হাজার হাজার পোশাকশ্রমিক রাস্তায়। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, গাড়িতে আগুন জ্বালানোর মতো অবস্থা তৈরি হয়ে গেল অল্প সময়ে। শ্রমিকদের দাবি ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা। অনেকে উষ্মা প্রকাশ করছেন—শ্রমিকদের বাড় বেড়েছে, ৩০ হাজার টাকা ছেলের হাতের মোয়া নাকি! কেউ দেখতে চাইছেন দাবির যৌক্তিকতা কতটা।
সুসংবাদ—সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। তবে ঠিক-বেঠিক সবকিছুতে সরকারের ষড়যন্ত্র খোঁজার বাতিক থাকে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ১২ হাজার ৫০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি নির্ধারিত হয়েছিল। তারপর যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতি, গ্যাস-সংকট ইত্যাদি মিলিয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে অনেক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। আগস্টে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ, আর মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। এভাবে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে প্রায় সাড়ে চার বছর টানা মূল্যস্ফীতি মজুরি বৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ সাড়ে চার বছর ধরে শ্রমজীবী মানুষের প্রকৃত আয় প্রতি মাসেই কমেছে।
খরচ বেড়েছে ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ, বেতন বেড়েছে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। বেতনে প্রতি ১ টাকা বৃদ্ধির বিপরীতে খরচ বেড়েছে ৩ টাকা। কোথা থেকে আসবে অতিরিক্ত এই টাকা?
পোশাকশ্রমিকদের বিষয়ে আমার পুরোনো গবেষণার আলোকে অতি সম্প্রতি হালনাগাদ বাস্তবতা যাচাই করতে গিয়েছিলাম। সেই সুবাদে একজন পোশাককর্মীর মাসিক খরচের মোটামুটি হিসাব আমার জানা। ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে তাঁর একক উপার্জনে চারজনের সংসার চলত। যে খরচগুলো নিতান্তই অত্যাবশ্যক, না করলে প্রাণ বাঁচানোই দায়, গড়ে প্রত্যেকের পেছনে ৪ হাজার ৫০০ টাকা হিসাবে লাগত ১৮ হাজার টাকা। কোনো বিলাসিতা নেই, নতুন খরচও যোগ নেই, সঞ্চয় তো নেই-ই। ওভারটাইম মিলিয়ে সর্বসাকল্যে তাঁর আয় হতো ১৫ হাজার টাকা। বাকি ৩ হাজার টাকা হয় ঋণ করতে হতো, নইলে শেষের দশ-পনেরো দিন আলুভর্তা-ডাল সম্বল করে বাঁচতে হতো।
সাড়ে চার বছর টানা প্রকৃত আয় কমেছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে জীবনধারণ মজুরি ৩০ হাজার ৪৫৯ টাকা, আর ন্যূনতম মজুরি প্রায় ৩ বছর ধরে ১২ হাজার ৫০০ টাকায় আটকে আছে। তাই রাস্তায় শ্রমিকেরা আকাশ–পাতাল বাড়তি সুবিধা চাইছেন না, বেঁচে থাকার ন্যূনতম নিশ্চয়তা চাইছেন—বুঝতে পারা সংবেদনশীলতাই সমাধানের পথ দেখাবে।
হিসাব করতে গিয়ে বুঝেছি, ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে গিয়ে তার বেঁচে থাকার ন্যূনতম প্রয়োজন হবে গড়ে প্রত্যেকের পেছনে ৫ হাজার ২৫০ টাকা হিসাবে ২১ হাজার টাকা। বেতন বাড়া ও ওভারটাইম মিলিয়ে শ্রমিকটির উপার্জন হবে বড়জোর ১৬ হাজার টাকা। ঘাটতি দাঁড়াবে ৫ হাজার টাকায়। বেশকম সামান্য এদিক-সেদিক হতে পারে। এক বছরের ব্যবধানে তার মাসিক ঋণগ্রস্ততায় আগের ৩ হাজারের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে অতিরিক্ত ২ হাজার টাকা।
এদিকে টাকার দরপতনের প্রভাবে ২০২৬ সালের দামে হিসাব করলে তার ২০২৭ সালের জানুয়ারির ১৬ হাজার টাকার প্রকৃত মূল্য ২০২৬ সালের জানুয়ারির ১৩ হাজার ৭১৪ টাকা মাত্র। অর্থাৎ কাগজে বেতন ‘বেড়েছে’, কিন্তু প্রকৃত আয় কমেছে প্রায় ১ হাজার ২৮৬ টাকা বা ৮ দশমিক ৬ শতাংশ।
যদি ন্যূনতম ন্যায্যতার মাপকাঠি বানাই, প্রথমত শুধু প্রকৃত বেতন আগের জায়গায় রাখতে, অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করতেই পোশাককর্মীটির বেতন হওয়া উচিত নিদেনপক্ষে ১৭ হাজার ৫০০ টাকা।
দ্বিতীয়ত, ঘাটতি অন্তত আগের ৩ হাজার টাকায় আটকে রাখতে হলে লাগবে ১৮ হাজার টাকা। অর্থাৎ ১৬ হাজার টাকার বেতনের ওপর আরও ২ হাজার টাকা যেভাবেই হোক সরকারকে বা সরকারের মধ্যস্থতায় মালিকপক্ষকে সহায়তা হিসেবে দিতেই হবে। নইলে শ্রমিকটি কীভাবে বাঁচবেন?
