প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

মতামত

নির্বাচন-পরবর্তী বাস্তবতা: সংবিধানের পথেই সমাধান

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা যত বাড়ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে—ভোটের দিনটিই শেষ কথা নয়। ফলাফল ঘোষণার পরপরই শুরু হবে সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা। কীভাবে গঠিত হবে নতুন সরকার? কে কাকে শপথ পড়াবেন, কবে সংসদ বসবে, কোন প্রক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ হবে—এসব বিষয়ে নানা জল্পনা–কল্পনা থাকলেও চূড়ান্ত নির্দেশনা দেবে সংবিধান। কারণ, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ক্ষমতার হস্তান্তর কোনো সমঝোতা বা রাজনৈতিক কৌশলের বিষয় নয়; এটি পূর্বনির্ধারিত সাংবিধানিক বিধান অনুসরণে সম্পন্ন করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া।

প্রথমেই আসে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় নিয়ে প্রশ্ন। সংবিধানের ৭২(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করতে হবে। এটি নির্দেশনামূলক নয়, বাধ্যতামূলক বিধান। অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই নতুন সংসদ কার্যকর হতে হবে। প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের জন্য পৃথক কোনো সময়সীমা নির্ধারিত না থাকলেও সংসদ অধিবেশন শুরু হওয়ার আগে একজন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া বাস্তবিক ও সাংবিধানিকভাবে অপরিহার্য—কারণ রাষ্ট্রে নির্বাহী ক্ষমতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের ক্ষেত্রে ৫৬(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘যে সংসদ সদস্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন বলিয়া রাষ্ট্রপতির নিকট প্রতীয়মান হইবেন, রাষ্ট্রপতি তাঁহাকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করিবেন।’ সংসদে কোনো দলের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে প্রক্রিয়াটি প্রায় স্বয়ংক্রিয়—সংখ্যাগরিষ্ঠ দল তাদের নেতা নির্বাচন করবে এবং রাষ্ট্রপতি তাঁকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেবেন।

তবে জটিলতা দেখা দেয় যখন কোনো দলই এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারে না। তখন রাষ্ট্রপতির ভূমিকা হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে তিনি নিজের পছন্দের কাউকে বেছে নিতে পারেন না; বরং এমন ব্যক্তিকেই নিয়োগ দিতে হবে, যিনি সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থা অর্জনে সক্ষম বলে যুক্তিসংগতভাবে প্রতীয়মান হন।
এখানে প্রশ্ন ওঠে, সংসদের আস্থা কীভাবে নির্ধারিত হবে? বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামো মূলত ওয়েস্টমিনস্টার মডেল অনুসরণ করে। এ ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর জন্য সংসদের আস্থা অর্জন করা শুধু রাজনৈতিক শালীনতার বিষয় নয়, এটি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা।

নির্বাচন কেবল ভোটের হিসাব নয়; এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক সক্ষমতারও পরীক্ষা। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মুহূর্তে সংবিধানই একমাত্র নির্ভরযোগ্য মানদণ্ড। সেই মানদণ্ড মেনে চলতে পারলেই বাংলাদেশ প্রমাণ করতে পারবে—ক্ষমতার পরিবর্তন এখানে কোনো সমঝোতার ফল নয়, বরং আইনের শাসনের প্রতি অবিচল আস্থার প্রতিফলন।

যুক্তরাজ্যের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, ঝুলন্ত পার্লামেন্টের ক্ষেত্রে দলগুলোর মধ্যে আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমেই সমাধান আসে। ব্রিটেনে ২০১০ সালের নির্বাচনে কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় কনজারভেটিভ ও লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের সমঝোতায় জোট সরকার গঠিত হয়। পুরো সময় বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী দায়িত্বে বহাল ছিলেন, যাতে প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বিঘ্নিত না হয়। বাংলাদেশেও অনুরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্বে বহাল থেকে রাজনৈতিক সমঝোতার সুযোগ সৃষ্টি করবে—এটাই সাংবিধানিক শালীনতা।

