
সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশ লাইনসে জেলা পুলিশের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে উচ্চ শব্দে গান বাজানোকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পণ্ড হয়েছে, আহত হয়েছেন অন্তত ৩০ জন।
পত্রিকার ভাষ্যে জানা যাচ্ছে, পরীক্ষা থাকায় উচ্চ শব্দে গান বাজানো নিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বাদানুবাদ থেকে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়েছিল। অন্যদিকে, প্রায় একই সময়ে ‘ইমাম-উলামা পরিষদ, কিশোরগঞ্জ সদর শাখা’র আপত্তিতে কিশোরগঞ্জে একটা কনসার্ট আয়োজনও বাতিল হয়েছে। আবার, বিভিন্ন গোষ্ঠীর তরফ থেকে ঈদে-মিলাদুন্নবী অনুষ্ঠানের আয়োজন বাতিলের দাবিও শোনা যাচ্ছে।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বাতিল বা হামলার যে প্রবণতা শুরু হয়েছিল, সেটা এখনো পুরোদমে বজায় আছে। তবে সরকারের প্রতিক্রিয়ায় অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে বর্তমান সরকারের মধ্যে কিছুটা পার্থক্যও দেখা যাচ্ছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনা নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মন্তব্য করেছেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া এলাকাটা এ রকম যে গান-বাজনা-সিনেমা বহু বছর ধরে তাদের মধ্যে নিষিদ্ধের মতো আরকি। ওখানকার পরিস্থিতি আলাদা।’ (সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক)
এখন যদি ধরেও নিই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনা বিচ্ছিন্ন; পত্রিকা মারফত জানা যাচ্ছে, গানের উচ্চ শব্দ ও পরীক্ষা নিয়ে বাদানুবাদের সূত্রপাত ঘটেছিল। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তো এটাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ‘গান-বাজনা-সিনেমা’ নিষিদ্ধের স্থানিক ‘বৈশিষ্ট্য’ আকারে চিহ্নিত করছেন।
অর্থাৎ তিনিও এ ঘটনাকে কেবল তাৎক্ষণিক বাদানুবাদ হিসেবে দেখছেন না, বরং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনার প্রবণতা হিসেবেই দেখছেন। এই তো মাস দুয়েক আগে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করেও সেখানে তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এখানে শুধু প্রবণতার কথা উল্লেখ করছেন না; বরং হামলা, সংঘর্ষসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বাতিলের ঘটনার ন্যায্যতা প্রদান করছেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবে যেখানে তাঁর দায়িত্ব হচ্ছে, নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সেখানে তিনি উল্টো যারা নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে, তাদের কর্মকাণ্ডের পক্ষে বৈধতা উৎপাদন করছেন। যারা দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হামলা করছে ও বাতিল করতে বাধ্য করছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য তাদের আরও উৎসাহ জোগাবে ও উসকে দেবে।
সাংস্কৃতিক পরিসরের সংকোচন দেখা যাচ্ছে, তেমনি রাজনৈতিক পরিসরেও সংকোচনের আলামতও দেখা যাচ্ছে। একদিকে যারা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পণ্ড করতে চাইছে, তাদেরকে সরকার উৎসাহ জোগাচ্ছে, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রশাসনিক অজুহাতে রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে বাঁধা দিচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এ ধরনের প্রবণতার বৃদ্ধি ও সরকারের নিষ্ক্রিয়তার সমালোচনা করা হয়েছে। কিন্তু অন্তত সেই সরকার এসব ঘটনার ক্ষেত্রে একটা বিবৃতি দিয়ে নিন্দা জানাত। এমনকি উল্টো ঘটনারও নজির আছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জয়পুরহাটে মাঠে ‘তৌহিদি জনতা’র ব্যানারে স্থানীয় একটা গোষ্ঠীর ভাঙচুরের পর নারীদের ফুটবল ম্যাচ বাতিল হয়ে গিয়েছিল।
এরপর প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে নারীদের ফুটবল ম্যাচ ফের আয়োজন করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। ভাঙচুরের ঘটনায় সেখানে গণশুনানির আয়োজন করা হয়, যাঁরা ভাঙচুর করেছিলেন, তাঁরা পরে জানিয়েছিলেন, ফুটবল ম্যাচ আয়োজনে আর বাধা দেবেন না। এরপর হাজারো দর্শকের উপস্থিতিতে জয়পুরহাটের মাঠে খেলার আয়োজন করা হয়। এই ছোট ঘটনা আসলে প্রমাণ করে, সরকার চাইলে বা সক্রিয় হলে দমন-পীড়নের তরিকা পরিহার করেও এসব আয়োজন চালু রাখতে পারে।
কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, নির্বাচিত সরকার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে বরং বাতিল করা এবং যারা বাতিল করছে, তাদেরকে বৈধতা প্রদানের দিকেই মনোযোগ দিচ্ছে।
এর পাশাপাশি ঢাকায় আরেকটি ঘটনার দিকে আমরা নজর দিতে পারি। ২২ আগস্ট রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সংস্কারের দাবিতে পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী অহিংস গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ভূমিহীন আন্দোলন ও বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের উদ্যোগে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে একটি সমাবেশ হওয়ার কথা ছিল।
