দীপেন দেওয়ান
দীপেন দেওয়ান

মতামত

পার্বত্য মন্ত্রীর ঝটিকা পদত্যাগ এবং পাহাড়ে নানা জল্পনা–কল্পনা

পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের ঝটিকা পদত্যাগের বিষয়টি পার্বত্য অঞ্চল ছাড়িয়ে সারা দেশে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

ঈদের দীর্ঘ সরকারি ছুটি শেষে দাপ্তরিক কাজ শুরুর প্রথম দিনের প্রথম প্রহরে প্রধানমন্ত্রীর বরাবরে পদত্যাগপত্র দাখিল এবং সঙ্গে সঙ্গে গ্রহণ ও দ্বিতীয় প্রহরে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এই অস্বাভাবিক দ্রুতগতিই স্বাভাবিকভাবে বিষয়টি সর্বস্তরে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে।

মানুষের মনে প্রশ্নের উদ্রেক করেছে, মন্ত্রী আসলে কোন কারণে পদত্যাগ করেছেন? সত্যি কি স্বাস্থ্যগত কারণে পদত্যাগ? স্বাস্থ্যগত কারণে পদত্যাগ হলে আগেভাগে কাউকে না জানিয়ে হঠাৎ হওয়ার কথা নয়। বাধ্য করা হলে কোন প্রক্রিয়ায় সেটি করা হয়েছে? প্রধানমন্ত্রীর কাছে মন্ত্রীর কর্মকাণ্ড সন্তোষজনক মনে না হলে পদত্যাগের ঘটনা ঘটতে পারে। অথবা মন্ত্রীর স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে অস্তিকর পরিবেশ তৈরি করে পদ্ধতিগতভাবে স্বেচ্ছায় পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে।

পরিপূরক এই দুটি কারণ যদি সত্যি হয়ে থাকে, বোঝাই যাচ্ছে, উভয় পক্ষে চাপা উত্তেজনার পরিবেশ ছিল এবং তারই প্রকাশ ঘটেছে ১ জুন। প্রধানমন্ত্রীর বরাবর মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগপত্র প্রদানের আইনি প্রক্রিয়া নিয়েও কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন। তবে এখন পর্যন্ত সরকারি তরফে কোনো বক্তব্য আসেনি, বিষয়টি ধোঁয়াশার মধ্যে রয়েছে।

মোদ্দাকথা, মানুষের কাছে মন্ত্রীর পদত্যাগ স্বাভাবিক কারণে ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় হয়নি—এ ধারণা সৃষ্টি হয়েছে। তাহলে এই অস্বচ্ছ পদত্যাগের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিষয়ে সরকারের কী নীতি প্রতিফলিত হয়েছে? ভবিষ্যতে কী হবে?

এ নিয়ে মানুষকে, বিশেষ করে পাহাড়ের মানুষকে কৌতূহলী ও উদ্বিগ্ন করেছে। চিম্বুক পাহাড়ে পরিবেশ দিবসের একটি সভায় গিয়েছিলাম। সভায় আগত ব্যক্তিরা সবাই খেটে খাওয়া ম্রো জনগোষ্ঠীর। সভা শেষে দুপুরে খাওয়ার সময় সবারই জিজ্ঞাসা, মন্ত্রীর পদত্যাগ কেন এবং পাহাড়ের পরিস্থিতি কী হবে! অনেকে বলেছেন, পরিস্থিতি খারাপ হলে নেতিবাচক নানা উপসর্গের সবচেয়ে বেশি শিকার হন তাঁদের মতো খেটে খাওয়া মানুষেরা। নিয়ন্ত্রণের বেড়াজালে বেঁচে থাকার জন্য উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। বিক্রি করলেও চাঁদাবাজিতে বড় একটি অংশ চলে যায়।

প্রবাদে আছে, ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়। পাহাড়ের মানুষও স্থিতাবস্থার সামান্য এদিক-ওদিক হলে আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন। এ অঞ্চলে দীর্ঘদিনে তৈরি হওয়া আশাভঙ্গের রাজনৈতিক আবহ এ অবস্থার জন্য দায়ী।

পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক সমস্যা রাজনৈতিকভাবে সমাধানের জন্য ১৯৯৭ সালে ২ ডিসেম্বর সরকারের সঙ্গে পার্বত্য চুক্তি হয়েছে। শান্তির আশায় চুক্তি হওয়ায় এটি শান্তিচুক্তি হিসেবে পরিচিত। এই চুক্তি পার্বত্যবাসী, বিশেষ করে এ অঞ্চলের ১১টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক আশা জাগিয়েছে। তাদের বিশ্বাস ছিল, চুক্তি বাস্তবায়নে শান্তি আসবে, ভূমির মালিকানা নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। স্থায়ী শান্তি ও ভূমির নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে আর্থসামাজিক উন্নয়নের মাধ্যমে অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে।

কিন্তু পার্বত্যবাসীর অভিযোগ, চুক্তি স্বাক্ষরকারী আওয়ামী লীগ সরকার দীর্ঘ প্রায় দেড় দশক নানা কলাকৌশলে ক্ষমতায় থাকলেও চুক্তি বাস্তবায়ন করেনি। এমনকি বাস্তবায়নের আগ্রহও পরিলক্ষিত হয়নি। আবার বিএনপি বিরোধিতা করলেও ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে চুক্তি বাতিল করেনি।

