গোল বা লম্বা যে টেবিলেই আলোচনা হোক, কিংবা গণমাধ্যমে বায়ুদূষণ নিয়ে বলাবলি বা লেখালেখি হোক—ঢাকার বায়ুদূষণ নিয়েই ঢাকঢোল পেটানো হয় বেশি। ঢাকা যেন সবকিছু, এক অর্থে ঢাকাতেই ঢাকা পড়ে সারা দেশ। অসুখ-বিসুখ, লেখাপড়া, বিয়ের বাজার, ভিসা, টিকিট—ঢাকা ছাড়া উপায় নেই। তাই ঢাকা দিয়েই সবকিছু মাপার চর্চা। তাই বলে বায়ুদূষণ কি ঢাকার একার ইস্যু?
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বারপাখিয়ায় গ্রামবাসী একটি ছোট্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। খুবই কাহিল অবস্থা এই দাখিল মাদ্রাসার। শীতের দিন নয়, তবু শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষের বাইরে খোলা মাঠে রোদের মধ্যে পাঠ গ্রহণ করছে। ক্লাসে তারা বসতে পারে না। দুর্গন্ধে সেখানে টেকা দায়। দুর্গন্ধের উৎস একটি মুরগির খামার।
মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গেই দেনদরবার করেছে, করছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, সামাজিক সালিস—সব দরজায় কড়া নেড়েই চলেছেন। কিন্তু পাথর আর গলছে না।
খামারের মালিক অনড়। তাঁর কথা হচ্ছে, ‘এক মাস বয়স হলে মুরগিগুলো বিক্রি করে দেওয়া হয়। প্রথম ২০ দিন খামারে তেমন কোনো দুর্গন্ধ থাকে না; শেষের দিকে প্রায় ১০ দিন কিছুটা দুর্গন্ধ হয়। এ সময়টুকু শিক্ষার্থীরা সহ্য করলে কী এমন হয়।’ অকাট্য যুক্তি বৈকি!
এ রকম বায়ুদূষণ শুধু বারপাখিয়ার সমস্যা নয়। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে নিবন্ধিত পোলট্রি খামারের সংখ্যা ৯০ হাজার। এর পাশাপাশি আরও প্রায় দুই লাখ অনিবন্ধিত খামার রয়েছে।
দেশের হাঁস-মুরগি পালন খাতকে আরও নিরাপদ ও রপ্তানিমুখী করতে প্রায় দুই দশক পর একটি নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করেছে সরকার। নতুন নীতিমালায় খামার স্থাপন ও বায়োসিকিউরিটি নিয়ে বেশ কিছু নিয়মের কথা বলা হয়েছে। খামার করতে হবে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার বাইরে, অপেক্ষাকৃত বিচ্ছিন্ন বা ফাঁকা জায়গায়। এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বসতবাড়ি বা জনবসতি থাকলে অন্তত ৩০০ মিটার দূরে খামার করতে হবে। আর একটি খামার থেকে আরেকটি খামারের দূরত্ব হতে হবে কমপক্ষে ২০০ মিটার।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) মতে, এমন দূরত্ব বা ‘বাফার জোন’ খামারের ধুলাবালি ও দুর্গন্ধ কমানোর পাশাপাশি রোগব্যাধি নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর। নতুন নীতিমালায় পরিবেশবান্ধব উপায়ে খামারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং উৎপাদনব্যবস্থাকে আধুনিক করার কথাও বলা হয়েছে।
নীতিমালা অনুযায়ী, বাণিজ্যিক খামারগুলোয় বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট এবং তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা থাকতে হবে। বাণিজ্যিক পোলট্রি খামারের জন্য বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট বিদ্যুতের দারুণ এক বিকল্প উৎস হতে পারে। মুরগির বিষ্ঠা প্রক্রিয়াজাত করে বায়োগ্যাস এবং তা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। এতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমতে পারে। বায়োগ্যাস প্ল্যান্টের তরল বর্জ্য জৈব সার হিসেবেও ব্যবহার করা যায়।
ঢাকার বাইরে বায়ুদূষণের আরেকটি নতুন উপসর্গ হচ্ছে পাটকাঠির কালো ধোঁয়া। অনিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়ায় পাটকাঠি পুড়িয়ে তৈরি করা হচ্ছে চারকোল ও ছাই। সারা দেশেই অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে কয়েক শ চারকোল কারখানা। পাটকাঠির ছাই থেকে তৈরি কার্বন চীনে রপ্তানি করা হয়।
গাছ লাগানোর পরিকল্পনাতেও আমাদের ভুল আছে। বিভিন্ন রাস্তার পাশে বেশির ভাগই পাতাঝরা বনের গাছ—মেহগনি, কাঠবাদাম ইত্যাদি। শীতের শুরুতেই এসব গাছের পাতা একসঙ্গে ঝরে পড়ে। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা পড়েন মহাবিপদে। বর্জ্য বহনকারী গাড়িগুলোতে ঝরাপাতার জায়গা নেই। ফলে বাধ্য হয়ে তাঁরা পাতাগুলো স্তূপ করে জ্বালিয়ে দেন। এভাবেই বর্জ্যের ধোঁয়া আমাদের বায়ুকে গ্রাস করে।
গত বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে পাবনা থেকে শুরু করে ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, রাজবাড়ী ঘুরে দেশের পাট উৎপাদনকারী প্রায় সব জেলায় এসব কারখানার রমরমা উপস্থিতি দেখেছিলাম। ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পাটকাঠি পোড়ানোর পর চুল্লির মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়, যাতে কোনোভাবে অক্সিজেন প্রবেশ করতে না পারে। এভাবে চার দিন রাখার পর সেখান থেকে কার্বন বের করে ক্রাশিং করে প্যাক করা হয়। চুল্লি জ্বালানোর সময় কারখানা থেকে প্রচুর ধোঁয়া বের হয়। এই ধোঁয়াতেই মারাত্মকভাবে পরিবেশ দূষিত হয়।
স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ ছিল, ছাই ও কালো ধোঁয়ায় শিশুসহ সব বয়সী মানুষ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গাছপালা, কমে গেছে ফসলের উৎপাদন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চারকোল কারখানা থেকে নির্গত ধোঁয়ায় আশপাশের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এর ফলে পার্শ্ববর্তী মাঠের ফসল ও ফলগাছের পরাগায়ন ব্যাহত হয়। এ ছাড়া ফসলের জন্য উপকারী পতঙ্গ মৌমাছিও এসব এলাকায় থাকতে পারে না। পরাগায়নের অভাবে ফলের উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে।
কালো ধোঁয়া মিশে বাতাসে কার্বন মনোক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যায়। এসব ধোঁয়া ফুসফুসের ক্ষতি করতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী হলে এমন দূষণ ক্যানসার পর্যন্ত ঘটাতে পারে। বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে গিয়ে বমির প্রবণতাও দেখা দিতে পারে। পরিচালনায় ত্রুটির কারণে চুল্লি থেকে মিথেন গ্যাস নির্গত হতে পারে। এটি একটি শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস, যা জলবায়ু পরিবর্তনে নেতিবাচক ভূমিকা রাখে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু উপদেষ্টার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে দেনদরবার হলেও এর ফলাফল জানা যায়নি। তবে কাগজে-কলমে দেখা যায়, সরকার এ বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন। বিগত ২০২২ সালেই বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় ‘চারকোল নীতিমালা’ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছিল।
এই নীতিমালার মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশীয় চারকোল–শিল্পকে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন, টেকসই এবং সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলা। নীতিমালায় যত্রতত্র ধোঁয়া উৎপাদনকারী চুল্লি বা কারখানা স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
যেসব কারখানা নিয়ম না মেনে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা বা ফসলি জমির পাশে কালো ধোঁয়া ছড়াচ্ছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, জরিমানা এবং কারখানা সিলগালা করার মতো আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছিল। কথা ছিল পাটকাঠি পোড়ানো কারখানাগুলোতে ‘ধোঁয়া শোধনব্যবস্থা’ থাকবে।
বলাবাহুল্য, কাজির গরু যেমন গোয়ালে নয়, কেতাবে থাকে, তেমনি এসব আদেশ-নির্দেশও কাগজের কালো হরফে ফাইলবন্দী থেকে গেছে।
লোকালয়ে ভুল গাছ থেকেও বায়ুদূষণ হচ্ছে। গাছ লাগানোর পরিকল্পনাতেও আমাদের ভুল আছে। বিভিন্ন রাস্তার পাশে বেশির ভাগই পাতাঝরা বনের গাছ—মেহগনি, কাঠবাদাম ইত্যাদি। শীতের শুরুতেই এসব গাছের পাতা একসঙ্গে ঝরে পড়ে। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা পড়েন মহাবিপদে। বর্জ্য বহনকারী গাড়িগুলোতে ঝরাপাতার জায়গা নেই। ফলে বাধ্য হয়ে তাঁরা পাতাগুলো স্তূপ করে জ্বালিয়ে দেন। এভাবেই বর্জ্যের ধোঁয়া আমাদের বায়ুকে গ্রাস করে।
অথচ আমাদের চিরহরিৎ গাছের কোনো ঘাটতি নেই—যেমন ছাতিম, দেবদারু, বকুল, জাম। চরম বায়ুদূষণ ঘটাচ্ছে অস্ট্রেলিয়া থেকে আনা একাশিয়া, যাকে আমরা আদর করে নাম দিয়েছি আকাশমণি। এর ফুলের পরাগও মারাত্মক শ্বাসকষ্টের কারণ হতে পারে।
একটু বুঝেসুঝে চলার কোনো বিকল্প নেই।
গওহার নঈম ওয়ারা লেখক ও গবেষক wahragawher@gmail.com