জাতীয় বাজেট
জাতীয় বাজেট

মতামত

যেসব বিষয় বিবেচনায় না নিলে বাজেট হতে পারে ফাঁপা স্বপ্নের দলিল

বাজেট মৌসুম এলে বিশেষজ্ঞদের সেমিনার, অর্থনীতিবিদদের সংবাদ সম্মেলন আর সংগঠনগুলোর স্মারকলিপিতে দেশ সয়লাব হয়ে যায়। অথচ বেশির ভাগ আলোচনাই শেষ পর্যন্ত সরকারি দলিলের ভাষায় হারিয়ে যায়, সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায় না। এবার দুটো প্রশ্ন একসঙ্গে মেলাতে চাই: কীভাবে বাজেট মানুষের কষ্ট কমাবে, আবার একই সঙ্গে দেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির দিকে নিয়ে যাবে?

বর্তমানে জিডিপি ৫১৭ বিলিয়ন ডলার। ২০৩৪ সালে ট্রিলিয়ন ডলারে যেতে বছরে গড়ে ৮-৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি লাগবে, অথচ গত বছর ছিল মাত্র ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০০০ সালে যেখানে মাথাপিছু আয় ছিল ৪০০ ডলারের নিচে, তা এখন ২ হাজার ৮০০ ডলারের কাছাকাছি।

বিবিএসের হাউসহোল্ড সার্ভে অনুযায়ী, দেশের শীর্ষ ১০ শতাংশ পরিবার নিচের ৪০ শতাংশ মানুষের চেয়ে প্রায় ১২ গুণ বেশি আয় করে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৯ শতাংশ। প্রবৃদ্ধি হয়েছে, কিন্তু সমানভাবে ভাগ হয়নি। মানুষকে দুর্বল করে ট্রিলিয়ন ডলার অর্জন সম্ভব নয়।

প্রথম কথা: মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ মানে বাজার সংস্কার

দেশে মজুরি বৃদ্ধির হার মাত্র ৮ দশমিক ১২ শতাংশে স্থির থাকায় প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমছে। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ থেকে ১৪ শতাংশ। কৃষি সরবরাহ চেইনের অদক্ষতা সরাসরি মানুষের পাতে চাপ বাড়াচ্ছে। ভারতে মূল্যস্ফীতি ৪ দশমিক ১ শতাংশ, ভিয়েতনামে ৩ থেকে ৫ শতাংশ। তাদের সাফল্যের কারণ কৃষি সরবরাহ চেইন ও লজিস্টিক আধুনিকায়ন।

ভারতের ‘ন্যাশনাল ই-মার্কেট’ প্ল্যাটফর্মের পর কৃষকের আয় গড়ে ১২ শতাংশ বেড়েছে, ভোক্তার দাম ৮ শতাংশ কমেছে। ভিয়েতনামের ‘ভিএনএ অ্যাগ্রি ট্রেস’, ফিলিপাইনের ‘ই-সাবসাব’ এবং ইন্দোনেশিয়ার ‘তানিহাব’-এর মতো অ্যাগ্রি-টেক প্ল্যাটফর্ম মধ্যস্বত্বভোগীর মুনাফা প্রায় ৩৫ শতাংশ কমিয়ে একই সঙ্গে উৎপাদকের আয় বাড়িয়েছে এবং ভোক্তার খরচ কমিয়েছে।

বাংলাদেশেও অ্যাগ্রি-টেক স্টার্টআপে বিশেষ বরাদ্দ ও কর অবকাশ এখন অপরিহার্য। দালাল চক্র ভাঙতে প্রযুক্তির বাধ্যতামূলক ব্যবহার ছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব।

