ডিজেলের অভাবে অনেক সময় সেচপাম্প বন্ধ রাখতে হয়। ধানের খেতে সেচ দিতে না পারায় ফলন নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকেন কৃষক
ডিজেলের অভাবে অনেক সময় সেচপাম্প বন্ধ রাখতে হয়। ধানের খেতে সেচ দিতে না পারায় ফলন নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকেন কৃষক

অভিমত–বিশ্লেষণ

খাদ্যনিরাপত্তার নতুন ঝুঁকি, মোকাবিলার উপায় কী

খাদ্যনিরাপত্তা কৃষি মন্ত্রণালয়ের একক বিষয় নয়; এটি জ্বালানি, বাণিজ্য, অর্থ ও সামাজিক সুরক্ষার সঙ্গে জড়িত একটি জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্ন। জ্বালানি ও সারসংকটের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার নতুন ঝুঁকি নিয়ে লিখেছেন গোলাম রসুল

গত ২৩ আগস্ট কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে দুই শতাধিক কৃষক গুদাম ভেঙে প্রায় ১০ হাজার কেজি ইউরিয়া নিয়ে যান, আর তার দুই সপ্তাহ আগে লালমনিরহাটের কালীগঞ্জে কৃষকেরা মহাসড়ক অবরোধ করেন—প্রতি বস্তা টিএসপির জন্য বাজারদরের চেয়ে অনেক বেশি দাম গোনার প্রতিবাদে। ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়; এগুলো সার সরবরাহব্যবস্থার গভীর সংকটের লক্ষণ। গ্যাস-সংকটে দেশের কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা বন্ধ বা সীমিত সক্ষমতায় চলছে, ফলে দেশীয় উৎপাদন কমে আমদানিনির্ভরতা বেড়েছে।

আসন্ন রবি ও বোরো মৌসুমে সারের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে এই দুর্বলতা আরও প্রকট হতে পারে। কৃষকের কাছে সময়মতো সার না পৌঁছানো অথবা উচ্চ মূল্যে পৌঁছানো, কেবল স্থানীয় বাজার ব্যর্থতার প্রশ্ন নয়। এটি জ্বালানি, সার ও খাদ্যের পারস্পরিক নির্ভরতার একটি বড় সংকট, যা বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তাকে ক্রমে একটি বড় অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্নে পরিণত করছে। সার সরবরাহে সাময়িক বিঘ্নও উৎপাদন খরচ, কৃষকের আয়, খাদ্যমূল্য ও নিম্ন আয়ের পরিবারের খাদ্যপ্রাপ্তিতে একসঙ্গে প্রভাব ফেলতে পারে।

  • খাদ্যনিরাপত্তায় সংকট দেখা দেওয়ার পর শুধু মোকাবিলা করার বিষয় হিসেবে নয়, বরং আগাম ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা দরকার। 

  • ডিজেলের দাম বাড়লে কৃষির প্রতিটি ধাপে খরচ বাড়ে; ফলে জ্বালানি–ধাক্কা শুধু সারের দামের মধ্য দিয়ে নয়, পুরো সরবরাহব্যবস্থা দিয়ে খাদ্যমূল্যে পৌঁছায়।

জ্বালানি-সার-খাদ্যের সংযোগ

আধুনিক কৃষির প্রধান উপকরণ সার, আর ইউরিয়া সার তৈরিতে প্রাকৃতিক গ্যাস একই সঙ্গে কাঁচামাল ও জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই দুই ভূমিকাই ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়—গ্যাসের দাম বাড়লে বা সরবরাহ কমে গেলে কারখানার উৎপাদন খরচ বাড়ে, আর কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে বাজারে সরবরাহ কমে দাম আরও বাড়ে। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া ও আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ঘাটতিতে সমস্যাটি আরও বেড়েছে।

বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) হিসাবে, পাঁচটি প্রধান ইউরিয়া কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে দিনে প্রায় ১৯৭ কোটি ঘনফুট গ্যাস দরকার, যা বাস্তবে প্রায়ই মেলে না। চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার (সিইউএফএল) ও কাফকো বন্ধ থাকায় ডিএপি সার কারখানাও অ্যামোনিয়ার অভাবে এ বছর উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।

