মতামত

সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন: যোগ্যতার মূল্যায়ন নাকি সংযোগের পরীক্ষা

সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন এখন একেবারে দোরগোড়ায়। কাল এ বিষয়ে তফসিল ঘোষণার কথা। ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের মনোনয়ন ও নির্বাচিত হওয়ার হার ছিল অত্যন্ত কম। ফলে বহু যোগ্য নারী রাজনীতিক, তৃণমূলের লড়াকু কর্মী ও দীর্ঘদিনের সংগঠকদের কাছে এই ৫০টি সংরক্ষিত আসনই শেষ গুরুত্বপূর্ণ ভরসা।

কিন্তু বিভিন্ন পত্রিকার খবরে বলা হচ্ছে, অনেক রাজনৈতিক দলে ভেতরে-ভেতরে কারা সংরক্ষিত আসনে যাবেন, সে সিদ্ধান্ত নাকি অনেকটাই হয়ে গেছে। অথচ অধিকাংশ নারী এখনো জানেন না—আবেদন কোথায়, প্রক্রিয়া কী, মানদণ্ড কী, আর সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন কারা, অনেকেই পার্টি অফিসে সিভি জমা দিয়েছেন।

ফলে এই পুরো প্রক্রিয়া শুরু থেকেই নারীদের সামনে স্বচ্ছ ও ন্যায্য পথ না খুলে, বরং অনিশ্চয়তা, অস্বস্তি ও অদৃশ্য ক্ষমতার বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে আসছে। এই প্রক্রিয়াটি অনেকের কাছে যোগ্যতা ও মেধার লড়াইয়ের চেয়ে ‘অদৃশ্য ক্ষমতার খেলায়’ পরিণত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

কেন্দ্রমুখিতা ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য

সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অভাবে অনেক নারীকে এখন প্রভাবশালী নেতা বা মধ্যস্থতাকারীদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকার বাইরের নারীদের জন্য বিষয়টি আরও কঠিন। রাজনীতি যখন ত্যাগ বা অভিজ্ঞতার চেয়ে ‘কার মাধ্যমে নাম যাবে’ এই তত্ত্বে আটকে যায়, তখন সেখানে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ক্ষুণ্ন হয়।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, এই অস্বচ্ছতা পেশিশক্তি ও অনৈতিক লেনদেনের সুযোগ তৈরি করে। যখন নিয়ম পরিষ্কার থাকে না, তখন কিছু মানুষ নিজেদের ‘প্রভাবশালী মাধ্যম’ হিসেবে জাহির করে। এতে শুধু নারীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হন না, দলের ভাবমূর্তি ও রাজনৈতিক সততাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

নারী সংগঠনের নামমাত্র ভূমিকা

রাজনৈতিক দলগুলোর নিজস্ব নারী সংগঠন থাকলেও মনোনয়নপ্রক্রিয়ায় তাঁদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা সিদ্ধান্তমূলক ভূমিকা নেই বললেই চলে। যারা বছরজুড়ে মাঠের রাজনীতি সচল রাখেন, মনোনয়নপ্রক্রিয়ায় তাঁদের মতামত বা সুপারিশের কোনো স্তর না থাকাটা দুঃখজনক। ফলে যাঁরা দলের ভিত গড়েন, তাঁরা নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছেন। এটি নারী সংগঠনগুলোর কার্যকর ভূমিকা রাখার সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

গুণগত নেতৃত্বের সংকট

যদি সংরক্ষিত আসনে মনোনয়নের ভিত্তি রাজনৈতিক যোগ্যতা না হয়ে ব্যক্তিগত আনুগত্য হয়, তবে তার প্রভাব পড়ে সরাসরি সংসদে। এর ফলে অরাজনৈতিক বা অপ্রস্তুত ব্যক্তিরা সংসদে ঠাঁই পেতে পারেন। সংখ্যাতাত্ত্বিকভাবে নারীর উপস্থিতি বাড়লেও, আইন প্রণয়ন বা নীতি-আলোচনায় তাদের কার্যকর অংশগ্রহণ সংকুচিত হয়ে পড়ে। পরিশেষে, এই ব্যর্থতার দায় পুরো নারী নেতৃত্বের ওপর চাপিয়ে দিয়ে তাঁদের ‘অযোগ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করা সহজ হয়, যা অত্যন্ত অন্যায্য।

রাজনৈতিক বৈধতা ও জনপ্রতিনিধিত্ব

প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্রে স্বচ্ছতা অপরিহার্য। মনোনয়নের বর্তমান পদ্ধতিটি অনেক ক্ষেত্রে নির্বাচিত হওয়ার চেয়ে ‘মনোনীত’ বা ‘নির্ধারিত’ হওয়ার রূপ নিচ্ছে। এতে সংসদ সদস্যদের জনভিত্তি দুর্বল হয় এবং তাঁরা প্রকৃত জনপ্রতিনিধি হিসেবে আত্মবিশ্বাস নিয়ে কাজ করতে বাধাগ্রস্ত হন।

সুপারিশ ও উত্তরণ

রাজনীতি যদি সত্যিই অধিকার ও গণতন্ত্রের জায়গা হয়, তবে সেই পথটি হওয়া উচিত উন্মুক্ত ও মর্যাদাপূর্ণ। দলগুলোর কাছে প্রত্যাশা:

• প্রকাশ্য আহ্বান: সংরক্ষিত আসনের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন আহ্বান ও সময়সীমা ঘোষণা করা।

• স্পষ্ট মানদণ্ড: যোগ্যতার সুনির্দিষ্ট মাপকাঠি ও মনোনয়ন বোর্ডের গঠনপ্রক্রিয়া প্রকাশ করা।

• ডিজিটাল ও স্থানীয় সমন্বয়: জেলা পর্যায় ও অনলাইনে আবেদন গ্রহণের মাধ্যমে প্রক্রিয়াকে সহজতর করা।

• কাঠামোগত সংস্কার: মনোনয়ন বাছাইপ্রক্রিয়ায় দলীয় নারী সংগঠনের ভূমিকা নিশ্চিত করা।

নারীদের জন্য শুধু আসন বরাদ্দ করাই যথেষ্ট নয়, সেই আসনে পৌঁছানোর পথটি হতে হবে স্বচ্ছ ও সম্মানজনক। রাজনৈতিক দলগুলো যদি ‘গোপন করিডর’ বন্ধ করে ‘স্বচ্ছ দরজা’ উন্মুক্ত করে, তবেই প্রকৃত নারী নেতৃত্ব গড়ে উঠবে এবং গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে।

  • লিপিকা বিশ্বাস নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নবিষয়ক বিশ্লেষক; সিনিয়র ডিরেক্টর, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল

    মতামত লেখকের নিজস্ব