আমাদের বহু আকাঙ্ক্ষিত নির্বাচনের আর দেড় মাসও বাকি নেই।
আমাদের বহু আকাঙ্ক্ষিত নির্বাচনের আর দেড় মাসও বাকি নেই।

মতামত

সুষ্ঠু ভোটের জন্য যা দরকার, কমিশন কি তা করছে

আমাদের বহু আকাঙ্ক্ষিত নির্বাচনের আর দেড় মাসও বাকি নেই। তফসিল ঘোষণার পরদিন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের শিকার হলেন। তিনি রাজধানী ঢাকার একটি আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী ছিলেন। তাঁর খুনীদের এখনো ধরা যায়নি। তাঁর হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে সরব ইনকিলাব মঞ্চ। এ ঘটনায় অনেকের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, এমন ভঙ্গুর আইনশৃঙ্খলার মধ্যে কীভাবে একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হবে।

এবারের নির্বাচন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কারণ, এটি একই সঙ্গে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট।

তফসিল ঘোষণার পর সবকিছুই নির্বাচন কমিশনের হাতে চলে যায়। ইতিমধ্যে পতিত আওয়ামী লীগ নির্বাচন প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছে। তাদের কেউ কেউ গৃহযুদ্ধেরও হুমকি দিচ্ছে। এই কমিশন কি সেসব সমস্যা মোকাবিলার প্রস্তুতি নিয়েছে?

সংবিধানের ১১৮ ও ১১৯ ধারা অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন সংস্থা। তার দায়িত্ব নির্বাচন পরিচালনা করা। নির্বাচন কমিশন আইন–২০২২ অনুযায়ী কমিশনের নিজস্ব সচিবালয় ও বিধিবিধান প্রণয়নের ক্ষমতা রয়েছে।

নির্বাচন কমিশন সিইসি অ্যাক্ট–২০২২ অনুযায়ী নির্বাচনী আচরণবিধি প্রণয়ন ও প্রয়োগ করতে পারে; কিন্তু এই আইনি ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও মাঠের বাস্তবতায় কেন নির্বাচন কমিশনের উপস্থিতি এত দুর্বল—এই প্রশ্নটিই আজ বড়।

নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যেই চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে। তারা নতুন দুটি রাজনৈতিক দলকে নিবন্ধন দিয়েছে এবং প্রবাসীদের ভোট দেওয়ার জন্য মুঠোফোনে অ্যাপ চালু করেছে।

এই সরকার সব থেকে ব্যর্থ হয়েছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে। বিভিন্ন ডেটা দিয়ে ফ্যাসিস্ট সরকারের সঙ্গে এই সরকারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তুলনা করে দেখানোর চেষ্টা থাকলেও তা আসলে হাস্যকর। কারণ, এই ডেটা কারা দেয়? আগের সরকারের সময়েও আমরা এ রকম বানানো অনেক ডেটা দেখতে পেয়েছি।

এই সরকার সময় পাওয়া সত্ত্বেও আগের সরকারের সময়ের সুবিধাভোগী ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের না সরিয়ে তাদের ওপরই আস্থা রেখেছে। ফলাফল—যখনই সুযোগ পাওয়া যায় তারা ফ্যাসিস্টদের সহায়তায় কাজ করবেই।

২০২৪ সালের আগস্টের পরবর্তী সময়ে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মব সহিংসতা ও অপরাধের মাত্রা বেড়ে যায়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ রিপোর্ট (জানুয়ারি ২০২৫) বলছে, নিরাপত্তা খাতে সংস্কার দরকার; কিন্তু আমরা নতুন কিছু দেখতে পাইনি।

তফসিলের পর সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তা হুমকি থাকে। সারা দেশে সব প্রার্থীকে মানুষের ভিড়ে যেতেই হবে। আর তার মধ্যেই হামলা করা সব থেকে সহজ।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের নির্বাচনী বছরে রাজনৈতিক সহিংসতায় কমপক্ষে ৪৫০ জন নিহত এবং ২৫ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছিল—যা প্রমাণ করে, কাগুজে নিরাপত্তা আর মাঠের বাস্তবতার ফারাক কতটা গভীর।

