ইলন মাস্ক
ইলন মাস্ক

মতামত

ডিজিটাল ভবিষ্যৎ বেজোস–মাস্কের হাতে ছেড়ে দেওয়া যাবে না

অ্যামাজন জানিয়েছে, তাদের লিও স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা ২০২৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় চালু হতে পারে। দেশটির ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী হেরোটেলের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে এটি চালু হবে। আফ্রিকায় এটিই লিওর প্রথম চুক্তি।

স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের বাজারে অ্যামাজনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ইলন মাস্কের স্পেসএক্স পরিচালিত স্টারলিংক। এ বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত ১৬৪টি দেশ ও বাজারে তাদের গ্রাহক ছিল ১ কোটি ৩০ লাখ। প্রায় ৯ হাজার স্যাটেলাইটের মাধ্যমে তারা আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও এশিয়ায় সেবা দিচ্ছে।

ইন্টারনেট এখন শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ব্যবসা, ব্যাংকিং, সরকারি সেবা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। ফলে নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রণ মানে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ব্রাজিল সরকার মাস্কের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স বন্ধের নির্দেশ দিলে স্টারলিংক প্রথমে তা মানতে অস্বীকৃতি জানায়। পরে সিদ্ধান্ত বদলায়। ঘটনাটি দেখায়, গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ অবকাঠামোর মালিক একটি বেসরকারি কোম্পানিও সরকারের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

অ্যামাজন ও স্পেসএক্স যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা অবকাঠামোর সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ২০২৫ সালে স্পেসএক্স ৫৯০ কোটি ডলারের সম্ভাব্য জাতীয় নিরাপত্তা উৎক্ষেপণ চুক্তি পেয়েছে। অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা সংস্থাকে গোপনীয় ক্লাউড সেবা দেয়। ফলে এসব কোম্পানির মাধ্যমে দরিদ্র দেশগুলোর ডিজিটাল অবকাঠামোয় যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রভাবও বাড়তে পারে।

বিশ্বে এখনো ২২০ কোটি মানুষ ইন্টারনেটের বাইরে। তাদের ৯৬ শতাংশ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে বাস করে। আফ্রিকায় মাত্র ৩৬ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে; গ্রামীণ এলাকায় এই হার ২১ শতাংশ। নিম্ন আয়ের দেশে স্থির ব্রডব্যান্ডের খরচ গড়ে মাসিক আয়ের এক-চতুর্থাংশের বেশি। নাইজেরিয়ায় ২০২৫ সালের এপ্রিলে স্টারলিংক মাসিক ফি ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে ৩৮ হাজার নাইরা থেকে ৫৭ হাজার নাইরা করে।

বিদেশি কোম্পানি যখন সংযোগের মূল্য ও শর্ত নির্ধারণ করে, তখন তাদের হাতে জবাবদিহিহীন ক্ষমতা তৈরি হয়। আফ্রিকার ঔপনিবেশিক ইতিহাসে এর নজির আছে। উনিশ শতকে বেলজিয়ান কোম্পানির নির্মিত মাতাদি-লিওপোল্ডভিল রেলপথ কঙ্গোর সম্পদ ইউরোপে পাঠানোর কাজে ব্যবহৃত হয়েছিল। ডিজিটাল যুগে একই ধরনের নির্ভরশীলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জেফ বেজোস

করপোরেট নিয়ন্ত্রণ এখন আরও গভীরে পৌঁছেছে। মেটা দুই আফ্রিকা সাবমেরিন কেব্‌ল প্রকল্পে নেতৃত্ব দিয়েছে, যা আফ্রিকা, ইউরোপ ও এশিয়ার ৩৩টি দেশকে যুক্ত করছে। গুগলের ইকুয়ানো কেবলও ইউরোপকে আফ্রিকার কয়েকটি দেশের সঙ্গে যুক্ত করেছে। অ্যামাজন আবার লিওকে অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেসের সঙ্গে যুক্ত করতে চায়। এতে সংযোগের পাশাপাশি তথ্য সংরক্ষণ, বিশ্লেষণ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেবাতেও অ্যামাজনের ভূমিকা বাড়বে। এপ্রিল মাসে অ্যামাজন গ্লোবালস্টার নামে একটি মার্কিন স্যাটেলাইট কোম্পানি কেনার চুক্তিও করেছে।

সমস্যা হলো, একই বিদেশি কোম্পানি যখন সংযোগ, ক্লাউড, তথ্য বিশ্লেষণ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো একাধিক স্তর নিয়ন্ত্রণ করে, তখন বৈশ্বিক দক্ষিণ ব্যবহারকারী ও বাজার দেবে; অথচ মালিকানা, মুনাফা ও নিয়ন্ত্রণ থাকবে যুক্তরাষ্ট্রে। এটাই ডিজিটাল ঔপনিবেশিকতার আশঙ্কা।

ব্রাজিলে স্টারলিংক ২০২৫ সালের এপ্রিলের মধ্যে আবাসিক স্যাটেলাইট ব্রডব্যান্ড বাজারের প্রায় ৮০ শতাংশ দখল করে। তবে দেশটি নিজস্ব স্যাটেলাইট অবকাঠামোও ধরে রেখেছে। তাদের এসজিডিসি স্যাটেলাইট ১২ হাজারের বেশি সরকারি স্থাপনায় সংযোগ দিয়েছে, যার মধ্যে ৯ হাজার ৩৮০টি গ্রামীণ স্কুল ও ৩৫৬টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে। অর্থাৎ বিদেশি কোম্পানি সরকারি ব্যবস্থার বিকল্প না হয়ে সহায়কও হতে পারে।

তাই শুধু সরকারি নিয়ন্ত্রণ নয়, গণতান্ত্রিক সুরক্ষাও প্রয়োজন। ২০২৫ সালে ৫২টি দেশে অন্তত ৩১৩টি ইন্টারনেট বন্ধের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে আফ্রিকার ১৫টি দেশে ছিল ৩০টি। নির্বাচন, বিক্ষোভ ও সংঘাতের সময় এসব বন্ধ করা হয়। স্বচ্ছ আইন, স্বাধীন পর্যালোচনা ও কার্যকর প্রতিকার ছাড়া কোনো সরকার বা কোম্পানির ইন্টারনেট বন্ধের ক্ষমতা থাকা উচিত নয়।

স্যাটেলাইট কোম্পানির লাইসেন্সে সাশ্রয়ী মূল্য, সর্বজনীন সেবা তহবিলে অবদান, নেট নিরপেক্ষতা, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও তথ্য স্থানান্তরের নিয়ম থাকা দরকার। একচেটিয়া চুক্তি ঠেকাতে হবে এবং প্রকৃত মালিকানা প্রকাশ করতে হবে। অ্যামাজন লিও ও স্টারলিংক অবহেলিত মানুষের কাছে ইন্টারনেট পৌঁছে দিতে পারে। কিন্তু এই সংযোগ যেন মানুষের স্বাধীনতা বাড়ায়, বিদেশি করপোরেশনের হাতে ক্ষমতা তুলে না দেয়। বৈশ্বিক দক্ষিণের ডিজিটাল ভবিষ্যৎ জেফ বেজোস ও ইলন মাস্কের হাতে ছেড়ে দেওয়া যাবে না।

  • তাফি মাহাকা আল–জাজিরার কলাম লেখক

    আল–জাজিরা থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত