
ফৌজদারি আইনের অন্যতম মৌলিক নীতি হলো, শাস্তি অপরাধের গুরুত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। ঐতিহাসিকভাবে মৃত্যুদণ্ড সংরক্ষিত থাকে ইচ্ছাকৃত প্রাণহানির মতো সবচেয়ে জঘন্য অপরাধের জন্য। অনলাইনে মাদক কেনাবেচায় মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি কতটা যৌক্তিক তা নিয়ে লিখেছেন হাবিবুর রহমান
সম্প্রতি সংসদে পাস হওয়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) বিল, ২০২৬-এর মাধ্যমে সাইবার মাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে মাদক কেনাবেচা, সরবরাহ বা বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংঘটিত মাদকসংক্রান্ত অপরাধের বিচার করতে অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছ থেকে মাদক উদ্ধার হওয়া বাধ্যতামূলক হবে না।
আইনটির উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে মাদকসংক্রান্ত অপরাধ দমন এবং সমাজকে এর ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করা। কিন্তু আইনশাস্ত্র ও অপরাধবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত তত্ত্ব ও গবেষণা ভিন্ন কথা বলে। কেবল শাস্তির মাত্রা বাড়িয়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। এই ধারণা যেমন ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, তেমনি অপরাধ প্রতিরোধেও কার্যকর প্রমাণিত হয়নি।
২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনেও মাদক পাচারের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের বিধান যুক্ত করা হয়েছিল। তখন ধারণা করা হয়েছিল, কঠোর শাস্তির ভয় মাদক ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রণে আনবে।
কিন্তু বিগত সাত বছরের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সামগ্রিকভাবে মাদক ব্যবসা ও পাচারের বিস্তার কমার পরিবর্তে বরং বেড়েছে। অথচ নতুন সংশোধনীতে সেই একই নীতি সম্প্রসারণ করে অনলাইন মাদক-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও মৃত্যুদণ্ডের বিধান যুক্ত করা হলো।
ফৌজদারি আইনকে কয়েকটি মৌলিক মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে হয়, যেমন সামঞ্জস্যপূর্ণতা, প্রতিরোধমূলক কার্যকারিতা, নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং ন্যায়সংগত বিচারপ্রক্রিয়া। অনলাইন মাদক অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের এই নতুন বিধান এই মানদণ্ডগুলোর প্রায় প্রতিটিতেই গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দেয়।
ফৌজদারি আইনের অন্যতম মৌলিক নীতি হলো, শাস্তি অপরাধের গুরুত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। ঐতিহাসিকভাবে মৃত্যুদণ্ড সংরক্ষিত থাকে ইচ্ছাকৃত প্রাণহানির মতো সবচেয়ে জঘন্য অপরাধের জন্য। অথচ একটি অহিংস ও লেনদেনভিত্তিক অপরাধের ক্ষেত্রে একই শাস্তি প্রয়োগ করলে হত্যাকাণ্ড এবং অহিংস অপরাধের মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য কার্যত বিলুপ্ত হয়ে যায়।
জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটি স্পষ্ট করেছে, মাদকসংক্রান্ত অপরাধ ‘সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ’-এর অন্তর্ভুক্ত নয়। বাংলাদেশ এই আন্তর্জাতিক চুক্তির একটি রাষ্ট্রপক্ষ। তা ছাড়া এই আইন অপরাধীদের মধ্যে প্রয়োজনীয় পার্থক্য করে না। একটি আন্তর্জাতিক মাদক চক্রের গডফাদার এবং আসক্তির কারণে অনলাইনে সীমিত পর্যায়ে বেচাকেনায় জড়িয়ে পড়া একজন ব্যক্তির অপরাধের মাত্রা ও দায় কখনোই এক হতে পারে না। সবাইকে একই কাতারে দাঁড় করানো ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
অপরাধবিজ্ঞানে সর্বসম্মত স্বীকৃত একটা বিষয় হচ্ছে, অপরাধ প্রতিরোধে শাস্তির কঠোরতার চেয়ে ধরা পড়ার নিশ্চয়তা অনেক বেশি কার্যকর। সম্ভাব্য অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ডের ভয় নয়, বরং অপরাধ করলে নিশ্চিতভাবেই ধরা পড়তে হবে—এই বিশ্বাসই সবচেয়ে বেশি নিরুৎসাহিত করে।