২০১৮ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রায় ছয় লাখ নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছিল (পুলিশ, বিজিবি, আনসার ও সেনাবাহিনী)। ২০২৪ সালের জানুয়ারি-নভেম্বর পর্যন্ত নির্বাচন-সম্পর্কিত সহিংসতায় শতাধিক ঘটনা রিপোর্ট করেছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।

৫ আগস্টের পর পুলিশের কাছ থেকে লুট হওয়া সহস্রাধিক অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে যেসব অস্ত্র দিয়ে গুলি চালিয়েছিল আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীরা, সেসব অস্ত্রও বেশির ভাগ উদ্ধার হয়নি। তাদের সন্ত্রাসীরা বেশির ভাগই বাইরে। কেউ কেউ ধরা পড়লেও আদালত থেকে সহজেই জামিন পেয়ে গেছেন। এটি অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোবল দুর্বল করছে।

এর মধ্যে চরম উদ্বেগজনক সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তারা এখন নতুন করে অস্ত্রের লাইসেন্স দিচ্ছে। এ যেন নিজেদের দুর্বলতা ঢাকতে সবাইকে আইন হাতে তুলে নেওয়ার আহ্বান। নতুন এত অস্ত্র কি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে?

যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস বাংলাদেশে থাকা তাদের নাগরিকদের জন্য সতর্কতা জারি করেছে। তারা বলেছে, নির্বাচনের তারিখ এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক সমাবেশ ও বিক্ষোভ আরও ঘন ঘন ও তীব্র হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে মার্কিনদের সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। পাশাপাশি মনে রাখা উচিত যে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ সংঘর্ষে পরিণত হতে পারে এবং সহিংসতা ঘটতে পারে।

বর্তমান এআই যুগে ফ্যাক্ট চেকিং অন্যতম মৌলিক চাওয়া। ইতিমধ্যে ডিপফেক ও মিসইনফরমেশন ক্যাম্পেইন শুরু হয়ে গেছে। কিছু নমুনাও এর মধ্যে আসা শুরু করেছে, যেসব কারণে সাধারণ ভোটার বিভ্রান্ত হচ্ছেন।

২০১৬ সালের মার্কিন নির্বাচনে ফেসবুক স্বীকার করেছিল যে ১২ কোটির বেশি ব্যবহারকারী রাজনৈতিক ভুয়া তথ্যের সংস্পর্শে এসেছিলেন—বাংলাদেশের এই সংবেদনশীল সময়ে এমন ডিজিটাল হামলার প্রভাব আরও ভয়াবহ হতে পারে।

এখন পর্যন্ত বেসরকারি খাতে বাংলাদেশে ৮টি ফ্যাক্ট চেক অর্গানাইজেশন সক্রিয় আছে। সরকারের কিন্তু এখনই সেই সক্ষমতা আছে। ডিএমপির সাইবার ক্রাইম ইউনিট এবং বাংলাদেশ টেলিকম রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি) ২০২৩ সালে ‘মিসইনফরমেশন কন্ট্রোল রুম’ চালু করে, যেখানে নির্বাচন কমিশনও যুক্ত; কিন্তু তাদের সামর্থ্য থাকলেও কেন নির্বাচন কমিশন সরকারি–বেসরকারি সহযোগে একটা টাস্কফোর্স করছে না, তা বোধগম্য নয়।

শুধু দেশ নয়, বিদেশ থেকেও বিভিন্ন মিথ্যা প্রচারণা দেশকে অশান্ত করতে পারে। আর বর্তমানের থেকেও যদি দেশ বেশি অশান্ত হয়, নির্বাচন কমিশন তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে কি না, সন্দেহ আছে।

২০১৮ সাল থেকে নাগরিক সমাজ সব ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি দাবি করে আসছে। দুঃখজনক হলেও ২০২৬ সালে এসেও তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। সম্প্রতি (ডিসেম্বর ২০২৫) কমিশন নির্দেশ দিয়েছে যে স্কুলগুলোতে বিদ্যমান সিসিটিভি চালু রাখতে হবে এবং যেখানে নেই, সেখানে অন্তত ভোটের দিন কভারেজের ব্যবস্থা করতে অনুরোধ করেছে; কিন্তু নিজেরা সব পোলিং স্টেশনে নতুন সিসিটিভি স্থাপনের দায়িত্ব নেয়নি।

