
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের মধ্যে একটি ভারসাম্য রক্ষার রাজনীতি করছেন। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এখানে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের চেয়েও আসিম মুনির ট্রাম্পের কাছে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছেন।
১৪ এপ্রিল ট্রাম্প নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ৪০ মিনিটের একটি টেলিফোনালাপ করেন। ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সের্হিও গোর জানিয়েছেন, ট্রাম্প মোদিকে বলেছেন যে তাঁরা সবাই (মার্কিন প্রশাসন) তাঁকে ভালোবাসেন।
একই দিনে ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইঙ্গিত দেন যে আগামী দুই দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার আলোচনা আবার শুরু হতে পারে এবং এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে পাকিস্তান। এই প্রসঙ্গের সূত্র ধরেই তিনি বলেন, পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল চমৎকার কাজ করছেন।
মার্কিন নেতারা কেবল মুনিরের প্রশংসাই করেননি, বরং তাঁকে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের চেয়েও উঁচুতে স্থান দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ায় এর প্রতিফলন স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। ১৫ এপ্রিল থেকেই মুনির তেহরান সফর শুরু করেন। অন্যদিকে শাহবাজ শরিফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার একই সময়ে সৌদি আরব, কাতার ও তুরস্ক সফরে যান।
পাকিস্তানের এই সংকট সহজে দূর হওয়ার সম্ভাবনা কম, কারণ দেশটির সামরিক বাহিনীর দাপট কমানোর জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার করার কোনো সদিচ্ছা তাদের নেই। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী রাষ্ট্রের সম্পদের একটি বড় অংশ ভোগ করে এবং তারা জবাবদিহিহীনভাবে দেশের বৃহৎ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনা করে। সেনাবাহিনী কখনোই সাধারণ মানুষের সম্পদের ওপর থেকে তাদের নিয়ন্ত্রণ ছাড়বে না।
এই সফরের মূল লক্ষ্য ছিল বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার আলোচনা সম্পর্কে অবহিত রাখা এবং মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকার কারণে ওই দেশগুলোর মনে যাতে কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি না হয়, তা নিশ্চিত করা। মূল আলোচনার যাবতীয় দায়িত্ব এখন মুনিরের হাতে এবং সম্ভবত তিনি শিগগিরই ওয়াশিংটন সফর করবেন। এটি নিশ্চিত যে তিনি সেখানে গেলে তাঁকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
মুনিরের প্রতি ট্রাম্পের এই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নতুন কিছু নয়। তিনিই একমাত্র সামরিক নেতা, যাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হোয়াইট হাউসে মধ্যাহ্নভোজ ও আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। অনেকে বলতে পারেন যে ট্রাম্প কেবল পাকিস্তানের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে স্বীকৃতি দিচ্ছেন।
কিন্তু এই আচরণের মাধ্যমে ট্রাম্প ও অন্য মার্কিন নেতারা পাকিস্তানের ভঙ্গুর গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর এক চরম আঘাত হানছেন, যা দেশটির গণতন্ত্র বা আঞ্চলিক শান্তির জন্য কোনো শুভ সংবাদ নয়।
পাকিস্তান সেনাবাহিনী দক্ষিণ এশিয়ায় সন্ত্রাসবাদ ও অস্থিতিশীলতার ইন্ধনদাতা হিসেবে পরিচিত। নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকেই তারা এই নীতি অনুসরণ করে আসছে। এখন এটি একটি বিড়ম্বনা যে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান হিসেবে নিজের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করা একজন সেনাপতিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনার প্রধান মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছে।
ইরানের রেভোল্যুশনারি গার্ডসের সঙ্গে মুনিরের যোগাযোগ মার্কিন আলোচনাপ্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে দেশটির নির্বাচিত সরকার ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে উপেক্ষা করে সামরিক বাহিনীকে প্রকাশ্যে এমন মহিমান্বিত করা অপরিহার্য ছিল।
