ছাত্রী হলে ‘বৈষম্যমূলক সান্ধ্য আইন’ বাতিলসহ তিন দফা দাবিতে সংহতি সমাবেশ করেছে ‘অবরোধবাসিনী’ নামের একটি প্ল্যাটফর্ম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; ১০ আগস্ট ২০২৬।
ছাত্রী হলে ‘বৈষম্যমূলক সান্ধ্য আইন’ বাতিলসহ তিন দফা দাবিতে সংহতি সমাবেশ করেছে ‘অবরোধবাসিনী’ নামের একটি প্ল্যাটফর্ম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; ১০ আগস্ট ২০২৬।

মতামত

রাত ১০টার পর মেয়েদের কী কাজ? এই প্রশ্নের জবাব

বিশ্ববিদ্যালয়–জীবনে একই সঙ্গে দুঃখজনক এবং হাস্যকর এমন বহু ঘটনা প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতা আমার আছে। এমন একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো ২০১৯ সালের ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্য চত্বরে আয়োজিত কনসার্ট। যেহেতু নারীদের হল রাত ১০টায় বন্ধ হয়, সেহেতু সেই কনসার্ট চলার মাঝামাঝি সময়েই আবাসিক নারী শিক্ষার্থীদের হলের উদ্দেশে রওনা দিতে হয়েছিল। নারী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত কনসার্ট সম্পূর্ণটা উপভোগ করে পুরুষ শিক্ষার্থী ও ঢাকায় নিজেদের বাসা থাকা ‘প্রিভিলেজড নারী’ শিক্ষার্থীরা।

নারী দিবস উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশিত আরেকটি কৌতুক হলো এক দিনের জন্য লাল বাসের দোতলায় মেয়েদের বসতে দেওয়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্নের লাল বাসে নারী ও পুরুষ শিক্ষার্থীদের যে সিটিং অ্যারেঞ্জমেন্ট, তাতে এই বিশেষ দিবসের বিশেষ ব্যবস্থাকে কৌতুক না বলে বরং অপমানজনক বলাটাই যথার্থ।

মেয়েদের হলের গেট কেন রাত ১০টায় বন্ধ হয়ে যায়—এ নিয়ে তখন আওয়াজ তুলতে গেলে একদল লোক আমাদের বলল, ‘এই তো কয় দিন আগেও সাড়ে ৯টায় বন্ধ হতো। তোমাদের কথা ভেবেই তো আমরা ১০টায় করলাম।’

আমরা কৃতার্থ হই।

এমন বাস্তবতায় রাত ১০টায় হলের গেট বন্ধ করে দিয়ে, দেরি করে ফেরা শিক্ষার্থীদের নানা নামে ডেকে, চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলে, অশ্লীল তকমা দিয়ে এবং ‘খারাপ চরিত্রের অধিকারী’ বানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নারীদের ঠিক কী নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে, কে জানে?

কারণ, এ কথা সত্যি যে ২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচনের আগেও মেয়েদের হলের গেট সাড়ে ৯টায় বন্ধ হয়ে যেত। সেটিকে রাত ১০টা পর্যন্ত বর্ধিত করা ডাকসুর অর্জন; স্পষ্ট ভাষায় বলতে গেলে ডাকসুতে অংশ নেওয়া মেয়েদের হলগুলোর নেতৃত্বের অর্জন।

সন্ত্রাসী সংগঠন ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) দৌরাত্ম্যের বিপরীতে মেয়েদের হলগুলোতে বিকল্প নেতৃত্ব গড়ে উঠতে দেখা যায় ২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচনেই। সে নির্বাচনে একমাত্র রোকেয়া হলেই ভোট জালিয়াতির বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল। মেয়েরা তালা ভেঙে সিল দেওয়া ব্যালট বাক্স ছিনিয়ে নিয়েছিল। ডাকসুতে একাধিক নারী হলে জিতে এসেছিল স্বতন্ত্র প্রার্থীরা, কারণ সেসব হলে নির্বাচনে কারচুপি করা কঠিন করে তুলেছিল হলের মেয়েরাই। হলের মেয়েরাই ভোট ডাকাতি করতে দেয়নি।

এই মেয়েরাই কয়েক বছর পর চব্বিশের জুলাইয়ে সম্মুখসারিতে থেকে আন্দোলন করেছে। ১৪ জুলাই রাতে থালা-চামচ বাজাতে বাজাতে হলের গেট ভেঙে বের হয়ে হাজারে হাজারে জমায়েত হয়েছে, পলাতক স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার ‘রাজাকার’ তকমার বিরুদ্ধে স্লোগান তুলেছে।

বাইরে যখন ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা অস্ত্রশস্ত্র হাতে নির্বিচারে একের পর এক হামলা চালিয়ে শিক্ষার্থীদের রক্তাক্ত করছিল, তখন এই মেয়েরাই হলের গেটের ভেতর থেকে সন্ত্রাসীদের দিকে স্যান্ডেল তাক করে রেখেছে। মেয়েরাই সর্বপ্রথম হল থেকে ছাত্রলীগকে তাড়িয়েছে, সন্ত্রাসীমুক্ত আবাসিক হলের ঘোষণা করেছে। রোকেয়া হলের মেয়েরাই রাজু ভাস্কর্যে বসে থাকা ছাত্রলীগের দিকে, পুলিশ বাহিনীর দিকে আঙুল তুলে প্রথম ‘খুনি, খুনি’ স্লোগান দিয়েছে।

এককথায় বলতে গেলে, শেখ হাসিনার বিদায়ের শক্তিশালী ঘণ্টাটি বাজিয়েছে এই মেয়েরাই। ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই মধ্যরাতে হল থেকে বেরিয়ে প্রথম প্রতিবাদ জানান নারী শিক্ষার্থীরা

এককথায় বলতে গেলে, শেখ হাসিনার বিদায়ের শক্তিশালী ঘণ্টাটি বাজিয়েছে এই মেয়েরাই। তবু যদি প্রশ্ন করা হয় ‘ছেলেদের হলে ২৪ ঘণ্টা প্রবেশ করার সুযোগ থাকলেও মেয়েদের হল কেন নয়?’, ‘কেন মেয়েরা কোনো কারণে রাত ১০টার বেশি দেরি হয়ে গেলে আর হলে ঢুকতে পারে না?’ এর জবাবে মুখ বাঁকিয়ে কেউ কেউ বলে ওঠেন, ‘ছেলেরা অনেক কিছু করতে পারে, মেয়েরা পারে না।’

শুনতে হয়, ‘মেয়েদের রাতে কী কাজ যে ১০টার পরেও বাইরে থাকতে হবে?’

তো মেয়েদের রাতে কী কাজ, সেই ফিরিস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই লেখা।

অবশ্য এই ফিরিস্তি মেয়েরা যুগ যুগ ধরেই দিয়ে আসছে। অন্তত ৩০ বছর আগে আমাদের মায়েরা দিয়েছেন। আরও ১৫-২০ বছর আগে আমাদের বড় বোনেরা দিয়েছেন। ১০ বছর আগে আমি এবং আমরা সহপাঠীরা দিয়েছি। এখন আমার জুনিয়ররা দিয়ে চলেছে।

তবে ছেলেদের কাছে কখনো কোনো ফিরিস্তি চাওয়া হয়নি। তারা জন্মগতভাবেই নিরাপত্তা সঙ্গে নিয়ে জন্মেছেন এবং যেকোনো প্রয়োজনে ২৪ ঘণ্টাই হলে প্রবেশের অধিকার রাখেন।

আমার পেশাগত জীবনের সূচনা ঘটে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় একটি ইংরেজি দৈনিকে। তৃতীয় বর্ষে থাকাকালীন আমি সেখানে যোগ দিই ট্রেইনি সাব এডিটর হিসেবে। এটি ছিল পূর্ণকালীন চাকরি। আমি যখন যোগ দিই, তখন নিউজরুমে সবচেয়ে কনিষ্ঠ কর্মীটি ছিলাম আমি। গ্র্যাজুয়েশন শেষ হওয়ার আগেই যে আমি বাংলাদেশের একটি শীর্ষ ইংরেজি দৈনিকে ফুলটাইম চাকরিতে ঢুকতে পেরেছি, এর পেছনে একটা বড় কারণ হলো আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক শিক্ষার্থী ছিলাম না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষ থেকেই আমি পত্রিকায় লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। ঢাকা লিট ফেস্টসহ বিভিন্ন সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক আয়োজনে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদের প্রকাশনা ও মিডিয়া ম্যানেজার হিসেবে কাজ করেছি। এই প্রতিটি কাজের জন্যই আমাকে অধিকাংশ দিন রাত ১১টার পরে বাসায় ফিরতে হয়েছে। প্রায়ই সঙ্গে করে হলে থাকা বান্ধবী, জুনিয়র অথবা সিনিয়রকে আমার বাসায় নিয়ে আসতে হয়েছে, কারণ ততক্ষণে হল গেট তার জন্য বন্ধ।

ফুলটাইম চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই ক্লাস, পরীক্ষা ও পড়াশোনা–সংক্রান্ত কাজ শেষ করেই আমাকে ছয় ঘণ্টা অফিস করতে হতো। অফিস আওয়ার বিকেল ৪টায় শুরু হলে ছয় ঘণ্টা গুনে শিফট শেষ হতো রাত ১০টায়। অর্থাৎ কোনো হলে থাকা আবাসিক নারী শিক্ষার্থীর পক্ষে আমার জায়গায় এই চাকরি করা কার্যত সম্ভব হতো না।

সপ্তাহে ছয় দিন দুপুর পর্যন্ত ক্লাস এবং রাত ১০টা পর্যন্ত অফিসের শিফট শেষ করে আমি যখন বাসার ফেরার উদ্দেশ্যে অফিসের গাড়িতে উঠতাম, তখন প্রায় প্রতিদিনই আমার সঙ্গে রওনা হতো আমারই সহপাঠী একই পত্রিকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি। গাড়ি আমাকে নামিয়ে দেওয়ার পর তাকে হলে পৌঁছে দিত। আর হলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে তার ১১টা বা সোয়া ১১টা তো বাজতই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে প্রায় ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থী নারী হলেও গত ১০ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতিতে আমি কোনো নারী নেতৃত্ব দেখিনি। কোনো পত্রিকা বা টেলিভিশন চ্যানেলকেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি হিসেবে কোনো নারীকে নিয়োগ দিতে দেখিনি।

কারণটা খুব সম্ভবত এটাই। আবাসিক হলের এই বিধিনিষেধের মধ্যে সংবাদমাধ্যমের মতো ২৪ ঘণ্টার পেশায় যুক্ত থাকা অসম্ভবের কাছাকাছি।

এই তো গেল সাংবাদিকতা বিভাগের আলাপ।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নাট্যকলা বিভাগের নারী শিক্ষার্থীদের কথা বলি। এ বিভাগের শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশ মঞ্চনাটকে কাজ করতে চায়। কারও ইচ্ছা থাকে টেলিভিশনে নিউজ কিংবা প্রোগ্রাম প্রেজেন্টেশনে যুক্ত হবে, যেহেতু একাডেমিক জীবনে তারা প্রেজেন্টেশন স্কিলই ডেভেলপ করে। একটা অংশ নাটক বা সিনেমায় যুক্ত হতে চায়। কেউ কেউ বিদেশি নাটক, সিনেমা, কার্টুন, বিজ্ঞাপন ও অন্যান্য কনটেন্টে ভয়েস আর্টিস্ট বা ডাবিংয়ের কাজ করে। কেউ কেউ কাজ শুরু করে রেডিওতে।

এই সবকটি ক্ষেত্রেই ক্যারিয়ার গড়তে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অবস্থাতেই খণ্ডকালীন কাজ শুরু করতে হয়। এবং নিশ্চিতভাবেই ঢাকা শহরের মতো জ্যামের শহরে রাত ১০টার মধ্যে হলে ঢোকার বাধ্যবাধকতা নিয়ে এই কাজের শিফট শেষ করা বেশ চ্যালেঞ্জিং।

একই পরিস্থিতিতে পড়তে হয় চারুকলা, সংগীত ও চলচ্চিত্র বিভাগের নারী শিক্ষার্থীদেরও।

বিজ্ঞান অনুষদের আট বিভাগের নারী শিক্ষার্থী এবং সংশ্লিষ্ট গবেষণাকেন্দ্রে কাজ করা নারী শিক্ষার্থীদের দিনের বড় অংশ কেটে যায় ক্লাসে আর ল্যাবে। রাত ১০টার গেট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের পড়াশোনার জন্য লাইব্রেরি ব্যবহারের সুযোগও সীমিত হয়ে যায়। রসায়নে পড়া কোনো শিক্ষার্থী যদি চায় সে কোনো সাহিত্য আড্ডায় অংশ নেবে, তবে তাকে সন্ধ্যার পরের সময়টুকুই বেছে নিতে হবে এবং যেকোনো উপায়ে রাত ১০টার মধ্যে হলে ফিরতে হবে।

বাণিজ্য অনুষদের শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশ প্রথম বর্ষ থেকেই বিভিন্ন ধরনের বিজনেস কম্পিটিশনে অংশ নেয়। এসব প্রতিযোগিতার আয়োজন করে থাকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষত প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়। অনেক সময় আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতে রাত ৮টা-৯টা বেজে যায়। এরপর থাকে ডিনারের আয়োজন। এই শিক্ষার্থীরা যাতে প্রতিযোগিতা ও পরবর্তী আয়োজন শেষ করে নিশ্চিন্তে হলে ফিরতে পারে, সে বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কি কখনো কোনো চিন্তা করেছে?

ঢাকায় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের কাছাকাছি বাসা হওয়ায় বিভিন্ন সময়ে দেরির কারণে হলে ঢুকতে না পারা আবাসিক নারী শিক্ষার্থীরা আমার বাসায় থেকেছে।

কখনো কখনো সম্পূর্ণ অপরিচিত কেউ পরিচিত কোনো নারী শিক্ষার্থীর সূত্রে আমার বাসার মেঝেতে রাত কাটিয়ে সকালে হলে ফিরে গেছে।

তাদের ‘অপরাধগুলো’র তালিকা করলে তালিকাটা হবে এ রকম—

১. রাতে ক্যাম্পাসের কোনো বন্ধু বা সিনিয়র ভাই-বোনের বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে ফিরতে দেরি হয়েছে।

২. হাসপাতালে কাউকে রক্ত দিয়ে ফিরতে দেরি হয়েছে।

৩. বাড়ি থেকে বা ঢাকার বাইরে থেকে ঢাকায় পৌঁছাতে রাত ১০টার বেশি বেজে গেছে।

৪. স্টুডেন্টের পরীক্ষা সে জন্য পড়াতে পড়াতে দেরি হয়ে গেছে, জ্যাম ঠেলে হলে ফিরতে ১০টার বেশি বেজে গেছে।

৫. সন্ধ্যায় কোনো প্রতিবাদ কর্মসূচি বা আন্দোলনের অংশ হিসেবে মিছিল শেষ করে মাইক, পোস্টার, ব্যানার, মশাল—সবকিছু গুছিয়ে রেখে পরবর্তী কর্মসূচির মিটিং শেষ করতে গিয়ে দেরি হয়েছে।

৬. সাইকেল চালানো শিখতে গিয়ে সময়ের দিকে খেয়াল ছিল না, যখন খেয়াল হয়েছে তখন ১০টার বেশি বেজে গেছে।

৭. কোনো আয়োজনে ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করতে গিয়ে শেষ দিনে গোছগাছ করতে সময় বেশি লাগায় হল গেট মিস হয়ে গেছে। আর নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য তাদের আশ্রয় নিতে হয়েছে ক্যাম্পাসের অপরিচিত এক বড় আপুর বাসায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে টিএসসির অধীন এবং বিভিন্ন অনুষদ ও হলের সঙ্গে যুক্ত প্রায় অর্ধশত সক্রিয় সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আছে। এই সংগঠনগুলোর বিভিন্ন আয়োজনে বিশেষ করে কোনো উৎসব বা বড় অনুষ্ঠানের সময় অনেক রাত পর্যন্ত ভেন্যুতে থেকে ডেকোরেশনের কাজ তদারকি করতে হয়। কারণ, ডেকোরেশনের কাজ সাধারণত রাতেই হয়। বছরজুড়ে এ ধরনের আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত থাকা অনেক নারী রাতে ডেকোরেশনের কাজ তদারকি করে আমার বাসায় থেকেছে এবং সকালে আবার ভেন্যুতে ফিরে গিয়ে দায়িত্বের বাকি অংশটুকু শেষ করেছে।