দ্বিতীয় কথা: করমুক্ত সীমা বাড়ান, মধ্যবিত্তকে ভোক্তা বানান

বর্তমান করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে তিন লাখ টাকা। এফবিসিসিআই ও ঢাকা চেম্বার ৫ লাখ টাকার দাবি করেছে। জামায়াতে ইসলামী দাবি করেছে ৬ লাখ। এডিবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতে ২০২৩ সালে করমুক্ত সীমা বাড়ানোর পর খুচরা বাজারে বিক্রি ১৮ শতাংশ বেড়েছিল। ভারতে করমুক্ত সীমা মাথাপিছু আয়ের ২ দশমিক ৬ গুণ, আমাদের মাত্র ১ দশমিক ১ গুণ। সেই অনুপাতে সীমা হওয়া উচিত ৮ লাখ টাকা, তাই ৬ লাখের দাবিও ন্যূনতম। ৮-৯ শতাংশ মূল্যস্ফীতিতে দুই বছরে সাড়ে তিন লাখ টাকার ক্রয়ক্ষমতা নেমে আড়াই লাখের কাছে এসেছে।

ঢাকায় একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক খরচ ২০২০ সালে ৪৫ হাজার থেকে ২০২৫ সালে ৭০ হাজার টাকায় পৌঁছেছে, অথচ বেতন বেড়েছে গড়ে মাত্র ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ। ফলে প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে, যা সরাসরি ভোক্তা চাহিদা সংকোচন ঘটাচ্ছে। যুক্তরাজ্য ও ভারতের মতো দেশে করমুক্ত সীমা মূল্যস্ফীতি সূচকের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমন্বয় হয়, বাংলাদেশেও এই আইনি কাঠামো তৈরি করা দরকার।

তৃতীয় কথা: পে স্কেল এখনই নয়, উৎপাদনশীলতার সঙ্গে যুক্ত করে ধাপে ধাপে

বেতন-ভাতা ও পেনশন খাতে নতুন অর্থবছরে ১ম ধাপের আংশিক বাস্তবায়নে বরাদ্দ বাড়ছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। ইউনিভার্সিটি অব ডুইসবার্গের গবেষণা বলছে, সরকারি বেতন ১০ শতাংশ বাড়লে জবাবদিহির সূচক না বাড়লে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ে।

গবেষণা আরও দেখাচ্ছে, বাংলাদেশের সিভিল সার্ভিসে উৎপাদনশীলতা ও বেতনের মধ্যকার ফারাক দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি। মালয়েশিয়া ২০১২ সালে সরকারি বেতন তিন ধাপে বাড়িয়েছে, প্রতিটি ধাপের শর্ত ছিল ই-সেবায় রূপান্তর, ফাইল নিষ্পত্তির সময় ৪০ শতাংশ কমানো এবং নাগরিক সন্তুষ্টি জরিপে ৭০ শতাংশ স্কোর। ফলে বেতন বাড়লেও উৎপাদনশীলতা বেড়েছে ২২ শতাংশ। শ্রীলঙ্কার ‘পাবলিক সেক্টর পারফরম্যান্স লিংকড ইনক্রিমেন্ট’ এবং ভারতের সিটিসি মডেলও অনুসরণযোগ্য। নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দিয়ে পাঁচ বছরে এবং সেবার মান ও দুর্নীতি কমানোর সঙ্গে যুক্ত করে পে স্কেল বাস্তবায়ন করতে হবে।

চতুর্থ কথা: বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ভর্তুকি সংস্কার করুন, অপচয় বন্ধ করুন

২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সম্মিলিত ভর্তুকি বরাদ্দ ছিল প্রায় ৪০,০০০ কোটি টাকা। তবে কাঠামোগত সীমাবদ্ধতায় এর বড় অংশ ধনীরা ভোগ করছেন। একই সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৭ শতাংশ, অথচ ক্যাপাসিটি চার্জ বেড়েছে ৫৬ শতাংশ। অর্থাৎ বিদ্যুৎ না কিনেও অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকদের কোটি কোটি টাকা দিতে হচ্ছে।

সমাধান তিনটি: ক্যাপাসিটি চার্জের চুক্তি পুনর্বিন্যাস, সৌরবিদ্যুতে সব শুল্ক ও মূল্য সংযোজন কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার এবং নেট মিটারিং গাইডলাইন সহজ করা। ভারতের লক্ষ্যমাত্রা হলো ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০০ গিগাওয়াট অ-জীবাশ্ম জ্বালানি। যার মধ্যে সৌরবিদ্যুতের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ২৮০ থেকে ৩০০ গিগাওয়াট। ভিয়েতনামও ফিড-ইন ট্যারিফের মাধ্যমে দ্রুত ছাদ সৌরবিদ্যুৎ প্রসার ঘটিয়েছে, আমাদের মোট উৎপাদনে সৌরের অংশ এখনো ৫ শতাংশের নিচে। জ্বালানি ভর্তুকির কাঠামো ঢেলে সাজাতে হবে, যাতে সত্যিকারের গরিব মানুষ উপকার পান।

পঞ্চম কথা: শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ মানে ভবিষ্যতের উৎপাদনশীলতা

আসন্ন এডিপিতে শিক্ষায় বরাদ্দ ৪৭ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা, তবে গত পাঁচ বছরে জিডিপি অনুপাত ২ শতাংশ থেকে নিচে নামছে। বিশ্বব্যাংকের হিউম্যান ক্যাপিটাল ইনডেক্স অনুযায়ী, একজন বাংলাদেশি শিশু সম্ভাব্য উৎপাদনশীলতার মাত্র ৪৮ শতাংশ অর্জন করতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়া ও মালয়েশিয়া এই সূচক ৭০ থেকে ৮০ শতাংশের ওপরে নিয়ে গেছে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জেমস হেকম্যানের ‘হেকম্যান ইকুয়েশন’ দেখায়, প্রারম্ভিক শিক্ষায় বিনিয়োগের রিটার্ন আসে ৭ থেকে ১০ গুণ।

ইউনেসকোর তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষা খাতে জিডিপির অন্তত ৪-৬ শতাংশ বরাদ্দ দিলে মানবসম্পদের উৎপাদনশীলতা দ্বিগুণ হয়। দক্ষিণ কোরিয়া ১৯৮০-এর দশকে শিক্ষা বাজেট জিডিপির ৫ শতাংশে নিয়ে দুই দশকে প্রযুক্তি রপ্তানিতে বিশ্বশক্তি হয়েছে। ভিয়েতনাম মোট রাজ্য ব্যয়ের ২০ শতাংশ শিক্ষায় বাধ্যতামূলকভাবে দেয়, আর তাদের রপ্তানি ঝুড়িতে এখন বিভিন্ন রকমের প্রোডাক্ট।

আসন্ন বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ মোট বাজেটের মাত্র ৫.৩ শতাংশ (প্রায় ৪১,৯০৮ কোটি টাকা), যা জিডিপির শূন্য দশমিক ৭ থেকে শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ। অথচ আউট-অব-পকেট খরচ ৭০ শতাংশের ওপরে। ভিয়েতনাম স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ২.৫-৩ শতাংশ বরাদ্দ দিয়ে ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজের দিকে এগিয়েছে।

অ্যাকশনএইডের প্রতিবেদন বলছে, প্রাথমিক শিক্ষায় প্রতি ১০০ টাকার ৩৫ টাকা প্রশাসনিক অদক্ষতায় নষ্ট হয়। পাশাপাশি স্বাস্থ্যে অপরিকল্পিত হাসপাতাল ভবন নির্মাণ ও কম ব্যবহৃত মেডিক্যাল সরঞ্জামেও বিপুল অপচয় হয়। তাই শুধু বরাদ্দ নয়, ভিয়েতনামের মতো আউটপুটভিত্তিক বরাদ্দ পদ্ধতি চালু করতে হবে। ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আমাদের অবকাঠামো বা মেগা প্রজেক্টের চেয়ে এই ‘হিউম্যান ক্যাপিটাল’ বা মানবপুঁজিতে বিনিয়োগের রিটার্ন দীর্ঘ মেয়াদে অনেক বেশি টেকসই হবে আর এর জন্য স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় মোট জিডিপির ৩-৪ শতাংশ বরাদ্দ লাগবে।