রাষ্ট্রপতির নিয়োগপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী প্রকৃতপক্ষে সংসদের আস্থা ভোগ করছেন কি না, তা যাচাইয়ের পথও স্পষ্ট। সংসদে আস্থা ভোট বা অনুরূপ প্রস্তাবের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠতার পরীক্ষা হতে পারে। যদি কোনো নেতা প্রয়োজনীয় সমর্থন প্রমাণে ব্যর্থ হন এবং যুক্তিসংগত প্রচেষ্টার পরও বিকল্প নেতৃত্ব পাওয়া না যায়, তবে সংসদ ভেঙে দিয়ে পুনর্নির্বাচনই শেষ সাংবিধানিক উপায়। এটি অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও অসাংবিধানিক নয়।

সংসদ কার্যকর হওয়ার পূর্বশর্ত হলো সদস্যদের শপথ গ্রহণ। সংবিধানের ১৪৮(১) অনুচ্ছেদ ও তৃতীয় তফসিল অনুযায়ী স্পিকার নবনির্বাচিত সদস্যদের শপথ পাঠ করান। স্পিকার অনুপস্থিত থাকলে বা দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে ৭৪(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ডেপুটি স্পিকার, অথবা তাঁর অবর্তমানে সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুসারে মনোনীত সদস্য স্পিকারের দায়িত্ব পালন করবেন।

বর্তমানে বাংলাদেশে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার—উভয় পদই শূন্য। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, নবনির্বাচিত সদস্যদের শপথ কে পড়াবেন? সংবিধানের ১৪৮(২ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নির্ধারিত ব্যক্তি নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশের তিন দিনের মধ্যে শপথ না পড়ালে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে এ দায়িত্ব পালন করবেন। এ ছাড়া সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ৫ নম্বর বিধি অনুযায়ী, স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের পদ শূন্য থাকলে রাষ্ট্রপতি শপথ পাঠ ও সংসদের প্রথম অধিবেশন পরিচালনার জন্য একজনকে মনোনীত করতে পারেন। অর্থাৎ শপথপ্রক্রিয়া অচল হয়ে পড়ার আশঙ্কা সংবিধান নিজেই দূর করেছে।

স্পিকার নির্বাচনের ক্ষেত্রেও ধারাবাহিকতার বিধান রয়েছে। ৭৪(৬) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নতুন স্পিকার দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত বিদায়ী স্পিকার বহাল থাকেন। আর যদি স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার—কেউই দায়িত্বে না থাকেন, তবে ৭৪(৩) অনুচ্ছেদ ও কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি একজন সদস্যকে দায়িত্ব দিতে পারেন, যিনি স্পিকার নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন। ৭৪(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন বাধ্যতামূলক।

নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার পরিস্থিতিতে এসব বিধান প্রায় অদৃশ্য থাকে। কিন্তু ঝুলন্ত সংসদে প্রতিটি অনুচ্ছেদই তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। তখন সংবিধানের অক্ষর ও মর্ম—উভয়ের প্রতিই আনুগত্য অপরিহার্য। রাষ্ট্রপতির নিরপেক্ষতা, রাজনৈতিক দলগুলোর সংলাপের সদিচ্ছা এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধাই নিশ্চিত করতে পারে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর।

পরিশেষে নির্বাচন কেবল ভোটের হিসাব নয়; এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক সক্ষমতারও পরীক্ষা। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মুহূর্তে সংবিধানই একমাত্র নির্ভরযোগ্য মানদণ্ড। সেই মানদণ্ড মেনে চলতে পারলেই বাংলাদেশ প্রমাণ করতে পারবে—ক্ষমতার পরিবর্তন এখানে কোনো সমঝোতার ফল নয়, বরং আইনের শাসনের প্রতি অবিচল আস্থার প্রতিফলন।

  • ইমরান এ সিদ্দিক সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এবং সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।