
নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমান বিএনপি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাস পেরিয়েছে। রাষ্ট্রীয় কাঠামো, অর্থনীতি ও রাজনীতিতে দীর্ঘ ১৫ বছরের স্বৈরশাসনের প্রভাব ও রেশ এখনো রয়ে গেছে। ফলে একটি নবনির্বাচিত সরকারকে বিচার করার জন্য ছয় মাস নিঃসন্দেহে কম সময়। এই বাস্তবতা মেনে নিয়েও বলা যায়, এই অল্প সময়ে প্রণীত বিভিন্ন আইন ও আইনের খসড়া পর্যালোচনা করলে সরকারের মূল অভিমুখ বা দৃষ্টিভঙ্গি বেশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
অর্থাৎ সরকার কোন পথে এগোচ্ছে, অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে কতটুকু শিক্ষা নিচ্ছে, কিংবা নাগরিকের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক নির্ধারণে তাদের মনোভাব কেমন, তার একটি ধারণা পাওয়া যাচ্ছে এই খসড়া আইনগুলো থেকে।
প্রথমেই আসা যাক সদ্য পাস হওয়া ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) বিল, ২০২৬’-এর প্রসঙ্গে। এতে বলা হয়েছে, সাইবার মাধ্যম বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে মাদক কেনাবেচা, সরবরাহ বা বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড। এমনকি এই আইনে বিচারিক প্রক্রিয়ায় অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছ থেকে সরাসরি মাদক উদ্ধার হওয়া বাধ্যতামূলক নয়।
এই বিধানের অসংগতি, অসামঞ্জস্য এবং বিচারব্যবস্থার মৌলিক ধারণার সঙ্গে এর সাংঘর্ষিকতা নিয়ে ইতিমধ্যে আইন বিশ্লেষকেরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এখানে অপরাধের ভিন্ন ভিন্ন মাত্রাকে যেমন এক করে ফেলা হয়েছে, তেমনি আইনটির চরম অপব্যবহারের ঝুঁকিও তৈরি করা হয়েছে। এ ধরনের অপরাধ মোকাবিলায় অতীতের প্রায়োগিক ও বাস্তব অভিজ্ঞতাকে একেবারেই বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
‘সাইবার সুরক্ষা আইন’-এর সাম্প্রতিক সংশোধনীর সংবাদ নিয়েও একই ধরনের শঙ্কা থেকে যায়। আওয়ামী লীগ আমলে বহুল বিতর্কিত ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’-এর বিরুদ্ধে দেশজুড়ে তীব্র আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। ২০২৩ সালে এটাকে সংশোধন করে ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন’ করা হয়েছিল। অবশেষে চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানের পর সেটা বাতিল করে ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫’ জারি করা হয়েছিল। চলতি বছরের এপ্রিলে ‘সাইবার সুরক্ষা বিল-২০২৬’ সংসদে পাস করা হয়।
সম্প্রতি এই আইনে আবার সংশোধনী আনার গুঞ্জন শুরু হয়েছে। গণমাধ্যমের সূত্র ধরে জানা যাচ্ছে, নতুন ধারা যুক্ত করে আইনটিকে আরও কঠোর করার প্রক্রিয়া চলছে। সেখানে গুজব ও অপতথ্য ছড়ানোর দায়ে ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগে কঠোর শাস্তি দিয়ে গুজব বা অপতথ্য কতটুকু রোধ করা সম্ভব, তা নিয়ে যেমন যথেষ্ট সংশয় রয়েছে, তেমনি অপতথ্যের অজুহাতে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার হরণের বহু নজির আছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কাঠামোগত জটিলতার কারণে প্রায়ই অপপ্রচারের মূল উৎস খুঁজে পাওয়া যায় না। যিনি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তথ্য তৈরি করেছেন, আর যিনি সত্য মনে করে শেয়ার করেছেন—আইনে তাঁদের পার্থক্য কীভাবে নিরূপণ করা হবে, তা অস্পষ্ট। গুজব বা অপতথ্য রোধের নামে এই ধরনের আইন খোদ বাক্স্বাধীনতা হরণে ব্যবহৃত হতে পারে। ফলে প্ল্যাটফর্মভিত্তিক কাঠামোগত প্রতিরোধ ও প্রতিকারের উপায় না বের করে কেবল শাস্তির মাত্রা বাড়িয়ে এই সংকট থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব নয়।
আপাতদৃষ্টিতে এই দুটি ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, সরকার সমস্যা সমাধানের পথ হিসেবে কেবল ‘শাস্তির মাত্রা বৃদ্ধি’কেই বেছে নিচ্ছে। কিন্তু রাজনৈতিক সংকটে এ ধরনের কঠোর আইন যে দিন শেষে বিরোধী মত দমন ও নাগরিক অধিকার হরণে ব্যবহৃত হয়, এমন এন্তার নজির আমাদের রাজনীতিতেই আছে।
এর পাশাপাশি আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ আইনের খসড়া তৈরি করা হয়েছে। প্রথমেই আছে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’–এর খসড়া। বাংলাদেশে এর একটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ইতিহাস রয়েছে। রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আওয়ামী লীগের দেড় দশকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পদ্ধতিগতভাবে গুমের ঘটনা ঘটেছে। বিগত শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রধান অভিযোগগুলোর কেন্দ্রেও ছিল বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুম।
২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট বাংলাদেশ ‘গুম হইতে সকল ব্যক্তিকে সুরক্ষার নিমিত্ত আন্তর্জাতিক কনভেশন’-এ অনুস্বাক্ষর করে। নিঃসন্দেহে এটা ছিল মানবাধিকার রক্ষার লড়াইয়ে একটি বড় পদক্ষেপ। ২০২৫ সালের ২ ডিসেম্বর ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ ২০২৫’ জারিও হয়েছিল। সেখানে গুমের স্পষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণের পাশাপাশি নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে বলা হয়েছিল যে, ‘গুমের অভিযোগ বা তথ্য পাওয়া গেলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫–এর প্রযোজ্য বিধান অনুসারে উক্ত অভিযোগের তদন্ত করিবার জন্য তদন্ত কর্মকর্তা নিযুক্ত করিবে এবং ট্রাইব্যুনালে একটি মামলা দায়ের করিবে।’
গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ‘কে করবে’—এই প্রশ্নটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রচলিত আইন অনুযায়ী এসব ঘটনার তদন্ত করার কথা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। কিন্তু যে বাহিনীর বিরুদ্ধে পদ্ধতিগতভাবে গুম বা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে, তারা কীভাবে নিজেদের সহকর্মীদের অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত করবে? এ কারণেই অধ্যাদেশে মানবাধিকার কমিশনকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ‘কে করবে’—এই প্রশ্নটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রচলিত আইন অনুযায়ী এসব ঘটনার তদন্ত করার কথা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। কিন্তু যে বাহিনীর বিরুদ্ধে পদ্ধতিগতভাবে গুম বা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে, তারা কীভাবে নিজেদের সহকর্মীদের অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত করবে? এ কারণেই অধ্যাদেশে মানবাধিকার কমিশনকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু সংসদে এই অধ্যাদেশটি রহিত করে নতুন একটি খসড়া তৈরি করা হয়েছে। সেখানে গুমের তদন্তের ভার জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের জায়গায় তুলে দেওয়া হয়েছে খোদ পুলিশ বা ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী দায়িত্বপ্রাপ্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে।
এখন গুমের তদন্তের ভার আগে যে কমিশনের হাতে দেওয়া হয়েছিল, সেই ‘মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫’ রহিত করে নতুন খসড়া তৈরি করা হয়েছে। সেখানে কমিশনকে আবারও কার্যত ঠুঁটো জগন্নাথ বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে কমিশন গঠন ও কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি নিরপেক্ষ ভারসাম্য রাখা হয়েছিল।
অথচ নতুন খসড়ায় নির্বাচন কমিটির ৯ সদস্যের মধ্যে স্পিকার, আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সরকারি দলের একজন সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিসভা সচিবকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ নিয়োগপ্রক্রিয়ায় সরকারের একক প্রাধান্য নিশ্চিত করা হয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনের খসড়াতেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় কমিশনকে সরকার বা বাহিনীপ্রধানের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভরশীল করা হয়েছে।
অর্থাৎ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি গুম বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটায়, তাহলে তদন্তের ভার আসলে তাদের হাতেই থাকবে। বাংলাদেশের সব গুম ও ক্রসফায়ার আসলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীই করেছে। এই দুই খসড়া আইনকে মিলিয়ে পাঠ করলে বোঝা যায়, সরকার সমস্যার মূলে যেতে আগ্রহী নয়।
দেড় দশক ধরে মানবাধিকার আন্দোলন ও যাবতীয় নাগরিক সক্রিয়তার অন্যতম একটি প্রশ্নই ছিল—রাষ্ট্রীয় বাহিনী যদি গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো অপরাধে জড়ায়, তবে তাদের বিচারের মুখোমুখি করার ব্যবস্থা কী হবে? খোদ বাহিনীই কি তার সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্ত করবে? নাকি অন্য কেউ সেটা করবে? যদি এই তদন্তের ভার ন্যূনতম কোনো স্বাধীন সংস্থার হাতে ছেড়ে দেওয়া না যায়, তাহলে সব আইনই কাগজে–কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে। নাগরিক আর প্রতিকার পাবে না।
সার্বিকভাবে, এই চারটি আইন ও প্রস্তাবিত খসড়া থেকে সরকারের রাজনৈতিক অভিমুখটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একদিকে আছে সরকারের শাস্তির মাত্রা বাড়িয়ে অপরাধ দমনের চিন্তা এবং নাগরিক অধিকার সীমিত করার নতুন হাতিয়ার তৈরি করা; অন্যদিকে আছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহি এড়ানোর পথ সুগম করা। মানে, যেমন ছিল, তেমনই থাকবে।
এখানে সরকারের ‘শাসন ও নিয়ন্ত্রণের’ উদ্দেশ্য স্পষ্ট। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, সুশাসনের জন্য বাংলাদেশের নাগরিকদের এখনো নির্ভর করতে হয় সরকারপ্রধানের ‘সদিচ্ছা’র ওপর। আবার দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে গঠিত সরকার যদি অধিকার হরণ করতে উদ্যত হয়, তখন নাগরিক কীভাবে আইনি সুরক্ষা ও প্রতিকার পাবেন, তার কাঠামোগত নিশ্চয়তা প্রদানই গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও ব্যবস্থার মূল প্রশ্ন। এটা এড়িয়ে গিয়ে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর কখনোই টেকসই হবে না।
● সহুল আহমদ লেখক ও গবেষক
* মতামত লেখকের নিজস্ব