নিয়মতান্ত্রিকভাবে সব অনুমতি নেওয়া হলেও ডিএমপি কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ দর্শানো ছাড়াই শেষ মুহূর্তে এসে এই সমাবেশ কর্মসূচি পালনের অনুমতি দেওয়া হলো না বলে জানায়। পরে পুলিশ জানায়, তিনটা সংগঠনের মধ্যে অহিংস গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশ নামক সংগঠনটির বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় মামলা থাকার কারণে সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি।
প্রথমত, এই সমাবেশ কোনো রাস্তা আটকে করার কথা ছিল না; ফলে আইনশৃঙ্খলা বা জনগণের ভোগান্তির কোনো বিষয় জড়িত নয়। দ্বিতীয়ত, শহীদ মিনারে অনুষ্ঠানের জন্য প্রয়োজন ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি, সেটাও নেওয়া হয়েছিল। তৃতীয়ত, পুলিশের দায়িত্ব ছিল সেখানে নিরাপত্তা প্রদান করা। কিন্তু দেখা যাচ্ছে একটা সংগঠনের নামে মামলা থাকার অজুহাতে সেই সমাবেশ বন্ধ করে দেওয়া হলো।
পুলিশের এই যুক্তি অত্যন্ত বিপজ্জনক। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি প্রধান রাজনৈতিক দল বা তাদের নেতা-কর্মীদের নামে একাধিক মামলা রয়েছে। মামলার অজুহাতে যদি শহীদ মিনারে সভা-সমাবেশ বন্ধ করা হয়, তবে কালক্রমে যেকোনো রাজনৈতিক কর্মসূচির পথরুদ্ধ করার অস্ত্র হিসেবে এটিকে ব্যবহার করা হবে।
সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক—দুই পরিসরের ঘটনাগুলো থেকে পরিলক্ষিত হচ্ছে যে জনপরিসর ক্রমেই সংকুচিত করার প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে। সেই সংকোচন প্রক্রিয়াতে রাষ্ট্রের যে সম্মতিও রয়েছে, তা ব্রাহ্মণবাড়িয়া নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য ও শহীদ মিনারের সমাবেশে পুলিশের বক্তব্য থেকে স্পষ্টও। উল্লেখ্য, অভ্যুত্থানের পর যত মাজার, দরবারে হামলা হয়েছিল, তাঁর অধিকাংশই হামলার পর আর খোলেনি। (আজকের পত্রিকা, ১৮ এপ্রিল ২০২৬)।
এর আরেক অর্থ হচ্ছে, সমাজে নাগরিক বিভিন্ন পরিসরের ওপর হামলার পরিপ্রেক্ষিতে পরিসর কেবল সংকুচিত হচ্ছে।
জনপরিসর কেবল ভৌগোলিক কোনো জায়গা (যেমন শহীদ মিনার বা মাঠ) নয়; এটি নাগরিক অধিকার, সাংস্কৃতিক চর্চা ও রাজনৈতিক মতপ্রকাশের মুক্ত স্থান। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক রূপান্তরের অপরিহার্য শর্ত হচ্ছে, এ ধরনের পরিসরের বিচিত্রতা ও ব্যাপকতা বৃদ্ধি। আওয়ামী লীগের কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠার পেছনে এ ধরনের পরিসরের সংকোচন এবং পরিসরে সবার অংশগ্রহণকে সীমিত করে তোলার প্রক্রিয়া ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল।
এই পরিসর এক ও সমরূপী হতে হবে এমন নয়। বরং সমাজের বিভিন্ন ধরনের মতাদর্শ, বাদপ্রতিবাদ সব থাকবে সেখানে। যাঁরা সিনেমা, গান আয়োজন করতে চান, তাঁরা যেমন করতে পারবেন; তেমনি যাঁরা গান-সিনেমা পছন্দ করেন না, তাঁরাও এর বিরুদ্ধে ওয়াজ-মাহফিল আয়োজন করতে পারবেন। তাঁরাও তাঁদের অপছন্দের কথা জানাবেন। এই সহাবস্থান নিশ্চিত করার দায়িত্ব হচ্ছে রাষ্ট্রের।
কিন্তু গান-সিনেমা-কনসার্টের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো এক জিনিস এবং সেখানে হামলা করা ও বাতিল করা আরেক জিনিস। যখন বাতিল ও হামলা করা হয়, তখন আসলে সহনাগরিকের অস্তিত্ব ও সহাবস্থানের পূর্বশর্তকেই হুমকিতে ফেলে দেওয়া হয়। এটা আর কেবল ভিন্ন মত বা ভিন্ন মতাদর্শের বিষয় থাকে না। নাগরিকের জান ও মালের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা যেমন সমাজের সব মতাদর্শিক গোষ্ঠীর ভেতর থেকে আসতে হবে, তেমনি সবার আগে রাষ্ট্রকেই এই দায়িত্ব পালন করতে হবে।
সাংস্কৃতিক পরিসরের সংকোচন দেখা যাচ্ছে, তেমনি রাজনৈতিক পরিসরেও সংকোচনের আলামতও দেখা যাচ্ছে। একদিকে যারা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পণ্ড করতে চাইছে, তাদেরকে সরকার উৎসাহ জোগাচ্ছে, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রশাসনিক অজুহাতে রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে বাঁধা দিচ্ছে।
কিন্তু, কোনো অজুহাতেই জনপরিসরকে সংকুচিত করা যাবে না। দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংস্কৃতিক পরিসরের ওপর চলমান হামলা থেকে নিরাপত্তা দিয়ে নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। এখন রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী যদি সাংস্কৃতিক পরিসরে হামলাকারীদের অবস্থানকেই বৈধতা দিতে থাকেন, তাহলে এটা বর্তমান পরিস্থিতির কোনো উন্নতি তো ঘটাবেই না, উল্টো পরিসর আরও সংকুচিত করে তুলবে।
যদি এভাবে নানা অজুহাতে নাগরিক পরিসর ক্রমে সংকুচিত হতে থাকে, তবে কেবল গণতান্ত্রিক রূপান্তরই নয়, বরং খোদ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্য এক মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনবে।
সহুল আহমদ লেখক ও গবেষক।
*মতামত লেখকের নিজস্ব