যুক্তরাজ্যের হোম অফিসের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, সিসিটিভি ব্যবহারে অপরাধ ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কমে যায়। অথচ বাংলাদেশের ভোটকেন্দ্রগুলো এখনো এই ন্যূনতম নিরাপত্তাব্যবস্থার বাইরে রয়ে গেছে।

এখন ভোটকেন্দ্রেও যদি সিসিটিভি থাকে, কেউ অন্তত কেন্দ্র দখলের সাহস করার সুযোগ পাবে না। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাও নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারবেন।

আওয়ামী লীগ ভোটকেন্দ্র দখল, প্রভাব বিস্তার করা ও ভোট ডাকাতির একটা উদাহরণ তৈরি করে গেছে। দেখা গেল, আওয়ামী লীগের হয়ে যাঁরা কেন্দ্র দখল করতেন বা নির্বাচনে অনিয়মে সহযোগিতা করতেন তাঁদের অনেকে এবারও হয়তো কোনো না কোনো দলের হয়ে কাজ করবেন, এমন আশঙ্কার বিষয়টি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ফলে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও অনিয়ম ঠেকাতে নির্বাচন কমিশনকে দৃঢ়তার সঙ্গেই আমাদের আশ্বস্ত করতে হবে।

জাল ভোটের হুমকি এই নির্বাচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হলো প্রবাসী ভোট। চার লাখের কাছাকাছি প্রবাসী রেজিস্ট্রেশন করেছেন, যা আরও বাড়বে। এখন একজন প্রবাসী যদি পোস্টাল ভোটের জন্য রেজিস্ট্রেশন করেন, তখন দেশে থাকা তালিকা থেকে কি তাঁর ভোট বাদ পড়বে? যদিও ডুপ্লিকেট ভোট এড়াতে এনআইডি চেক করা হচ্ছে।

এত অল্প সময়ে কমিশনের পক্ষে এই কাজ করা কঠিন। ফলাফল—একজনের নামে দুটি ভোট থেকে যেতে পারে। অনেকে বাসা বা এলাকা বদলের জন্য অন্য এলাকায় ভোট দিতে না–ও যেতে পারেন। এ তথ্য যদি কোনো রাজনৈতিক দলের হাতে যায়, সে খুব সহজেই জাল ভোটের ব্যবস্থা করে ফেলতে পারে।

বাংলাদেশে যেহেতু এক দিনে দুটি ভোট নেওয়া হবে, সেহেতু মোট ভোটের সংখ্যা হবে ২৪ কোটির ওপর। এই দেশে একসঙ্গে কখনো এত বিশালসংখ্যক ভোট নেওয়ার অভিজ্ঞতা নেই।

যদি একজন ভোটারের দুটি ব্যালটে ভোট দিতে গড়ে দুই মিনিট সময় লাগে, তাহলে ২৪ কোটির বেশি ব্যালট গ্রহণ করতে বাস্তবসম্মতভাবে আরও অনেক বেশি সময় প্রয়োজন। মাত্র এক ঘণ্টা সময় বাড়িয়ে এই সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। সময়ের ব্যাপারে তাই আরও চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

ইতিহাস বলে, প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকার আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচনার মুখে পড়ে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে বিনিয়োগ, বৈদেশিক সহায়তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর। নির্বাচন কমিশন নিজেদের দুর্বলতা অনুযায়ী প্রয়োজন সাপেক্ষে জাতিসংঘ বা অন্যান্য বিদেশি দাতাদের কাছ থেকে কৌশলগত ও কারিগরী সহযোগিতা নেওয়ার কথা চিন্তা করতে পারে।

এই নির্বাচন নিয়ে যদি প্রশ্ন থাকে—তাহলে নির্বাচিত সরকারের পক্ষে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। আমাদের অর্থনীতির জন্য ২০২৬ সাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওই বছরের ২৪ নভেম্বরে আমরা নিম্ন-আয়ের দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় (গ্র্যাজুয়েশন) উন্নীত হব। এখন তার আগে যদি আমরা স্থিতিশীল সরকার না পাই, পুরো দেশকে এ জন্য ভুগতে হবে।

  • সুবাইল বিন আলম টেকসই উন্নয়নবিষয়ক লেখক। নাগরিক কোয়ালিশন এবং বাংলাদেশ রিসার্চ অ্যানালাইসিস অ্যান্ড ইনফরমেশন নেটওয়ার্কের (ব্রেইন) সদস্য। ইমেইল: contact@subail.com