জ্বালানি ও খাদ্যের সম্পর্ক অবশ্য শুধু সারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একই বৈশ্বিক জ্বালানি-ধাক্কা খাদ্যব্যবস্থায় দুই পথে ঢোকে। প্রথমত, সারের দাম ও পরিবহন খরচ বাড়িয়ে। দ্বিতীয়ত, জ্বালানির দাম বাড়লে জৈব জ্বালানির (ইথানল-বায়োডিজেল) চাহিদা বেড়ে যায়, তখন খাদ্যশস্যের একাংশ খাদ্য বা পশুখাদ্যের বদলে জ্বালানি তৈরিতে চলে যায়—ফলে খাদ্য ও জ্বালানির মধ্যে সরাসরি প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। ২০০৭-০৮ সালের বৈশ্বিক খাদ্যসংকট এই দুই পথ একসঙ্গে সক্রিয় হলে কী ঘটতে পারে, তার সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত।

জ্বালানি–ধাক্কা ও খাদ্যসংকট

২০০৩ সালে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৩০ ডলার থাকা অপরিশোধিত তেলের দাম ২০০৮ সালের জুলাইয়ে ১৪৭ ডলার ছাড়িয়ে যায়। এতে একদিকে সারের উৎপাদন খরচ হঠাৎ বেড়ে যায়, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে ভুট্টাভিত্তিক ইথানল উৎপাদন দ্রুত বাড়তে থাকে। ফলে ভুট্টা, আখ ও সয়াবিনের বড় অংশ খাদ্য ও পশুখাদ্যের পরিবর্তে জ্বালানি উৎপাদনে চলে যায়—একই শস্যের ওপর দুটি বাজারের চাপ তৈরি হয়।

এর ফলে বিশ্ববাজারে গমের দাম তিন গুণ, ভুট্টার দাম দ্বিগুণ হয়ে যায়, আর চালের দাম নভেম্বর ২০০৭ সালের টনপ্রতি ৩০০ ডলার থেকে এপ্রিল ২০০৮ সালে এক হাজার ডলার ছাড়িয়ে যায়—মূলত ভারত ও ভিয়েতনামের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার পর তৈরি হওয়া আতঙ্কে কেনাকাটার কারণে। এক বছরে বিশ্বে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা ৮৫ কোটি থেকে বেড়ে ১০০ কোটির ওপরে পৌঁছে যায়। বাংলাদেশও বাদ যায়নি; চালের দাম দেশে প্রায় ৩৮ শতাংশ বেড়ে যায়, বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ হয়, আর দেশ সরাসরি খাদ্যসংকটে পড়ে।

বর্তমান বৈশ্বিক ঝুঁকি

অতীতের সংকট দেখিয়েছে, ছোট ছোট কয়েকটি সিদ্ধান্ত একটি দেশের রপ্তানি বন্ধ বা অন্য দেশের আতঙ্কে আমদানি কীভাবে গোটা বিশ্ববাজারকে অস্থির করে তুলতে পারে; আজ সেই একই ধরনের ঝুঁকি নতুন রূপে ফিরে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ও হরমুজ প্রণালি ঘিরে অনিশ্চয়তার জেরে চীন ২০২৬ সালের মার্চ থেকে ডিএপি, এমএপিসহ বিভিন্ন ফসফেট সারের রপ্তানিতে কড়াকড়ি আরোপ করেছে, যা আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত বলবৎ থাকার কথা। রয়টার্সের হিসাবে, চীনের মোট সার রপ্তানির ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ এখন এর আওতায়। রাশিয়াও কোটার মাধ্যমে সার রপ্তানি সীমিত রেখেছে, যার প্রভাবে এমওপি সারের দাম গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৭ শতাংশ বেশি। বিশ্বব্যাংকের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, হরমুজ ঝুঁকির কারণে ২০২৬ সালে সারের দাম সার্বিকভাবে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।

