গত বছরের ১৬ জুলাই শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে নগরের মুরাদপুর এলাকায় হামলা করেন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীরা
গত বছরের ১৬ জুলাই শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে নগরের মুরাদপুর এলাকায় হামলা করেন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীরা

ডেভিড বার্গম্যানের বিশ্লেষণ

জুলাই হত্যাকাণ্ড ও আওয়ামী এমপি: কাঠগড়ায় কি ভুল মানুষ?

বাংলাদেশে সবাই রংপুরে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার ঘটনাটি জানেন। ছাত্র আন্দোলনের সময় এটি ছিল প্রথম দিকের প্রাণঘাতী ঘটনা; এরপর একে একে শত শত মানুষ মারা যান। ঘটনার ভিডিও ধারণ করা হয়েছিল এবং হাত প্রসারিত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকা এক তরুণ ছাত্রকে পুলিশের গুলি করার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ রূপ নেয়। শেষ পর্যন্ত, তিন সপ্তাহের মাথায় শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে।

তবে ১৬ জুলাই শুধু আবু সাঈদই নিহত হননি। ওই দিনই চট্টগ্রাম শহরে আরও তিনজন নিহত হন। তাঁরা হলেন—ফয়সাল আহমেদ শান্ত, ওয়াসিম আকরাম ও মো. ফারুক। রংপুরের ঘটনার মতো এখানে পুলিশের ভূমিকা মুখ্য ছিল না। চট্টগ্রামে গুলির ঘটনায় জড়িত ছিলেন আওয়ামী লীগের কর্মী ও তাঁদের রাজনৈতিক নেতারা।

ঘটনার ছয় দিন পর, স্বাধীন সংবাদমাধ্যম নেত্র নিউজ চট্টগ্রামের এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে একটি বিস্তারিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তারা ঘটনাস্থলের ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে এবং একই সময়ের মাঠপর্যায়ের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে। অনুসন্ধানে যাঁদের গুলি করতে দেখা যায়, তাঁরা সবাই আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের কর্মী বলে শনাক্ত হন।

চট্টগ্রামে জুলাই ছাত্র–জনতার আন্দোলনে গুলির ঘটনায় অংশ নেন আওয়ামী লীগের কর্মী ও তাঁদের রাজনৈতিক নেতারা। কয়েকজন শুটারের ছবি ও ভিডিও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

নেত্র নিউজ জানায়, এই শুটাররা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর ও নুরুল আজিম রনির পরিচিত ও প্রমানিত অনুসারী। অনুসন্ধানে আরও উঠে আসে, বাবর নিজে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এবং আওয়ামী লীগের কর্মীদের একটি মিছিলে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। ভিডিও ও অন্যান্য প্রমাণে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, গুলিতে ব্যবহৃত অস্ত্রগুলো বাবরের এক সহযোগীর মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়েছিল।

এই লেখার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো—নেত্র নিউজের অনুসন্ধানে বলা হয়, হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর ও নুরুল আজিম রনি ছিলেন মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের ‘সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ তৃণমূল সহযোগীদের’ মধ্যে দুজন। সে সময় নওফেল ছিলেন দেশের শিক্ষামন্ত্রী এবং যে আসনে হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটেছে, তিনি ছিলেন সেই এলাকার সংসদ সদস্য।

নেত্র নিউজ জানায়, তারা নওফেল ও বাবরের একসঙ্গে রাজনৈতিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার প্রায় এক শটি ছবি সংগ্রহ করেছে। পাশাপাশি, নওফেল যে বহুবার বাবরের বাড়িতে গিয়েছেন—এমন ছবিও তাদের কাছে আছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, রনিকে চট্টগ্রাম শহর ও আশপাশের এলাকায় নওফেলপন্থী ছাত্রলীগের প্রকৃত নেতা হিসেবে ধরা হতো।

নেত্র নিউজের এই অনুসন্ধান অবশ্যই চট্টগ্রামের ১৬ জুলাইয়ের ঘটনার জন্য কারও অপরাধ শত ভাগ প্রমাণ করে না। কিন্তু এটি তদন্তের জন্য একটি স্পষ্ট ও বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দেয়। বাংলাদেশ পুলিশ হোক বা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তকারীরা—এই প্রতিবেদন থেকে তাঁরা জানতে পারেন কারা গুলি চালিয়েছে বলে অভিযোগ, অস্ত্রের উৎস কোথা থেকে এসেছে, বাবর ও রনি কীভাবে শুটারদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষক ছিলেন, এবং সেই সঙ্গে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী নওফেলের সঙ্গে তাঁদের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের তথ্যও এতে উঠে এসেছে।

