
এখন ভারতে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে রুপির দাম কেন পড়ছে আর বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডারের ওপর কতটা ভরসা করা ঠিক। বিশ্বরাজনীতি এখন অস্থির, তাই এই চিন্তা স্বাভাবিক। কিন্তু এর বাইরে আরও কিছু বড় সমস্যা সামনে আসছে। তেলের দাম বাড়ছে, বর্ষায় এল নিনোর কারণে কৃষিতে সমস্যা হতে পারে, আর শুল্ক নিয়ে টানাপোড়েনে বিশ্ববাণিজ্য ধাক্কা খাচ্ছে। এসব মিলেই ভারতের অর্থনীতিতে চাপ পড়ছে।
মোটামুটি হিসাব বলছে, এসব ধাক্কা একসঙ্গে মিললে ভারতের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের বৃদ্ধির হার এক থেকে দেড় শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। তেলের দামের প্রভাব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণভাবে মনে করা হয়, তেলের দাম যদি প্রতি ব্যারেলে ১০ ডলার বাড়ে, তাহলে ভারতের প্রবৃদ্ধি শূন্য দশমিক ২ থেকে শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ কমে যায়।
সেই হিসাবে যদি দীর্ঘ সময় ধরে তেলের দাম ৯০ থেকে ১০০ ডলারের মধ্যে থাকে, তাহলে প্রবৃদ্ধি কমতে পারে শূন্য দশমিক ৫ থেকে শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ পর্যন্ত। অন্যদিকে এল নিনোর কারণে কৃষিক্ষেত্রে স্থবিরতা বা পতন দেখা দিলে (যার অবদান মোট অর্থনীতির প্রায় ১৮ শতাংশ) আরও শূন্য দশমিক ৪ থেকে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি কমে যেতে পারে।
স্বল্পমেয়াদি ধাক্কা সামলাতে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি শক্তি গড়ে তোলার কাজ থেমে থাকতে পারে না। বরং এই কঠিন সময়ই সংস্কারের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। প্রয়োজন নীতিগত সরঞ্জাম নয়, প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। অসমাপ্ত সংস্কারের কাজ আর পিছিয়ে রাখা যাবে না—এখনই সময় এগিয়ে যাওয়ার।
বিশ্ববাণিজ্যের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি আশাব্যঞ্জক নয়। বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরে বিশ্ব অর্থনীতির বৃদ্ধি হবে প্রায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ, যা ২০২৫ সালের ৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে অনেকটাই কম। সাধারণত ভারতের রপ্তানি বিশ্বপ্রবণতার সঙ্গে তাল মিলিয়েই চলে। ফলে এখানেও গতি কমার আশঙ্কা প্রবল।
তবে এই প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও একটি সম্ভাবনার ইঙ্গিত রয়েছে। যদি এই সংকটগুলো ভারতকে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সংস্কারগুলো এগিয়ে নিয়ে যেতে বাধ্য করে, তাহলে তা আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে এমন ক্ষেত্রগুলোতে জোর দেওয়া দরকার, যেখানে বহু বছর ধরে তেমন অগ্রগতি হয়নি অথচ অর্থনৈতিক বৃদ্ধির জন্য তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, উচ্চ শুল্কহার কমানো জরুরি। দীর্ঘদিন ধরে এই শুল্কনীতি ভারতের উৎপাদন খাতের প্রতিযোগিতামূলক শক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বহু প্রচেষ্টা সত্ত্বেও উৎপাদন খাত দেশের অর্থনীতিতে প্রায় ১৫ শতাংশেই আটকে রয়েছে। অথচ লক্ষ্য ছিল ২৫ শতাংশে পৌঁছানো। আগামী ৮ থেকে ১০ বছরের মধ্যে ভারতকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মতো শুল্ককাঠামোর দিকে এগোতে হবে এবং বিশ্ব সরবরাহ শৃঙ্খলের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হতে হবে। বৃহত্তর আঞ্চলিক বাণিজ্যচুক্তিতে যোগ দেওয়া সেই পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, খনি নীতিতে বড় পরিবর্তন দরকার। এখন ভারতে খনিজ খোঁজা আর তা তোলা—এই দুই কাজ আলাদা করে করা হয়, যা ঠিকভাবে কাজ করে না। অথচ এই খাতে ঝুঁকি নিয়ে খনিজ খুঁজে বের করলে তবেই লাভ হয়। ভারতের মাটির গঠন অস্ট্রেলিয়ার মতোই, কিন্তু অস্ট্রেলিয়া ভালো নীতি, সহজ অনুমতি আর পরিষ্কার নিয়মের কারণে খনিজ সম্পদকে বড় অর্থনৈতিক শক্তিতে বদলে ফেলেছে।
তৃতীয়ত, শহরাঞ্চলে জমির ব্যবহার ও প্রাপ্যতা উন্নত করা জরুরি। সুসংগঠিত পরিকল্পনার অভাবে শহরের জমির দাম আকাশছোঁয়া হয়েছে। বর্তমানে গড় আয়ের একটি পরিবারকে একটি ফ্ল্যাট কিনতে প্রায় ১১ বছরের সমান আয় সঞ্চয় করতে হয়। ফলে উৎপাদনশিল্প শহর ছেড়ে গ্রামে সরে যাচ্ছে। ১৯৯৪ সালে যেখানে শহরাঞ্চলে উৎপাদনের অংশ ছিল প্রায় ৭০ শতাংশ, ২০১২ সালে তা নেমে এসেছে ৫০ শতাংশের নিচে। শহরগুলোর মাস্টারপ্ল্যান আরও বিস্তারিত ও বাস্তবসম্মত করতে হবে, যাতে নতুন বিনিয়োগকারীরা আসতে পারেন।
চতুর্থত, কেন্দ্র ও রাজ্য—উভয় সরকারকেই ভর্তুকির বোঝা কমাতে হবে। গত কয়েক দশকে, বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই বোঝা আরও বেড়েছে। বিশ্ব উন্নয়ন সূচক অনুযায়ী, ভারতে কেন্দ্রীয় সরকারের মোট ব্যয়ের ৪২ দশমিক ৫ শতাংশই ভর্তুকি ও অন্যান্য স্থানান্তরে খরচ হয়, যেখানে সমমানের অন্যান্য দেশে তা ২৫ থেকে ৩০ শতাংশের মধ্যে। এই বিপুল অর্থ অনেক সময় অপচয় হয়, যা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করলে দীর্ঘ মেয়াদে বেশি সুফল মিলত।
সবশেষে, গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো অত্যন্ত প্রয়োজন। বর্তমানে এই খাতে ব্যয় মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের মাত্র শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ, যেখানে উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর দেশগুলোতে তা ২ থেকে ৩ শতাংশ। এর অন্যতম কারণ বেসরকারি খাতের কম অংশগ্রহণ।
স্বল্পমেয়াদি ধাক্কা সামলাতে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি শক্তি গড়ে তোলার কাজ থেমে থাকতে পারে না। বরং এই কঠিন সময়ই সংস্কারের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। প্রয়োজন নীতিগত সরঞ্জাম নয়, প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। অসমাপ্ত সংস্কারের কাজ আর পিছিয়ে রাখা যাবে না—এখনই সময় এগিয়ে যাওয়ার।
শিশির গুপ্ত নয়াদিল্লির সেন্টার ফর সোশ্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক প্রগ্রেসের সিনিয়র ফেলো।
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