কিন্তু অনলাইন মাদক ব্যবসায় ঠিক এই নিশ্চয়তাটিই সবচেয়ে দুর্বল। এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও পরিচয় গোপনকারী প্রযুক্তি তদন্তকে জটিল করে তোলে। যে ব্যক্তি ধরে নেয় যে সে ধরা পড়বে না, তার কাছে শাস্তির মাত্রা বাড়ানো খুব কমই প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় বিপুলসংখ্যক মামলার তুলনায় দণ্ডাদেশের হার, বিশেষ করে সাইবার অপরাধের সাজার হার অত্যন্ত নগণ্য। আন্তর্জাতিক গবেষণাও দেখিয়েছে, মাদক অপরাধে মৃত্যুদণ্ড এবং মাদক পাচার হ্রাসের মধ্যে কোনো সুস্পষ্ট সম্পর্ক নেই।
২০১৮ সালের পর বাংলাদেশের অভিজ্ঞতাও দেখায় যে কঠোর আইনের কারণে প্রকৃত রাঘব বোয়ালরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে গেছেন; কেবল চুনোপুঁটি বা নিম্নস্তরের কর্মীরাই গ্রেপ্তার হয়েছেন, যাঁদের শূন্যস্থান দ্রুতই অন্য কেউ পূরণ করে নেয়।
এর চেয়েও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনলাইন মাদকসংক্রান্ত অপরাধ প্রমাণের ধরন বাস্তব জগতের প্রচলিত মাদক উদ্ধারের মামলার তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। একটি আইপি ঠিকানা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে নয়, বরং একটি ইন্টারনেট সংযোগ বা রাউটারকে শনাক্ত করে। ডিভাইস ম্যালওয়্যারে আক্রান্ত হতে পারে, ক্রিপ্টোকারেন্সি ওয়ালেট বা ডার্ক ওয়েব অ্যাকাউন্ট চুরি হতে পারে। এই বাজারের মূল ভিত্তিই হলো পরিচয় গোপন রাখা।
নতুন সংশোধনী অনুযায়ী, এসব অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছ থেকে মাদক উদ্ধার হওয়াও অপরিহার্য নয়। ফলে বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ বস্তুগত সাক্ষ্য-প্রমাণের পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রেই নির্ভর করতে হবে ডিজিটাল তথ্য-উপাত্তের ওপর। এটা ভুলভাবে ব্যাখ্যা হওয়ার বা বিকৃত হওয়ার বা অন্যের বিরুদ্ধে ব্যবহার হওয়ার ঝুঁকি বহন করে। এতে মিথ্যা মামলা ও নিরপরাধ ব্যক্তিকে ফাঁসিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
শাস্তি যত কঠোর হয়, বিচারিক ভুলের পরিণতিও ততই ভয়াবহ হয়ে ওঠে। একটা কারণেই মৃত্যুদণ্ডকে অন্যান্য সব শাস্তি থেকে আলাদা করে দেখা হয়। মৃত্যুদণ্ড একবার কার্যকর হলে তা আর সংশোধনের কোনো সুযোগ থাকে না। এমনকি পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত বিচারব্যবস্থাগুলোতেও ভুল রায়, ভুল শনাক্তকরণ এবং ত্রুটিপূর্ণ ফরেনসিক বিশ্লেষণের অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে।
বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় ডিজিটাল ফরেনসিক, সাইবার তদন্ত ও ইলেকট্রনিক সাক্ষ্য মূল্যায়নের ক্ষেত্র এখনো বিকাশমান। এ বাস্তবতায় মৃত্যুদণ্ডের মতো অপরিবর্তনীয় শাস্তির পরিধি বাড়ানো বিচারিক ঝুঁকিও তৈরি করে।
বাংলাদেশের নিজস্ব অভিজ্ঞতাও ভিন্ন শিক্ষা দেয়। ২০০২ সালের অ্যাসিড অপরাধ দমন আইনে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হলেও অ্যাসিড-সহিংসতা কমে আসার পেছনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল একই বছরের ‘অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণ আইন’। এর মাধ্যমে আসলে অ্যাসিডের উৎপাদন, পরিবহন, বিক্রি ও বিপণনের ওপর কঠোর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়।
মাদকের ক্ষেত্রেও অপরাধ সংঘটনের পর সর্বোচ্চ শাস্তি আরোপের চেয়ে অপরাধের সুযোগ সংকুচিত করা বেশি কার্যকর। এর জন্য প্রয়োজন সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা, অবৈধ আর্থিক লেনদেন শনাক্ত করা, সাইবার গোয়েন্দা সক্ষমতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল ফরেনসিক অবকাঠামো উন্নয়ন এবং অপরাধীদের নিশ্চিতভাবে বিচারের আওতায় আনা।
অপরাধের প্রকৃত কারণ, কাঠামো এবং অপরাধবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত নীতিকে উপেক্ষা করে কেবল যদি শাস্তির মাত্রা বাড়ানোর পথ বেছে নেওয়া হয়, তবে তা জনমনে ক্ষণিকের সন্তুষ্টি এনে দিতে পারলেও অপরাধ দমনে স্থায়ী সাফল্য এনে দিতে পারবে না।
হাবিবুর রহমান সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী
মতামত লেখকের নিজস্ব