ফজলে করিম চৌধুরীর গ্রেপ্তার

এসব তথ্য থাকার পরও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) কৌঁসুলিরা চট্টগ্রামের হত্যাকাণ্ডের জন্য প্রথমে নেত্র নিউজ যাঁদের চিহ্নিত করেছিল, তাঁদের কাউকে নিয়েই তদন্ত করেননি। বরং তাঁরা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সাবেক আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্যকে অভিযুক্ত করেন। ২০২৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের রাউজান আসনের সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরীকে আইসিটির বিচারকদের সামনে হাজির করা হয়। কৌঁসুলি আবদুল্লাহ নোমানের আবেদনের পর তাঁকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আটক রাখা হয়।

সেই সময় স্পষ্ট ছিল না, ঠিক কোন অপরাধের জন্য ফজলে করিমকে অভিযুক্ত করা হচ্ছে। ট্রাইব্যুনালের আটকাদেশে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার উল্লেখ ছিল না। সেখানে শুধু খুব সাধারণভাবে বলা হয়—সাম্প্রতিক জুলাই-আগস্টের ছাত্র–জনতার আন্দোলনের সময় তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ, সহায়তা, উসকানি ও নির্দেশনার মাধ্যমে হত্যা, গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধসহ নানা অপরাধ সংঘটিত করেছেন বলে কৌঁসুলি অভিযোগ করেছেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া সীমান্ত থেকে ফজলে করিম চৌধুরীকে আটক করে বিজিবি। আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য থাকাকালীন নিজস্ব বাহিনী দিয়ে এলাকা নিয়ন্ত্রণ করতেন। তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা, দখলের অভিযোগের শেষ নেই। মুনিরিয়া যুব তাবলিগ নামে ধর্মীয় একটি আধ্যাত্মিক সংগঠনের ৪৬টি কার্যালয় গুঁড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

এরপর আইসিটির কৌঁসুলিরা ফজলে করিমের আইনজীবীদের একটি এক পৃষ্ঠার নোট দেন, যেখানে তাঁর আটকের কারণ ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়। ওই নোটে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই চট্টগ্রাম শহরে সংঘটিত তিনটি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাঁকে যুক্ত করা হয়। সেখানে বলা হয়, ওই দিন ফজলে করিম অন্যান্য আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে মিলে দলীয় কর্মীদের ছাত্র-জনতার বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন দমনে পরিকল্পিতভাবে আক্রমণ’ চালান এবং তারই ফলস্রুতিতে তিনজন নিহত হন।

তবে এই অভিযোগের পক্ষে ওই নোটে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। সে সময় পর্যন্ত এই তিনটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় একমাত্র ফজলে করিম চৌধুরীকেই আটক বা গ্রেপ্তারের আবেদন করেছিল আইসিটি।

অনেকের কাছেই এই আটক অযৌক্তিক বলে মনে হয়েছে। কারণ, ভিডিও ফুটেজ ও অন্যান্য যে প্রমাণ পাওয়া গেছে; বিশেষ করে নেত্র নিউজের অনুসন্ধানে যেগুলো উঠে এসেছে—সেগুলোতে চট্টগ্রামের হত্যাকাণ্ডে সম্পূর্ণ ভিন্ন আওয়ামী লীগ নেতাদের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তা ছাড়া ফজলে করিমের নিজ নির্বাচনী এলাকা রাউজানে (যা চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে) জুলাইয়ের অস্থিরতার সময় কোনো গুলির ঘটনা ঘটেনি, কেউ গুরুতর আহত হননি, এমনকি কোনো আন্দোলনকারী নিহতও হয়নি।

পুরোনো শত্রুতার নিষ্পত্তি?

এই প্রশ্নের সম্ভাব্য উত্তর খুঁজতে গেলে দুজন ব্যক্তির পরিচয়ের দিকে নজর দিতে হয়। ফজলে করিম চৌধুরীর আটকাদেশ দেওয়ার কয়েক মিনিট পরই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বাইরে এক তাৎক্ষণিক সংবাদ সম্মেলনে তাঁরা দাবি করেন, তাঁদের ‘অভিযোগের’ ভিত্তিতেই আইসিটি ফজলে করিমকে গ্রেপ্তার করেছে। এই দুজন ব্যক্তি বলেন যে হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর ও নুরুল আজিম রনি শিক্ষামন্ত্রী নওফেলের লোক না। তাদের দাবী হলো বাবর ও রনি আসলে ফজলে করিম চৌধুরীর লোক। উল্লেখ্য, ১৬ জুলাইয়ের ঘটনায় এই বাবর ও রনিকেই মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত করেছিল নেত্র নিউজের অনুসন্ধানি প্রতিবেদন।

