একসময় যে আল-আকসায় জুমার নামাজে লাখো মানুষ সমবেত হতো, আজ সেখানে কঠোর বিধিনিষেধের কারণে উপস্থিতি নেমে এসেছে কয়েক হাজারে, কখনো কখনো কয়েক শততে।
একসময় যে আল-আকসায় জুমার নামাজে লাখো মানুষ সমবেত হতো, আজ সেখানে কঠোর বিধিনিষেধের কারণে উপস্থিতি নেমে এসেছে কয়েক হাজারে, কখনো কখনো কয়েক শততে।

মতামত

আল-আকসার ওপর চূড়ান্ত আঘাত আসছে; মুসলিম বিশ্ব কি জাগবে?

গত সপ্তাহে মিডল ইস্ট আই-এর একটি বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এমন এক তথ্য উঠে এসেছে যা গোটা মুসলিম জাহানের জন্য উদ্বেগজনক।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসলাম ধর্মের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান আল-আকসা মসজিদের দেখভালের যে দায়িত্ব জর্ডানের ওপর এত দিন ধরে আছে, সে দায়িত্ব তুলে নেওয়ার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে কাজ করছে।

এটি নিছক কূটনৈতিক কোনো পদক্ষেপ নয়। বরং এটি দীর্ঘদিন ধরে চলা এক সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টার চূড়ান্ত রূপ, যার লক্ষ্য অধিকৃত জেরুজালেম থেকে ইসলামের উপস্থিতি একেবারে মুছে ফেলা।

একই সঙ্গে এটি বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের জন্য এক সরাসরি সতর্কবার্তা; এটি আল আকসার বিষয়ে মুসলিম উম্মাহর গাফিলতি আর নিষ্ক্রিয়তার ঘুম থেকে জেগে ওঠার আহ্বান।

যখন এই ঘোষণা আসবে, তখন সেটিকে উপস্থাপন করা হবে ‘বহুধর্মীয় সহাবস্থান’, ‘সমান প্রবেশাধিকার’ এবং ‘সামাজিক ঐতিহ্য’-এর মতো আকর্ষণীয় শব্দে। কিন্তু এই আবরণের আড়ালে লুকিয়ে থাকবে অন্য বাস্তবতা।

সেটি হবে ইসরায়েলি উপনিবেশবাদের চূড়ান্ত ধাপ, যেখানে জেরুজালেমের ইসলামি পরিচয়কে মুছে দিয়ে নতুন অর্থে পুনর্গঠন করা হবে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওয়াশিংটন ও তেল আবিব সক্রিয়ভাবে চেষ্টা করছে আল-আকসার ওপর জর্ডানের ঐতিহাসিক তত্ত্বাবধান বাতিল করতে। এর ফলে জর্ডান-সমর্থিত ইসলামি ওয়াক্‌ফ কর্তৃপক্ষের ভূমিকা তুলে দিয়ে তার জায়গায় ইসরায়েল সরকারের তৈরি একটি নতুন সংস্থা বসানো হবে।

এই নতুন সংস্থা আল-আকসাকে ‘বহুধর্মীয় কেন্দ্র’ হিসেবে ঘোষণা করবে এবং ইহুদিদের জন্য ‘সমান প্রবেশাধিকার’ নিশ্চিত করবে।

এমনকি ইমাম ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেবে ইসরায়েল। জুমার খুতবার বিষয়বস্তুও তাদের অনুমোদন ছাড়া দেওয়া যাবে না।

এই পরিকল্পনা শুধুমাত্র একটি প্রস্তাব নয়; এটি এক ধরনের সাংস্কৃতিক গণহত্যার নকশা। এর উদ্দেশ্য একটাই—জেরুজালেম থেকে মুসলিম পরিচয় মুছে ফেলা এবং শতাব্দীজুড়ে গড়ে ওঠা ইতিহাসকে অদৃশ্য করে দেওয়া।

আসলে জর্ডানের তত্ত্বাবধান সরিয়ে দেওয়ার এই প্রক্রিয়া নতুন কিছু নয়। বহুদিন ধরেই ধাপে ধাপে আল-আকসার ওপর মুসলিম কর্তৃত্ব খর্ব করা হচ্ছে। ধীরে ধীরে সেই পরিবর্তনকে এখন আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

একসময় যে আল-আকসায় জুমার নামাজে লাখো মানুষ সমবেত হতো, আজ সেখানে কঠোর বিধিনিষেধের কারণে উপস্থিতি নেমে এসেছে কয়েক হাজারে, কখনো কখনো কয়েক শততে। কে প্রবেশ করবে, কে করবে না—সবকিছুই এখন ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে।

এই বিধিনিষেধ কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত নয়। এটি একটি সুপরিকল্পিত কৌশল। চলতি বছরেই ছয় শতাধিক ফিলিস্তিনিকে আল-আকসায় প্রবেশে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ওয়াক্‌ফের ত্রিশজন কর্মীর অনুমতি বাতিল হয়েছে, ছয়জন ইমামকে খুতবা দেওয়া থেকে বিরত রাখা হয়েছে।

আল-আকসার জ্যেষ্ঠ ইমাম একরিমা সাবরি এই পরিস্থিতিকে ‘অভূতপূর্ব’ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, এখন আর শুধু এক ধরনের হুমকি নয়, বরং একাধিক বিপদ একসঙ্গে ঘিরে ধরেছে এই পবিত্র স্থানকে।

গত মাসেই ইসরায়েলি মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা সংগঠিতভাবে আল-আকসা প্রাঙ্গণে প্রবেশ করেন। এক ইসরায়েলি আইনপ্রণেতা প্রকাশ্যে আহ্বান জানান, আল-আকসা ভেঙে সেখানে একটি ইহুদি মন্দির নির্মাণ করা হোক। মসজিদ প্রাঙ্গণে ইসরায়েলের পতাকা ওড়ানো হয়।

একই সময়ে চেইন গেট এলাকার আশপাশে ফিলিস্তিনিদের সম্পত্তি দখলের প্রক্রিয়াও জোরদার করা হয়েছে, যা জেরুজালেমের দ্রুত ইহুদিকরণের অংশ।

ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় আল-আকসা টানা চল্লিশ দিন বন্ধ রাখা হয়েছিল। আটটি আরব ও ইসলামি দেশ এর নিন্দা জানালেও বাস্তবে তা প্রতিরোধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।

এই মুহূর্তে মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বড় সংকট কেবল ইসরায়েলি আগ্রাসন নয়, বরং নিজেদের ভেতরের উদাসীনতা, বিভাজন এবং প্রাতিষ্ঠানিক অচলাবস্থা।

মুসলমানদের কাছে আল-আকসা কেবল একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা নয়। এটি প্রথম কিবলা, মহানবী (সা.)-এর মেরাজের স্মৃতি বহনকারী স্থান, ইসলামি সভ্যতার একটি কেন্দ্রবিন্দু। তাই এর অবমাননা শুধু রাজনৈতিক ঘটনা নয়, এটি দুই শ কোটির বেশি মানুষের আত্মপরিচয়ের ওপর আঘাত।

তবুও মুসলিম বিশ্ব মূলত নীরব। তাদের দিক থেকে বিবৃতি দেওয়া হয়, তারপর আবার সব আগের মতো চলতে থাকে। যেসব রাষ্ট্র অর্থনৈতিক বা কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারত, তারা নিজেদের স্বার্থের হিসাব কষে পিছিয়ে থাকে। সাধারণ মানুষ প্রতিবাদের বদলে নীরব দর্শকের ভূমিকায় থাকে।

সময়ের শেষ মুহূর্ত যেন ইতিমধ্যেই এসে গেছে। মুসলিম বিশ্ব এবং যাঁরা উপনিবেশবাদী মুছে ফেলার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চান, তাঁদের এখনই সব ধরনের (কূটনৈতিক, আইনি, অর্থনৈতিক এবং নৈতিক) পদক্ষেপ নিতে হবে। এখন যদি কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা না যায়, তাহলে ‘সহাবস্থান’-এর ভাষাকে ব্যবহার করে বহু দশকের এক দখলদার প্রকল্প সম্পূর্ণ হয়ে যাবে।

মুসলিম বিশ্বের বাইরে থাকা মানুষের জন্যও এই পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি এমন এক দৃষ্টান্ত তৈরি করবে, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে চালানো মুছে ফেলার রাজনীতি শেষ পর্যন্ত স্বীকৃতি পায়।

আরব মানবাধিকার সংস্থা এই লঙ্ঘনগুলোর ধারাবাহিকতা তুলে ধরেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সমাজের বড় অংশই নীরব থেকেছে। এই নীরবতা নিরপেক্ষ নয়, বরং তা পরোক্ষ সমর্থন।

সময়ের শেষ মুহূর্ত যেন ইতিমধ্যেই এসে গেছে। মুসলিম বিশ্ব এবং যাঁরা উপনিবেশবাদী মুছে ফেলার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চান, তাঁদের এখনই সব ধরনের (কূটনৈতিক, আইনি, অর্থনৈতিক এবং নৈতিক) পদক্ষেপ নিতে হবে।

এখন যদি কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা না যায়, তাহলে ‘সহাবস্থান’-এর ভাষাকে ব্যবহার করে বহু দশকের এক দখলদার প্রকল্প সম্পূর্ণ হয়ে যাবে।

  • ইসমাইল প্যাটেল একজন লেখক। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ‘দ্য মুসলিম প্রবলেম: ফ্রম দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার টু ইসলামোফোবিয়া’। তিনি লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো এবং যুক্তরাজ্যভিত্তিক ‘ফ্রেন্ডস অব আল-আকসা’ সংস্থার চেয়ারম্যান।
    মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া
    অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