ষষ্ঠ কথা: কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ান, চাপ দিন সম্পদশালীদের ওপর

বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৬ দশমিক ৯ শতাংশ। ভিয়েতনামে ১৩ শতাংশ, ভারতে ১১ থেকে ১২ শতাংশ। জাতিসংঘের হিসাবে টেকসই উন্নয়নের জন্য এই অনুপাত ১২ থেকে ১৫ শতাংশ দরকার। মাত্র ২ শতাংশ বাড়াতে পারলে বছরে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা বাড়তি রাজস্ব মিলবে। মোট রাজস্বের ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ আসে ভ্যাট ও শুল্ক থেকে, যা ধনী-দরিদ্রনির্বিশেষে সবাইকে দিতে হয়, ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে যেতে প্রত্যক্ষ কর ৬০ শতাংশে নিতে হবে। আইএমএফের হিসাবে, রাজস্ব সংগ্রহের প্রায় ৪০ শতাংশই আসে সীমিত কিছু বড় করদাতার কাছ থেকে। বাংলাদেশে মাত্র ২ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ আয়কর দেন।

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ট্যাক্স জমা দেওয়া মোট ব্যক্তির অর্ধেকই ঢাকা ও চট্টগ্রাম নগরীর বাসিন্দা। বাকি জেলায় কর নেট বিস্তার করতে সহজে, ইউটিলিটি বিল ও ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সঙ্গে টিআইএন বাধ্যতামূলক করা ছাড়া বিকল্প নেই। একই সঙ্গে সম্পদের তথ্য গোপন রাখা সহজ করলে কালোটাকা সাদা করার ‘বিশেষ সুযোগ’ কখনোই কর ন্যায্যতা আনতে পারে না। এনবিআরের অনুমান, কর ফাঁকি ও অব্যাহতির কারণে বছরে ৬০ থেকে ৭০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারিয়ে যাচ্ছে। ভিয়েতনাম ডিজিটাল লেনদেনে কর আরোপ করে পাঁচ বছরে কর-জিডিপি অনুপাত ৩ শতাংশ বাড়িয়েছে। মালয়েশিয়ার স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল করব্যবস্থা ‘হ্যাসানা’ আমাদের জন্য অনুসরণযোগ্য মডেল।

সপ্তম কথা: ঋণের বোঝা কমান, বিনিয়োগের জায়গা তৈরি করুন

২০২৫-২৬ বাজেটের প্রায় ২২ শতাংশ ঋণের সুদ পরিশোধ বাবদ বরাদ্দ, অর্থাৎ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মোট ব্যয়ের দ্বিগুণ সুদে চলে যাচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়া ১৯৭০-এর দশকে একই ফাঁদে পড়েছিল। তাদের উত্তরণ হয়েছিল রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও প্রযুক্তি উন্নয়নের মাধ্যমে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা তৈরি করে, শিক্ষা-স্বাস্থ্য কাটছাঁট করে নয়। প্রতিটি প্রকল্পের বিপরীতে অর্থায়নের উৎস, সুদসহ মোট ব্যয় এবং প্রত্যাশিত আয়ের প্রক্ষেপণ স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা উচিত।

অষ্টম কথা: সামাজিক সুরক্ষায় স্মার্ট বিনিয়োগ

উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে দরিদ্র মানুষের জন্য খাদ্য ও নগদ সহায়তা কমলে কর্মশক্তির স্বাস্থ্য ও সক্ষমতা কমে। একটি অসুস্থ ও অপুষ্ট শ্রমশক্তি দিয়ে ট্রিলিয়ন ডলারের উৎপাদন হয় না। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা ও ভাতার পরিমাণ বাড়াতে হবে এবং ডিজিটাল স্বচ্ছতার মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্তভাবে সেটি বাস্তবায়ন করতে হবে।

নবম কথা: জলবায়ু–সহনশীলতা, ট্রিলিয়ন ডলারের পথে অদৃশ্য হুমকি

বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা অনুসারে ২০৫০ সাল পর্যন্ত জলবায়ু অভিযোজনে প্রয়োজন ২৩০ বিলিয়ন ডলার, বার্ষিক প্রায় ৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু বাজেটে জলবায়ু-সম্পর্কিত বরাদ্দ এখনো জিডিপির ১ শতাংশের নিচে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা ও ঘূর্ণিঝড়ের কারণে কৃষি ও জীবিকা হুমকির মুখে। ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্ন টেকসই হতে হলে জলবায়ু অভিযোজন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে বাজেটের মূল অগ্রাধিকারে রাখতে হবে।

দশম কথা: বেকারত্ব দূরীকরণ, অনেক সমস্যার একমাত্র সমাধান

বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প মোট শিল্প কর্মসংস্থানের প্রায় ৮০ শতাংশ তৈরি করে, অথচ ব্যাংকঋণের মাত্র ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পায়। বর্তমানে আরএমজি খাত একাই রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি। আইটি, ফার্মা, চামড়া ও অ্যাগ্রো-প্রসেসিংয়ে রপ্তানি বৈচিত্র্য না আনলে ট্রিলিয়ন ডলার থাকবে কাগজে।

এমসিসিআইসহ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোও বলছে, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করলে বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থান হবে। করপোরেট ট্যাক্স যুক্তিসংগত রাখলে বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে। শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে বেকারত্বের হার উল্লেখযোগ্য। পার্বত্য চট্টগ্রাম ও উত্তরবঙ্গে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও সফটওয়্যার পার্কে বিশেষ বরাদ্দ রাখলে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি আঞ্চলিক বৈষম্যও কমবে।

বড় খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি বন্ধ করে এসএমই খাতে ‘ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ড’, স্কিল প্রোগ্রাম এবং জামানতবিহীন সহজ ঋণের ব্যবস্থা করা হলে তা গ্রামীণ ও শহরতলির বেকারত্ব দূরে গেমচেঞ্জার হিসেবে কাজ করবে।

একাদশ কথা: বাজেট বাস্তবায়নে পর্যবেক্ষণব্যবস্থা

গত পাঁচ বছরের বাজেট মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, প্রায় ৪০ শতাংশ জনকল্যাণমুখী প্রস্তাব কাগজেই থেকে গেছে। সিপিডি ও বিআইডিএসের সুপারিশ অনুযায়ী, একটি স্বাধীন ‘বাজেট ওয়াচডগ’ তৈরি করা দরকার, যেখানে সংসদ সদস্য, অর্থনীতিবিদ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। এই কমিটি প্রতি তিন মাস অন্তর মূল্যস্ফীতি, খাদ্যনিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবার আউটরিচ সূচকের অগ্রগতি প্রকাশ করবে। নেপাল ও মালয়েশিয়ায় এই মডেল কাজ করছে, বাংলাদেশেরও এখন সময় এসেছে।

শেষ কথাটি সহজ। পে স্কেলের ১ম ধাপের বরাদ্দ ৩৫ হাজার কোটি, বিদ্যুৎ ভর্তুকির ৬২ হাজার কোটি আর ঋণের সুদের ১ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা একসঙ্গে যোগ করলে বোঝা যায়, বাজেটের কতটা অংশ কোনো উৎপাদনশীল বিনিয়োগ ছাড়াই চলে যাচ্ছে। এই তিনটি খাতে একই সঙ্গে সংস্কার না আনলে ট্রিলিয়ন ডলারের স্বপ্ন স্বপ্নই থাকবে। বাজেটের সাফল্য জিডিপির শতাংশে মাপা হয় না, মাপা হয় মানুষ বাজারে গিয়ে কতটা স্বস্তিতে চাল-ডাল কিনতে পারছেন, সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে পারছেন, চিকিৎসা করাতে পারছেন, আর ভবিষ্যৎ নিয়ে কতটা আশাবাদী থাকতে পারছেন।

  • সুবাইল বিন আলম টেকসই উন্নয়ন–বিষয়ক লেখক, contact@subail.com

    মতামত লেখকের নিজস্ব