সংবাদ সম্মেলনে কথা বলা এই দুই ব্যক্তি হলো আবদুল্লাহ আল মামুন ও জুবায়ের আহমেদ। তারা ফজলে করিমের সাবেক নির্বাচনী এলাকা রাউজানকেন্দ্রিক একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী মুনিরিয়া যুব তাবলিগ-এর সঙ্গে যুক্ত। কেউ কেউ এই সংগঠনটিকে একটি স্বাভাবিক ধর্মীয় সংগঠন হিসেবে দেখেন। আবার অনেকের মতে এটি চরমপন্থী এবং ভূমি দখলসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। মুনিরিয়ার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ কতটা সত্য, তা আলাদা বিষয়। তবে এটুকু স্পষ্ট যে রাউজানের সংসদ সদস্য থাকাকালে ফজলে করিম ও মুনিরিয়া যুব তাবলিগের মধ্যে প্রায়ই পরষ্পর বিরোধিতা হয়েছে। ফজলে করিমের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি তাদের অপরাধমূলক তৎপরতা দমনে চেষ্টা করেছিলেন।

মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর ও নুরুল আজিম রনি (বা থেকে)। তাঁরা তিনজনই এখন দেশের বাইরে পলাতক।

ফজলে করিমের পরিবার মনে করে, এই দ্বন্দ্বই তাঁর দীর্ঘ আটক থাকার মূল কারণ। তাদের দাবি—এখন প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে মুনিরিয়ার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা চাপ সৃষ্টি করছে, আর সেই চাপের ফলেই তাঁর বিরুদ্ধে মামলা ও বিচারপ্রক্রিয়া এগোচ্ছে।

এটা নিশ্চিতভাবেই দেখা যাচ্ছে যে মুনিরিয়ার সঙ্গে যুক্ত এবং নতুন কিছু ছাত্রগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যক্তিরা বারবার ফজলে করিমের আটক, বিচার, এমনকি মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করার জন্য সক্রিয়ভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

ফজলে করিম গ্রেফতার হবার আগে, ২০২৪ সালের অক্টোবরে, মুনিরিয়ার এক সদস্য সম্রাট রোবায়েত (যিনি পরবর্তীতে আইসিটিতে দেওয়া মূল অভিযোগটি লিখেছিলেন) চট্টগ্রামের একটি আদালতের সামনে এক সমাবেশের নেতৃত্ব দেন। সেখানে একটি ব্যানারে ফজলে করিমের গলায় ফাঁসের ছবি দেখিয়ে প্রকাশ্যেই তাঁর ‘ফাঁসি’ দাবি করা হয়।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে একদল ছাত্র (যাদের মধ্যে অন্তত একজন মুনিরিয়া যুব তাবলিগের সঙ্গে যুক্ত) অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ওই সাক্ষাৎ নিয়ে ফেসবুকে দেওয়া একটি পোস্টে বলা হয়, এটি ছিল—‘বিচার ব্যাবস্থা ও আওমী সন্ত্রাসীদের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রয়োগ ও রাউজানের শীর্ষ সন্ত্রাসী ফজলে করিমের সর্বোচ্চ শাস্তি সহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মাননীয় প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রাফাত আহমেদ এর সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ।’ ‘সর্বোচ্চ শাস্তি’ বলতে সাধারণভাবে মৃত্যুদণ্ডকেই বোঝানো হয়।

এরপর ২০২৬ সালের ১২ জানুয়ারি ফজলে করিমের গুরুতর স্বাস্থ্যগত অবস্থার কারণে পরিবার তাঁকে হাসপাতালে নেওয়ার আবেদন করলে রোবায়েতসহ অন্যান্য লোকজন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সামনে ঘেরাও কর্মসূচি পালন করে। এর উদ্দেশ্য ছিল—ফজলে করিম যেন কোনোভাবেই, তাদের ভাষায়, ‘জামিন’ না পান। ওই কর্মসূচিতে বক্তব্য দিতে গিয়ে রোবায়েত বলেন, ‘চট্টগ্রামের অন্যতম গণহত্যাকারী এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী, তাঁকে জামিন দেয়ার নাকি…চক্রান্ত চালাচ্ছে একটি নির্দিষ্ট চক্র…আমরা চাই এইসব হত্যাকারি যাতে কোনভাবেই জামিন না পায়।’

এমনকি এর কয়েক সপ্তাহ আগেই রাউজানে এক সভায় আরেকজন ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়—যদি ‘তাকে ট্রাইব্যুনাল থেকে তাঁকে মুক্ত দেয়ার যে পাঁয়তারা যে গল্প আপনারা সাজাচ্ছেন তা আমাদের জানা…যদি সত্য হয়’, চট্টগ্রামের মানুষ তথা রাউজানের মানুষ প্রত্যেকটা মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে আপনাদের ট্রাইব্যুনাল ভেঙ্গে দেব।

জুলাইয়ে ছাত্রদের আন্দোলন দমনে অস্ত্র হাতে হেলাল আকবর চৌধুরী। চট্টগ্রাম নগরীর মুরাদপুর; ১৬ জুলাই, ২০২৪

আইসিটির জবাব

এই মামলার দায়িত্বে থাকা আইসিটির কৌঁসুলি আবদুল্লাহ নোমান স্বীকার করেছেন, ফজলে করিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার জন্য ট্রাইব্যুনালের ওপর বাইরের কিছু গোষ্ঠী চাপ সৃষ্টি করেছে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, কৌঁসুলিরা এমন চাপের কাছে নতি স্বীকার করছেন না।

নোমান বলেন, ‘এটা ঠিক যে মুনিরিয়া কোনোভাবে বিচারপ্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করছে এবং ফজলে করিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিশ্চিত করতে জনতার চাপ তৈরি করতে চাইছে। কিন্তু আমরা আইসিটির কৌঁসুলি হিসেবে; এবং এই মামলার দায়িত্বপ্রাপ্ত কৌঁসুলি হিসেবে যতক্ষণ না পর্যন্ত চূড়ান্তভাবে প্রাথমিকভাবে (প্রাইমা ফেসি) অভিযোগের ভিত্তি পাই, ততক্ষণ কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ আনছি না। সে কারণেই মামলাটি এখনো তদন্তাধীন রয়েছে।’

নোমান আরও স্বীকার করেন, ফজলে করিমের বিরুদ্ধে মামলা করার ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তাঁর ভাষায়, ‘যে আসন থেকে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, সেই এলাকায় কোনো নৃশংস ঘটনা ঘটেনি বা সংঘটিত হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রাম শহরে, অর্থাৎ যেখানে ওই হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটেছে, সেখানে ফজলে করিমের কোনো সাংগঠনিক দায়িত্ব ছিল না; তিনি আওয়ামী লীগ, যুবলীগ বা ছাত্রলীগের কোনো পদে ছিলেন না।

তবে নোমান উল্লেখ করেন, মুনিরিয়ার পক্ষ থেকে দেওয়া মূল অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, জুলাইয়ের আন্দোলনের সময় ফজলে করিম ছাত্রদের হত্যার উদ্দেশ্যে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহ করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘এই অভিযোগটি আমরা এখনো তদন্ত করে দেখছি।’

এর ফলে আটক হওয়ার এক বছর পরও ফজলে করিম ও তাঁর পরিবারকে তাঁর ভবিষ্যৎ কী হবে—তা জানার জন্য আরও অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এদিকে চট্টগ্রাম শহর আওয়ামী লীগ বা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের সাথে যুক্ত বিভিন্ন ব্যক্তিকে এখন গ্রেফতার করা হয়েছে বা তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে এই হত্যাগুলোর মামলায়। এর মধ্যে রয়েছেন সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলও।

এই পরিস্থিতির আলোকে ফজলে করিম চৌধুরীর গ্রেফতার নিয়ে উদ্বেগ হলো তাঁকে যে এখনো অন্তরীন রাখা হয়ছে তা কি আদৌ কোন প্রমানের ভিত্তিতে হচ্ছে কিনা। বরং বাস্তবতা হলো—মুনিরিয়া যুব তাবলিগ ও তাদের সঙ্গে যুক্ত কিছু ছাত্রগোষ্ঠীর সংগঠিত প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় আইসিটির কৌঁসুলিরা কার্যত একজন সাবেক আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্যকে মুক্তি দিতে সাহস পাচ্ছেন না, যদিও তাঁর বিরুদ্ধে আনা মূল অভিযোগগুলোর পক্ষে কোনো শক্ত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।

  • ডেভিড বার্গম্যান সাংবাদিক। ফেসবুক অ্যাকাউন্ট: david.bergman.77377
    ইংরেজি থেকে অনূদিত। মতামত লেখকের নিজস্ব।