তৃতীয়ত, ঘাটতি পুরোপুরি মেটানোর সদিচ্ছা দেখালে তাঁকে বেতন দিতে হবে অন্তত ২১ হাজার টাকা।
লক্ষ করুন, ২ হাজার টাকা সহায়তাটি বোনাস নয়; পরিবারটিকে আগের মতো দেনাদার জায়গায় দাঁড় করিয়ে রাখার ন্যূনতম শর্ত। নইলে পরিবারটি দরিদ্র থেকে এক-দেড় বেলা খাওয়া হতদরিদ্র পর্যায়ে নামবে।
ব্রিটিশ সমাজবিজ্ঞানী সিবোম রাউনট্রি প্রথম দেখিয়েছিলেন, পরিবারের মৌলিক চাহিদার একটি বাজেট ধরে মজুরির ন্যূনতম সীমা মাপা যায়। সেই ধারা থেকেই এসেছে রিচার্ড ও মার্থা আঙ্কারের ‘জীবনধারণ মজুরি’ বা লিভিং ওয়েজ পদ্ধতি, যা আজ সারা বিশ্বে গৃহীত ও সমাদৃত মানদণ্ড।
এই পদ্ধতিতে গ্লোবাল লিভিং ওয়েজ কোয়ালিশনের ২০২৫ সালের হিসাব বলছে, ঢাকায় চারজনের পরিবারে (যেখানে উপার্জনকারী গড়ে ১.৫৮ জন) একজন শ্রমিকের জীবনধারণ মজুরি মাসে ৩০ হাজার ৪৫৯ টাকা। শ্রমিকদের দাবি ৩০ হাজার টাকা আন্তর্জাতিক গবেষণার হিসাবের সঙ্গে প্রায় হুবহুই মিলে যায়।
আইএলওর ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ কনভেনশন ১৩১ (১৯৭০) মতে, ন্যূনতম মজুরি ঠিক করার সময় শ্রমিক ও তাঁর পরিবারের প্রয়োজন এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় নিতে হবে। জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মজুরি সমন্বয় বহু দেশেই প্রচলিত নিয়ম।
অমর্ত্য সেন ‘পভার্টি অ্যান্ড ফেমিনিন্স’ বইয়ে দেখিয়েছিলেন, ১৯৪৩ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষ খাদ্যের অভাবে হয়নি। হয়েছিল মানুষের ‘এনটাইটেলমেন্ট’ ভেঙে পড়ায়: মজুরির বিনিময়ে যতটুকু চাল কেনা যেত, তা হঠাৎ কমে গিয়েছিল। বাজারে চাল ছিল, কিন্তু শ্রমিকের মজুরিতে তা কেনা যাচ্ছিল না। একজন পোশাকশ্রমিকের এনটাইটেলমেন্ট হলো তাঁর মজুরি। মজুরি আর চালের দামের অনুপাত যখন কমতে থাকে, বাজার ভরা থাকলেও ঘরে অভাব আসে।
‘বেশি মজুরি দিলে কারখানা চলবে না’—এ আশঙ্কার জবাবও অর্থনীতিতে আছে। অর্থনীতিবিদ জর্জ আকারলফ, কার্ল শাপিরো ও জোসেফ স্টিগলিৎসের ‘দক্ষতা মজুরি’ তত্ত্ব বলে, ভালো মজুরি পেলে শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা বাড়ে, চাকরি ছেড়ে যাওয়ার হার কমে, প্রশিক্ষণের খরচ বাঁচে। অর্থনীতিবিদ ডেভিড কার্ড ও অ্যালান ক্রুগার যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে দেখিয়েছিলেন, ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর পর কর্মসংস্থান কমেনি। এই গবেষণার ধারায় কার্ড ২০২১ সালে নোবেল পান।
জন রলসের ন্যায়তত্ত্বে বলে, সমাজে অসমতা তখনই ন্যায্য, যখন তা সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের উপকারে আসে। খাতটি চার দশকে কোটি কোটি ডলারের হয়েছে। সেই সমৃদ্ধিতে কি সবচেয়ে নিচের মানুষটির জীবন ভালো হয়েছে? নাকি সাড়ে চার বছর ধরে খারাপ হয়েছে?
