নাসার টেরা স্যাটেলাইটে ধারণ করা ছবিতে হরমুজ প্রণালি। নাসা আর্থ অবজারভেটরির সরবরাহ করা
নাসার টেরা স্যাটেলাইটে ধারণ করা ছবিতে হরমুজ প্রণালি। নাসা আর্থ অবজারভেটরির সরবরাহ করা

মতামত

আমেরিকার হরমুজ-দুর্বলতাকে যেভাবে হাতিয়ার বানাল ইরান

শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে স্বীকার করতেই হচ্ছে হরমুজ প্রণালি শুধু একটি সামুদ্রিক পথ নয়, এটি ইরানের অস্তিত্ব ও কৌশলের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ২০২৬ সালের বসন্তে দাঁড়িয়ে বিশ্ব আবার নতুন করে বুঝছে, আধুনিক যুদ্ধের হিসাব শুধু অস্ত্রের শক্তিতে মাপা যায় না; ভূগোল এখানে বড় নির্ধারক।

 বহু দশক ধরে পশ্চিমা শক্তিগুলোর মধ্যে একটি বিশ্বাস ছিল—বিশাল নৌবহর, বিমানবাহী রণতরি ও উন্নত প্রযুক্তির জোরে তারা চাইলে যেকোনো সময় এই জলপথ খোলা রাখতে পারবে। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, সেই ধারণা আজ বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে।

হরমুজ প্রণালির সবচেয়ে সরু অংশ মাত্র ২১ মাইল চওড়া। কিন্তু এই অল্প জলরেখাই বিশ্ব অর্থনীতির প্রাণরস বহন করে। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়ে যায়। প্রণালির দুই পাশে রয়েছে ওমান ও ইরানের উপকূল। জাহাজ চলাচলের নির্দিষ্ট পথ এতটাই সীমিত যে বড় ট্যাংকারগুলোকে প্রায় একই রুট ধরে চলতে হয়। ফলে এগুলো হয়ে ওঠে সহজ লক্ষ্য। ইরান এই দুর্বলতাকে শক্তিতে পরিণত করেছে।

ইরানের উত্তর উপকূল পাহাড়ি, গুহাময় এবং লুকানো ঘাঁটিতে ভরা। এখানেই গড়ে উঠেছে তাদের বিকেন্দ্রীভূত প্রতিরক্ষাকাঠামো। কেন্দ্র থেকে নির্দেশনা এলেও স্থানীয় ইউনিটগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। ফলে শত্রুপক্ষ কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে আঘাত করলেও যুদ্ধ থামে না। ছোট ছোট ইউনিট ছড়িয়ে থেকে লড়াই চালিয়ে যেতে পারে। সমুদ্রপথে মাইন পাতা, দ্রুতগতির নৌযান, ড্রোন এবং মোবাইল ক্ষেপণাস্ত্র—সব মিলিয়ে এক জটিল প্রতিরক্ষাবলয় তৈরি হয়েছে।

গত ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হাজার হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ফল আসেনি। স্থির ঘাঁটি ধ্বংস হলেও মোবাইল অস্ত্র দ্রুত স্থান বদল করেছে। একটি ঘাঁটি ধ্বংস হলে আরেকটি সক্রিয় হয়েছে। ফলে যুদ্ধ একধরনের দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থায় পৌঁছেছে। দ্রুত জয়লাভের যে ধারণা ছিল, তা ভেঙে পড়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি পুরো শক্তি দিয়ে প্রণালি খুলতে যায়, তবে সেটি উল্টো বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। কারণ, ইরানের প্রতিক্রিয়া শুধু সমুদ্রে সীমাবদ্ধ থাকবে না; উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো, যেমন পানি শোধনাগার বা তেল প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র হামলার লক্ষ্য হতে পারে। এতে শুধু যুদ্ধক্ষেত্র নয়, পুরো অঞ্চলের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে।

সম্প্রতি প্রণালিটি বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য আবার খুলে দেওয়া হয়েছে বলে ঘোষণা এসেছে। কিন্তু এটি কোনো নিঃশর্ত সিদ্ধান্ত নয়। এটি লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। অর্থাৎ আঞ্চলিক রাজনীতির সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহকে একসুতায় বেঁধে ফেলেছে ইরান। এ কৌশল তাদের প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত করেছে।

এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র এক অদ্ভুত দ্বিধায় পড়েছে। একদিকে তারা শক্ত অবস্থান দেখাতে চায়, অন্যদিকে বড় সংঘাত এড়িয়ে চলতে বাধ্য হচ্ছে। তাই একদিকে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখা হচ্ছে, অন্যদিকে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। এ দুইয়ের সমন্বয়েই তারা পরিস্থিতি সামাল দিতে চাইছে।

সম্প্রতি প্রণালিটি বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য আবার খুলে দেওয়া হয়েছে বলে ঘোষণা এসেছে। কিন্তু এটি কোনো নিঃশর্ত সিদ্ধান্ত নয়। এটি লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। অর্থাৎ আঞ্চলিক রাজনীতির সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহকে একসুতায় বেঁধে ফেলেছে ইরান। এ কৌশল তাদের প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত করেছে।

জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রেও নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। নির্দিষ্ট রুট মেনে চলা এবং তত্ত্বাবধানে যাত্রা করার মতো শর্ত সামনে এসেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক আইনের প্রচলিত ধারণা—সমুদ্রপথে অবাধ চলাচল—প্রশ্নের মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে নিরাপত্তার নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও উঠছে। কিছু ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে বলে জানা যাচ্ছে, যা একধরনের অপ্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ইঙ্গিত দেয়।

এই সংকটে চীন ও ভারতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ দুই দেশই এই প্রণালির তেলের ওপর নির্ভরশীল। তাই তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নীরব কিন্তু সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছে। বিশেষ করে চীন আঞ্চলিক সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। তাদের জন্য এই পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে সরাসরি অর্থনৈতিক চাপ।

ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে আলোচনা চলছে, তা দীর্ঘদিনের বৈরিতার প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য গভীর হলেও আলোচনা চালু থাকাটাই বড় বিষয়। যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করুক। অন্যদিকে ইরান চায় নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হোক এবং বাইরের সামরিক চাপ কমানো হোক।

এ আলোচনায় অর্থনৈতিক বিষয়ও বড় হয়ে উঠেছে। বিদেশে আটকে থাকা ইরানের অর্থ ছাড় করা হবে কি না, তা নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। এটি এখন আস্থার পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। যদি এ বিষয়ে সমঝোতা হয়, তবে বড় ধরনের চুক্তির পথ খুলতে পারে।

  • ড. জান্নুস টি এইচ সিয়াহান একজন আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক

    মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত