
বেলুচিস্তান নিয়ে রাজনৈতিক সহিংসতার খবর আসছে প্রতিদিন। সেখানে কী ঘটছে, কেন ঘটছে—সেসব নিয়ে দুই পর্বে লিখেছেন আলতাফ পারভেজ। গতকাল প্রকাশিত হয়েছে—বালুচদের আন্দোলন কেন সশস্ত্র হয়ে উঠেছে। আজ প্রকাশিত হলো শেষ পর্ব।
বেলুচিস্তানের ঘটনাবলির ভূরাজনৈতিক তাৎপর্য বহুমুখী। এর মূলে রয়েছে সেখানকার খনিজ সম্পদ এবং ভৌগোলিক গুরুত্ব। উভয় কারণে ইসলামাবাদের শত্রু-মিত্র অনেকের নজর এদিকে। বেলুচিস্তানের সীমান্ত রয়েছে ইরান ও আফগানিস্তানের সঙ্গে। ইরানে রয়েছে ৩০-৪০ লাখ বালুচ। আফগানিস্তানে আছে ৩ থেকে ৫ লাখ। বালুচ জাতি এসব দেশের সীমান্তে ভাগ হওয়ার কারণেও সেসব দেশের স্বার্থ যুক্ত হয়ে আছে তাদের রাজনৈতিক তৎপরতায়।
বেলুচিস্তানের খনিজভান্ডার বিপুল। এর মাঝে সেইন্দাক ও রেকো দিকে রয়েছে স্বর্ণ ও কপারের খনি। কপার এ মুহূর্তে ক্রিটিক্যাল মিনারেল বা কৌশলগত এক খনিজ। প্রায় ছয় বিলিয়ন টন আকরিকের মজুত নিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অনুত্তোলিত কপারের খনি আছে বেলুচিস্তানের চাগাই জেলায়।
এসব খনিজ উত্তোলনের জন্য যেসব কোম্পানি তৈরি হচ্ছে এবং যারা কাজ পাচ্ছে, তাতে অতি সামান্য হিস্যা রয়েছে বালুচদের। এখানে উত্তর আমেরিকান যে বড় কোম্পানিটির নাম সবচেয়ে বেশি শোনা যায়, সেই ‘বাররিক মাইনিংয়ে’র সদর দপ্তর কানাডায়। ২০২৪–এ বাররিকের ঘোষিত আয় ছিল তিন বিলিয়ন ডলার। চাগাই প্রকল্প থেকে তারা প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলার আয় করার ধারণা দিচ্ছে। এর মধ্যে স্বর্ণ মিলবে ৫৪ বিলিয়ন ডলারের, বাকিটা কপার থেকে।
অথচ চাগাই হলো পুরো পাকিস্তানের গড় হিসাবে সবচেয়ে দরিদ্র এলাকা। এত এত কপার ও সোনা বালুচদের ভাগ্য বদল করতে পারছে না। কারণ, রাজনীতি, প্রশাসন কোথাও তাদের নিয়ন্ত্রণ নেই। পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক বন্ধুরাও এ নিয়ে মাথা ঘামায় না। এ কারণে বালুচরা কেবল ইসলামাবাদ নয়, একই সঙ্গে চীন-যুক্তরাষ্ট্রেরও বিরোধী। জাতীয় সংগ্রামে বিশ্ব মুরব্বিদের কারও সহায়তা নিতে অনিচ্ছুক তারা।
কেন্দ্রীয় সরকার ও মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলো স্থানীয়দের মতামতের তোয়াক্কা না করেই যে এখানকার সম্পদ আহরণ ও বিপণন করতে পারে—তার কারণ খনিজপ্রধান জেলাগুলোতে মানববসতি খুব কম। বেলুচিস্তানের যে চাগাইয়ে এত এত দামি খনিজ রয়েছে, সেটা পুরো পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় জেলা (১৭ হাজার বর্গমাইল) হলেও লোকসংখ্যায় ১৪৫টি জেলার মধ্যে সবচেয়ে কম ১০টির একটি। মাত্র আড়াই লাখ মানুষ আছে এখানে। মানুষ কম হওয়ায় স্বভাবত সম্পদ হারানোর প্রতিরোধ ও প্রতিবাদও কম।
গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র চাগাইয়ের রেকো দিকে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের খনিজ প্রকল্প নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এই প্রকল্পের নাম দিয়েছে তারা এফওআরজিই (ফোরাম অন রিসোর্স জিওস্ট্র্যাটেজিক এনগেজমেন্ট। ‘এফওআরজিই’কে বলা হচ্ছে এই অঞ্চলে ট্রাম্পের কূটনীতির কেন্দ্রীয় বিষয়।
যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান জন জোভানোভিক গত নভেম্বরে জানিয়েছিল তারা দুর্লভ কিছু খনি অঞ্চলে ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে যাচ্ছেন। জোভানোভিকের এই ঘোষণার দুই মাস আগেই ইউএস স্ট্র্যাটেজিক মেটালস (ইউএসএসএম) এবং পাকিস্তানের ফ্রন্টিয়ার ওয়ার্কস অর্গানাইজেশন বেলুচিস্তানে ‘খনিজ বিষয়ে কৌশলগত সহযোগিতা’র নামে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি করে। ইউএসএসএম হলো আমেরিকার নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট এ মুহূর্তের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত সংস্থা। পাকিস্তানে তারা একটা পলি-মেটালিক রিফাইনারি বানাবে বলে আলাপ রয়েছে।
এসব চুক্তি ও প্রয়োজন মিলেই যুক্তরাষ্ট্র কিছুদিন আগের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ থামিয়েছিল। জনপ্রিয় নেতা ইমরান খানের লাগাতার জেলজীবন এবং বেলুচিস্তানের খনিজে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের আলোকেই সেনাপ্রধান আসিম মুনির এবং শরিফ ও ভুট্টো ডাইন্যাস্টির সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের সুসম্পর্ককে দেখছেন ভূরাজনৈতিক ভাষ্যকারেরা। তবে বেলুচিস্তান নিয়ে গণচীনের আগ্রহ আরও পুরোনো।
২০১৫ সালে চীন তার বিআরআই প্রকল্পের অংশ হিসেবে ইসলামাবাদের সঙ্গে মিলে বেলুচিস্তানে অর্থনৈতিক করিডর গড়তে শুরু করে। শুরুতে ৬০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের কথা শোনা গিয়েছিল এতে। ভূকৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলে চীনের এই বিশাল উপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দ ছিল না। সেই অপছন্দের কারণ ছিল ভূরাজনৈতিক এবং ওপরে উল্লিখিত খনিকেন্দ্রিক।
ভারতও বিআরআই প্রকল্পে যোগ দেয়নি। বালুচরাও নিজেদের বিবেচনা থেকে শুরু থেকে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরে অসন্তুষ্ট। গদার বন্দর চীনের হাতে যাওয়া নিয়ে তারা ক্ষুব্ধ। তাদের মত হলো, এসব থেকে স্থানীয় লােকজন লাভবান হচ্ছে না। পাকিস্তান ও চীন সরকারই কেবল এসবের সুবিধাভোগী। ইতিমধ্যে চীনের অনেক নাগরিক বালুচদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। মারাও গেছে। আত্মঘাতী হামলাও ছিল অনেক। কিছু হামলা হয়েছে সুদূর করাচিতে।
এসব ঘটনা নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটনের জন্য সুখকর ছিল। তবে পাকিস্তান সরকার চীনের কর্মীদের রক্ষায় গত জানুয়ারিতে একটা বিশেষ পুলিশ ইউনিট করেছে। তার পর থেকে বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মির চীনের নাগরিকমুখী আক্রমণ কমেছে।
বালুচরা লড়ছে সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার লক্ষ্যে। বিএলএ ও বিএলএফে প্রচুর বামপন্থী রয়েছে। অন্যদিকে পশতুন তালেবানের লক্ষ্য শরিয়াহভিত্তিক ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্র। তবে এখন ইসলামাবাদের শাসকদের সঙ্গে তালেবানের সম্পর্কের অবনতি হওয়া মাত্র পাকিস্তান সরকার বালুচ সশস্ত্রতা বাড়ার পেছনে আফগান সরকারকেও দায়ী করতে শুরু করেছে।
পাকিস্তানে চীনের প্রায় ২০ হাজার নাগরিক বিভিন্ন ধরনের কাজে রয়েছে। এত মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়া পাকিস্তানের জন্য বড় এক সামরিক চ্যালেঞ্জ। অর্থনৈতিক করিডর রক্ষায় প্রচুর সেনা মোতায়েন রাখতে হয়। এরপরও যদি সহিংসতা ঘটে, তখন তারা ভারতকে দোষারোপ করে।
ইসলামাবাদের প্রায় নিয়মিত অভিযোগ হলো মূলত ভারতের সহায়তাতেই বেলুচিস্তানে অস্থিতিশীলতা চলছে। তারা বিএলএ বা বিএলএফের হামলাকে ‘ফিতনা আল হিন্দুস্তান’ বলে উল্লেখ করছে কিছুকাল ধরে। যেভাবে তারা টিটিপির হামলাকে ‘ফিতনা আল খাওয়ারিজ’ বলে থাকে। ‘ফিতনা আল হিন্দুস্তান’ শব্দ নিয়ে ভারত খুবই ক্ষুব্ধ। গত জুনে তারা ‘পাকিস্তানের তথ্যযুদ্ধে’র বিষয় জাতিসংঘেও উত্থাপন করেছে।
বাস্তবে ভারত-পাকিস্তান উভয়ে তাদের সশস্ত্র ভিন্নমতাবলম্বীদের সব তৎপরতাকে অপর দেশের তৈরি সমস্যা হিসেবে দেখাতে অভ্যস্ত। এর মাধ্যমে উভয় দেশের সামরিক আমলাতন্ত্র বোঝাতে চায়—সমস্যায় তাদের কোনো ভূমিকা নেই!
বালুচ সমস্যায় ভারতের যোগসূত্রের প্রমাণ হিসেবে পাকিস্তানের বড় এক প্রচার-পণ্য হলেন কুলভূষণ যাদব। ২০১৬ থেকে পাকিস্তান দাবি করছে ভারতীয় নৌবাহিনীর এই কর্মকর্তাকে গোয়েন্দাকাজে লিপ্ত অবস্থায় তারা বেলুচিস্তানে আটক করেছে।
অন্যদিকে ভারত বলছে, যাদবকে ইরানের সিস্তান-বেলুচিস্তান থেকে অপহরণ করা হয়েছে। তৃতীয় একটা মত হলো, ইরান-বেলুচিস্তান সীমান্তে কুলভূষণকে আটক করেছিল ইরানের গেরিলাদল জয়সে আল-আদল। পরে তারা তাঁকে পাকিস্তানের কাছে হস্তান্তর করে। প্রকৃত সত্য যা–ই হোক, কুলভূষণ যাদবের ঘটনা ইঙ্গিত দিচ্ছে বালুচ সমস্যায় ইরানও যুক্ত।
বালুচদের স্বাধিকারের সংগ্রাম যে ইরানের পছন্দ নয় সেটা সবারই জানা। ভুট্টোর আমলে বালুচ এলাকায় সামরিক অভিযান চালাতে বিশেষভাবে প্ররোচিত করেছিলেন ইরানের শাহ। এর কারণ, বেলুচিস্তানে যেকোনো স্বায়ত্তশাসিত সরকারের রাজনৈতিক প্রভাব পড়বে ইরানের সিস্তানে। সেখানে সুন্নি বালুচদের সঙ্গে সংখ্যালঘু শিয়া সিস্তানিদের বৈরিতা আছে। এখানে রাষ্ট্রীয় দপ্তরগুলোতে বালুচরা চাকরি পায় কম। এখানকার বালুচদের ক্ষোভ তেহরানের বিরুদ্ধে। অর্থাৎ সীমান্তের এদিকের বালুচ এবং ওই দিকের বালুচ উভয়ের প্রতিপক্ষ আলাদা।
