মতামত

বিশ্ববিদ্যালয়ে ফাইলবন্দী একাডেমিক তথ্য ও উচ্চশিক্ষায় আমাদের বিড়ম্বনা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার যত উৎকর্ষের দিকে এগোচ্ছে, তত দেশের উচ্চশিক্ষা খাতের একটি মৌলিক দুর্বলতা দিন দিন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একাডেমিক তথ্য এখনো সঠিকভাবে অনলাইনে সহজলভ্য নয়। ভর্তি, ফলাফল, ট্রান্সক্রিপ্ট ও সনদ যাচাইয়ের মতো মৌলিক কাজের জন্য শিক্ষার্থীদের এখনো পুরোপুরি নির্ভর করতে হয় কাগুজে নথিপত্র, সিলমোহর ও দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ওপর। প্রশ্ন হলো, এই মান্ধাতা আমলের বাস্তবতা নিয়ে আমরা কি সত্যিই বৈশ্বিক শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছি?

দেশের অধিকাংশ পাবলিক ও অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে শিক্ষার্থীদের তথ্য হয় অসম্পূর্ণ, নয়তো মান্ধাতা আমলের। অনেক ক্ষেত্রে ফলাফল নিয়মিত হালনাগাদ করা হয় না। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই নেই অনলাইন ট্রান্সক্রিপ্ট বা ডিগ্রি যাচাইয়ের কোনো ডিজিটাল ব্যবস্থা। ফলে একজন শিক্ষার্থীকে নিজের একাডেমিক পরিচয় প্রমাণ করতে গিয়ে বারবার বিশ্ববিদ্যালয়ে সশরীর হাজির হতে হয়। বিভিন্ন দপ্তরে ধরনা দিয়ে দিনের পর দিন অপেক্ষায় থেকে তাঁকে অনাকাঙ্ক্ষিত বিড়ম্বনার মুখোমুখি হতে হয়।

এই সংকটের সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্রটি ফুটে ওঠে, যখন কোনো শিক্ষার্থী বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদন করেন। বর্তমান বিশ্বের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ই এখন দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল ভেরিফিকেশন বা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া পছন্দ করে। আবেদনকারীর ফলাফল, কোর্সের ইতিহাস ও ডিগ্রির বৈধতা তারা অনলাইনেই দেখে নিতে চায়; কিন্তু বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানে এই তথ্যের ডিজিটাল উপস্থিতি না থাকায় পুরো প্রক্রিয়াটি অসম্ভব জটিল ও দীর্ঘ হয়ে পড়ে।

উদাহরণ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আরিফ হোসেনের কথা বলা যায়। তিনি যুক্তরাজ্যের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার আবেদন করেছিলেন। তাঁর একাডেমিক ফলাফল যথেষ্ট ভালো থাকলেও সংকটের শুরু হয় ভেরিফিকেশন পর্যায়ে। সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁর ট্রান্সক্রিপ্ট অনলাইনে যাচাই করতে না পেরে আবেদনটি গুরুত্বহীন অবস্থায় ফেলে রাখে।

আরিফকে তখন আবার নতুন করে দাপ্তরিক কাগজপত্র সংগ্রহ করে এবং সেগুলো সত্যায়িত করার পর কুরিয়ারের মাধ্যমে পাঠাতে হয়। এই জটিলতায় প্রায় এক মাস সময় নষ্ট হয় এবং এর মধ্যেই তাঁর স্কলারশিপ বা বৃত্তির সময়সীমা পার হয়ে যায়। ফলে একটি উজ্জ্বল স্বপ্ন ভেঙে পড়ে তাঁর। এমন ট্র্যাজেডি আজ বাংলাদেশের হাজার হাজার তরুণের।

বাংলাদেশের তরুণেরা আজ বিশ্বমঞ্চে নিজেদের মেধা ও সক্ষমতার জানান দিচ্ছেন; কিন্তু তাঁদের সেই জয়যাত্রা যদি খোদ নিজ দেশের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতায় থমকে যায়, তবে সেটি হবে একজাতীয় অপচয়। উচ্চশিক্ষা খাতে ডিজিটাল রূপান্তর তাই কোনো বিলাসিতা নয়, এটি সময়ের অনিবার্য দাবি।

একই তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নওশিন আক্তারের। কানাডার একটি নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার পর অনলাইনে তথ্য যাচাই সম্ভব না হওয়ায় তাঁকে সশরীর দপ্তরে গিয়ে সব নথিপত্র প্রমাণ করতে বলা হয়। ক্লাস শুরু হওয়ার পর যেখানে পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়ার কথা, সেখানে তাঁকে কাটাতে হয়েছে প্রচণ্ড মানসিক চাপ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে। শেষ পর্যন্ত কাজ সম্পন্ন হলেও বাড়তি খরচ ও বিড়ম্বনা তাঁকে মানসিক ট্রমার শিকার করে।

এই সমস্যা কেবল ভর্তি বা বৃত্তিতেই সীমাবদ্ধ নেই। বিদেশে পড়াশোনার পাশাপাশি পার্টটাইম চাকরি বা ইন্টার্নশিপের ক্ষেত্রেও শিক্ষার্থীরা বৈষম্যের শিকার হন। অনেক নিয়োগদাতা সরাসরি অনলাইনে ডিগ্রি যাচাই করতে পছন্দ করেন। তথ্য সহজলভ্য না হলে তাঁরা অন্য দেশের প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেন, যাঁদের একাডেমিক রেকর্ড ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রস্তুত আছে। এমনকি ভিসা আবেদনের প্রক্রিয়ায় অনেক কর্মকর্তা অনলাইনে যাচাই করতে গিয়ে ব্যর্থ হলে বাড়তি কাগজ বা ব্যাখ্যা চান, যা ভিসা পাওয়ার প্রক্রিয়াকে দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা অনেক আগেই এই সমস্যার আধুনিক সমাধান নিশ্চিত করেছে। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কমন ডেটাবেজ ব্যবহার করে, যেখানে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই শিক্ষার্থীর অর্জনগুলো যাচাই করা সম্ভব। এটি যেমন স্বচ্ছতা বাড়ায়, তেমনি শিক্ষার্থীবান্ধব একটি পরিবেশ নিশ্চিত করে। এই দৌড়ে পিছিয়ে থাকা বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা আসলে একধরনের ডিজিটাল বৈষম্যের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। উন্নত বিশ্বের একজন ছাত্র যখন মাত্র কয়েক ক্লিকেই তাঁর যোগ্যতা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরছেন, আমাদের শিক্ষার্থীদের তখন ছুটতে হচ্ছে পুরোনো ফাইল আর কাগজের পেছনে।

এই অচলাবস্থার সমাধান অসম্ভব নয়, বরং প্রয়োজন বছরের পর বছর চলে আসা এই স্থবিরতার অবসান। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডেটাবেজ গড়ে তোলা এখন বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য নিজস্ব অনলাইন পোর্টাল থাকতে হবে, যেখান থেকে তাঁরা ট্রান্সক্রিপ্ট ও সনদ যাচাই এবং শেয়ার করতে পারবেন। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী, ডিজিটাল ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা চালু হলে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় ও নিয়োগকর্তারা ঘরে বসেই দ্রুত সঠিক তথ্য নিশ্চিত হতে পারবেন।

বাংলাদেশের তরুণেরা আজ বিশ্বমঞ্চে নিজেদের মেধা ও সক্ষমতার জানান দিচ্ছেন; কিন্তু তাঁদের সেই জয়যাত্রা যদি খোদ নিজ দেশের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতায় থমকে যায়, তবে সেটি হবে একজাতীয় অপচয়। উচ্চশিক্ষা খাতে ডিজিটাল রূপান্তর তাই কোনো বিলাসিতা নয়, এটি সময়ের অনিবার্য দাবি।

যুগ যুগ ধরে চলা প্রশাসনিক ভোগান্তি ও অনিশ্চয়তার ইতি টানতে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই আমূল পরিবর্তন আজ জরুরি। ডিজিটাল যুগে দেশের মেধার পরিচয়কে কাগজের ফাইলে বন্দী করে সামনে এগোনো সম্ভব নয়। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) চাইলেই সমন্বিতভাবে এই কাজের শুভ সূচনা করতে পারে। শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি লাঘবে এর কোনো বিকল্প নেই।

  • মোছাব্বের হোসেন সাংবাদিক ও যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মন্টানার শিক্ষার্থী
    ribon.bd@gmail.com