
এটি প্রশংসনীয় যে ভারত সরকার নিজেদের জন্য ও জাতির জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, সেটা হলো ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতকে বিকশিত ভারতে পরিণত হতে হবে, যে বছরটি হবে ভারতের স্বাধীনতার শততম বার্ষিকী। যদিও সাধারণভাবে একমত হওয়া যায় যে বিকশিত ভারত বলতে একটি উন্নত দেশকে বোঝায়, তবু জননীতি প্রণয়নের উদ্দেশ্যে এ ধারণাকে বিশ্লেষণ করে এর অন্তর্নিহিত বিষয়গুলো কী, সেটা জানাটা এখনো প্রয়োজন। এরপর সেটাই করার প্রচেষ্টা করা হয়েছে।
মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) নিরিখে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি হওয়ার ফলে ভারত সংগত কারণেই গর্বিত হতে পারে, তবু বাস্তবতা হলো, প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন জনসংখ্যার একটি দেশের জন্য বর্তমান ৪ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের জিডিপি প্রত্যাশার চেয়ে কিছুটা কম। সুতরাং ভারতকে যদি প্রকৃত অর্থেই ‘বিকশিত’ হতে হয়, তাহলে জিডিপিকে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়ে অন্তত ১০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের অঙ্কে পৌঁছাতে হবে।
আমরা যদি কয়েকটি কাজ করতে পারি, তাহলে এটি সম্পূর্ণরূপে অর্জন করা সম্ভব। প্রথমত, আমাদের জিডিপির ৪০ শতাংশই আসে বৈদেশিক বাণিজ্য থেকে, তাই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আমাদের অংশীদারত্ব অবশ্যই দ্বিগুণ করতে হবে। বিশেষ করে বৈশ্বিক রপ্তানিতে আমাদের অংশীদারত্ব, যা বর্তমানে প্রায় ২ শতাংশের কাছাকাছি রয়েছে, সেটাকে ১০ শতাংশে উন্নীত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, আমাদের প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (ফরেন ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট—এফডিআই), যা সর্বশেষ বছরে প্রায় ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কিছুটা কম ছিল, সেটাকেও বহুগুণে বৃদ্ধি করতে হবে।
উল্লিখিত দুটি বিষয় বাস্তবায়নের জন্য ভারত সরকারকে ভূমি, শ্রম, বিদ্যুৎ, কৃষি, অবকাঠামো ও নিয়ন্ত্রক প্রতিবন্ধকতার মতো ক্ষেত্রগুলোতে গভীর ও মৌলিক অর্থনৈতিক সংস্কার সাধন করতে হবে।
যদিও এতে কোনো প্রশ্ন নেই যে জিডিপির প্রবৃদ্ধি অবশ্যই ত্বরান্বিত করতে হবে, যেমনটা ওপরে উল্লেখ করা হয়েছে, তবে শুধু এটিই যথেষ্ট নয়। প্রবৃদ্ধি অবশ্যই অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হবে, অর্থাৎ এর সুফলকে অবশ্যই সমাজের সর্বনিম্ন স্তরে থাকা নিপীড়িত মানুষদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। সরকার গরিব কল্যাণ যোজনার মতো চমৎকার সব প্রকল্প গ্রহণ করেছে।
তবে এর ঊর্ধ্বেও যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাটা কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার উভয়েরই জাতীয় মূলমন্ত্র হয়ে উঠতে হবে। যেহেতু সরকারের পক্ষে এককভাবে, এমনকি সংগঠিত খাতের পক্ষেও প্রয়োজনীয় সব কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব নয়, তাই এমন একটি পরিবেশ গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে যুবসমাজ কেবল চাকরিপ্রার্থী না হয়ে উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী হয়ে উঠবে। বর্তমান অর্থনৈতিক বৈষম্যের মাত্রা টেকসই নয় এবং সমাজকে আরও বেশি সমতাভিত্তিক করে তোলার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
এটা সর্বজনস্বীকৃত যে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা মুখস্থনির্ভর শিক্ষার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল এবং এর ফলে প্রতিবছর হাজার হাজার এমন স্নাতক তৈরি হয়, যাঁরা হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে কর্মসংস্থানের জন্য উপযুক্ত নন।
এই প্রেক্ষাপটে স্নাতকদের দক্ষতা উন্নয়ন ও পুনর্দক্ষতা অর্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আমাদের স্নাতকদের জন্য বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, শিল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ) প্রদানের ধারণাকে মিশন-স্তরের গুরুত্ব প্রদান করতে হবে।
সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতেই শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যয় বহুগুণে বৃদ্ধি করতে হবে, বিশেষ করে যেসব রাজ্য জাতীয় গড়ের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে, সেসব রাজ্যে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানে গবেষণা ও উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করতে হবে। এটি প্রকৃতপক্ষেই সত্য যে প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন জনসংখ্যা ভারতের জন্য একটি জনমিতিক লভ্যাংশে পরিণত হতে পারে। তবে তা কেবল তখনই সম্ভব হবে, যখন জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য এই জনগোষ্ঠী যথেষ্ট পরিমাণে দক্ষ হয়ে উঠবে।
ডিজিটালাইজেশন ও পরিকাঠামো সম্প্রসারণের দ্বারা পরিচালিত হয়ে ভারতের স্বাস্থ্যসেবা খাত চমৎকার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তবে চিকিৎসা ক্ষেত্রে ব্যয় বৃদ্ধি ও দীর্ঘস্থায়ী রোগের (ক্রনিক রোগ) ক্রমবর্ধমান বোঝার কারণে এখনো বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা বিদ্যমান রয়ে গেছে।
সরকার আয়ুষ্মান ভারত ও আয়ুষ্মান আরোগ্য মন্দির প্রকল্পের মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগসমূহ গ্রহণ করেছে, যা দেশে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। চিকিৎসক-রোগী ব্যবধান ঘোচানোর প্রচেষ্টা হিসেবে ২০১৪ সাল থেকে শুরু করে মেডিক্যাল কলেজের আসনসংখ্যা বৃদ্ধি করে দ্বিগুণের বেশি করা হয়েছে। ভারতকে চিকিৎসা পর্যটনের একটি বৈশ্বিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিভিন্ন সফল উদ্যোগও গ্রহণ করা হয়েছে।
এসব সত্ত্বেও গুরুতর প্রতিবন্ধকতা রয়ে গেছে। স্বাস্থ্যসেবা খাতে সরকারি ব্যয় এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রার তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। ভারত বিশ্বব্যাপী হৃদ্রোগ ও ডায়াবেটিসের প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠার ঝুঁকিতেও রয়েছে।
তাই ভারতের উচিত তার জনসংখ্যার বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের জন্য জনস্বাস্থ্য পরিকাঠামোকে সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও গুণমানসম্পন্ন করে তোলার লক্ষ্যে এর ব্যাপক রূপান্তরের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। জাতীয় স্বাস্থ্য মিশন একটি প্রশংসনীয় কাজ করছে। এটিকে শুধু আরও সুদৃঢ় ও সুসংগঠিত করা প্রয়োজন।
উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভারতের কোনোভাবেই উচ্চ কার্বননির্ভর পথ অনুসরণকারী শিল্পোন্নত দেশগুলোর পদ্ধতি কিংবা চীনের পথ—কোনোটিই অনুকরণ করা উচিত নয়। কারণ, বিশ্বের বাকি সব দেশ সম্মিলিতভাবে যে পরিমাণ কয়লা পোড়ায়, চীন এখনো তার চেয়েও বেশি কয়লা পোড়ায়।
ভারতই বর্তমানে একমাত্র মুখ্য অর্থনীতি, যার রয়েছে টেকসই উন্নয়নের ওপর ভিত্তি করে নিম্ন কার্বননির্ভর পথ অনুসরণ করে একটি উচ্চ আয়ের অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা। ভারতকে এটা করতে হবে শুধু বিশ্ব সেটা চায় বলে নয়, বরং এই দেশের জনগণ অধিকার হিসেবেই এটা পাওয়ার যোগ্য বলেই তা করতে হবে।
ভারত ২০৪৭ সালের মধ্যে বিকশিত ভারতে পরিণত হয়ে ওঠার জন্য প্রকৃতপক্ষেই একটি সুদৃঢ় অবস্থানে রয়েছে। তবে দেশকে একটি মিশন-মোডে থাকতে হবে এবং জাতীয় পর্যায়ের এ প্রচেষ্টায় কোনো দিক যাতে অপূর্ণ না থাকে, তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি সর্বাত্মক সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। যেকোনো বিচারে আগামী ২০টি বছর ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হতে চলেছে।
ড. মোহন কুমার ফ্রান্সে নিযুক্ত ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং বর্তমানে ও পি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক।
মতামত লেখকের নিজস্ব।