
গোটা পৃথিবী এগিয়ে চলছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকে ভিত্তি করে। প্রায় এক দশক ধরে আমাদের দেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সভা-সেমিনার হয়েছে, প্রচুর কথাবার্তা হয়েছে। কিন্তু এই সবকিছুই অর্থহীন হয়ে পড়ে, যদি সেটি থেকে কার্যকর কোনো ফলাফল না আসে। ১৮ কোটি মানুষের দেশ থেকে মানসম্পন্ন মাত্র ১০০ জন এআই প্রকৌশলী খুঁজে বের করে দেওয়ার জন্য বলা হলে কাজটি সহজ হবে না।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাজ মাটি কাটার কাজ নয় যে একজন শ্রমিকের যে কাজ করতে ১০ দিন লাগে, সেখানে অতিরিক্ত টাকা খরচ করে ১০ জন শ্রমিক ভাড়া করলেই সেই একই কাজ ১ দিনে করে ফেলা যাবে। প্রয়োজন সঠিক ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে মূল কাজ হলেও শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে হবে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে। গাণিতিক দক্ষতা, যৌক্তিক ও বিশ্লেষণী চিন্তা করার সংস্কৃতি তৈরি করতে হয় শিক্ষাজীবনের শুরুর দিকে।
পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও চীন প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রকৌশলী তৈরি করছে। তাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে স্নাতক পর্যায়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সায়েন্স বিষয়ে ডিগ্রি প্রদান করছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একযোগে কাজ করছে ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে। একই কাজ সিঙ্গাপুর করছে কম সংখ্যায়, কিন্তু অধিকতর গুণগত মান বজায় রেখে। এই দেশগুলো মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়টি যুক্ত করেছে, তবে সেটি সে স্তরের জন্য উপযোগী করে। সরকারি–বেসরকারি উদ্যোগে তাদের রয়েছে বিশাল অবকাঠামোগত সুবিধা ও গবেষণাবান্ধব পরিবেশ।
আমাদের এখন প্রয়োজন আগামী ৫ থেকে ১০ বছরকে লক্ষ্য করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষা ও উন্নয়নের জন্য এআই কৌশল ঠিক করা এবং সে অনুযায়ী একটি রোডম্যাপ তৈরি করা।
এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে বর্তমান এআই গবেষণার বড় একটি অংশ বড় বড় ল্যাব ও সরকারি অবকাঠামো দ্বারা সমর্থিত। বিভিন্ন দেশ এই অবকাঠামো তৈরি করতে শত শত মিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। সুপারকম্পিউটার ক্লাস্টার তো দূরে থাক, ব্যক্তিগত পর্যায়ে এআই মডেল চালানোর জন্য একটি মানসম্পন্ন কম্পিউটার কিনতে গেলেও ক্ষেত্রবিশেষে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকার প্রয়োজন পড়ে। অর্থাৎ বড় মানের কাজ করতে গেলে জাতীয় পর্যায়ের এআই ল্যাব বা সেন্টার স্থাপনের বিকল্প নেই। তাহলে সেটি বিভিন্ন গবেষণাকাজের ক্ষেত্রে ও রাষ্ট্রীয় বড় প্রকল্পে শেয়ার করে ব্যবহার করা যাবে।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বাংলাদেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষায় মেশিন লার্নিং, ডিপ লার্নিং, ডেটা সায়েন্স, ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং ইত্যাদি সমজাতীয় কোর্সগুলো শেখানো হয়। শুধু কোর্সে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ডেটা সায়েন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর মানসম্পন্ন স্নাতক ডিগ্রি প্রদান করার কথা পরিকল্পনায় নেওয়া যেতে পারে, স্নাতকোত্তর হতে পারে এআই ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো বিষয়গুলোর ওপর। মাধ্যমিক পর্যায়ে মেশিন লার্নিং, ডেটা লিটারেসি, রোবোটিকস বা অটোমেশনের ধারণাগুলো পাঠ্যক্রমে যুক্ত হতে পারে। তবে সেটির জন্য শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের পরিকল্পনাও করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক বইপুস্তক লেখাকে উৎসাহিত করার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
সরকারের উদ্যোগে জাতীয় এআই সুপারকম্পিউটিং সেন্টার স্থাপন করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এআই মডেল চালানোর জন্য সহজে যেন জিপিইউ ক্লাস্টার ব্যবহার করতে পারে, সেটির সুব্যবস্থা করতে হবে। এআই গবেষণার জন্য ডেটাসেট তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে এবং সেটি সবাই যেন শেয়ার করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
আমাদের বড় ধরনের একটি দুর্বলতা হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পের (ইন্ডাস্ট্রি) মধ্যে সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে না ওঠা। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে এআই ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রাম, যৌথ গবেষণা ল্যাব প্রতিষ্ঠা, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে এআই স্টার্টআপ ইনকিউবেশন সেন্টার স্থাপন করার উদ্যোগ নিতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ে পিএইচডি করার জন্য আলাদা ফান্ড দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে, পোস্টডক্টরাল এআই গবেষণার জন্য বিভিন্ন পদ সৃষ্টি করা যেতে পারে।
অন্তত বাংলা এআই গবেষণায় আমাদের বিশ্বে নেতৃত্ব দেওয়ার অবস্থায় পৌঁছানো উচিত। বাংলা ভাষা প্রক্রিয়াকরণ ও বাংলার জন্য নানা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক টুল তৈরির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট গবেষণার বিকল্প নেই। সেটির মূল কাজে নেতৃত্ব দিতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেই। শিক্ষার্থীদের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক মেধা লালনের জন্য নিয়মিত হতে পারে মেশিন লার্নিং হ্যাকাথন, জাতীয় এআই গবেষণা চ্যালেঞ্জ, রোবোটিকস প্রতিযোগিতাসহ নানান আয়োজন।
স্কুল-কলেজ পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ইতিমধ্যে দেশব্যাপী আয়োজিত হয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অলিম্পিয়াড। এই অলিম্পিয়াডের আন্তর্জাতিক আসরে গত দুই বছর বাংলাদেশ সাফল্য অর্জন করেছে। সৌদি আরবের রিয়াদে অনুষ্ঠিত প্রথম আন্তর্জাতিক এই অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশ অর্জন করে দুটি রৌপ্য ও দুটি ব্রোঞ্জপদক। গত বছর চীনের বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আরেকটি আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশ দল অর্জন করে একটি ব্রোঞ্জপদক ও একটি সম্মানজনক স্বীকৃতি। এ বছরও দেশব্যাপী বাংলাদেশ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অলিম্পিয়াডের তৃতীয় আসরের নিবন্ধন শুরু হয়েছে। আগামী ১০ এপ্রিল পর্যন্ত নিবন্ধন করা যাবে bdaio.org ওয়েবসাইটে গিয়ে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগ্রহী স্কুল–কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য এটি দারুণ এক সুযোগ।
আমাদের এখন প্রয়োজন আগামী ৫ থেকে ১০ বছরকে লক্ষ্য করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষা ও উন্নয়নের জন্য এআই কৌশল ঠিক করা এবং সে অনুযায়ী একটি রোডম্যাপ তৈরি করা, যেখানে জাতীয়ভাবে নির্ধারণ করা হবে এআই পাঠ্যক্রম, থাকবে গবেষণা তহবিল কর্মসূচি, নৈতিক এআই নির্দেশিকা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ে দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের পরিকল্পনা। আমাদের দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা বিবেচনায় যাত্রাটা সহজ হবে না, কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানো গেলে ফল হবে মধুর।
ড. বি এম মইনুল হোসেন অধ্যাপক ও পরিচালক, তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
bmmainul@du.ac.bd