ইরান সীমান্তে জয়েশ আল-আদল, জুনদুল্লাহ ইত্যাদি নামে বালুচদের একাধিক গেরিলা দলের কথা শোনা যায়। তেহরানের অভিযোগ, এই গেরিলাদের আশ্রয়শিবির রয়েছে সীমান্তের এদিকে। তাদের দমন করতেই ২০২৪–এর জানুয়ারিতে ইরান বেলুচিস্তানে কয়েক দফা মিসাইল ছোড়ে। এই হামলার কয়েক দিন আগে সিস্তানের পাশের কেরমানের সাহেব আল-জামান মসজিদের কাছে জেনারেল কাসেম সোলাইমানির স্মরণে আয়োজিত এক সভায় আত্মঘাতী আক্রমণে শতাধিক মানুষ নিহত হন। ওই ঘটনার প্রতিশোধ হিসেবে বেলুচিস্তানে জয়েশ আল–আদলের শিবিরগুলোতে মিসাইল হামলা চালানো হয়েছিল।
বালুচদের নিয়ে তেহরান ও ইসলামাবাদের সমস্যা যেহেতু প্রায় একই রকম, সেই সূত্রে বিভিন্ন সময় অনেক বালুচ স্বাধীনতাসংগ্রামীকে ধরার ক্ষেত্রে ইরানের সহায়তা পেয়েছে ইসলামাবাদ। বিএলএফের ওয়াহিদ কামবারও ইরানের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ধরা পড়েন বলে বেলুচিস্তানের গেরিলারা মনে করে।
২০২৪–এ পাল্টাপাল্টি হামলার পর ইরান ও পাকিস্তানের নেতারা আলাপ-আলোচনায় বসে বালুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ধরতে তথ্য বিনিময়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বর্তমানে যে যুদ্ধ চলছে তাতে বেলুচিস্তানে ইরানের নীতিকৌশল পাল্টাতে পারে। সীমান্তের এদিকের বালুচদের সঙ্গে তেহরানের পুরোনো বৈরিতা না–ও থাকতে পারে। বিশেষ করে চাগাইয়ে আমেরিকার বিনিয়োগ ও উপস্থিতি নিশ্চিতভাবে ইরানের শাসকদের নজরে রয়েছে।
বেলুচিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি ভাবাচ্ছে কাবুলের তালেবানকেও। অতীতে আফগানিস্তান বালুচ সংগ্রামের অন্যতম আশ্রয়দাতা ছিল। অনেক বালুচ নেতা পাকিস্তান সরকারের হাত থেকে বাঁচতে ওদিকে আশ্রয় নিতেন। তবে তালেবানের উত্থানের পর পুরোনো এই যোগাযোগে বাধা পড়ে। এর কারণ ছিল তালেবানের সঙ্গে পাকিস্তানের ডিপ স্টেটের মৈত্রী এবং প্রথমোক্তদের সঙ্গে বালুচ রাজনৈতিক কর্মীদের আদর্শিক ভিন্নতা।
বালুচরা লড়ছে সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার লক্ষ্যে। বিএলএ ও বিএলএফে প্রচুর বামপন্থী রয়েছে। অন্যদিকে পশতুন তালেবানের লক্ষ্য শরিয়াহভিত্তিক ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্র। তবে এখন ইসলামাবাদের শাসকদের সঙ্গে তালেবানের সম্পর্কের অবনতি হওয়া মাত্র পাকিস্তান সরকার বালুচ সশস্ত্রতা বাড়ার পেছনে আফগান সরকারকেও দায়ী করতে শুরু করেছে।
ভূরাজনৈতিক ভাষ্যকারেরা সচরাচর বালুচ সমস্যাকে আন্তরাষ্ট্রীয় দাবা খেলার ছকে সাজিয়ে পর্যালোচনা করতে পছন্দ করেন। এই পদ্ধতির মৌলিক দুর্বলতা হলে এতে বেলুচিস্তানের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতা গুরুত্ব পায় কম।