ঝুঁকিটি আরও গভীর, কারণ সার উৎপাদন হাতে গোনা কয়েকটি দেশেই কেন্দ্রীভূত—ফসফেট শিলার প্রায় ৪৬ শতাংশ আসে একা চীন থেকে, আর পটাশের এক-তৃতীয়াংশ জোগান দেয় রাশিয়া ও বেলারুশ মিলে। অর্থাৎ এই কয়েকটি দেশের যেকোনো সিদ্ধান্ত—রপ্তানি বন্ধ, কোটা বা শুল্ক—সরাসরি বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের সার সরবরাহ নাড়িয়ে দিতে পারে; ঠিক যেভাবে ২০০৭-০৮ সালে ভারত ও ভিয়েতনামের সিদ্ধান্ত গোটা বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। আজকের বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সেই আন্তসংযুক্ত ঝুঁকি আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। জ্বালানি, সার, খাদ্য ও বাণিজ্যনীতির ধাক্কা একসঙ্গে এলে একটি বাজারের সংকট দ্রুত পুরো খাদ্যব্যবস্থার সংকটে রূপ নিতে পারে।

বৈশ্বিক জ্বালানি ও সার বাজারের মূল্যবৃদ্ধি বাংলাদেশ একা ঠেকাতে পারবে না। কিন্তু সেই ধাক্কা দেশের কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থায় কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে বাংলাদেশের প্রস্তুতির ওপর। তাই দরকার আগেভাগে ঝুঁকি কমিয়ে আরও সহনশীল খাদ্য-জ্বালানি-সারব্যবস্থা গড়ে তোলা। চারটি অগ্রাধিকার ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপের একটি সমন্বিত কাঠামো অপরিহার্য।

বাংলাদেশের সারনির্ভরতা

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশে সারের চাহিদা দাঁড়াবে প্রায় ৬৭ লাখ ৭০ হাজার টনে—ইউরিয়া ২৬ লাখ ২০ হাজার টন, ডিএপি ১৩ লাখ ৫০ হাজার টন, এমওপি প্রায় ৯ লাখ ৭০ হাজার টন, টিএসপি প্রায় ৯ লাখ টন, বাকিটা অন্যান্য সার। অথচ দেশের সাতটি রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানার মধ্যে হালে সচল ছিল মাত্র দুটি; বাকিগুলো গ্যাস-সংকটের কারণে বন্ধ বা সীমিত সক্ষমতায় চলছে। ফলে দেশের মোট সারের চাহিদার এক-পঞ্চমাংশের কম দেশীয় উৎপাদনে মেটে; বাকি প্রায় ৮০ শতাংশ পূরণ করতে হয় আমদানি করে। গত কয়েক বছরে এই আমদানির পরিমাণ ৩৮ থেকে ৪৮ লাখ টনের মধ্যে ওঠানামা করেছে।

এই নির্ভরতা সারের নিরাপত্তাকে জ্বালানিনিরাপত্তা ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও জুড়ে দেয়। আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম বাড়লে সরকারকে বেশি দামে আমদানি করতে হয়। কৃষকের দাম স্থিতিশীল রাখতে ভর্তুকি বাড়ে, ভর্তুকি কমালে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়ে।

উচ্চ মূল্যে কৃষক সার প্রয়োগ কমালে ফলন কমার ঝুঁকি তৈরি হয়; উৎপাদন খরচ বাড়লেও ফসলের দাম একই হারে না বাড়লে কৃষকের আয় ও পরের মৌসুমে বিনিয়োগের সামর্থ্য কমে যায়। ডিজেলের দাম বাড়লে সেচ, জমি প্রস্তুত, ফসল কাটা, পরিবহন ও সংরক্ষণ—কৃষির প্রতিটি ধাপে খরচ বাড়ে; ফলে জ্বালানি-ধাক্কা শুধু সারের দামের মধ্য দিয়ে নয়, পুরো সরবরাহব্যবস্থা দিয়ে খাদ্যমূল্যে পৌঁছায়।

এই চাপ অবশ্য সবার ওপর সমান পড়ে না। খাদ্যের দাম বাড়লে নিম্ন আয়ের পরিবার বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ, তাদের ব্যয়ের বড় অংশ যায় খাদ্যের পেছনে। আবার কৃষক ন্যায্য দাম না পেলে তাঁর আয়, সঞ্চয় ও ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের সামর্থ্য কমে যায়। কুড়িগ্রামের গুদাম ভাঙার ঘটনা আসলে এই দুই চাপেরই মিলিত রূপ—কৃষক সার পাচ্ছেন না, আর সরকার সেই ঘাটতি সামলাতে গিয়ে ভর্তুকি ও আমদানি খরচের দ্বিমুখী চাপে পড়ছে। এ বাস্তবতায় প্রশ্ন—শুধু কত সার আমদানি করা যাবে, তা নয়; আসল প্রশ্ন হলো, বহিঃস্থ ধাক্কা এলে বাংলাদেশ কত দ্রুত বিকল্প সরবরাহ নিশ্চিত করতে এবং কৃষক ও ভোক্তাকে কার্যকরভাবে সুরক্ষা দিতে পারবে?

প্রতীকী ছবি

নীতিগত করণীয়: অগ্রাধিকারভিত্তিক খাদ্য-জ্বালানি-সার নিরাপত্তা

বৈশ্বিক বাজারের ধাক্কা সামলাতে সরকার সাধারণত ভর্তুকি, জরুরি আমদানি ও সরকারি মজুতের ওপর নির্ভর করে। সংকটের সময় এগুলো প্রয়োজনীয় হলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। সর্বজনীন ভর্তুকি রাজস্ব ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ায়, জরুরি আমদানি বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ ফেলে, আর মজুতও যথেষ্ট নয় যদি সরবরাহ দীর্ঘ সময় বিঘ্নিত থাকে—যেমনটা এখন হচ্ছে আশুগঞ্জ, সিইউএফএল ও কাফকোর ক্ষেত্রে। খাদ্যনিরাপত্তা তাই কৃষি মন্ত্রণালয়ের একক বিষয় নয়; এটি জ্বালানি, বাণিজ্য, অর্থ ও সামাজিক সুরক্ষার সঙ্গে জড়িত একটি জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্ন।

বৈশ্বিক জ্বালানি ও সার বাজারের মূল্যবৃদ্ধি বাংলাদেশ একা ঠেকাতে পারবে না। কিন্তু সেই ধাক্কা দেশের কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থায় কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে বাংলাদেশের প্রস্তুতির ওপর। তাই দরকার আগেভাগে ঝুঁকি কমিয়ে আরও সহনশীল খাদ্য-জ্বালানি-সারব্যবস্থা গড়ে তোলা। চারটি অগ্রাধিকার ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপের একটি সমন্বিত কাঠামো অপরিহার্য। 

বাংলাদেশ বৈশ্বিক জ্বালানি ও সারের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। তবে আমদানির উৎস বৈচিত্র্যপূর্ণ করা, কৌশলগত মজুত গড়ে তোলা, দেশীয় উৎপাদনের দক্ষতা বাড়ানো, সারের সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং ঝুঁকিতে থাকা কৃষক ও ভোক্তাদের লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দেওয়া তার নীতিনির্ধারণের আওতায় রয়েছে।

প্রথম অগ্রাধিকার: সরবরাহের নিরাপত্তা (তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি)। আসন্ন রবি ও বোরো মৌসুমের আগে গুরুত্বপূর্ণ সারের জন্য জেলাভিত্তিক কৌশলগত মজুত ও বিতরণ পরিকল্পনা নিশ্চিত করতে হবে। ডিলার পর্যায়ে বরাদ্দ ও বিক্রির তদারকি জোরদার করতে হবে; যাতে মজুতদারি ও কালোবাজারি ঠেকানো যায়। দীর্ঘ মেয়াদে আমদানির উৎস আরও বৈচিত্র্যপূর্ণ করতে হবে, যেন সরবরাহ কোনো একক উৎস বা অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল না থাকে।

দ্বিতীয় অগ্রাধিকার: কাঠামোগত নির্ভরতা কমানো (মধ্যমেয়াদি)। বর্তমান কারখানার গ্যাসনির্ভরতা, দক্ষতা ও খরচ নতুন করে বিবেচনা করে ঠিক করতে হবে কোথায় দেশীয় উৎপাদন লাভজনক, আর কোথায় দীর্ঘমেয়াদি আমদানি বেশি কার্যকর। মাটি পরীক্ষা ও সুষম সার প্রয়োগের মাধ্যমে সারের কার্যকারিতা বাড়াতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশে অনেক কৃষক সুপারিশের চেয়ে বেশি সার ব্যবহার করেন—ফলন বাড়ে না, বরং মাটির স্বাস্থ্য নষ্ট হয় ও খরচ বেড়ে যায়। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) হিসাবে দেশের প্রায় ৭৬ শতাংশ কৃষিজমি ইতিমধ্যে মাঝারি থেকে তীব্র মাত্রায় উর্বরতা হারিয়েছে। তাই শুধু প্রযুক্তিগত সমাধান নয়, কৃষকের জ্ঞান ও সচেতনতা বাড়ানোই সবচেয়ে জরুরি। মাটি পরীক্ষার ভিত্তিতে সুষম সার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে যেখানে সম্ভব ডিজেল–নির্ভর সেচের বদলে বিদ্যুৎ ও সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে।

প্রতীকী ছবি

তৃতীয় অগ্রাধিকার: কৃষক ও ভোক্তাকে সুরক্ষা (তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি)। সার ও জ্বালানির দাম বাড়ার পুরো বোঝা কৃষকের ওপর চাপানো যাবে না, আবার দীর্ঘদিন সর্বজনীন ভর্তুকিও টেকসই নয়। তাই ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা এবং খাদ্যমূল্য বৃদ্ধিতে ক্ষতিগ্রস্ত নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করা দরকার।

চতুর্থ অগ্রাধিকার: আগাম সতর্কব্যবস্থা (মধ্যমেয়াদি)। কৃষি ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় যৌথভাবে একটি খাদ্য-জ্বালানি-সার ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে, যা নিয়মিত প্রকাশ্য বুলেটিনে আন্তর্জাতিক দাম, দেশের গ্যাস সরবরাহ, কারখানার উৎপাদন, আমদানি ও মজুতের হালনাগাদ তথ্য জানাবে। এতে সংকট দেখা দেওয়ার আগেই ক্রয় ও মজুতের পরিকল্পনা করা যাবে, আর স্থানীয় ঘাটতি বড় আকার নেওয়ার আগেই সতর্কসংকেত মিলবে।

আগাম প্রস্তুতিই নিরাপত্তা

কৃড়িগ্রামের গুদাম ভাঙা ও লালমনিরহাটের মহাসড়ক অবরোধ কেবল স্থানীয় প্রশাসনিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে সংকটের প্রকৃতি বোঝা যাবে না। এগুলো দেখায় যে সার সরবরাহ, জ্বালানি সক্ষমতা, আমদানি ব্যবস্থাপনা, কৃষকের ক্রয়ক্ষমতা ও খাদ্যমূল্য—সব একই ঝুঁকিব্যবস্থার অংশ।

বাংলাদেশ বৈশ্বিক জ্বালানি ও সারের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। তবে আমদানির উৎস বৈচিত্র্যপূর্ণ করা, কৌশলগত মজুত গড়ে তোলা, দেশীয় উৎপাদনের দক্ষতা বাড়ানো, সারের সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং ঝুঁকিতে থাকা কৃষক ও ভোক্তাদের লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দেওয়া তার নীতিনির্ধারণের আওতায় রয়েছে।

তাই খাদ্যনিরাপত্তাকে সংকট দেখা দেওয়ার পর শুধু মোকাবিলা করার বিষয় হিসেবে নয়, বরং আগাম ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা দরকার। আসন্ন রবি মৌসুমের আগে এই প্রস্তুতি জোরদার করা জরুরি—নইলে কুড়িগ্রামের মতো দৃশ্য অন্য জেলাতেও ফিরে আসতে পারে।

গোলাম রসুল অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস, অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি, ঢাকা

ই-মেইল: golam.grasul@gmail.com

*মতামত লেখকের নিজস্ব