
পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি শুধু পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগ নয়; সঠিক আন্তর্জাতিক কাঠামো অনুসরণ করলে এটি বাংলাদেশের জন্য নতুন এক সবুজ অর্থনীতির ভিত্তি হতে পারে। UNFCCC এর REDD+ কাঠামো, প্যারিস চুক্তির কার্বন বাজার এবং একটি জাতীয় ডিজিটাল বৃক্ষ মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে কোটি কোটি গাছ একদিন দেশের জন্য শত মিলিয়ন ডলারের কার্বন অর্থনীতির সুযোগ তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা, নদীভাঙন এবং ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা ইতিমধ্যেই দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে। তবে এই জলবায়ুসংকটের মধ্যেই বিশ্বব্যাপী একটি নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হয়েছে—কার্বন অর্থনীতি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ এখন বন ও বৃক্ষভিত্তিক কার্বন শোষণকে একটি অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত করার চেষ্টা করছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি থেকে আন্তর্জাতিক কার্বন ক্রেডিট অর্জনের যে পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে, তা সময়োপযোগী একটি ধারণা। বিশেষ করে ২০২৬ থেকে ২০৩১ সালের মধ্যে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর জাতীয় কর্মসূচির সঙ্গে যদি আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারকে যুক্ত করা যায়, তাহলে এটি পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি নতুন একটি সবুজ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রও তৈরি করতে পারে।
তবে এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য শুরুতেই আইপিসিসি নির্দেশিকা এবং সিওপি ম্যান্ডেটগুলোকে অনুসরণ করে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করা অপরিহার্য। আরইডিডি+ হলো জাতিসংঘের একটি নেগোশিয়েশন কাঠামো, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বন রক্ষা, সংরক্ষণ, টেকসই ব্যবস্থাপনা এবং বর্ধিত কার্বন মজুতের জন্য আর্থিক প্রণোদনা প্রদান করে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে বন উজাড় কমানো, বন পুনরুদ্ধার এবং নতুন বৃক্ষ আচ্ছাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে কার্বন শোষণের ফলাফল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পায়। কোনো দেশ যদি নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী অতিরিক্ত কার্বন শোষণ প্রমাণ করতে পারে, তাহলে সেই কার্বনকে আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করা সম্ভব হয়।
এই প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো একটি দেশের বনভূমির জন্য একটি ফরেস্ট রেফারেন্স লেভেল বা বেজলাইন নির্ধারণ করা। অর্থাৎ নতুন নীতি বা প্রকল্প না থাকলে বনভূমি থেকে কত কার্বন নিঃসরণ বা শোষণ ঘটত—তার একটি ঐতিহাসিক মান নির্ধারণ করা হয়। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে এই ধাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ২০১৯ সালে সম্পন্ন করেছে এবং ইউএনএফসিসিসি-এ একটি ফরেস্ট রেফারেন্স লেভেল জমা দিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে মূল্যায়িত হয়েছে। ভবিষ্যতে নতুন বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি কত অতিরিক্ত কার্বন শোষণ করছে, তা এই বেজলাইনের ভিত্তিতেই নির্ধারণ করা হবে।
কিন্তু কার্বন ক্রেডিট অর্জনের জন্য কেবল বেজলাইন নির্ধারণ যথেষ্ট নয়। এর জন্য একটি শক্তিশালী ন্যাশনাল ফরেস্ট মনিটরিং সিস্টেম গড়ে তোলা প্রয়োজন। স্যাটেলাইট ডেটা, ভূমি ব্যবহার পরিবর্তনের বিশ্লেষণ এবং মাঠপর্যায়ের জরিপের মাধ্যমে বনভূমি ও বৃক্ষ আচ্ছাদনের পরিবর্তন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী মেজারমেন্ট, রিপোর্টিং অ্যান্ড ভেরিফিকেশন বা এমআরভি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হয়, যাতে কার্বন শোষণের তথ্য আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়।
এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির প্রস্তাবিত জাতীয় বৃক্ষ মনিটরিং অ্যাপ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত ভিত্তি তৈরি করতে পারে। একটি আধুনিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রতিটি গাছের জিপিএস অবস্থান, প্রজাতি, রোপণের সময় এবং রক্ষণাবেক্ষণের তথ্য একটি জাতীয় ডেটাবেজে সংরক্ষণ করা সম্ভব। যদি প্রতিটি গাছের জন্য একটি ইউনিক ডিজিটাল আইডি তৈরি করা হয় এবং তা স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ ও জিআইএস প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করা হয়, তাহলে একটি সমন্বিত জাতীয় বৃক্ষ নিবন্ধনব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে। এই ডেটাবেজ ভবিষ্যতে জাতীয় বন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।
এ ধরনের একটি ডিজিটাল ব্যবস্থা কেবল প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা সহজ করবে না; এটি কার্বন হিসাবের জন্যও একটি নির্ভরযোগ্য ভিত্তি তৈরি করবে। গাছের প্রজাতি, বয়স এবং বৃদ্ধির হার অনুযায়ী কার্বন শোষণের পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী কার্বন স্টক রিপোর্ট তৈরি করা সহজ হবে এবং ইউএনএফসিসিসি-এ নিয়মিত রিপোর্ট জমা দেওয়া সম্ভব হবে।
এখানে অর্থনৈতিক সম্ভাবনাটিও গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণা অনুযায়ী একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ গড়ে বছরে প্রায় ২০ কেজি কার্বন ডাই–অক্সাইড শোষণ করতে পারে। যদি জাতীয় পর্যায়ে ২৫ কোটি গাছ লাগানো হয়, তাহলে পূর্ণমাত্রায় বৃদ্ধি পাওয়ার পর এই বৃক্ষসম্ভার বছরে প্রায় ৫০ লাখ টন কার্বন ডাই–অক্সাইড শোষণ করতে পারে। আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী কার্বন বাজারে বর্তমানে প্রতি টন কার্বনের মূল্য গড়ে ৫ থেকে ১৫ ডলার পর্যন্ত ওঠানামা করে। এই হিসাবে ভবিষ্যতে বছরে প্রায় ২৫ থেকে ৭৫ মিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ কার্বন অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি আরইডিডি+ কে কার্যকরভাবে পরিপূরক করতে পারে যদি রোপণগুলো এমন এলাকায় কেন্দ্রীভূত হয়, যেগুলো অবক্ষয় থেকে উচ্চ নির্গমন এবং পুনরুদ্ধার থেকে অপসারণের সম্ভাবনা বেশি—উভয় দিকেই উচ্চ স্কোর করে দুই ধরনের লাভ পাওয়া যায়, যেমন নদীকূল, টিলা, উপকূল ও সুন্দরবনের প্রান্ত, যেখানে এফআরএল বিশ্লেষণ ইতিমধ্যে উচ্চ অবক্ষয় ও বেশি পুনরুদ্ধার সম্ভাবনা দেখায় রোপণের পর শুধু ‘রোপণ দিবস’ নয়, বরং সাইটভিত্তিক ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা, প্রজাতি মিশ্রণ, বেড়াজাল, পশুচারণ ও বেআইনি কাটাকাটি রোধ, এবং বছর তিনেক পর সমৃদ্ধকরণ (এনরিচমেন্ট) অন্তর্ভুক্ত করে স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা জরুরি। সেই সঙ্গে নথিভুক্ত করলে কার্বন সংরক্ষণের ঝুঁকি কমবে এবং ফলাফল নির্ভুলভাবে মাপা সহজ হবে। পাশাপাশি বনভূমির বাইরে থাকা গাছ বা ট্রিজ আউটসাইড ফরেস্টস (টিওএফ)—যেমন রাস্তার ধারে, বাঁধে ও বাড়ির আঙিনায় রোপণ—যদিও প্রচলিত বন সংজ্ঞার বাইরে, তবু এগুলো বড় কার্বন শোষণ তৈরি করে; তাই আলাদা পর্যবেক্ষণ ও পরিমাপ ব্যবস্থার মাধ্যমে এগুলোকেও ভবিষ্যৎ অর্থায়ন কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব। বিশেষ করে উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ ও বালিয়াড়ি অঞ্চলে রোপণ দ্রুত বায়োগ্যাস বৃদ্ধি ও কার্বন শোষণ ঘটায়, একই সঙ্গে উপকূল সুরক্ষা ও জীববৈচিত্র্যের মতো অতিরিক্ত সুবিধাও দেয়, যা ফলাফলভিত্তিক জলবায়ু অর্থায়নের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয়।
আর যদি এই কর্মসূচি আরইডিডি+ কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্যারিস চুক্তির আর্টিকেল সিক্স কার্বন মার্কেটে অংশ নিতে পারে, তাহলে এই সম্ভাবনা আরও বড় হতে পারে। দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশে একটি ১০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি কার্বন অর্থনীতি গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
অবশ্য এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। প্রথমত, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো গাছের বেঁচে থাকার হার। গাছ লাগানোর পর অন্তত কয়েক বছর ধরে সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বন বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, কৃষি মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বিত নীতি প্রয়োজন। তৃতীয়ত, প্রযুক্তিনির্ভর তথ্য ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে হবে, যাতে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী রিপোর্টিং এবং যাচাই সম্ভব হয়।
তবে সঠিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তি এবং জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা গেলে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি শুধু পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন সবুজ অর্থনীতির ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে গাছ কেবল ছায়া দেয় না; এটি একটি অর্থনৈতিক সম্পদও। সঠিক নীতি অনুসরণ করা গেলে বাংলাদেশের কোটি কোটি গাছ একদিন বৈশ্বিক কার্বন বাজারে দেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে।
ড. ফয়সাল একজন পরিবেশ–গবেষক ও নগর পরিকল্পনাবিদ, রায়হানুল ইসলাম ইউএনএফসিসিসির একজন কর্মকর্তা এবং ড. সাইমুম বিএনপি চেয়ারপারসনের পররাষ্ট্রবিষয়ক বিশেষ সহকারী।