
গত মঙ্গলবার এক নাটকীয় মুহূর্তে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন, ‘আজ রাতেই একটি পুরো সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।’ কিন্তু হঠাৎই সুর বদলে তিনি দুই সপ্তাহ সময় নেওয়ার ঘোষণা দেন। ঠিক হয়, এই সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আলোচনায় বসবে আর আড়াল থেকে নজর রাখবে ইসরায়েল।
ঘটনাটি যেন একধরনের বৈপরীত্যের ছবি। সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র নিঃসন্দেহে অনেক এগিয়ে, কিন্তু কৌশলগত দিক থেকে ইরান এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে, যা উপেক্ষা করা যায় না। কারণ, তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বিশ্বের তেল পরিবহনের অন্যতম প্রধান পথ হরমুজ প্রণালি। এই প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ মানে জ্বালানির দাম থেকে শুরু করে বৈশ্বিক শেয়ারবাজার পর্যন্ত বড় প্রভাব বিস্তার করার ক্ষমতা।
এই বাস্তবতায় অনেকের আশঙ্কা, ইরান যুদ্ধও শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের আগের ব্যর্থ যুদ্ধগুলোর মতোই পথে হাঁটতে পারে। ইতিহাসের দিকে তাকালেই সেই আশঙ্কার ভিত্তি পাওয়া যায়। ষাট ও সত্তরের দশকের ভিয়েতনাম যুদ্ধ—এ যুদ্ধক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র বহুবার এগিয়ে থাকলেও শেষ পর্যন্ত পরাজয় এড়াতে পারেনি। টেলিভিশনের পর্দায় যুদ্ধের নির্মমতা, সরকারের বিভ্রান্তিকর তথ্য এবং ৫৮ হাজার মার্কিন সেনার মৃত্যু—সব মিলিয়ে দেশের ভেতরেই ভেঙে পড়ে জনসমর্থন।
আফগানিস্তানেও প্রায় একই চিত্র। দুই দশক ধরে বিপুল অর্থ খরচ করে রাষ্ট্র গঠনের চেষ্টা করা হলেও সেই কাঠামো টিকতে পারেনি তালেবানের সামনে। আবার ২০০৩ সালে ইরাকে হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র সাদ্দাম হোসেনের শাসন সরাতে সফল হলেও, দেশটিকে ঠেলে দেয় দীর্ঘস্থায়ী বিশৃঙ্খলার মধ্যে। সেই অস্থিতিশীলতার প্রভাব পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত তা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্যই বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায়।
এই ধারাবাহিক ব্যর্থতার পেছনে রয়েছে কিছু পুরোনো ভুল। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব বারবার যুদ্ধের বাস্তবতা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। অনেক সময় পর্যাপ্ত জ্ঞান ছাড়া সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যুদ্ধের যৌক্তিকতা যাচাই করা হয়নি, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে নিজেদের শক্তিকে অতিমূল্যায়ন করা হয়েছে। একই ধরনের চিন্তায় আটকে থাকা এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে সম্ভাব্য পরিণতি ঠিকভাবে বিবেচনায় আনা হয়নি। ফলে কৌশলগত ভুল সিদ্ধান্তই হয়ে উঠেছে নিয়ম।
ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রেও যেন সেই পুরোনো ভুলগুলোই আবার ফিরে এসেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে যত সামরিক মহড়া বা পরিকল্পনা হয়েছে, প্রায় সব ক্ষেত্রেই একটি বিষয় স্পষ্ট ছিল—হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাহলে কি এই ঝুঁকির কথা ট্রাম্পকে কেউ বলেনি, নাকি তিনি তাতে গুরুত্ব দেননি—এই প্রশ্ন উঠছেই।
এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে, যুদ্ধের প্রতিটি লড়াই জিতলেই পুরো যুদ্ধ জেতা যায় না। যেমনটি হয়েছিল ভিয়েতনাম বা আফগানিস্তানে, তেমনি ইরানও একটি ভিন্ন কৌশল নিয়েছে। তারা হারবে না, এটুকুই তাদের লক্ষ্য। আর সেই কৌশলের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা।
