
বিক্ষোভের দিন, ১০ ও ১১ অক্টোবর দিল্লির সড়ক থেকে উঠে আসা দৃশ্যগুলো ভয়াবহ এবং গভীরভাবে উদ্বেগজনক। উদ্বেগের কারণ শুধু এই নয় যে হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে পুলিশের চোখের সামনে নারীসহ বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা করার অভিযোগ উঠেছে; একইভাবে উদ্বেগজনক হলো, ইউনিফর্ম পরা সদস্যদের আচরণের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ। তাঁদের দেখে মনে হয়েছে, জবাবদিহির মুখোমুখি হওয়ার কোনো ভয়ই তাঁদের নেই। সেদিনের ভিডিও ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ থেকে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে—নারীদের সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব যাঁদের, তাঁরাই তাঁদের শরীরে অশালীনভাবে স্পর্শ করেছেন এবং যৌন হয়রানি করেছেন।
আইনের রক্ষকদের বিরুদ্ধেই যদি এমন আচরণের অভিযোগ ওঠে, তাহলে সাধারণ নাগরিকেরা কী সুরক্ষা আশা করতে পারেন? প্রায়ই ভারতের ‘ধর্ষণের রাজধানী’ হিসেবে বর্ণিত দিল্লি এখনো নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছে। এই পরিস্থিতি গোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক ভয়াবহ অভিযোগ তুলে ধরে।
পুলিশ যেভাবে বিক্ষোভ মোকাবিলা করেছে, তা আরও কিছু উদ্বেগজনক প্রশ্ন সামনে আনে। কঠোর দমন-পীড়নের পাশাপাশি ঘটনাগুলো নথিবদ্ধ করতে যাওয়া সাংবাদিক ও ইউটিউবারদের ওপর বিধিনিষেধ দেখে মনে হয়, পুরো ঘটনা প্রকাশ্যে আসা ঠেকাতে কর্তৃপক্ষ বদ্ধপরিকর ছিল। স্বাধীনভাবে সংবাদ সংগ্রহে বাধা দেওয়ায় এখন যে ভিডিও ও প্রতিবেদন পাওয়া যাচ্ছে, তা হয়তো সেদিন দিল্লির সড়কে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর সামান্য অংশমাত্র।
পুলিশের বিরুদ্ধে বাড়াবাড়ির অভিযোগের পাশাপাশি খবর পাওয়া গেছে, ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভে যোগ দিতে বিক্ষোভকারীরা যখন যন্তর মন্তরের দিকে যাচ্ছিলেন, তখন কয়েকটি ডানপন্থী হিন্দু সংগঠন তাঁদের এবং সাংবাদিকদের হুমকি দিয়েছে, ভয় দেখিয়েছে ও শারীরিকভাবে আক্রমণ করেছে। বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যায়, নারীরাও রেহাই পাননি।
এসব ঘটনা ঘটেছে পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতিতে। এতে একটি মৌলিক প্রশ্ন ওঠে: বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলার অভিযোগ যাঁদের বিরুদ্ধে, তাঁদের প্রায় বাধাহীনভাবে কাজ করতে দেখা গেল, অথচ বিক্ষোভকারীদের ওপর কেন চাপানো হলো ব্যাপক বিধিনিষেধ? এর উত্তর হয়তো একটি উদ্বেগজনক সম্ভাবনার মধ্যে নিহিত—নির্দেশ এসেছিল ওপর থেকে।
বিজেপি কি ইতিহাসের অন্ধকারতম অধ্যায়গুলো থেকে কৌশল ধার করেছে—যখন কর্তৃত্ববাদী আন্দোলনগুলো বিরোধীদের ভয় দেখাতে এবং ভিন্নমত দমনে সমমনা রাস্তার গোষ্ঠীগুলোর ওপর নির্ভর করত? এমন প্রশ্ন মনে না এসে পারে না। আমরা কি পুলিশের রাজনীতিকীকরণ প্রত্যক্ষ করছি, যেখানে হিন্দুত্ববাদী আদর্শের প্রতি সহানুভূতিশীলদের দায়মুক্তভাবে কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে? পেগাসাসের মতো নজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহারের অভিযোগের বাইরে, সরকার কি ভিন্নমত দমনে এমন পদ্ধতিও গ্রহণ করেছে, যা ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইসরায়েলের আচরণ মনে করিয়ে দেয়?
এগুলো গুরুতর প্রশ্ন; রাজনৈতিক সুবিধার জন্য সেগুলোকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
কাশ্মীরিরা বছরের পর বছর বিধিনিষেধ, ভয়ভীতি এবং ভিন্নমত দমনের শিকার হয়েছেন—বিশেষ করে ২০১৯ সালে অসাংবিধানিকভাবে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের পর থেকে। তাঁদের ‘দেশবিরোধী’ তকমা দেওয়া হয়েছে, তাঁদের মানবিক মর্যাদা অস্বীকার করা হয়েছে, আরও কত কিছুই না করা হয়েছে। তবে সে আলোচনা আরেক দিনের জন্য থাক। আজ উদ্বেগ ভারতের বাকি অংশ নিয়ে। জাতীয় রাজধানীতে ঘটতে থাকা দৃশ্যগুলো দেখে মনে হচ্ছে, গোটা দেশকেই যেন আরও বড় এক কাশ্মীরে পরিণত করা হচ্ছে।
রাহুল গান্ধী বারবার এসব বিষয় তুলে ধরেছেন এবং জাতির বিবেককে জাগানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু প্রায়ই তাঁকে একা মনে হয়েছে। এমনকি তাঁর নিজের দলের সদস্যরাও সব সময় তাঁর মতো অবিচল থাকেননি। অন্যদিকে অনেক বিরোধী দলকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার আশঙ্কায় এমন একটি সরকারের মুখোমুখি হতে অতিমাত্রায় ভীত বলে মনে হয়েছে, যে সরকার ক্রমেই ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণু হয়ে উঠছিল।
তবু একটি পার্থক্য আছে, আছে একচিলতে আশার আলো। এবার মানুষ প্রতিবাদে সরব হচ্ছেন।
বছরের পর বছর মুসলমানদের পিটিয়ে হত্যা করা, বিলকিস বানু মামলার দণ্ডিতদের মুক্তি দিয়ে ফুলের মালায় বরণ করা এবং মুসলমানদের বাড়িঘর ও মসজিদ ভেঙে ফেলার ঘটনা দেখা ছিল গভীরভাবে হতাশাজনক। এসব ঘটনায় সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের বড় অংশের মধ্যে প্রায়ই তেমন ক্ষোভ দেখা যায়নি। এরপর এল হাথরসের ঘটনা, যেখানে এক দলিত নারীকে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়। উত্তর প্রদেশের কর্তৃপক্ষ তাঁর পরিবারকে নিজেদের ইচ্ছামতো শেষকৃত্য করতে না দিয়ে মরদেহ দাহ করে ফেলে।
অথচ এত বড় অন্যায়ের তুলনায় জনসাধারণের প্রতিক্রিয়া ছিল অপ্রতুল।
বিজেপির এক নেতার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তোলা তরুণী কুস্তিগিরদের প্রতিবাদের সময় দিল্লির সড়ক দিয়ে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গিয়েছিল পুলিশ। আবারও জনক্ষোভ ঘটনাটির গুরুত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। এমনকি রামমন্দিরে ভক্তদের দেওয়া নিবেদন চুরির খবরও প্রত্যাশিত মাত্রায় জনরোষ সৃষ্টি করতে পারেনি। প্রায়ই মনে হতো, দেশের বড় একটি অংশকে যেন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন করে রাখা হয়েছে; অন্যায় যতক্ষণ অন্য কারও ওপর হচ্ছে, ততক্ষণ তা তাদের বিচলিত করছে না।
আমাদের মধ্যে যাঁরা, বিশেষ করে কাশ্মীরে—সুবিধার জন্য নয়, দৃঢ় বিশ্বাস থেকে ভারত এবং ভারতের আদর্শে আস্থা রাখেন—তাঁদের কাছে অন্যায়ের এই স্বাভাবিক হয়ে ওঠা ছিল গভীর হতাশার কারণ। যে সাংবিধানিক মূল্যবোধ আমরা গ্রহণ করেছি এবং যার সঙ্গে আত্মিক বন্ধন গড়ে তুলেছি, তা পদে পদে ক্ষুণ্ন হচ্ছে। অথচ কী ঘটছে, তার মুখোমুখি হতে দেশকে অনিচ্ছুক মনে হয়েছে।
রাহুল গান্ধী বারবার এসব বিষয় তুলে ধরেছেন এবং জাতির বিবেককে জাগানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু প্রায়ই তাঁকে একা মনে হয়েছে। এমনকি তাঁর নিজের দলের সদস্যরাও সব সময় তাঁর মতো অবিচল থাকেননি। অন্যদিকে অনেক বিরোধী দলকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার আশঙ্কায় এমন একটি সরকারের মুখোমুখি হতে অতিমাত্রায় ভীত বলে মনে হয়েছে, যে সরকার ক্রমেই ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণু হয়ে উঠছিল।
এরপর সামনে এল ককরোচ জনতা পার্টি এবং তরুণ ভারতীয়দের এমন এক প্রজন্ম, যারা নীরব থাকতে অস্বীকৃতি জানাল। কিছু একটা বদলাতে শুরু করল। যে দেশ অন্যায় মেনে নিয়েছে বলে মনে হচ্ছিল, সেই দেশ নড়েচড়ে উঠতে শুরু করল। তরুণ-তরুণীরা রাস্তায় নামলেন, এমন সব প্রশ্ন তুললেন, যেগুলোর উত্তর বছরের পর বছর মেলেনি। দেশজুড়ে আবার শোনা যেতে শুরু করল সংবিধান রক্ষা এবং হিন্দু-মুসলিম ভ্রাতৃত্বের স্লোগান।
মেহবুবা মুফতি পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টির শীর্ষ নেতা এবং জম্মু ও কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী
দ্য ওয়ার থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত এবং কিছুটা সংক্ষেপিত।