মোদি ও মুনিরকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এই ভারসাম্য রক্ষা ভারতকেন্দ্রিক একটি চিন্তার উদ্রেক করে। যুক্তরাষ্ট্র কি আবারও সেই পুরোনো ভারত-পাকিস্তানকে ‘একই পাল্লায় মাপা’ বা হাইফেনেশন তত্ত্বে ফিরে যাচ্ছে? বাস্তবতা হলো, বর্তমান বিশ্বে এই হাইফেনেশন বা সমান্তরালীকরণের আর কোনো যৌক্তিকতা নেই। ভারত আজ বৈশ্বিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে, অন্যদিকে পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হিমশিম খাচ্ছে।
পাকিস্তানের এই সংকট সহজে দূর হওয়ার সম্ভাবনা কম, কারণ দেশটির সামরিক বাহিনীর দাপট কমানোর জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার করার কোনো সদিচ্ছা তাদের নেই। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী রাষ্ট্রের সম্পদের একটি বড় অংশ ভোগ করে এবং তারা জবাবদিহিহীনভাবে দেশের বৃহৎ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনা করে।
সেনাবাহিনী কখনোই সাধারণ মানুষের সম্পদের ওপর থেকে তাদের নিয়ন্ত্রণ ছাড়বে না। যুক্তরাষ্ট্র থেকে মুনির যেভাবে গুরুত্ব পাচ্ছেন তাতে এই বাহিনীর সম্পদ কুক্ষিগত করার তৃষ্ণা আরও বাড়বে এবং রাজনৈতিক দলগুলো আরও কোণঠাসা হয়ে পড়বে।
যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে যে মধ্যস্থতার ভূমিকা দিয়েছে এবং ইরান যাতে সায় দিয়েছে, তাতে পশ্চিম এশিয়া ও মুসলিম বিশ্বে পাকিস্তানের গুরুত্ব সাময়িকভাবে বাড়তে পারে। তবে এই সুযোগ কোনো স্থায়ী অর্থনৈতিক সুবিধা বয়ে আনতে পারবে না, কারণ দেশটির অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় চরম গলদ রয়েছে। তা সত্ত্বেও এই নতুন সমীকরণের অংশ হিসেবে পশ্চিম এশিয়া বা আফগানিস্তানে পাকিস্তানকে বড় কোনো নিরাপত্তা ভূমিকা দিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র।
আশির দশকে অনেক উপসাগরীয় রাষ্ট্র প্রতিরক্ষা খাতে পাকিস্তানের ওপর নির্ভর করত। পরবর্তী সময়ে এই সম্পর্ক কিছুটা ফিকে হলেও সৌদি আরবের সঙ্গে কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তির ফলে পাকিস্তানের গুরুত্ব আবার বৃদ্ধি পেয়েছে।
ভারতকে এখন খুব সাবধানে পশ্চিম এশিয়ায় তার নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক অবস্থান জোরদার করতে হবে। এটি কেবল সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। আমিরাতের সঙ্গে সম্পর্ক অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ তবে ইরানের সঙ্গে উত্তেজনার অবসান ঘটলে ওই অঞ্চলের পরিস্থিতিতে আমূল পরিবর্তন আসবে। তাই ভারতের অর্থনৈতিক স্বার্থে উপসাগরীয় অঞ্চলের সব দেশের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে এবং সেই প্রক্রিয়া এখনই শুরু হওয়া জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্র চাইবে কোয়াড বা চতুর্মুখী নিরাপত্তা সংলাপে ভারতের ভূমিকা আরও শক্তিশালী হোক, যাতে ভারত প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আরও বড় দায়িত্ব পালন করে। তবে এখানে একটি সমস্যা আছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় কৌশল মূলত চীনের সঙ্গে তাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। ধারণা করা হয়, ট্রাম্প বেইজিংয়ের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে চান। এমন অবস্থায় চীনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ভারতের কেবল কোয়াড জাতীয় কাঠামোর ওপর নির্ভর করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
পরিশেষে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গভীর সম্পর্কের কথা প্রতিনিয়ত বলা হলেও আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, গত মার্চ মাসে ভারতে ক্রিস্টোফার ল্যান্ডাউ এক স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে চীনের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র যে ভুল করেছে ভারতের বেলায় তারা সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে চায় না। যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থানের গুরুত্ব আমাদের অনুধাবন করতে হবে।
বিবেক কাটজু সাবেক ভারতীয় কূটনৈতিক
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেক্স থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত