আজ শিক্ষকই যেন সবচেয়ে সহজ টার্গেট।
আজ শিক্ষকই যেন সবচেয়ে সহজ টার্গেট।

মতামত

শিক্ষককে অপমানের সংস্কৃতি: আমরা কত নিচে নামছি

কয়েক সপ্তাহ আগে গাইবান্ধার পিয়ারাপুর হাইস্কুলে প্রধান শিক্ষকের কক্ষে ঢুকে এক ছাত্র চেয়ার উঁচিয়ে হামলা চালায়। বিভিন্ন জায়গায় এইচএসসি পরীক্ষা পেছানোর দাবিতে শিক্ষকদের অকথ্য ভাষায় গালাগাল করা হয়েছে।

গত বছর কোথাও প্রধান শিক্ষককে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। এমনকি শিক্ষার্থীদের আচরণে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে একজন শিক্ষকের মৃত্যুর খবরও এসেছে।

চুয়াডাঙ্গায় এক অভিভাবক স্কুলে ঢুকে প্রধান শিক্ষিকাকে থাপ্পড় মারেন। আন্দোলনের সময় শিক্ষকদের গায়ে গরম পানি ছুড়ে মারার ঘটনাও ঘটেছে।

সম্প্রতি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিউটি রানী পাল ক্লাস শেষে বাড়ি ফেরার আগে মেঘলা আকাশ ও ঝোড়ো হাওয়া দেখে একটি ছোট ভিডিও করেন।

সেটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর হাজারো মানুষ তাঁকে নিয়ে সাইবার বুলিং ও অশ্লীল মন্তব্য করতে শুরু করে। এসব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এগুলো আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক সংস্কৃতির গভীর অসুস্থতার লক্ষণ।

গত দেড় বছরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও শিক্ষককে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করা, হেনস্তা করা কিংবা শ্রেণিকক্ষে পাঠদান বন্ধ করে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে।

পরিস্থিতি যেন রবীন্দ্রনাথের সেই কথারই প্রতিফলন, ‘যা কিছু হারায়, গিন্নি বলেন, কেষ্টা বেটাই চোর’।

আজ শিক্ষকই যেন সবচেয়ে সহজ টার্গেট। পরীক্ষা পেছাবে কি না, শিক্ষানীতির সিদ্ধান্ত কী হবে কিংবা প্রশাসনিক ব্যর্থতার দায় কোথায়—এসবের বেশির ভাগই শিক্ষকের নিয়ন্ত্রণে থাকে না।

তবু সব ক্ষোভ, সব দোষ, সব ব্যর্থতার বোঝা তাঁর কাঁধেই চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আজ শুধু নীতিগত নয়, মূল্যবোধেরও গভীর সংকটে।

আমরা কোনো ব্যক্তি—তিনি শিক্ষক, মন্ত্রী, সরকারি কর্মকর্তা কিংবা সাধারণ নাগরিক—কাউকেই অশ্লীল ভাষায় গালাগাল বা হেনস্তা করার সংস্কৃতিকে সমর্থন করতে পারি না।

মতভেদ, প্রতিবাদ ও সমালোচনা অবশ্যই থাকবে; কিন্তু একটি সভ্য সমাজে সেগুলোরও একটি ভাষা ও সীমা থাকা উচিত। আজ প্রশ্ন জাগে, এই দেশে শিক্ষকের অবস্থান আসলে কোথায়?

মাত্র ৩০ বছর আগেও বাংলাদেশে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক ছিল অনেক বেশি শ্রদ্ধা, স্নেহ ও পারস্পরিক সম্মানের ওপর প্রতিষ্ঠিত।

মতবিরোধ ছিল, প্রতিবাদও ছিল; কিন্তু তা প্রকাশ পেত যুক্তি, ভাষার সৌন্দর্য, সাহিত্য, কবিতা কিংবা শালীন সমালোচনার মাধ্যমে।

আজ সেই জায়গা দখল করেছে গালাগাল, অপমান, হুমকি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা।

একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা হলো, আজ অনেকেই শিক্ষককে অপমান করে জনপ্রিয় হতে চান।

কোনো সরকারি কর্মকর্তা শ্রেণিকক্ষে ঢুকে শিক্ষকের ভুল ধরিয়ে ভিডিও প্রকাশ করেন। কোনো অভিভাবক স্কুলে গিয়ে শিক্ষককে হুমকি দেন বা মারধর করেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে করতালি পাওয়ার চেষ্টা করা হয়। প্রশ্ন হলো, একটি পেশাকে অপমান করে আমরা আসলে কী অর্জন করছি?

উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, অস্ট্রেলিয়া বা যুক্তরাষ্ট্রের বহু বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের আধুনিক পাঠদানের কৌশল শেখানো হয়, অনলাইন রিসোর্স ব্যবহার করতে উৎসাহ দেওয়া হয়, উদ্ভাবনী শিক্ষণ-পদ্ধতি একে অপরের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলা হয়।

ভালো শিক্ষককে সম্মানিত করা হয়, তাঁকে অন্যদের জন্য অনুসরণীয় হিসেবে তুলে ধরা হয়। কারণ, তাঁরা জানেন, একজন ভালো শিক্ষক তৈরি হন প্রশিক্ষণ, সহযোগিতা ও সম্মানের মাধ্যমে; অপমানের মাধ্যমে নয়।

শিক্ষকদের কি ব্যক্তিগত জীবন থাকতে নেই? তাঁরা কি হাসতে পারবেন না, গান গাইতে পারবেন না, ছবি তুলতে পারবেন না, ফুটবল খেলতে পারবেন না কিংবা স্বাভাবিক আনন্দময় জীবন যাপন করতে পারবেন না?

একজন শিক্ষক কি শুধুই একটি পেশাগত পরিচয়ে সীমাবদ্ধ, নাকি তিনি একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষও?

আমাদের সমাজে যেন একটি অলিখিত ধারণা তৈরি হয়েছে, শিক্ষককে সব সময় কষ্টে থাকতে হবে, কম বেতনেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে, সব সময় গম্ভীর ও নিরানন্দ থাকতে হবে।

কোনো অবস্থাতেই শিক্ষককে গালাগাল করা, প্রকাশ্যে অপমান করা, জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করা কিংবা শারীরিকভাবে হেনস্তা করা একটি সভ্য রাষ্ট্রে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

অথচ একজন সুখী, মানসিকভাবে সুস্থ ও সৃজনশীল শিক্ষকই একজন ভালো শিক্ষক হতে পারেন। যে সমাজ তার শিক্ষকদের স্বাভাবিক জীবনযাপনের অধিকারকে সম্মান করে না, সে সমাজ কখনো মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারে না।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগ হতে হবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, মেধাভিত্তিক এবং প্রতিযোগিতামূলক।

কোনো ধরনের দলীয় বা ব্যক্তিগত প্রভাব নয়-প্রার্থীর শিক্ষাজীবনের ফলাফল, গবেষণা, আন্তর্জাতিক প্রকাশনা, উপস্থাপনা দক্ষতা, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের সক্ষমতা এবং সাক্ষাৎকারের সামগ্রিক মূল্যায়নের ভিত্তিতেই নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

একই সঙ্গে শিক্ষকদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তাঁরা কতটা আন্তরিকতার সঙ্গে পাঠদান করছেন, শিক্ষার্থীদের শেখাতে পারছেন কি না, আধুনিক শিক্ষণ-পদ্ধতি ব্যবহার করছেন কি না—এসব বিষয়ে নিয়মিত একাডেমিক মূল্যায়ন ও সহায়ক মনিটরিং ব্যবস্থা থাকতে পারে।

কিন্তু সেই মূল্যায়নের ভাষা হতে হবে পেশাদার, সম্মানজনক এবং আইনসম্মত।

কোনো অবস্থাতেই শিক্ষককে গালাগাল করা, প্রকাশ্যে অপমান করা, জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করা কিংবা শারীরিকভাবে হেনস্তা করা একটি সভ্য রাষ্ট্রে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। দেশে আইন আছে, আদালত আছে, প্রশাসনিক ও বিচারিক ব্যবস্থা আছে। অভিযোগ থাকলে তার সমাধানও আইনের মাধ্যমেই হতে হবে।

যদি শিক্ষকদের জীবনমান উন্নত না হয়, তাহলে মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আসবেন না। যদি শিক্ষকতার সামাজিক মর্যাদা কমতে থাকে, তাহলে এই পেশা আর সেরা মেধার মানুষদের আকর্ষণ করবে না। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায়, আর সেই দুর্বল ভিত্তির ওপর কখনোই একটি শক্তিশালী বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে না।

মব, হামলা, ভাঙচুর কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চরিত্রহনন—এসব কোনো সভ্য সমাজের ভাষা হতে পারে না।

বাংলাদেশের এক প্রত্যন্ত গ্রামের একজন স্কুলশিক্ষকের টিনের ঘরে আজও বর্ষার রাতে বৃষ্টির পানি পড়ে।

অথচ সেই শিক্ষকেরই একসময়ের ছাত্র আজ কানাডার টরন্টোতে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে একটি সচ্ছল জীবন কাটাচ্ছে।

এটাই শিক্ষকতার মহত্ত্ব—নিজে সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেও অন্যের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আর কত দিন?

যদি শিক্ষকদের জীবনমান উন্নত না হয়, তাহলে মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আসবেন না। যদি শিক্ষকতার সামাজিক মর্যাদা কমতে থাকে, তাহলে এই পেশা আর সেরা মেধার মানুষদের আকর্ষণ করবে না।

এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায়, আর সেই দুর্বল ভিত্তির ওপর কখনোই একটি শক্তিশালী বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে না।

আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে শিক্ষক সম্মান নিয়ে বাঁচবেন, শিক্ষার্থী আনন্দ নিয়ে শিখবে এবং বিদ্যালয় হবে সৃজনশীলতা, মানবিকতা ও জ্ঞানের প্রাণকেন্দ্র।

একটি আনন্দময় শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি হলো একজন আনন্দময়, নিরাপদ এবং সম্মানিত শিক্ষক। শিক্ষককে মর্যাদা দেওয়া কোনো পেশাকে সম্মান জানানো নয়; এটি একটি জাতির ভবিষ্যতের ওপর বিনিয়োগ।

  • ড. আদনান মান্নান, অধ্যাপক, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ই-মেইল: adnan.mannan@cu.ac.bd

    *মতামত লেখকের নিজস্ব।