
পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার প্রথম পর্যায়ের যুদ্ধবিরতি আলোচনা কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়েছে। দীর্ঘ ২১ ঘণ্টার আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সোজাসাপটা জবাব দিয়েছেন, ‘ইরান আমাদের শর্ত মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।’
ভ্যান্সের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছে ইরান যেন আর পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার নিশ্চয়তা দেয়; কিন্তু ইরান সেই প্রতিশ্রুতি দিতে নারাজ। উল্টো ইরানি কর্মকর্তাদের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র মূলত সমঝোতার জন্য প্রস্তুতই নয়।
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ দীর্ঘ মেয়াদে বন্ধ করা এবং বর্তমান মজুত ধ্বংসের মতো ওয়াশিংটনের দাবিগুলোকে তারা ‘সর্বোচ্চ সীমায় উন্নীত’ বা ‘ম্যাক্সিমালিস্ট’ হিসেবে দেখছেন, যা ইরানের কাছে পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য।
ইরানের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা মেহদি তাবাতাবেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঠিক এ কথারই প্রতিধ্বনি করে লিখেছেন, ‘আমরা সংলাপের জন্য আগ্রহী, কিন্তু কোনো অমূলক বা জবরদস্তিমূলক দাবির কাছে মাথানত করব না।’
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় খুব শিগগির দ্বিতীয় দফা আলোচনার একটি তোড়জোড় চলছে। বর্তমানে চালু থাকা দুই সপ্তাহের অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আর মাত্র এক সপ্তাহ পরেই শেষ হতে চলেছে।
ছয় সপ্তাহ ধরে চলা এ সংঘাতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্মিলিত বোমাবর্ষণে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ বহু শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হিসাবে, দেশটিতে নিহত বেসামরিক মানুষের সংখ্যা ১ হাজার ৭০০ ছাড়িয়েছে।
এর জবাবে ইরানও মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়েছে এবং বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম প্রধান পথ ‘হরমুজ প্রণালি’ কার্যত অবরুদ্ধ করে দিয়েছে। এমন ভয়ংকর ধ্বংসযজ্ঞের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—ইসলামাবাদের ব্যর্থতার পর এ দুই দেশ এখন কী করবে?
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তববাদী দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে পারস্পরিক আস্থাহীনতাই এই চুক্তি বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। তেহরানের মনে ভয়, চুক্তির নামে সাময়িক বিরতি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে গুছিয়ে হামলা চালাতে পারে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের শঙ্কা, ইরান হয়তো সামরিকভাবে পুনরায় সংগঠিত হওয়ার জন্যই যুদ্ধবিরতি চাইছে। দর-কষাকষির চেয়ে এ যেন শক্তির ভারসাম্য প্রমাণের এক স্নায়ুযুদ্ধ, যেখানে সমঝোতাকে উভয়েই নিজের দুর্বলতা হিসেবে ভাবছে।
এমন পরিস্থিতিতে সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার বড় কারণ—উভয় পক্ষই নিজেকে এই যুদ্ধে বিজয়ী মনে করছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, তারা ইরানের নেতৃত্ব ও সামরিক অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দিয়ে লড়াইয়ে এগিয়ে রয়েছে। বিপরীতে ইরানের দাবি, শত আক্রমণের পরও তারা শুধু টিকে আছে তা নয়, বরং হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অঞ্চল কবজায় নিয়েছে।
আয়াতুল্লাহর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা আলী আকবর ভেলায়াতির কথাতেই তা স্পষ্ট। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটকে প্রাচীন পারস্যে আটকে দেওয়ার ইতিহাস স্মরণ করে তিনি লিখেছেন, ‘অতীতে আবু আল-হায়াত গিরিপথ যেমন বিদেশিদের প্রতিরোধের প্রতীক ছিল, তেমনি আজ হরমুজ প্রণালি আমাদের হাতে শক্ত প্রতিরোধের ঢাল।’
জটিল এই সমীকরণ মেলানোর ক্ষেত্রে একটি বড় প্রভাবক ছিল কূটনীতির অভাব। ইসলামাবাদ আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেওয়া তিনজনের (জেডি ভ্যান্স, স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার) পেশাদার ও ঐতিহ্যবাহী কূটনৈতিক অভিজ্ঞতায় বেশ ঘাটতি ছিল।
অন্যদিকে যুদ্ধকালীন ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্রমাগত ‘আমরা জিতবই’–জাতীয় হঠকারী ও অহংকারী মন্তব্য আলোচনা টেবিলের পরিবেশকে আরও জটিল করেছে। যুক্তরাষ্ট্র একতরফা জয় নিশ্চিত করার মানসিকতা নিয়ে টেবিলে আসায় আপসের রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়।
মাথায় রাখতে হবে, এই যুদ্ধ শুধু যুক্তরাষ্ট্র আর ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; ইসরায়েল, সৌদি আরব, হিজবুল্লাহ, হুতি থেকে শুরু করে কাতার ও আরব আমিরাতের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থ এর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে ইরানের এই অবরোধ ইতিমধ্যে এক বিশাল বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কা তৈরি করেছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক আলী ভায়েজের শঙ্কা—ইরান অন্তত আরও দুই মাসের বেশি সময় শক্ত প্রতিরোধ চালিয়ে যেতে পারবে, আর হুতিদের কাজে লাগিয়ে বাব আল-মানদেব প্রণালিতেও চাপ বাড়াতে পারে। তখন কেবল রণক্ষেত্র নয়, বড় মূল্য চোকাতে হবে পুরো বিশ্বের জ্বালানি খাতকে।
১৯৩৬ সালে প্রকাশিত ‘দ্য পিপল, ইয়েস’ কবিতায় প্রখ্যাত মার্কিন কবি কার্ল স্যান্ডবার্গ লিখেছিলেন, ‘কোনো এক দিন তারা যুদ্ধ ডাকবে, কিন্তু আর কেউই তাতে যোগ দিতে আসবে না।’ পরবর্তী সময়ে ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধীদের মুখে স্লোগান হয়ে ফেরা সেই পঙ্ক্তি আজকের মার্কিন প্রশাসনের জন্য যেন নতুন করে সত্যি হতে যাচ্ছে।
আমেরিকা আজ সবাইকে পাশে ডাকলেও উল্লেখযোগ্য মিত্ররা, বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিগুলো সেভাবে সাড়া দিচ্ছে না। সবাই চাইছে এ যুদ্ধ থামুক।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় খুব শিগগির দ্বিতীয় দফা আলোচনার একটি তোড়জোড় চলছে। বর্তমানে চালু থাকা দুই সপ্তাহের অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আর মাত্র এক সপ্তাহ পরেই শেষ হতে চলেছে।
ফলে কূটনীতির জানালা খুব দ্রুত বন্ধ হয়ে আসছে। দুই দেশ যদি তাদের ‘বিজয়ীর অহমিকা’ ত্যাগ করে বসার টেবিলে কার্যকর সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারে, তবে সামনের দিনগুলোয় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড ছাপিয়ে পুরো বিশ্বকেই এর জন্য চরম মূল্য চোকাতে হবে।
সানজিদা বারী ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় শিকাগোতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ডক্টরাল ফেলো
ই-মেইল: sanjidabary5@gmail.com
* মতামত লেখকের নিজস্ব