মহিউদ্দিন আহমদের লেখা

মব–সংস্কৃতি: ক্ষোভের প্রকাশ, নাকি সংগঠিত সন্ত্রাস

বাংলাদেশের জনজীবনে ‘মব’ বা জনতার হঠাৎ সংগঠিত হয়ে ওঠার সংস্কৃতি এক অদ্ভুত সামাজিক বাস্তবতা। কখনো এটি প্রতিবাদের শক্তি, কখনো আবার অন্ধ প্রতিশোধের হাতিয়ার। জনতার এই আচরণ আমাদের সমাজের অন্তর্গত ভয়, ক্ষোভ এবং ন্যায়বিচারের অভাব ও প্রতিহিংসাপরায়ণতাকে প্রকাশ করে।

 বাংলাদেশের ইতিহাসে জনতার শক্তি সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ। মুক্তিযুদ্ধের সময় জনতার ঐক্য ছিল মুক্তির শক্তি। গ্রামীণ কৃষক থেকে শহুরে শ্রমিক—সবাই একত্র হয়েছিল স্বাধীনতার জন্য। সেই সময় জনতার শক্তি ছিল ইতিবাচক। স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা এবং সামাজিক বৈষম্য জনতার ক্ষোভকে ‘মব’ আকারে প্রকাশ করেছে। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে ক্ষুধার্ত জনতা খাদ্যগুদাম আক্রমণ করেছিল।

জনতার ভেতরে একধরনের সমষ্টিগত আবেগ কাজ করে, যা ব্যক্তিকে তার নিজস্ব যুক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন করে। ফরাসি চিকিৎসক, সমাজবিজ্ঞানী ও মনস্তত্ত্ববিদ গুস্তাভ লে বঁ তাঁর দ্য ক্রাউড: আ স্টাডি অব দ্য পপুলার মাইন্ড বইয়ে বলেছেন, জনতার ভেতরে ব্যক্তির যুক্তি হারিয়ে যায়, আবেগই প্রাধান্য পায়। লে বঁ-এর এই ধারণা, ফ্যাসিবাদী ও গণতান্ত্রিক উভয় আন্দোলনেই ব্যবহৃত হয়েছে। এ নিয়ে আছে মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্ব ‘ডিইন্ডিভিডুয়েশন থিওরি’ (ব্যক্তিসত্তা লোপ)। এই তত্ত্ব অনুযায়ী জনতার ভেতরে ব্যক্তি তার পরিচয় হারায়। এটি সামাজিক মনোবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। এটি ব্যাখ্যা করে যে যখন একজন ব্যক্তি জনতার ভেতরে মিশে যায়, তখন তার ব্যক্তিগত পরিচয়, যুক্তি ও নৈতিকতা দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে সে এমন আচরণ করতে পারে, যা একা থাকলে কখনো করত না।

এই ব্যক্তিসত্তা লোপের অনুষঙ্গগুলো হলো; (ক) পরিচয় হারানো: জনতার ভেতরে ব্যক্তি নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় হারায়; (খ) আবেগের আধিপত্য: যুক্তি নয়, আবেগই আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে; (গ) দায়িত্ববোধ কমে যায়: জনতার ভেতরে থাকলে ব্যক্তি মনে করে, তার কাজের দায় সে একা বহন করছে না। এ অবস্থায় মানুষ ভাঙচুর, আক্রমণ বা সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে। এ রকম উদাহরণ আছে অজস্র—জনতা গুজব শুনে কাউকে চোর বা ছিনতাইকারী ভেবে পিটিয়ে হত্যা করে; রাজনৈতিক মিছিলে আবেগে ভেসে গিয়ে গাড়ি বা দোকান ভাঙে; খেলার মাঠে দর্শকেরা হঠাৎ সহিংস হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশে মব–সংস্কৃতির একটি অন্যতম কারণ হলো বিচারহীনতা। বিচারহীনতা ও দুর্নীতি জনতাকে আইন নিজের হাতে তুলে নিতে বাধ্য করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা গণমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে মবকে আরও দ্রুত সংগঠিত করে। শহর ও গ্রামে একইভাবে এই সংস্কৃতি বিদ্যমান। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পল্লী–সমাজ উপন্যাসে দেখা যায়, গ্রামীণ সমাজে জনতার আবেগ কীভাবে একজন ব্যক্তির জীবনকে ধ্বংস করতে পারে।

বাংলাদেশের মব–সংস্কৃতি কখনো তা আলোকিত করে প্রতিবাদের পথ, যেমন গণ-আন্দোলনে জনতার শক্তি। আবার কখনো তা পুড়িয়ে দেয় নিরপরাধের জীবন, যেমন গুজবের ভিত্তিতে মানুষ হত্যা। মব–সংস্কৃতি হলো আগুন, যা আলোও দেয়, আবার দহনও ঘটায়।

জনতার হঠাৎ সংগঠিত হয়ে ওঠা, আবেগের বশে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কিংবা গুজবের ভিত্তিতে সহিংসতায় জড়িয়ে পড়া—এসবের শিকড় আমাদের ইতিহাসে অনেক পুরোনো। গুজবের ভিত্তিতে খুনখারাবির অনেক উদাহরণ আছে। ২০১৯ সালে ‘ছেলেধরা’ গুজবে অনেক মানুষ খুন হয়। রাজনৈতিক সমাবেশে জনতার উন্মাদনা তো নৈমিত্তিক ব্যাপার। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক মিছিল ভাঙচুরে রূপ নেয়। আবার সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে হঠাৎ জনতার প্রতিবাদও লক্ষণীয়। ধর্ষণ বা হত্যার ঘটনায় জনতা আদালতের বাইরে গিয়ে প্রতিশোধ নেয়। এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে জনতার শক্তি নিয়ন্ত্রিত না হলে তা ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

মব–সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে প্রয়োজন শক্তিশালী বিচারব্যবস্থা, জনসচেতনতা বাড়ানো, গণমাধ্যমের দায়িত্বশীলতা, শিক্ষার মাধ্যমে যুক্তিবাদী সমাজ গঠন ইত্যাদি। বাংলাদেশে মব–সংস্কৃতি আমাদের সমাজের অন্তর্গত ক্ষতকে প্রকাশ করে। এটি একই সঙ্গে ভয়াবহ এবং শিক্ষণীয়। জনতার শক্তিকে যদি সঠিক পথে পরিচালনা করা যায়, তবে তা হতে পারে গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ। আর যদি তা অন্ধ প্রতিশোধে রূপ নেয়, তবে তা সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। এর লক্ষণ ইতিমধ্যে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে গুজবের ভিত্তিতে জনতার সংগঠিত হওয়ার প্রবণতা অনেক পুরোনো। চোর সন্দেহে গ্রামবাসীর হাতে নিরপরাধ মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনা বহুবার ঘটেছে। সমাজে বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা জনতাকে আইন নিজের হাতে তুলে নিতে বাধ্য করেছে। এ প্রবণতা আসলে মব–সংস্কৃতির প্রাথমিক রূপ। বাংলাদেশে মব–সংস্কৃতি যেন এক নদী। গণ-আন্দোলনের সময় এটি ছিল জীবনদায়ী জলধারা। কিন্তু বিচারহীনতার যুগে তা হয়ে উঠেছে বন্যা, যা সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

যখন দুটি দল বা গোষ্ঠী সংগঠিতভাবে মুখোমুখি হয়, তাদের মধ্যে মারামারি হয়, তখন সেটি সাধারণত রাজনৈতিক সহিংসতা বা সংঘর্ষ হিসেবে চিহ্নিত হয়।
এটি দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ক্ষমতার লড়াই বা রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অংশ। মব–সন্ত্রাস ঘটে তখনই, যখন জনতা হঠাৎ করে আবেগের বশে সংগঠিত হয়, কোনো গুজব, ক্ষোভ বা তাৎক্ষণিক উত্তেজনার কারণে আইন নিজের হাতে তুলে নেয়। এখানে সচরাচর কোনো সংগঠিত রাজনৈতিক কাঠামো থাকে না, বরং জনতার আবেগই প্রধান চালিকা শক্তি। অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সংঘর্ষকে বলা যায় ‘সংগঠিত সহিংসতা’—যেখানে দলীয় পতাকা, স্লোগান, নেতৃত্ব থাকে। আর মব–সন্ত্রাস হলো জনতার উন্মাদনা, যেখানে যুক্তি হারিয়ে যায়, আবেগই রাজত্ব করে। তবে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মব উসকে দিতে রাজনৈতিক গোষ্ঠী কলকাঠি নাড়ে।

‘প্রেশার গ্রুপ’ বনাম মব–সন্ত্রাস নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে কথা চালাচালি হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রেশার গ্রুপ তত্ত্বটি বাজারে আসে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, মব–সংস্কৃতিকে রাজনৈতিক ন্যায্যতা দিতে এ তত্ত্ব ব্যবহার করা হয়েছে। যাঁরা এ তত্ত্বের পক্ষে, তাঁরাও একটি রাজনৈতিক পক্ষ। তাঁরা মনে করেন, তাঁদের কাজের সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈধতা আছে। মব–সংস্কৃতিকে আদৌ প্রেশার গ্রুপের কাজ বলা যায়? প্রেশার গ্রুপ সংগঠিত চাপ প্রয়োগ করে, আর মব–সংস্কৃতি হলো নিয়ন্ত্রণহীন সহিংসতা। প্রেশার গ্রুপের আন্দোলন যদি নিয়ন্ত্রণ হারায়, জনতার আবেগে ভেসে যায়, তখন সেটি মব ভায়োলেন্সে রূপ নেয়। এ ধরনের ঘটনা অনেক ঘটছে।

মব–সংস্কৃতির প্রকাশ নানাভাবে হয়। এর যুক্তিগুলোও বেশ চিত্তাকর্ষক। যেমন ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ। দেখা যায়, ফেসবুকে একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে জনতা একজনকে বা একটি ধর্মীয় স্থাপনায় আক্রমণ চালায়।

সম্প্রতি আমরা মব–সংস্কৃতির বেশ কয়েকটি উদাহরণ তৈরি হতে দেখেছি। শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনী বইটিকে কেন্দ্র করে বইটির প্রকাশকের একটি আউটলেটে কয়েকজন চড়াও হয়েছিল। সমাজে এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বইটি অনেকের কাছে ইতিহাসের দলিল, আবার কারও কাছে বিতর্কের উৎস। মব এটাকে যুক্তির বাইরে নিয়ে গেছে। ছবিতে যাদের দেখা গেছে, চেহারা দেখে মনে হয় না তারা জীবনে কোনো একটা মননশীল বই পড়েছে। বইটির নামও তারা শুদ্ধভাবে উচ্চারণ করতে পারেনি। বোঝা যায়, এর পেছনে ইন্ধন জুগিয়েছে কোনো স্বার্থান্বেষী বা রাজনৈতিক পক্ষ।

কয়েক দিন আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলা হয়েছে। একটি ছাত্রসংগঠনের কর্মীরা সাংবাদিকদের মারধর করে। এটি মূলত একটি রাজনৈতিক সংঘর্ষ। ছাত্রসংগঠনটি একটি রাজনৈতিক পক্ষ। তাদের মনে হয়েছে, তাদের সতীর্থ সংবাদকর্মীরা তাদের বিরুদ্ধে লেখালেখি করে। অতএব তাদের ধরে পেটাও। ছাত্রসংগঠনের সদস্যরা যখন সহিংস হয়ে ওঠে, তখন তার রাজনৈতিক চরিত্র আর থাকে না, সেটি মব–সন্ত্রাসে রূপ নেয়।

  • মহিউদ্দিন আহমদ লেখক ও গবেষক

  • মতামত লেখকের নিজস্ব