তিন মাসের মাথায় দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগে আবারও পার্বত্যবাসীকে, বিশেষ করে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রোসহ ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে শুধু হতাশ করেনি, উদ্বিগ্নও করে তুলেছে। এ জন্য দীপেন দেওয়ানকে স্বপদে পুনর্বহালের জন্য রাজপথে নেমেছেন অনেকে।

এ অবস্থায় প্রায় ২৮ বছর ধরে চুক্তি বাস্তবায়ন মূলত সেই ১৯৯৮ সালের প্রস্তুতিমূলক আয়োজনের মধ্যে অচলাবস্থায় পড়ে রয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়, আঞ্চলিক ও জেলা পরিষদ গঠনসহ বাস্তবায়নসংক্রান্ত বিভিন্ন কাঠামো তৈরির পর আর মূল কাজ হয়নি। অনেকটা উৎসব উদ্‌যাপনের সব আয়োজন হয়েছে, কিন্তু ভোজ-বিনোদনের ব্যবস্থা নেই। এর ফলে চুক্তি বাস্তবায়নের অপেক্ষায় থেকেও উপেক্ষিত পার্বত্যবাসী বর্তমানে চরমভাবে হতাশাগ্রস্ত। দশকে পর দশক হতাশাগ্রস্ত মানুষ কী করতে পারে না পারে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট পথরেখা থাকে না। পার্বত্য চট্টগ্রামে এখন সে রকমই পথরেখাহীন অবস্থা বিরাজ করছে।

স্বৈরাচারী সরকারের পতনের গণ-অভ্যুত্থানের মূল চেতনা ছিল রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার ও পরিবর্তন। সেই চেতনা সারা দেশে গণমানুষের যে আশার সঞ্চার করেছিল, সেই আশায় পার্বত্যবাসীও আশাবাদী হয়েছিল। রাষ্ট্র বহুত্বের চেতনায় সবার আকাঙ্ক্ষা পূরণে অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে বিশ্বাসে পাহাড়ি তরুণেরাও স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন। তখন পাহাড়ি তরুণদের আঁকা দেয়ালচিত্রে (গ্রাফিতি) সেই আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয়েছে। তরুণেরা পরিচয়ের সাংবিধানিক স্বীকৃতি, পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন, শাসনতান্ত্রিক কাঠামোয় সব জাতিগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তিতে সমতা ও ন্যায্যতার কথা দেয়ালচিত্রে তুলে ধরেছেন।

দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির সভাপতি তারেক রহমানও দেশে ফিরে সংস্কারের চেতনায় রংধনু জাতীয়তা নির্মাণের কথা তুলে ধরেছেন, যা দক্ষিণ আফ্রিকায় সাদা, কালো, বাদামি, হলুদ—সব জাতিগোষ্ঠীকে আত্তীকরণে (অ্যাসিমিলেশন) নয়, অন্তর্ভুক্তিকরণে (ইনক্ল‍ুশন) বর্ণবাদবিরোধী মহান নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা রংধনু জাতীয়তা নির্মাণ করেছিলেন। এ জন্য পাহাড়ের মানুষ এবারে পার্বত্য অঞ্চলের তিনটি আসনেই বিএনপিকে ভোট প্রদান করেছে।

ক্ষমতায় এসে রাঙামাটি থেকে নির্বাচিত দীপেন দেওয়ানকে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী নিয়োগ দেওয়ায় বিএনপি কথা রেখেছে মনে করা হয়েছে। এর ফলে এবার কিছু একটা হবে ধারণায় পার্বত্যবাসীকে যথেষ্ট আশাবাদীও করেছে। কিন্তু পাশাপাশি তিন জেলার চৌহদ্দির ছোট মন্ত্রণালয়ে বাইরের আরেকজন প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়ায় ভাবনায় ফেলে দিয়েছে। অনেকে প্রতিমন্ত্রী নিয়োগে প্রতিবাদ ও নিয়োগ বাতিলের দাবি করেছিলেন।

এ ধরনের অস্বস্তির তিন মাসের মাথায় দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগে আবারও পার্বত্যবাসীকে, বিশেষ করে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রোসহ ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে শুধু হতাশ করেনি, উদ্বিগ্নও করে তুলেছে। এ জন্য দীপেন দেওয়ানকে স্বপদে পুনর্বহালের জন্য রাজপথে নেমেছেন অনেকে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের কো-চেয়ার জুয়ামলিয়ান আমলাইয়ের মতে, বাইরের প্রতিমন্ত্রী বহাল রেখে পার্বত্য মন্ত্রীর পদত্যাগে বাধ্য করা সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক প্রতিফলন মনে হয় না। সম্প্রতি অসমর্থিতভাবে শোনা যাচ্ছে, পাহাড়ি একজনকে উপমন্ত্রী নিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে। বিষয়টি সত্য না হলে ভালো, যদি সত্য হয়ে থাকে, যাঁকে উপমন্ত্রী করা হবে তাঁর জন্য যেমন অস্বস্তিকর, তেমনি হবে পার্বত্য চুক্তির লঙ্ঘন। একই সঙ্গে পার্বত্যবাসীকে অপরায়নের শামিল হবে।                

  • বুদ্ধজ্যোতি চাকমা প্রথম আলোর বান্দরবান প্রতিনিধি
    মতামত লেখকের নিজস্ব