আরও প্রশ্ন রয়েছে। কেন তিনি যুদ্ধের পথে হাঁটলেন? ভ্লাদিমির পুতিন যেমন ভেবেছিলেন কয়েক দিনের মধ্যেই কিয়েভ দখল হয়ে যাবে, সেভাবে কেন তিনি ইরানে তাঁর নিজের ভাষায় ‘অভিযান’ শুরু করলেন? সেই হিসাব যেমন ভুল প্রমাণিত হয়েছে, তেমনি এখানেও বাস্তবতা ভিন্ন পথে হাঁটছে।
যুদ্ধ শুরুর আগেই যে ভুল–বোঝাবুঝি ও অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস কাজ করছিল, তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে ট্রাম্পের আলোচক দলকে দেখে। স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার—দুজনেরই পারমাণবিক অস্ত্র বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান ছিল না। ফলে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় তাঁরা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেননি। একই সঙ্গে হোয়াইট হাউস ভুলভাবে ধরে নিয়েছিল, ইরান খুব দ্রুত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রস্তুত করবে, যা ছিল অতিরঞ্জিত ধারণা।
ভেনেজুয়েলায় আগের এক অভিযানের সাফল্যও ট্রাম্পকে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। তিনি ইসরায়েলের সেই ধারণায় বিশ্বাস করেন, তেহরানের সরকার দ্রুত ভেঙে পড়বে। কিন্তু বাস্তবতা একেবারেই অন্য কথা বলছে।
এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে, যুদ্ধের প্রতিটি লড়াই জিতলেই পুরো যুদ্ধ জেতা যায় না। যেমনটি হয়েছিল ভিয়েতনাম বা আফগানিস্তানে, তেমনি ইরানও একটি ভিন্ন কৌশল নিয়েছে। তারা হারবে না, এটুকুই তাদের লক্ষ্য। আর সেই কৌশলের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা।
বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি, সার উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় ফসফেট এবং চিপ তৈরির জন্য অপরিহার্য হিলিয়ামের বড় অংশ এই অঞ্চল ঘিরেই ঘোরে। ফলে সংঘাত দীর্ঘ হলে তার অভিঘাত যে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মারাত্মক হবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
ইরানের কাছে তাই সাফল্যের মানদণ্ড একেবারেই ভিন্ন। তারা দেখছে না কতটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ধ্বংস হলো বা কতটি ঘাঁটিতে আঘাত হানা গেল। বরং তাদের নজর যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে—জ্বালানির দাম কতটা বাড়ছে, শেয়ারবাজার কতটা নড়বড়ে হয়ে উঠছে।
এই যুদ্ধ শুরুর সময় থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে এর বিরোধিতা ছিল প্রবল। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আমেরিকান এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। জ্বালানির দাম বাড়া এবং মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা—এসব মিলিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে সামাজিক অসন্তোষ আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের সামনে এখন মাত্র দুটি পথ, তবে কোনোটিই সহজ নয়। লিন্ডন বি জনসন যেমন ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় দোটানায় পড়েছিলেন, তেমনি ট্রাম্পও এখন হয় ইরানের শর্ত মেনে নেবেন, নয়তো যুদ্ধ আরও বাড়িয়ে দীর্ঘ এক সংঘাতে জড়িয়ে পড়বেন।
এই মুহূর্তে ট্রাম্প আপাতত আলোচনার পথ বেছে নিয়েছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যে পথই বেছে নিন না কেন, ট্রাম্প এমন এক পরিস্থিতিতে নিজেকে আটকে ফেলেছেন, যেখানে ভালো কোনো বিকল্প নেই।
হারলান উলম্যান ওয়াশিংটনভিত্তিক আটলান্টিক কাউন্সিলের সিনিয়র উপদেষ্টা
আল–জাজিরা থেকে নেওয়া; অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