এই আগস্টে পাকিস্তান যখন স্বাধীনতার ৭৯তম বার্ষিকী উদ্যাপন করবে, তখন দেশটিতে সরকারি হিসাবেই দারিদ্র্যের হার ২৯ শতাংশ। পাকিস্তান হলো সেসব দেশের একটি, যেখানে দারিদ্র্য কমার বদলে বাড়ছে। এক দশক আগেও সেখানে দারিদ্র্য ছিল ২২ শতাংশ। দেশটির সর্বশেষ অর্থনৈতিক জরিপে বেলুচিস্তানে দরিদ্র মানুষ মিলেছে ৪৭ শতাংশ (ডন, ১২ জুন ২০২৬)। অর্থাৎ জাতীয় গড়ের প্রায় দ্বিগুণ দরিদ্র মানুষ রয়েছে সবচেয়ে বেশি খনিজসমৃদ্ধ প্রদেশটিতে! আবার বেলুচিস্তানে যখন ৪৭ শতাংশ দারিদ্র্য—পাঞ্জাবে তখন সেটা ২৩ শতাংশ।
একটি দেশের ভেতর কীভাবে ভিন্ন ভিন্ন দেশ তৈরি হয়, তার নজির এসব তথ্য-উপাত্ত। এসব উপাত্ত ২০০৫–এর ফেব্রুয়ারিতে দেওয়া নেলসন ম্যান্ডেলার সেই উক্তিও মনে করায়, ‘যতক্ষণ দারিদ্র্য ও অসাম্য থাকবে, ততক্ষণ আসলে কেউ শান্তিতে থাকবে না।’
বেলুচিস্তানে অশান্তির আরও কারণ রয়েছে। পাকিস্তানের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে বেলুচিস্তানের জন্য আসন রয়েছে মাত্র ১৭টি, যা পুরো অ্যাসেম্বলির সদস্যপদের ৫ শতাংশের কম। সরকার বলছে, যেহেতু পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্ব নির্ধারিত হয় লোকসংখ্যার হিসাবে, সেহেতু এর বিকল্প কী! কিন্তু এই বাস্তবতায় সংগত কারণেই জাতীয় পরিসরে নীতিনির্ধারণে বালুচদের প্রভাব খুব কম।
ইসলামাবাদে গুরুত্বহীন হয়েই বালুচরা কোয়েটা, চমন বা গদারের রাস্তা বেছে নেয় মিছিলের জন্য। সেখানে দাঁড়াতে দেওয়া না হলে চলে যাচ্ছে পাহাড়ি অঞ্চলে বন্দুকের খোঁজে। রাজনীতির যেখানে শেষ, সহিংসতার সেখানেই শুরু। ২০২৬–এর প্রথম ত্রৈমাসিকে বেলুচিস্তানে ৪৪৩ জন মারা গেছে সহিংসতায়।
বলা বাহুল্য, বহুমাত্রিক বঞ্চনার যোগফল আজকের বেলুচিস্তানের এই পরিস্থিতি—যেখানে বালুচরা ‘পয়েন্ট অব নো রিটার্নে’ চলে গেছে এবং ইসলামাবাদের সঙ্গে তাদের সম্পর্কে সংশোধন-অযোগ্য অনেক ক্ষতি ঘটে গেছে। সামরিক বাহিনী গেরিলাদের হত্যা ও গুম করতে পারলেও অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক বঞ্চনার কোনো সমাধান দিতে পারছে না। ফলে তাদেরও কাজ করতে হচ্ছে স্থায়ী জরুরি অবস্থায়। বালুচ পাড়াগুলোতে ঘর থেকে কাজে যাওয়ার রাস্তায় প্রতি সপ্তাহে চেকপোস্টের সংখ্যা কেবল বাড়ছেই।
তবে সমস্যাটা কেবল পাকিস্তানের নয়। যেহেতু এই জাতির মানুষ ছড়িয়ে আছে ইরান ও আফগানিস্তানে এ কারণে এই সংকটের সঙ্গে যুক্ত আছে ওই সব দেশের নীতি-কৌশলও। আবার যুক্তরাষ্ট্র ও গণচীনের সরাসরি উপস্থিতি ও আগ্রহের কারণে বর্তমান বেলুচিস্তানে তারাও প্রভাবশালী পক্ষ। যে কারণে বেলুচিস্তান সংকটকে বলা হচ্ছে এক মহাসংঘাত—‘আ গ্রেট গেম’।
আলতাফ পারভেজ ইতিহাস বিষয়ে গবেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব