মিয়ানমারে জাতীয় নির্বাচনের সময় একটি কেন্দ্র ঘুরে দেখছেন দেশটির জান্তা সরকারের প্রধান মিন অং হ্লাইং
মিয়ানমারে জাতীয় নির্বাচনের সময় একটি কেন্দ্র ঘুরে দেখছেন দেশটির জান্তা সরকারের প্রধান মিন অং হ্লাইং

আলতাফ পারভেজের কলাম

মিয়ানমারে নির্বাচন শেষে যে রাজনৈতিক মোড়বদল ঘটছে

১ ফেব্রুয়ারি মিয়ানমারে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলের পাঁচ বছর পূর্তি হলো। মিয়ানমারের নির্বাচন–পরবর্তী সামগ্রিক অবস্থা নিয়ে দুই পর্বে লিখেছেন আলতাফ পারভেজ। আজ প্রকাশিত হলো প্রথম পর্ব

বাংলাদেশে নির্বাচনী প্রচারণার মধ্যেই মিয়ানমারে ভোট হয়ে গেল। তিন পর্যায়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন শেষ হলো ২৫ জানুয়ারি। সশস্ত্র বাহিনীর অধীনে ও তত্ত্বাবধানেই এই নির্বাচন হয়। নতুন সরকার গঠন শেষে ‘তাতমা-দ’ নামে পরিচিত দেশটির সশস্ত্র বাহিনী দেশব্যাপী গেরিলা প্রতিরোধ দমনে নতুন অভিযানে নামবে বলে ধারণা করা হচ্ছে—যার একটা অংশ হতে পারে রাখাইন বা আরাকান প্রদেশে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধেও। কাছাকাছি সময়ে বাংলাদেশেও নতুন সরকার দায়িত্ব নেবে।

নির্বাচন ও নতুন বেসামরিক সরকার গঠনের ডামাডোলের মধ্যে মিয়ানমারের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান গেরিলা প্রতিরোধযুদ্ধের সাংগঠনিক কাঠামোতেও একটা মোড়বদল ঘটছে এবং তার সঙ্গে গভীর যোগ রয়েছে ভূরাজনীতির, যা বাংলাদেশের সম্ভাব্য নতুন সরকারের মনোযোগ দাবি করছে।

নির্বাচনের মাধ্যমে জেনারেলদের ‘ছদ্ম সরকার’

যদিও এই ১ ফেব্রুয়ারি মিয়ানমারে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলের পাঁচ বছর পূর্তি হলো, তবে সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া দেশটি গত আট দশক সামরিক ছত্রচ্ছায়াতেই আছে। প্রধান রাজনীতিবিদ অং সান সু চি পাঁচ ধরে কারাগারে বন্দী। তাতমা-দ–এর ধরপাকড়ের মুখে তাঁর দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি বা এনএলডির প্রায় কোনো নেতা আর প্রকাশ্যে নেই।

চলমান সামরিক শাসনকে কিছুটা বেসামরিক আবরণ দিতেই সম্প্রতি নির্বাচন দেন জান্তাপ্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাই। তবে নির্বাচনের আগে সামরিক শাসনের বিরোধিতাকারী রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধন বাতিল করে নেওয়া হয়। জান্তার অনুমোদন পাওয়া ছয়টি দল কেবল জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়। এনএলডির পাশাপাশি প্রধান আঞ্চলিক দল শান ন্যাশনালিস্ট লিগ ফর ডেমোক্রেসিও নির্বাচনে ছিল না।

মিয়ানমারের প্রশাসনিক কাঠামো সম্পর্কে অবহিত ব্যক্তিরা জানেন, নির্বাচন শেষে নতুন সরকারেও ক্ষমতার লাগাম জেনারেলদের হাতে থাকবে। আগামী মাসে নতুন সরকার দায়িত্ব নেবে বলে আশা করা হচ্ছে। বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী, যেকোনো বেসামরিক সরকারে স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও সীমান্তবিষয়ক মন্ত্রণালয় সশস্ত্র বাহিনীর হাতে থাকে এবং পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে ২৫ শতাংশ আসন সশস্ত্র বাহিনীর জন্য সংরক্ষিত রাখার নিয়ম। ফলে নতুন সরকারেও তাদের চূড়ান্ত প্রভাব থাকবে।

তা ছাড়া যে দলটি নির্বাচন শেষে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে, সেই ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি বা ইউএসডিপি প্রতিষ্ঠা হয়েছে সাবেক জেনারেলদের মাধ্যমেই ২০১০-এ। এখন দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন সাবেক পুলিশপ্রধান খিন ই। দলটি ২০২১–এর সামরিক অভ্যুত্থান সমর্থনও করেছিল।

এনএলডির নিবন্ধন বাতিল করিয়ে ইউএসডিপিকে পার্লামেন্টে প্রধান দল হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনী নির্বাচনী ব্যবস্থায়ও পরিবর্তন ঘটাল এবার। সংসদের একটা কক্ষে এবং প্রাদেশিক পরিষদগুলোতে আসনের একাংশ নির্বাচনে অংশ নেওয়া দলগুলোকে ভোটের সংখ্যানুপাতে বরাদ্দ করা হচ্ছে। ভোটে আসা সব দলকে পার্লামেন্টে কিছু আসন দিয়ে সন্তুষ্ট রাখার লক্ষ্যে এটা করা হলো। এ রকম সব উপায়ে সম্ভাব্য যে বেসামরিক শাসন শুরু হতে যাচ্ছে, তাতে ফেব্রুয়ারির পরও সেনাছাউনির প্রভাব আগের মতোই থাকবে। প্রতিবেশী দেশগুলোকেও তাই দ্বিপক্ষীয় বিষয়ে তাতমা-দ–এর জেনারেলদের সঙ্গেই বোঝাপড়ায় আসতে হবে।

নির্বাচনকালে শঙ্কার চেয়ে কম গোলযোগ হওয়ায় জেনারেলদের আন্তর্জাতিক পরিসরে অগণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি আড়াল করার কিছুটা সুযোগ তৈরি হয়েছে। পশ্চিমের সংবাদমাধ্যমগুলো নির্বাচনকে ক্রমাগত ‘সাজানো’ হিসেবে উল্লেখ করলেও মিয়ানমারের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাব ট্রাম্পের আমলে কিছুটা নমনীয় দেখা যাচ্ছে।

অস্তিত্বের সংকটে সু চির সমর্থক এনইউজি

মিয়ানমারে সশস্ত্র বাহিনীর প্রাদেশিক প্রতিপক্ষ বহু। জাতীয় পর্যায়ে বিরোধীপক্ষ মূলত নিষিদ্ধ এনএলডি। এই দল–প্রভাবিত দেশটির গণতন্ত্রপন্থী প্রবাসী সরকার (ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট বা এনইউজি) গত ২৮ ডিসেম্বর নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে একটা বিবৃতি দেয়। সেখানে প্রত্যাখ্যানের কারণ হিসেবে বলা হয়, ২০২০–এর নির্বাচনে বিজয়ীদের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেওয়াকে তারা এখনো অবৈধ মনে করে। তা ছাড়া বর্তমান সংবিধানের অধীনে কোনো নির্বাচন মিয়ানমারের রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে পারবে বলে মনে করে না তারা। ‘প্রবাসী সরকার’ নাগরিকদের প্রতি নির্বাচন বর্জনের আহ্বান জানিয়েছিল। তবে নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবেই শেষ হয়েছে, যদিও ভোটে উৎসাহ-উদ্দীপনা ছিল না।

সামরিক জান্তার নির্দেশমতো শ্রমিক-কর্মচারীদের ভোট দিতে বাড়িতে যাওয়ার পর্যাপ্ত ছুটি দেওয়া হয়। প্রশাসন নানাভাবে এ–ও জানিয়েছে, যেসব এলাকায় ভোট কম হবে, সেখানে প্রশাসনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এনইউজির গেরিলাদের নিয়ন্ত্রণে দেশের কিছু কিছু এলাকা থাকলেও তাদের শক্তি এত বেশি ছিল না যে ব্যাপকভাবে সামরিক বাহিনীর নির্বাচনী কর্মসূচি প্রতিরোধ করতে পারে। সরকারের দাপ্তরিক দাবি, ৩৩০টি টাউনশিপের ২৬৫টিতে তারা নির্বাচন করিয়েছে। বাকিগুলো গেরিলানিয়ন্ত্রিত এলাকা বলে অনুমান করা হয়।

প্রবাসী জাতীয় ঐকমত্যের সরকার বলছে, তাদের ভাষায়, ‘প্রহসনমূলক’ এই নির্বাচন শেষেও সামরিক বাহিনীর প্রকাশ্য ও ছদ্ম শাসন উৎখাত এবং তাদের সংবিধান বাতিল করে ফেডারেলধর্মী মিয়ানমার গড়তে সব জাতিসত্তাকে নিয়ে গণতান্ত্রিক সংবিধান তৈরির রাজনৈতিক লক্ষ্যে কাজ চালিয়ে যাবে তারা।

পর্যবেক্ষকেরা অবশ্য মনে করছেন, সশস্ত্র বাহিনী যে নির্বাচন করে ফেলতে পারল, এটা প্রবাসী সরকারের জন্য বড় এক ধাক্কা। দীর্ঘ পাঁচ বছরেও জান্তার বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক সফলতা না আসায় জনগণ ভবিষ্যতে তাদের ব্যাপারে উৎসাহ না–ও দেখাতে পারে। ফলে তাদের সামনে এখন নতুন করে সংগ্রাম পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

মিয়ানমারের গেরিলাদের জন্য এখনকার সময়টা ভাটার মতো।

গেরিলা সংগ্রাম গঠন-পুনর্গঠনের নতুন পর্ব

মিয়ানমার গেরিলাযুদ্ধের দেশ হিসেবে পরিচিত। সব প্রদেশ ও বিভাগে কোনো না কোনো জাতির গেরিলা সংগঠন সক্রিয় সেখানে। তবে নির্বাচনের পর রাজনৈতিকভাবে পক্ষ দাঁড়াচ্ছে তিনটি—সশস্ত্র বাহিনী, বেসামরিক সরকার ও গেরিলা সংগঠনগুলো।

২০২১–এর আগে গৃহযুদ্ধের ভরকেন্দ্র ছিল প্রান্তিক সীমান্তপ্রদেশগুলো। কিন্তু এনএলডির কাছ থেকে নির্বাচনী ফল ছিনতাই করে তাকে নিষিদ্ধ করার পর জাতীয়ভাবে সু চির সমর্থক বামার তরুণেরাও গণতন্ত্র উদ্ধারে অস্ত্র হাতে নেন। এ রকম সব গেরিলা গোষ্ঠী নানাভাবে বিভক্ত। তাদের বিভক্ত রাখা এবং পরস্পরের বিরুদ্ধে লাগিয়ে রাখার ক্ষেত্রে সামরিক জান্তার পাশাপাশি গণচীনেরও পরোক্ষ, কিন্তু সক্রিয় ভূমিকা আছে।

জাতীয়ভাবে একক কোনো নেতৃত্বের অধীনে না থাকা এবং বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করার ধারা গেরিলা সংগঠনগুলোকে অস্তিত্বের সংকটে ফেলেছে এখন। পরিস্থিতি সামলাতে অনেক অঞ্চলে এ রকম সংগঠনগুলো জান্তার সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তি করে টিকে আছে। ২০২৩ থেকে গেরিলাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা অনেক এলাকা সম্প্রতি কেড়ে নিতেও সক্ষম হয়েছে তাতমা-দ। দৃঢ় সামরিক কমান্ড এবং চীন-রাশিয়া থেকে রসদের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ গেরিলাদের থেকে এগিয়ে রাখছে তাদের। তবে তাতমা-দ যেহেতু দেশটির মূল রাজনৈতিক সমস্যাগুলোর কোনো সমাধান দিতে পারছে না বা দিতে অনিচ্ছুক, সেই কারণে গৃহযুদ্ধ তুষের আগুনের মতো জ্বলছেই।

গেরিলাদের জন্য এখনকার সময়টা ভাটার মতো। সেটা বিবেচনায় নিয়ে গত কয়েক মাসে দেশজুড়ে এ রকম সংগঠনগুলো সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক পর্যালোচনায় নেমেছে। তারই ফল হিসেবে ছোট ছোট ১৯টি গেরিলা সংগঠনের একটি জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে গত ১৫ ডিসেম্বর। এটা সরকারবিরোধী বহুল আলোচিত ‘থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স’–এর বাইরের ঘটনা, যা পর্যবেক্ষকদের বিশেষ মনোযোগ কাড়ছে।

এসআরএর আত্মপ্রকাশ

মিয়ানমারজুড়ে তিন ধারার গেরিলা সংগঠন রয়েছে এ মুহূর্তে। কেন্দ্রীয় সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে রয়েছে কিছু দল। এর মধ্যে আবার দুটি উপধারা আছে। একদল বহুকাল ধরে যুদ্ধবিরতিতে আছে। যেমন শান প্রদেশের ওয়া আর্মি। আবার কিছু কিছু দল সম্প্রতি যুদ্ধবিরতিতে গেছে, মূলত চীনের চাপে। যেমন তাঙ ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি বা টিএনএলএ (কিছুদিন আগেও টিএনএলএ থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের সদস্য হিসেবে সরকারের সঙ্গে সংঘাত ছিল)।

দ্বিতীয় একগুচ্ছ গেরিলা দল আছে, যারা কেন্দ্রীয় আর্মির সঙ্গে ব্যাপক যুদ্ধে লিপ্ত। যেমন আরাকান আর্মি, কাচিন আর্মি। ভারত–সংলগ্ন চিন প্রদেশের কিছু কিছু সংগঠনও এ রকম লড়াইয়ে আছে। প্রবাসী সরকার–সমর্থিত বিভিন্ন এলাকার পিপলস ডিফেন্স ফোর্সগুলোকেও এই তালিকায় রাখা যায়। এর বাইরেও দেশজুড়ে সরকারবিরোধী ছোট ছোট অনেক গেরিলা সংগঠন গড়ে উঠেছে ২০২১–এর পর থেকে। তৃতীয় ধারার এই গ্রুপগুলো গত ১৫ ডিসেম্বর জোটবদ্ধ হওয়ার ঘোষণা দিয়ে বিশেষ নজর কেড়েছে। ‘স্প্রিং রেভোল্যুশন অ্যালায়েন্স’ বা এসআরএ নাম নিয়েছে তারা।

এসআরএ যে দেশটির সরকারবিরোধী খ্যাতনামা প্রাদেশিক গেরিলা সংগঠনগুলোকে বাদ দিয়েই গড়ে উঠেছে—সেটা বেশ অভিনব। থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের কোনো সদস্য এই জোটে নেই। এসআরএ বলছে, তারা জোটবদ্ধ হওয়ার আগে কাচিন আর্মি, আরাকানি আর্মিসহ সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত বড় সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে নিয়েছে। এই জোট তাতমা-দ–বিরোধী সামরিক প্রতিরোধ সমন্বয় করতে আগ্রহী এবং একই সঙ্গে তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে নাগরিক সুবিধার বিকল্প কাঠামো (মোবাইল ক্লিনিক, স্কুল ইত্যাদি) গড়ে তুলতে চায়।

এসআরএর আওতায় সম্মিলিতভাবে ১০ থেকে ১৫ হাজার সদস্য রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এর কেন্দ্রীয় পরিচালনা কমিটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন ৪২ বছর বয়সী খ্রিষ্টান কারেন খুন বেদু। তিনি কাইয়া প্রদেশের কারেননি ডিফেন্স ফোর্সের একজন নেতা। ব্রিটেনসহ ইউরোপীয় অনেক দেশের রাজনৈতিক চাপে ২০১২ সালে কারাগার থেকে ছাড়া পেয়েছিলেন বেদু। তাঁর ভাষায়, বিচ্ছিন্ন লড়াই একটা কৌশলগত সংকট। এসআরএ–ভুক্তরা পারস্পরিক গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং অন্যান্য কাঠামোগত সহায়তায় চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। প্রত্যেকের এলাকায় বেসামরিক প্রশাসন পরিচালনায় সম্পদ লেনদেনও তাদের সমঝোতায় রয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় ধীরে ধীরে তারা একক কমান্ডের অধীনে বিকল্প ফেডারেল সেনাবাহিনী গড়ার দিকে যেতে চায়।

মিয়ানমারে গণতন্ত্রপন্থী প্রবাসী সরকারের ঘোষিত একটা লক্ষ্য, ফেডারেল রাজনৈতিক ব্যবস্থার পাশাপাশি একই ধাঁচের কেন্দ্রীয় সেনাবাহিনী গঠন। এসআরএ এনইউজির রাজনৈতিক লক্ষ্যের সঙ্গে সমন্বয় করে চলতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে। তবে নতুন এই গেরিলা জোট পুরোপুরি এনইউজি–নিয়ন্ত্রিত নয়।

অনেকের ধারণা, সামনের দিনগুলোতে এনইউজি রাজনৈতিক-সামরিক সংগ্রামে নেতৃত্ব দিতে অসমর্থ হলে এসআরএ সেই জায়গা দখল করবে এবং কাচিন, কারেন, রাখাইন ও চিনদের পুরোনো সংগঠনগুলোও সম্ভবত তা–ই চাইছে। কিছু ইউরোপীয় শক্তিও মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের এ রকম পুনর্বিন্যাসে উৎসাহী—যেখানে অং সান সু চির মতো পুরোনো বামার একক নেতৃত্বের বদলে বহু জাতিসত্তার সংগঠকদের যৌথ নেতৃত্ব জান্তাকে চ্যালেঞ্জ করবে। এসআরএ জোট সামরিকভাবে চীনকে প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করছে, যা ভূরাজনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। মিয়ানমারের গেরিলা সংস্কৃতিতে এটা বেশ নতুন ঘটনা।

নতুন সংঘাতের শঙ্কায় আরাকান

কাচিন, রাখাইন বা কারেনসহ মিয়ানমারের দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকার বড় গেরিলা সংগঠনগুলো যে জাতীয়ভাবে এসআরএ জোট গড়ে ওঠায় সবুজ সংকেত দিয়েছে, তার কিছু বাস্তব কারণ রয়েছে। নতুন সরকার গঠন শেষ হলেই কেন্দ্রীয় সেনাবাহিনী সব অঞ্চলে বিরুদ্ধবাদীদের লক্ষ্য করে সামরিক অভিযানে নামবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে বিশেষ আতঙ্ক রয়েছে আরাকানে; যদিও এই প্রদেশের বড় অংশ আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে, কিন্তু রাজধানী সিত্তিউই, শিল্পশহর চাইয়াকফুসহ দক্ষিণের ২-৩টি গুরুত্বপূর্ণ টাউনশিপের পতন ঘটাতে পারেনি তারা। আবার উত্তরে মংডুর দিকের রোহিঙ্গাদের প্রতিরোধসংগ্রামও মোকাবিলা করতে হচ্ছে তাদের। বাংলাদেশ–সংলগ্ন সীমান্তচৌকিগুলোতে গত বছর কেন্দ্রীয় সশস্ত্র বাহিনীর জওয়ানদের ফেলে যাওয়া অস্ত্রপাতি পেয়ে অনেক রোহিঙ্গা উপদল এখন বেশ উজ্জীবিত অবস্থায় আছে।

এসব কারণে আরাকান আর্মির জন্য সামনের সময়টা খুব চ্যালেঞ্জিং। কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে এনইউজির অনুগতও নয় তারা। ফলে তাতমা-দ–এর ভবিষ্যৎ আক্রমণের মুখে টিকে থাকার চেষ্টায় নামা সব প্রদেশের ছোট-বড় গেরিলা সংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বয়ে যুক্ত আছে তারাও। এসআরএর গঠন সেই লক্ষ্যেই। এতে দেশটির কেন্দ্রীয় বামার অঞ্চলের সঙ্গে প্রান্তিক অন্য জাতির প্রদেশগুলোর গেরিলাদের যোগাযোগের কাঠামো গড়ে উঠল। তবে খুন বেদুর মতো তরুণদের নেতৃত্ব সব জাতিসত্তার সশস্ত্র ধারার পুরোনো নেতারা মেনে নেবেন কি না, সেই বিষয়ে অনিশ্চয়তা আছে। আবার সামরিকভাবে টিকে থাকার পাশাপাশি আরাকানসহ সর্বত্র তাতমা-দ–বিরোধীদের অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকার বিষয়ও বড় প্রশ্ন হিসেবে আছে।

  • আলতাফ পারভেজ গবেষক

    মতামত লেখকের নিজস্ব