তারিখে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হাম ওয়ার্ড থেকে তোলা। ১১ মে ২০২৫
তারিখে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হাম ওয়ার্ড থেকে তোলা। ১১ মে ২০২৫

মতামত

হাসপাতালের বিছানার পাশে ইঁদুরের আনাগোনা

আমরা যা বলতে পারি না, যা আমাদের বর্ণনার অতীত, ছবি তা চিহ্নিত করে দেয়। ছবি তা দেখিয়ে দেয়। কোনো অবস্থা বা পরিস্থিতির ব্যাখ্যার আর প্রয়োজন হয় না। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে আমাদের হাজার কথা বলে দিয়েছে একটি ভিডিও চিত্র। এই হাসপাতালের ১৩ নম্বর মেডিসিন ওয়ার্ডের একটি রাতের ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

ভিডিওতে দেখা যায়, ওয়ার্ডজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ময়লা-আবর্জনা। রোগীর শয্যার আশপাশে, করিডোরে, মেঝেতে অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে বড় বড় ইঁদুর। ভিডিওর মাধ্যমে দুর্গন্ধ ছড়ানো যায় না, কিন্তু দৃশ্যটি দেখার সঙ্গে সঙ্গে দর্শক যেন অবচেতনে নাকে হাত দেন। মুখ বিকৃত হয়ে ওঠে ঘৃণা, বিস্ময় ও বেদনার মিশ্র অনুভূতিতে।

রাস্তার নালা, ময়লার ভাগাড় কিংবা পরিত্যক্ত কোনো গুদামঘরে এমন দৃশ্য দেখা গেলে হয়তো আমরা বিস্মিত হতাম না। কিন্তু যেখানে মানুষ রোগমুক্তির আশায় আসেন, যেখানে জীবনের সঙ্গে মৃত্যুর প্রতিদিনের লড়াই চলে, সেই হাসপাতালের ভেতরে যদি এমন দৃশ্য দেখতে হয়, তাহলে তাকে শুধু অব্যবস্থাপনা বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। এটি একটি মানবিক বিপর্যয়।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কেবল একটি হাসপাতাল নয়; এটি বৃহত্তর চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, পার্বত্য চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, ফেনীসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলের কোটি মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসাস্থল। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এখানে আসেন শেষ আশ্রয়ের বিশ্বাস নিয়ে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেই আশ্রয়স্থল আজ নিজেই নানা সংকটে জর্জরিত।

হাসপাতালটির শয্যাসংখ্যা ২ হাজার ২০০ হলেও প্রায় সব সময়ই ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি রোগী এখানে চিকিৎসা নিচ্ছেন। কোনো কোনো সময় রোগীর সংখ্যা তিন থেকে চার হাজার ছাড়িয়ে যায়। ফলে অনেক রোগীকে মেঝেতে, বারান্দায় কিংবা করিডোরে চিকিৎসা নিতে হয়। যে হাসপাতাল একসময় ৮৫০ শয্যার পরিকল্পনায় নির্মিত হয়েছিল, আজ সেখানে চার গুণ রোগীর চাপ সামলাতে হচ্ছে। অবকাঠামো, পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশনের ব্যবস্থা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা—সবকিছুর ওপরই পড়ছে অস্বাভাবিক চাপ।

অন্যদিকে আধুনিক চিকিৎসাসেবার জন্য অপরিহার্য যন্ত্রপাতির সংকটও দীর্ঘদিনের। হৃদ্‌রোগীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্যাথল্যাব প্রায়ই বিকল হয়ে পড়ে। জরুরি এনজিওগ্রাম কিংবা স্টেন্ট প্রতিস্থাপনের মতো সেবা ব্যাহত হয়। মর্গে নেই আধুনিক লাশ সংরক্ষণের ব্যবস্থা। বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং অস্বাস্থ্যকর টয়লেট রোগী ও স্বজনদের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দেয়।

এ দেশে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির দীর্ঘ ইতিহাস আছে, বাস্তবায়নের ইতিহাস তুলনামূলকভাবে অনেক ছোট। ফলে প্রতিশ্রুতি শুনে মানুষ এখন আর সহজে উচ্ছ্বসিত হয় না। তবু আমরা চট্টগ্রামের মেয়রের প্রতি আস্থা হারাতে চাই না। কারণ, তিনি শুধু একজন জনপ্রতিনিধি নন, তিনি এই মেডিকেল কলেজেরই সাবেক শিক্ষার্থী এবং হাসপাতালটির বাস্তবতা সম্পর্কে অবগত একজন চিকিৎসক।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো হাসপাতালকে ঘিরে গড়ে ওঠা দালাল ও সিন্ডিকেট সংস্কৃতি। একজন অসহায় রোগী যখন জীবন বাঁচানোর জন্য হাসপাতালে আসেন, তখন তাঁকে দালালের ফাঁদে পড়তে হয়, অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়, কখনো কখনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। স্বাস্থ্যসেবা যখন বাজারের পণ্যে পরিণত হয়, তখন তার মূল্য পরিশোধ করতে হয়ে সাধারণ মানুষকে।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ অবশ্যই আছে। প্রথমত, হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতাব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। হাসপাতাল এমন একটি স্থান, যেখানে পরিচ্ছন্নতা কোনো সৌন্দর্যের বিষয় নয়, এটি চিকিৎসার অংশ। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জীবাণুনাশক কার্যক্রম, ইঁদুর ও পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণে স্থায়ী কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পানির সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন ও টয়লেট ব্যবস্থার দ্রুত আধুনিকায়ন প্রয়োজন। তৃতীয়ত, বিকল যন্ত্রপাতি মেরামত এবং নতুন প্রযুক্তি সংযোজনের জন্য বিশেষ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, দালাল ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করে কঠোর নজরদারি চালাতে হবে। একই সঙ্গে চট্টগ্রামে বিকল্প সরকারি হাসপাতালগুলোকে শক্তিশালী করে রোগীর চাপ ভাগ করে নেওয়ার উদ্যোগও জরুরি।

সম্প্রতি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন হাসপাতালকে যানজটমুক্ত, পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক হাসপাতাল হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগ, তিন শিফটে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা, টয়লেট সংস্কার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, দিকনির্দেশনামূলক সাইনেজ স্থাপন, অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা এবং হাসপাতাল এলাকার সামগ্রিক পরিবেশ উন্নয়নের নানা পরিকল্পনার কথা বলেছেন। এগুলো নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক উদ্যোগ।

কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। এ দেশে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির দীর্ঘ ইতিহাস আছে, বাস্তবায়নের ইতিহাস তুলনামূলকভাবে অনেক ছোট। ফলে প্রতিশ্রুতি শুনে মানুষ এখন আর সহজে উচ্ছ্বসিত হয় না। তবু আমরা চট্টগ্রামের মেয়রের প্রতি আস্থা হারাতে চাই না। কারণ, তিনি শুধু একজন জনপ্রতিনিধি নন, তিনি এই মেডিকেল কলেজেরই সাবেক শিক্ষার্থী এবং হাসপাতালটির বাস্তবতা সম্পর্কে অবগত একজন চিকিৎসক।

একই কথা বললেন সভায় উপস্থিত  চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান। তিনি তিনি হাসপাতাল পরিচালককে সঙ্গে নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকা পরিদর্শন করেছেন এবং বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করে লিখিতভাবে নোট নিয়েছেন। তিনি বলেন, চট্টগ্রামের জন্য সৌভাগ্যের বিষয় হলো অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী চট্টগ্রামের সন্তান এবং তিনি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের যে কোনো সমস্যা দ্রুত সমাধানে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।

আমরা আশা করি, আন্তরিকতা, দক্ষতা এবং জবাবদিহিতার মাধ্যমে সবার সমন্বয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন তাঁরা। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে কেবল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করাই নয় বরং আধুনিক, মানবিক ও মানসম্মত একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে পরিণত করার উদ্যোগ নেবেন। কারণ, হাসপাতালের বিছানার পাশে ইঁদুরের ছায়া কোনো সভ্য সমাজের পরিচয় হতে পারে না। চিকিৎসার আশ্রয়স্থলকে মানুষের মর্যাদা ও আস্থার জায়গা হিসেবেই ফিরিয়ে আনতে হবে।

  • ওমর কায়সার প্রথম আলোর চট্টগ্রাম অফিসের বার্তা সম্পাদক

মতামত লেখকের নিজস্ব