
মাত্র ১০ মাস আগের কথা। নেপালের দুর্নীতিবিরোধী তরুণেরা আন্দোলন করে একজন প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিলেন। আর জেন-জি সমর্থিত এক র্যাপারকে বিপুল ভোটে জিতিয়ে নতুন সরকারের নেতৃত্বে নিয়ে এসেছিলেন।
আজ আন্দোলনকারীদেরই শত শত তরুণ আবারও রাস্তায় নেমে এসেছেন। তবে এবার তাঁরা লড়ছেন সেই সরকারেরই বিরুদ্ধে, যাকে ক্ষমতায় বসাতে এক দিন তাঁরা জানপ্রাণ দিয়ে লড়েছিলেন। পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে যাঁকে দেখা হয়েছিল, সেই বালেন শাহ দেশে এক আমূল সংস্কারের অঙ্গীকার করেছিলেন। কিন্তু এরই মধ্যে ১০০ দিন পেরিয়ে গেছে; তরুণেরা যেমনটা আশা করেছিলেন, বাস্তবে তার খুব সামান্যই দেখতে পাচ্ছেন।
একটি সরকারকে মূল্যায়ন করার বা তার কাজের পরিবর্তন দেখার জন্য মাত্র তিন মাস হয়তো যথেষ্ট নয়, কিন্তু বালেন শাহর প্রশাসনের ওপর তরুণদের ক্ষোভ ও হতাশা ক্রমেই বাড়ছে। কারণ, তাঁর প্রতি তাঁদের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী।
গত রোববার কাঠমান্ডুর সিংহ দরবার সচিবালয়ের বাইরে শত শত বিক্ষোভকারী সমবেত হন। তাঁদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘গরিবের ওপর নিপীড়ন বন্ধ করো’ এবং ‘মানবাধিকারকে সম্মান করো’।
এই স্লোগানগুলো কিন্তু পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে ছিল না; এগুলো ছিল খোদ বালেন শাহর বিরুদ্ধে। বিরোধীদলীয় নেতা এবং বিক্ষোভকারীরা—যাঁদের বেশির ভাগই তরুণ—তাঁরাও প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন।
এই সাম্প্রতিক বিক্ষোভের সূত্রপাত ঘটে রাইড শেয়ারিংয়ের এক রাইডার, তথা মোটরসাইকেলচালকের আত্মাহুতির চেষ্টার ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ৯ জুলাই কাঠমান্ডুর পাসপোর্ট অফিসের সামনে গণেশ নেপালি নামের ২৫ বছর বয়সী এক রাইডার নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, মোটরসাইকেল পার্কিংকে কেন্দ্র করে পৌর পুলিশ তাঁর গাড়ির চাকা লক করে দিলে এ নিয়ে বিতণ্ডা থেকে তিনি এই চরম পথ বেছে নেন। পরদিনই তিনি মারা যান। এটি একটি ছোট ঘটনা হতে পারে; কিন্তু নির্মম উদাহরণ, যার মধ্য দিয়ে একটি দেশের মানুষ তাৎক্ষণিকভাবে বুঝতে পারে যে এর পেছনে লুকিয়ে আছে আরও বড় কোনো সংকট।
এর পরবর্তী দুই দিনে অশ্বিন রাউত ও বিবেক মণ্ডল নামের আরও দুই ব্যক্তি একইভাবে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। অবশ্য ট্রাফিক পুলিশ পরবর্তী সময়ে দাবি করেছে যে জরিমানা বা চাকা লক করার কারণে গণেশ এই কাণ্ড ঘটাননি এবং ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে আনুষ্ঠানিক তদন্ত চলছে।
এই ঘটনা মূলত সাধারণ মানুষের মনের ভেতরে থাকা একটি পুরোনো ক্ষতকেই নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে। এপ্রিল মাস থেকে নেপালজুড়ে নদীতীরবর্তী অবৈধ বসতি উচ্ছেদের এক দেশব্যাপী অভিযান শুরু হয়েছে, যার ফলে ২ হাজার ৬০০-এর বেশি পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই পুনর্বাসনের কোনো ব্যবস্থা করার আগেই এই উচ্ছেদ চালানো হয়।
সরকার অবশ্য এই অভিযানের পক্ষে সাফাই গেয়ে বলছে যে এটি অনেক আগেই হওয়া উচিত ছিল। দশকের পর দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা পূর্ববর্তী সরকারগুলো রাজনৈতিক ভীরুতার কারণে এই পাবলিক ল্যান্ড বা বন্যাপ্রবণ নদীতীরবর্তী অঞ্চলগুলো উদ্ধার করতে পারেনি, যা বালেন শাহর প্রশাসন অবশেষে করে দেখাচ্ছে।
কিন্তু বিক্ষোভকারী ও বিরোধী এমপিদের ক্ষোভ উচ্ছেদ নিয়ে নয়; বরং উচ্ছেদের পর অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে (যেমন কীর্তিপুরের কেন্দ্রটি) যেভাবে পানি ঢুকে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে। জেন-জি অ্যাকটিভিস্টরা যখন সেখানকার মানবিক পরিস্থিতি পরিদর্শন করতে যান, তখন তাঁদের ওপর লাঠিপেটা করা হয়, গ্রেপ্তার করা হয় এবং মুখের গুরুতর জখম নিয়ে অনেককে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়।
এর ঠিক দুই দিন পর, কাঠমান্ডুর তিনটি প্রধান সংবাদমাধ্যমের কার্যালয়ের প্রবেশদ্বার রহস্যজনকভাবে গাড়ি পার্ক করে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়—যে ঘটনাটি বর্তমানে তদন্তাধীন এবং যা নেপালের প্রতিনিধি সভায়ও (সংসদ) উত্থাপিত হয়েছে।
এই পুরো সংকটের নিচে চাপা পড়ে আছে আমলাতান্ত্রিক এক অদ্ভুত জটিলতা। বেআইনি পার্কিংয়ের একই অপরাধের জন্য পৌর পুলিশ এবং ন্যাশনাল ট্রাফিক পুলিশ সম্পূর্ণ দুটি ভিন্ন আইন এবং ভিন্ন জরিমানার বিধান কার্যকর করে। এই বিভ্রান্তি কিন্তু আকস্মিক নয়। ঠিক এই প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার জায়গাতেই পৌর পুলিশের সঙ্গে গণেশ নেপালির সেই বিরোধের সূত্রপাত ঘটেছিল—যদিও পুলিশ এখন দাবি করছে যে সেদিন জরিমানা তাৎক্ষণিক কোনো কারণ ছিল না।
১০০ দিন দিয়ে তো আর দশকের পর দশক ধরে জমে থাকা জঞ্জাল দূর করা যায় না। একই সীমানায় পুলিশের একাধিক বাহিনীর এখতিয়ারের জটিলতা, অমীমাংসিত বস্তি ও ভূমিহীন আইন—এসব জটিলতা তৈরি হয়েছে বালেন শাহের সরকারের অনেক আগের আমল থেকে।
কিন্তু তাঁর প্রশাসনের উচিত ছিল না পুনর্বাসনের কোনো বিকল্প ব্যবস্থা না করে এভাবে তাড়াহুড়ো করে উচ্ছেদ অভিযানে নেমে যাওয়া। এখন সেই মানুষগুলো আশ্রয়কেন্দ্রে অবর্ণনীয় কষ্টে দিন কাটাচ্ছে এবং সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছে।
নেপালের জেন-জি গত বছর রাস্তায় নেমে এমন এক সরকার গঠন করেনি যাকে তারা কোনো দিন কোনো প্রশ্ন করবে না। বরং তারা এমন এক প্রশাসন চেয়েছিল যাদের তারা প্রশ্ন করতে পারবে এবং তাদের কথা শোনা হবে। তারা এত দ্রুত আবার রাস্তায় নেমে এসেছে মানেই এই নয় যে তাদের এই রাজনৈতিক পরীক্ষা ব্যর্থ হয়ে গেছে। বরং এটি প্রমাণ করে যে পরীক্ষাটি এখনো চলছে।
বিগত তিন মাসে দুর্নীতির মামলায় রাজনৈতিক নেতাদের তড়িঘড়ি করে গ্রেপ্তার এবং এর পরপরই আদালত থেকে তাঁদের জামিনে মুক্তি পাওয়ার ঘটনাও নেপালের তরুণদের মধ্যে তীব্র হতাশা তৈরি করেছে।
দেশের পুরোনো পচন পরিষ্কার করার জন্য যে প্রশাসন নির্বাচিত হয়েছে, দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দায় তাদের অবশ্যই আছে। নদীতীরের অবৈধ দখলদারি দূর করার লক্ষ্য নিয়ে কারও কোনো আপত্তি ছিল না; এমনকি সরকারের কড়া সমালোচকরাও মানেন যে এই সমস্যার সমাধান দরকার ছিল। কিন্তু বড় ভুলটি হয়ে গেছে এর ধারাবাহিকতায়—প্রথমে উচ্ছেদ, তারপর আশ্রয়ের ব্যবস্থা (তা-ও যদি করা হয়)।
বালেন শাহ সরকারের উচিত হবে এই উচ্ছেদ অভিযানের ধারাবাহিকতার পক্ষে আর সাফাই না গেয়ে নিজেদের ভুল সংশোধন করা। বাস্তুচ্যুতদের জন্য সুনির্দিষ্ট ও যাচাইকৃত আবাসনের ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত পরবর্তী উচ্ছেদ স্থগিত করা দরকার। একই সঙ্গে নিজস্ব পুলিশ বাহিনী এবং ন্যাশনাল পুলিশের মধ্যকার আইনি এখতিয়ারের বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি করা উচিত। পাশাপাশি তিনটি সংবাদমাধ্যমের কার্যালয় অবরুদ্ধ করার পেছনের হোতাদের খুঁজে বের করাকে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রতি সরকারের শ্রদ্ধাবোধের বড় পরীক্ষা হিসেবে নেওয়া উচিত।
নেপালের জেন-জি গত বছর রাস্তায় নেমে এমন এক সরকার গঠন করেনি, যাকে তারা কোনো দিন কোনো প্রশ্ন করবে না; বরং তারা এমন এক প্রশাসন চেয়েছিল, যাদের তারা প্রশ্ন করতে পারবে এবং তাদের কথা শোনা হবে। তারা এত দ্রুত আবার রাস্তায় নেমে এসেছে মানেই এই নয় যে তাদের এই রাজনৈতিক পরীক্ষা ব্যর্থ হয়ে গেছে; বরং এটি প্রমাণ করে যে পরীক্ষাটি এখনো চলছে।
মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি, তবে সরকারের উচিত হবে না সবকিছুতে তাড়াহুড়ো করা এবং হঠকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া। আরেকটি প্রাণঘাতী বা বড় ধরনের সহিংস আন্দোলন দানা বাঁধার আগেই সরকারের উচিত মানুষের এই হতাশা এবং যৌক্তিক দাবিগুলোর দ্রুত সমাধান করা।
ব্রাবিম কারকি নেপালের ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও কলামলেখক
ফার্স্টপোস্ট থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