জনবিচ্ছিন্ন কোনো শাসনের প্রথম বৈশিষ্ট্যই হলো ভিন্নমতকে সরাসরি মোকাবিলা না করে তাকে নানা বিশেষণে আটকে ফেলা। তারা সমালোচককে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে, তার সমর্থনভিত্তিকে আলাদা করে দেয় এবং মূল অভিযোগকে গুরুত্বহীন করতে চায়। বর্তমানে পাকিস্তানে এ পদ্ধতিই ক্ষতিকরভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে।
সেখানে বিদেশি আধিপত্য বিস্তারের যুদ্ধের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে স্রেফ ‘সাম্প্রদায়িক গোলযোগ’ হয়েছে বলে তকমা দেওয়া হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের অনুগত একটি নিরাপত্তা রাষ্ট্র নিজেকে এখন জাতীয় শৃঙ্খলা রক্ষার প্রধান হিসেবে হাজির করতে চাইছে।
শিয়া আলেমদের কাছে পাকিস্তানের শাসকদের দেওয়া বার্তাটি ছিল চরম নিষ্ঠুর। তাঁদের বলা হয়েছে, ‘ইরানকে যদি এতই ভালো লাগে, তবে ইরানে চলে যান।’ এটি কোনো শক্তির ভাষা নয়। এটি আসলে একটি ভিতু ও অনুগত শাসকগোষ্ঠীর দুর্বল অভিব্যক্তি। যারা মূলত ইরান ইস্যুতে মার্কিন ও ইসরায়েলি যুদ্ধের বিরুদ্ধে কোনো রাজনৈতিক অবস্থান নিতে চরম ব্যর্থ হয়ে ভিন্নমতকে অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত করছে এবং মানুষের মধ্যে ভীতি ও অপবাদের পরিবেশ তৈরি করতে চাইছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রিয় ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এখন ঠিক সেই পুরোনো ও পরিত্যক্ত কৌশলের ওপর ভর করছেন। তিনি যখন শিয়াদের এই অযৌক্তিক দ্বিধায় ফেলে দেন যে হয় তারা শান্ত নাগরিক হয়েছে থাকবে, নতুবা ইরানে চলে যাবে—সেটি মোটেই রাষ্ট্রনেতাসুলভ কাজ নয়।
এখানে আসল প্রশ্নটি ধর্মীয় বা তাত্ত্বিক নয়, প্রশ্নটি ক্ষমতার। পাকিস্তান কে শাসন করছে, কার স্বার্থে শাসন চলছে এবং পাকিস্তান কার ছায়ায় টিকে আছে?
পাকিস্তানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী খুব ভালো করেই বোঝে যে তারা শুধু একটি সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িক সংকটের মুখে নেই। তারা এমন কিছুর মুখোমুখি, যা তাদের অস্তিত্বের জন্য অনেক বেশি বিপজ্জনক। সেই বিপদ হলো, পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ নিজেদের ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে বুঝতে পারছে যে তাদের দেশ এখন পরাধীনতার জালে বন্দী। তারা এখন বাইরের দেশের স্বার্থ রক্ষা এবং ভেতরকার ভীরুতাকে সাহসের আবরণে দেখতে শুরু করেছে।
করাচির মার্কিন কনস্যুলেটের বাইরে ঘটে যাওয়া সেই হত্যাকাণ্ড কেন এত তাৎপর্যপূর্ণ? যখন পাকিস্তানের মাটিতেই মার্কিনদের গুলিতে যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভকারীরা মারা যান, তখন রাষ্ট্রীয় সব অজুহাত মিথ্যা হয়ে যায়।
যখন বাইরের দেশের সহিংসতা এবং দেশের ভেতরকার দমন-পীড়ন একই বিন্দুতে মিলে যায়, তখনই রাষ্ট্রযন্ত্রের আসল চেহারা উন্মোচিত হয়। বিদেশের আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করার বদলে বরং দেশের ভেতরে মানুষের ক্ষোভকে দমন করা পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রধান কাজে পরিণত হয়েছে।
এই দমনের জন্য তারা মতাদর্শিক কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে। কারণ, যেকোনো বিক্ষোভ আটকে দেওয়া গেলেও রাজনীতিকে সহজে আটকানো যায় না। রাজনীতি আমাদের চেনার সুযোগ দেয়—কারা কাঠামোর সুফল ভোগ করছে। রাজনীতি প্রশ্ন তোলে, কেন দেশটি জনসভায় সার্বভৌমত্বের দোহাই দিলেও ওয়াশিংটনের সামনে এতটা নরম হয়ে থাকে? কেন তারাই আবার নিজ নাগরিকদের ওপর এতটা নির্মম হয়ে ওঠে? রাজনীতি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে যাঁরা জাতির অভিভাবক সাজেন, তাঁরা বাস্তবে অন্যের আজ্ঞাবহ এক কারারক্ষীমাত্র।
ইরানের বিপ্লব কেন বিশ্বের বহু দেশের শাসক ও সামরিক আজ্ঞাবহদের আতঙ্কিত করেছিল? কারণ, সেটি কেবল নির্দিষ্ট মতাদর্শের বিজয় ছিল না, বরং তা ছিল বিদেশি শক্তির সমর্থনে টিকে থাকা এক শাসকের পতন। সেই বিপ্লব প্রমাণ করেছিল যে দেশের মানুষ চাইলে সার্বভৌমত্ব ছিনিয়ে নিতে পারে।
ঠিক এ কারণেই তারা আতঙ্কে রাজনৈতিক সেই লড়াইকে সাম্প্রদায়িক হিসেবে প্রচার করতে থাকে। একটি সার্বভৌম রাজনৈতিক আন্দোলনকে তাত্ত্বিক পথভ্রষ্টতা বলে রটনা করে দেয়। এটি একটি ভয়াবহ জোচ্চুরি হলেও দীর্ঘকাল ধরে এ কাজই করা হচ্ছে। কারণ, রাষ্ট্র ও তাদের প্রচারণাযন্ত্র দিনরাত মানুষের মগজে এই বিষ ঢোকায়।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রিয় ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এখন ঠিক সেই পুরোনো ও পরিত্যক্ত কৌশলের ওপর ভর করছেন। তিনি যখন শিয়াদের এই অযৌক্তিক দ্বিধায় ফেলে দেন যে হয় তারা শান্ত নাগরিক হয়েছে থাকবে, নতুবা ইরানে চলে যাবে—সেটি মোটেই রাষ্ট্রনেতাসুলভ কাজ নয়। এটি স্রেফ বিদেশি প্রভুদের খুশি করার জন্য নেওয়া এক সাম্প্রদায়িক জবরদস্তি। সেই জেনারেল আসলে ভয় পাচ্ছেন যে ইসরায়েল ও আমেরিকার ইরানে হামলার বিরুদ্ধে জনরোষ আর শুধু শিয়াদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। একে দ্রুত সাম্প্রদায়িক তকমা না দিতে পারলে জনতা অজেয় হয়ে উঠবে।
পাকিস্তান রাষ্ট্র এখন চায় জনতার বিক্ষোভকে শিয়া-সুন্নি বিরোধ হিসেবে বিশ্বের সামনে হাজির করতে। কারণ, এটি যে আসলে শাসক বনাম সাধারণ জনগণের একটি চূড়ান্ত রাজনৈতিক সংঘাত, তা স্বীকার করার ক্ষমতা তাদের নেই। পাকিস্তানের শাসকেরা কোনো জাতীয় ঐক্য রক্ষা করছেন না, বরং তাঁরা তাঁদের সুবিধা ও বিদেশি স্বার্থ পাহারা দিচ্ছেন।
পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী তার দেশে ইরান যুদ্ধকেন্দ্রিক গণরোষকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় রূপ দিতে চায়। কারণ, দাঙ্গাকে খুব সহজেই বিচ্ছিন্ন করা যায়। কিন্তু সচেতন রাজনৈতিক সংহতিকে রুখে দেওয়ার ক্ষমতা কারও নেই।
রাষ্ট্রের প্রতিটি হুমকির পেছনে কাজ করছে চরম আতঙ্ক। সেই আতঙ্ক ইরানকে নিয়ে নয়, কিংবা কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম নিয়ে নয়, বরং আসল আতঙ্ক হলো পাকিস্তানের সুন্নি ও শিয়া সম্প্রদায়ের মানুষ হয়তো আজ বুঝতে পারছে যে বিদেশের যুদ্ধ ও ঘরের ভেতরে শাসকের অত্যাচার বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এগুলো আসলে একটি অভিন্ন শাসনকাঠামোর নিষ্ঠুর বহিঃপ্রকাশ।
অধ্যাপক জুনাইদ এস আহমদ ইসলামাবাদের সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব ইসলাম অ্যান্ড ডিকলোনাইজেশনের (সিএসআইডি) পরিচালক
মিডিল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত