বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ বহু প্রত্যাশা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে। এই সংসদ এমন এক সময় গঠিত হয়েছে, যখন দীর্ঘ আন্দোলন, ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে। মানুষের আশা ছিল, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো নিয়েও একটি নতুন আলোচনা শুরু হবে। বিশেষ করে সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নে একটি বিস্তৃত ঐকমত্য তৈরি হবে।
কিন্তু সংসদের শুরুতেই একটি বিতর্ক সামনে এসেছে। সেটি হলো ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন এবং সংবিধান পরিবর্তনের পদ্ধতি নিয়ে মতভেদ। অনেকের কাছে একটি মৌলিক সাংবিধানিক প্রশ্ন বলে মনে হচ্ছে। আবার অন্যদের মতে, এটি একটি অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক, যা মূল কাজকে বিলম্বিত করছে।
আসলে বিষয়টি একটু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, বিতর্কটি কেবল শপথ নেওয়া বা না নেওয়া, কিংবা আইনি বৈধতার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়; এগুলো মূল সমস্যার উপসর্গমাত্র। প্রকৃত প্রশ্নটি হচ্ছে, সংবিধান সংস্কার কীভাবে হবে এবং সেই সংস্কারের বৈধতা কোথা থেকে আসবে?
বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সাম্প্রতিক পরিবর্তন এসেছে, সেখানে বহু রাজনৈতিক দল একত্র হয়েছিল। মোটাদাগে তাদের মধ্যে একটি বিষয়ে ঐকমত্য ছিল। সেটি হলো, কেবল একটি সরকারের পতন ঘটালেই সমস্যার সমাধান হবে না। রাষ্ট্রের ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যেই এমন কিছু দুর্বলতা আছে, যা ভবিষ্যতে আবারও কর্তৃত্ববাদী শাসনের সুযোগ তৈরি করতে পারে। তাই সংবিধানের ক্ষমতার কাঠামো সংস্কার করা প্রয়োজন।
এই লক্ষ্য সামনে রেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। সেই আলোচনায় সংবিধানের কোন কোন অংশ পরিবর্তন করা প্রয়োজন, তা নিয়েও অনেকটা স্পষ্টতা তৈরি হয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিভিন্ন দলের মধ্যে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। কিছু বিষয়ে ভিন্নমতও রয়েছে, যা স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয়েছে সংস্কার বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে।
রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেখা যায়, এই আন্দোলনে অংশ নেওয়া শক্তিগুলোকে মোটামুটি দুই ভাগে দেখা যায়। একদিকে ছিল বিএনপি, গণতন্ত্র মঞ্চ এবং আরও অনেক রাজনৈতিক দল। তারা দীর্ঘদিন ধরেই রাষ্ট্র সংস্কারের কথা বলছিল। তাদের মতে, ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ এবং সাংবিধানিক কাঠামোর কিছু দুর্বলতা ভবিষ্যতে স্বৈরশাসনের পথ খুলে দেয়। অন্যদিকে কিছু দল শুরুতে সংস্কারের বিষয়ে খুব স্পষ্ট অবস্থান নেয়নি। পরে তারা আলোচনায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয় এবং ধীরে ধীরে সংস্কার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে শুরু করে।
পরে সংবিধান সংস্কার নিয়ে আলোচনা চালানোর জন্য একটি ঐকমত্য কমিশন গঠিত হয়। এই কমিশনের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু এখানেও মতপার্থক্য বাড়তে থাকে। কিছু দল চেয়েছে আরও গভীর ও মৌলিক পরিবর্তন। অন্যদিকে কিছু দল ধীরে চলার পক্ষে অবস্থান নেয়। ফলে যে সমঝোতার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, তা কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে।
শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য একটাই হওয়া উচিত—এমন একটি সাংবিধানিক কাঠামো তৈরি করা, যাতে ভবিষ্যতে ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করা যায় এবং গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি শক্তিশালী হয়। সংবিধান সংস্কার সেই বৃহত্তর লক্ষ্য পূরণের একটি উপায়।
আরেকটি সমস্যা ছিল সংস্কার বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা না হওয়া। সংবিধানের কোন অংশ পরিবর্তন করতে হবে, তা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। কিন্তু কীভাবে সেই পরিবর্তন কার্যকর করা হবে, সে প্রশ্নে পর্যাপ্ত মনোযোগ দেওয়া হয়নি।
শেষ পর্যন্ত বিষয়টি ঐকমত্য কমিশনের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু কমিশনের প্রস্তাব নিয়েও পরে বিতর্ক তৈরি হয়। বিশেষ করে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন, তার ক্ষমতা, মেয়াদ ও গণভোটের বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের আপত্তি দেখা যায়।
তবু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নে জনগণের মতামত নেওয়ার জন্য গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে জনগণ সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কারের ক্ষমতা দেওয়ার পক্ষে মত দেয়। অর্থাৎ জনগণ মূলত রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের ওপর এই দায়িত্ব অর্পণ করেছে।
এখানেই বিতর্কের আরেকটি দিক সামনে আসে। সাধারণভাবে একটি রাষ্ট্রে সংবিধানই সর্বোচ্চ আইন। সরকারের কোনো আইন বা সিদ্ধান্ত যদি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে তা বাতিল হতে পারে। সংবিধানের ব্যাখ্যা দেওয়ার ক্ষমতা থাকে উচ্চ আদালতের।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, খোদ সংবিধান নিয়েই যদি মানুষের অসন্তোষ তৈরি হয়, তখন পরিবর্তনের বৈধতা কোথা থেকে আসবে? সংবিধান কি নিজেই নিজের পরিবর্তনের সীমা নির্ধারণ করবে? নাকি জনগণের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত সেই পরিবর্তনের ভিত্তি হবে?
বিশ্বের অনেক দেশে এই প্রশ্ন নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। সাংবিধানিক আইনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো ‘মৌল কাঠামো’ বা বেসিক স্ট্রাকচার। এর অর্থ, সংসদ সংবিধান সংশোধন করতে পারলেও এমন পরিবর্তন করতে পারে না, যা সংবিধানের মৌল চেতনা বদলে দেয়। বাংলাদেশেও আদালত এই নীতির ভিত্তিতে কয়েকটি সংশোধনী বাতিল করেছে। এই অভিজ্ঞতার কারণেই অনেকের মতে সংবিধান সংস্কারের জন্য একটি বিশেষ প্রক্রিয়া প্রয়োজন।
এখানেই ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ ধারণাটি আসে। এ প্রস্তাবের মূল যুক্তি হলো গণতন্ত্রে সব ক্ষমতার উৎস জনগণ। জনগণ যদি সরাসরি বা গণভোটের মাধ্যমে প্রতিনিধিদের একটি বিশেষ দায়িত্ব দেয়, তাহলে সেই দায়িত্ব পালনের বৈধতা জনগণের কাছ থেকেই আসে। অর্থাৎ জনগণ যদি প্রতিনিধিদের সংবিধান সংস্কারের ক্ষমতা দেয়, তাহলে সেই সংস্কারের বৈধতা বিদ্যমান সংবিধানের সীমাবদ্ধতার মধ্যে আটকে থাকে না।
এই যুক্তির ভিত্তিতেই সংস্কার পরিষদ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল সংবিধান পরিবর্তনের একটি পরিষ্কার ও আইনি বিতর্কমুক্ত পথ তৈরি করা। তবে বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, সংসদে এই প্রশ্ন নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। কেউ কেউ গণভোটের সিদ্ধান্ত নিয়েও আপত্তি তুলছে। তারা বলছে, প্রক্রিয়াগত কিছু বিষয় সঠিকভাবে অনুসরণ করা হয়নি।
এই অভিযোগের পেছনে রাজনৈতিক বাস্তবতাও রয়েছে। অনেকের মতে, আলোচনার সময় কিছু সিদ্ধান্ত দ্রুত নেওয়া হয়েছিল এবং সব পক্ষ সমানভাবে সন্তুষ্ট ছিল না। তবু একটি মৌলিক বিষয় ভুলে গেলে চলবে না। সংবিধান সব আইনের বৈধতা নির্ধারণ করে ঠিকই; কিন্তু সংবিধান নিজেই তার বৈধতা পায় জনগণের কাছ থেকে। যখন একটি সমাজে ব্যাপক রাজনৈতিক আন্দোলন ঘটে এবং মানুষ বড় ধরনের পরিবর্তনের পক্ষে রায় দেয়, তখন সেই পরিবর্তনের বৈধতার উৎসও জনগণই হয়।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনও অনেকের কাছে সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন। তাই সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নে আইনি বিতর্কের পাশাপাশি রাজনৈতিক বাস্তবতাকেও বিবেচনায় নিতে হবে।
শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য একটাই হওয়া উচিত—এমন একটি সাংবিধানিক কাঠামো তৈরি করা, যাতে ভবিষ্যতে ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করা যায় এবং গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি শক্তিশালী হয়। সংবিধান সংস্কার সেই বৃহত্তর লক্ষ্য পূরণের একটি উপায়। তাই এই বিতর্ক যেন মূল উদ্দেশ্যকে আড়াল না করে, সেদিকেই এখন সবচেয়ে বেশি নজর দেওয়া প্রয়োজন।
হাসনাত কাইয়ুম সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী; রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি
মতামত লেখকের নিজস্ব