বাংলাদেশে চাকরির বাজারের বাস্তবতা হলো, বিশ্ববিদ্যালয়–জীবন শেষ করার আগেই, মাস্টার্স শেষ করার আগেই যেকোনো শিক্ষার্থীর ঝুলিতে কাজের অভিজ্ঞতা থাকা এখন প্রায় বাধ্যতামূলক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষ থেকেই শিক্ষার্থীরা টিউশন ও বিভিন্ন পার্টটাইম কাজে যুক্ত হয়। চতুর্থ বর্ষ ও মাস্টার্সের শিক্ষার্থীরা এক বেলা পড়াশোনা করে ও অন্য বেলা চাকরি করে। খেয়ে না খেয়ে কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এই শিক্ষার্থীদের পেশাগত জীবনে প্রবেশ করতে হয়।

এমন বাস্তবতায় রাত ১০টায় হলের গেট বন্ধ করে দিয়ে, দেরি করে ফেরা শিক্ষার্থীদের নানা নামে ডেকে, চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলে, অশ্লীল তকমা দিয়ে এবং ‘খারাপ চরিত্রের অধিকারী’ বানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নারীদের ঠিক কী নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে, কে জানে?

নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ যৌক্তিক। বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব হলো শিক্ষার্থীদের হয়রানি, সহিংসতা এবং অন্যান্য ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দেওয়া। যদি রাত ১০টার পর ক্যাম্পাস অনিরাপদ হয়, তাহলে প্রশ্ন হওয়া উচিত ক্যাম্পাস কেন অনিরাপদ এবং ক্যাম্পাস নিরাপদ করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কী কী করতে পারে?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হল ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার দাবিতে স্মারকলিপি দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ক্যাম্পাসে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করতে পারে। নিরাপত্তাকর্মী বাড়াতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী সিসিটিভি বসাতে পারে। জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা চালু রাখতে পারে। অন্তত রাত ১১টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব পরিবহনের ব্যবস্থা করতে পারে। হলে প্রবেশ ও বের হওয়ার কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা করতে পারে।

সবচেয়ে জরুরি বিষয়টি হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়রানি ও সহিংসতার অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি করা। এমন তো না যে শিক্ষার্থীরা দিনের আলোতে হয়রানির শিকার হয় না কিংবা দিনের বেলায় কোনো নিরাপত্তাজনিত ঘটনা ঘটে না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন নিপীড়ন ও হয়রানি প্রতিরোধ সেলকে কার্যকর ও শক্তিশালী করা সবচেয়ে বেশি জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা ভর্তির পরপরই ওরিয়েন্টেশন ক্লাস করেন। প্রত্যেকের হাতে একটি করে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচিতিমূলক বই দেওয়া হয়। অথচ সেই বইয়ে হয়রানি প্রতিরোধ সেল বিষয়ক কোনো অংশ নাই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উচিত প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক জেন্ডার ওরিয়েন্টেশন ক্লাস চালু করা, স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা কেউ কোনো ধরনের হয়রানির শিকার হলে কোথায় অভিযোগ জানাবে এবং কী ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব হলো ঝুঁকি কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, সেই ব্যবস্থা তৈরি করা; ঝুঁকি মোকাবিলার দায়িত্ব শুধু নারীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কোনো দায়িত্বশীল আচরণ হতে পারে না। বিপদ সৃষ্টি করতে পারে এমন বিষয়গুলোকে চিহ্নিত করে মোকাবিলা করার পরিবর্তে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নারীদের চলাফেরাকেই বিপদের কারণ হিসেবে বিবেচনা করছে।

যদি নারীদের সম্মুখসারিতে রেখে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মতো একটা অভ্যুত্থানকে সংগঠিত করা যায়, শেখ হাসিনার মতো স্বৈরাচারকে হটানো যায় তবে তারা কখন নিজের হলে ফিরবে—এই সিদ্ধান্তটুকু নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের বিশ্বাস করা যাবে না কেন?

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষাকেন্দ্রিক যাবতীয় আয়োজন দেখে মনে হয়, তাদের একমাত্র দর্শন ও লক্ষ্য হলো বছর বছর ছেলেমেয়েদের সার্টিফিকেট দিয়ে বিদায় করা। ছেলেমেয়েরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকবে কোনোমতে সনদ নিয়ে বের হবে।

অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল দর্শনই হলো—মানুষকে চিন্তা করতে শেখানো, প্রশ্ন করতে শেখানো, ভিন্ন মতামত ও ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সহাবস্থান করতে শেখানো এবং ভবিষ্যতের সমাজ ও পৃথিবী নির্মাণে জ্ঞানকে কাজে লাগানোর সক্ষমতা তৈরি করা। শুধু পেশাজীবী তৈরি করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা নয়।

বিশ্ববিদ্যালয়–জীবনে শিক্ষার্থীরা সিদ্ধান্ত নিতে শেখে, নিজেদের সময় পরিচালনা করতে শেখে, নিজের দায়িত্ব নিজে নিতে শেখে এবং পৃথিবীর সঙ্গে চলতে শেখে। রাত ১০টার কারফিউ নারী ও পুরুষ শিক্ষার্থীদের জন্য পরিষ্কার বার্তা দেয়। এর মধ্য দিয়ে পুরুষদের পরোক্ষভাবে এমন প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যারা কখন বাড়ি ফিরবে সে সিদ্ধান্ত নিজেরাই নিতে সক্ষম। আর নারীদের এমন প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যাদের নিজেদের সুরক্ষার জন্য নিজেদেরই চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

যদি নারীদের পড়াশোনা করতে, ভোট দিতে, সংগঠনের নেতৃত্ব দিতে, গবেষণা করতে এবং ভবিষ্যতে তারা শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, উদ্যোক্তা ও নীতিনির্ধারক হতে পারবে এটি বিশ্বাস করা যায়, তাহলে তারা কখন নিজের হলে ফিরবে—এই সিদ্ধান্তটুকু নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের বিশ্বাস করা যাবে না কেন?

যদি নারীদের সম্মুখসারিতে রেখে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মতো একটা অভ্যুত্থানকে সংগঠিত করা যায়, শেখ হাসিনার মতো স্বৈরাচারকে হটানো যায় তবে তারা কখন নিজের হলে ফিরবে—এই সিদ্ধান্তটুকু নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের বিশ্বাস করা যাবে না কেন?

বিশ্ববিদ্যালয়ের যে শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষক তাঁদের সন্তানদের বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে পাঠান, সেখানে তাদের নিরাপত্তা কে দেয়?

প্রতিষ্ঠার ১০৫ বছর পার করেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বুঝতে পারছে না মেয়েদের রাতে কী কাজ? উত্তর সহজ।

পড়াশোনা আছে। গবেষণা আছে। চাকরি আছে। ইন্টার্নশিপ আছে। সাংবাদিকতা আছে। নাটক আছে। সংগীত আছে। চলচ্চিত্র আছে। ছবি আঁকা আছে। সংগঠন আছে। স্বেচ্ছাসেবা আছে। রাজনীতি আছে। মিছিল-মিটিংয়ে অংশ নেওয়া, নেতৃত্ব দেওয়ার প্রয়োজন আছে। কখনো হাসপাতাল আছে, কখনো কারও পাশে দাঁড়ানোর প্রয়োজন আছে। কখনো শুধু নিজের মতো করে সময় কাটানোর প্রয়োজনও আছে।

সুচিস্মিতা তিথি যোগাযোগকর্মী ও লেখক।

* মতামত লেখকের নিজস্ব