বাজার অর্থনীতির জনক অ্যাডাম স্মিথ তাঁর ‘দ্য ওয়েলথ অব নেশনস’-এ লিখেছিলেন, মানুষকে তার শ্রম দিয়েই বাঁচতে হয়, তাই মজুরি অন্তত এতটুকু হতে হবে, যাতে সে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পারে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তার চেয়ে কিছুটা বেশিই হওয়া উচিত, নইলে সে পরিবার প্রতিপালন করতে পারবে না। বাজারের সবচেয়ে বড় প্রবক্তাও মজুরির নৈতিক ভিত্তিটি মানার সুপরামর্শ দিয়ে গেছেন।
ধর্মও দিচ্ছে একই দীক্ষা। বিখ্যাত হাদিস ‘শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তাঁর মজুরি দিয়ে দাও’ (ইবনে মাজাহ) বহুশ্রুত। ঘাম শুকানোর আগে মজুরি দেওয়াই যেখানে কর্তব্য হওয়ার কথা, এমন মজুরি কেন হবে, যা দিয়ে একটি মাসও ন্যূনতম দরকারি অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-চিকিৎসা-বাসস্থানের সংস্থান হবে না?
সরকার ও মালিকপক্ষের একটিই কথা, কে দেবে এই টাকা?
দায় কেবল মালিকের নয়, তিনটি পক্ষেরই। আন্তর্জাতিক ক্রেতা ব্র্যান্ডগুলো বছরের পর বছর পোশাকের দাম নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। শ্রমিকের মজুরির খরচ ক্রয়মূল্যের মধ্যে আলাদা করে সুরক্ষিত রাখতে তাদের সম্মত করানো সরকার ও মালিকপক্ষের দায়। মালিকপক্ষকেও মুনাফার ন্যায্য অংশটি মজুরিতে দিতে হবে। আর রাষ্ট্রকে রেশন, ভর্তুকি মূল্যে নিত্যপণ্য, বাসস্থান ও যাতায়াত সহায়তার মাধ্যমে ঘাটতির একটি অংশ পূরণ করার ব্যবস্থা করতে হবে। অমর্ত্য সেন ও জঁ দ্রেজ একেই বলেছেন ‘পাবলিক অ্যাকশন’। বাজার যখন মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে না, রাষ্ট্রকেই তখন দায়িত্ব নিতে হবে।
মালিকপক্ষের উদ্বেগগুলোও যৌক্তিক। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট আছে। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় জ্বালানির বাজার অনিশ্চিত। ক্রেতারা দাম বাড়াতে চায় না। ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতা তীব্র। হঠাৎ মজুরি দ্বিগুণ হলে ছোট কারখানা বন্ধ হয়ে চাকরি হারানোর ঝুঁকি শ্রমিককেই চাকরিহীন ও ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তবে এক বাস্তবতায় জোর দিতে গিয়ে অন্য বাস্তবতা আড়াল করলে বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী।
সাড়ে চার বছর টানা প্রকৃত আয় কমেছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে জীবনধারণ মজুরি ৩০ হাজার ৪৫৯ টাকা, আর ন্যূনতম মজুরি প্রায় ৩ বছর ধরে ১২ হাজার ৫০০ টাকায় আটকে আছে। তাই রাস্তায় শ্রমিকেরা আকাশ–পাতাল বাড়তি সুবিধা চাইছেন না, বেঁচে থাকার ন্যূনতম নিশ্চয়তা চাইছেন—বুঝতে পারা সংবেদনশীলতাই সমাধানের পথ দেখাবে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের ৪৮ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয়ের মধ্যে ৩৮ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৮০ দশমিক ৬ শতাংশ এসেছে পোশাক খাত থেকে। চীনের পরেই বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক। আমদানির ডলার, রিজার্ভ, বিনিময় হার—সবকিছুর পেছনের শক্তি রাস্তায় নামা শ্রমশক্তিটিই। যাঁরা দেশের ৮০ শতাংশ রপ্তানি আয় এনে দেন, তাঁদের সংসার ধারদেনায় চলবে—এটা অর্থনীতির হিসাবেও ভুল, ন্যায়বিচারের হিসাবেও অন্যায়।
ড. হেলাল মহিউদ্দীন শিক্ষক, লিবারেল আর্টস, ম্যেভিল স্টেট ইউনিভার্সিটি, নর্থ ডেকোটা, যুক্তরাষ্ট্র
মতামত লেখকের নিজস্ব